তরিকুল ইসলাম তাকি
মতিঝিল-পল্টন প্রতিনিধি
গ্রামবাংলার সমাজব্যবস্থায় সব প্রভাবশালী মানুষ খারাপ নন। অনেকেই আছেন যারা সত্যিকার অর্থেই মানুষের পাশে দাঁড়ান, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন এবং সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এমন একটি শ্রেণি রয়েছে যারা সমাজপতি, মোড়ল, সালিশদার, রাজনৈতিক বড় ভাই কিংবা বিভিন্ন কমিটির দায়িত্বশীল পরিচয়ের আড়ালে নিজেদের ব্যক্তিগত প্রভাব ও স্বার্থ রক্ষার কাজে বেশি ব্যস্ত থাকে। ধীরে ধীরে তারাই সমাজের স্বাভাবিক পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে।
তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ক্ষমতা, প্রভাব এবং মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ভয়। তারা অনেক সময় চায় না এলাকার মানুষ শান্তিতে বসবাস করুক। কারণ মানুষ শান্তিতে থাকলে তাদের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। ফলে বিভিন্ন পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, প্রতিবেশী বিরোধ কিংবা সামাজিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা সমস্যার সমাধান করছে বলে দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে এমন সমাধান দেয় যা ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের জন্ম দেয়। একটি বিরোধ শেষ হওয়ার আগেই নতুন বিরোধ সৃষ্টি হয়। ফলে শত্রুতা, মারামারি এবং মামলার সংখ্যা বাড়তে থাকে, আর এতে লাভবান হয় সেই প্রভাবশালী গোষ্ঠী।
কখনও এক পক্ষকে উসকে দেওয়া হয়, কখনও অন্য পক্ষকে ভয় দেখানো হয়। কোথাও মিথ্যা সাক্ষ্য, কোথাও পক্ষপাতদুষ্ট সালিশ, আবার কোথাও অর্থের বিনিময়ে বিচারকে প্রভাবিত করার অভিযোগ শোনা যায়। এর ফলে প্রকৃত ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় সাধারণ মানুষ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক সময় ব্যক্তিগত রাগ, রাজনৈতিক মতভেদ কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণেও নির্দোষ মানুষ এসব প্রভাবশালী গোষ্ঠীর টার্গেটে পরিণত হয়। শুধু ভিন্নমত প্রকাশ করা বা প্রতিবাদ করাও অনেক সময় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশের কারণেও অনেককে হুমকি দেওয়া হয়। ব্যবসায়ী, দোকানদার কিংবা সাধারণ মানুষকে বলা হয়— “এভাবে কথা বললে এলাকায় ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না।” কোনো কোনো ক্ষেত্রে এলাকার তরুণদেরও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া হয়।
গ্রামের সাধারণ মানুষ অনেক সময় সত্য জানলেও মুখ খুলতে সাহস পায় না। কারণ তারা ভয় পায়— একঘরে করে দেওয়া হবে, সামাজিকভাবে অপমান করা হবে, রাজনৈতিক চাপ দেওয়া হবে কিংবা মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হবে।
যে সালিশ ব্যবস্থা মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা ছিল, অনেক জায়গায় সেটিই ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ন্যায়বিচারের জায়গায় দেখা যাচ্ছে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থের লেনদেনের অভিযোগ।
শহরাঞ্চলেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। কারও নতুন ব্যবসা শুরু হলে, দোকান নির্মাণ বা বাড়ির কাজ চললে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ দাবি করে। সমাজের খরচ, এলাকার নিয়ম কিংবা বিভিন্ন নামে নেওয়া এই অর্থ অনেক সময় সরাসরি চাঁদাবাজির শামিল।
আরও একটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কমিটির প্রভাবকে ব্যবহার করে অনেক সময় ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করা হয়। এর ফলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো— এই ধরনের অনেক মানুষ বাইরে থেকে অত্যন্ত ভদ্র, ধর্মীয় ও সম্মানিত ব্যক্তির পরিচয় বহন করেন। ফলে সাধারণ মানুষ সহজে তাদের প্রকৃত চরিত্র বুঝতে পারেন না। কিন্তু যখন ধর্ম, সমাজ বা নেতৃত্বের পরিচয় ব্যবহার করে অন্যায় করা হয়, তখন সেই ক্ষতি আরও গভীর হয়।
এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। মানুষ ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা হারায়, তরুণরা শিখে যায় যে ক্ষমতাই সত্য, প্রতিবাদ করার সাহস কমে যায়, সমাজে বিভক্তি বাড়ে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে শেখে।
প্রকৃত সমাজপতি কখনও মানুষকে মামলা-মারামারির দিকে ঠেলে দেন না। তিনি মানুষকে একত্রিত করেন, বিভক্ত করেন না। তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন, ভয় সৃষ্টি করেন না। তিনি সমাজকে রক্ষা করেন, ধ্বংস করেন না।
তাই সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষের উচিত ক্ষমতার অপব্যবহার, পক্ষপাতদুষ্ট সালিশ, চাঁদাবাজি এবং সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকা। কারণ একটি সমাজ ধ্বংস হতে সময় লাগে না, কিন্তু একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে লাগে বহু বছরের ত্যাগ, সততা ও ন্যায়বোধ।
সচেতনতার জন্য এই লেখা।