ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

বিনোদন

নীলফামারীর বাঁশের পণ্য পাড়ি দিচ্ছে ইউরোপে, বদলে যাচ্ছে উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের জীবন

একসময় পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতেই হিমশিম খেতে হতো নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার হাজিমুল ইসলামকে। দিনমজুর হিসেবে অন্যের বাড়িতে বাঁশের সিলিং তৈরির কাজ করেই চলত সংসার। সেই হাজিমুল ইসলাম আজ একজন সফল উদ্যোক্তা। তাঁর প্রতিষ্ঠানে তৈরি বাঁশ ও বেতের নান্দনিক পণ্য দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় ব্যাপক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। ফলে বদলে গেছে শুধু তাঁর নয়, কর্মসংস্থান হয়েছে এলাকার আরও বহু মানুষের।সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ঠেলাপীর এলাকার উত্তর সোনাখুলী ডাঙ্গাপাড়ার বাসিন্দা হাজিমুল ইসলাম নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘আরিফুল হস্তশিল্প’ নামে একটি উৎপাদন কারখানা।হাজিমুল ইসলামের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথ মোটেও সহজ ছিল না। অর্থনৈতিক সংকট, পুঁজি সংকট এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই শুরু হয় তাঁর যাত্রা। অন্যের অধীনে কাজ করার সময় থেকেই নিজের কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। একপর্যায়ে স্মার্টফোনে ইউটিউব দেখে বাঁশের নান্দনিক পণ্য তৈরির বিভিন্ন কৌশল ও নকশা শেখেন।প্রথমে বাড়ির পাশের বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে কয়েকটি পানির মগ তৈরি করেন। পরে সেই পণ্যের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অনলাইন পেজে প্রকাশ করলে ব্যাপক সাড়া পান। ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন ‘আরিফুল হস্তশিল্প’।বর্তমানে তাঁর কারখানায় বাঁশ ও বেত দিয়ে আধুনিক নকশার মগ, ট্রে, ল্যাম্পশেড, ফুলদানি, শোপিস, ফল ও সবজি রাখার ঝুড়ি, ঘর সাজানোর বিভিন্ন সামগ্রী এবং ড্রয়িংরুমের জন্য বাঁশের তৈরি সোফাসহ নানা ধরনের আকর্ষণীয় পণ্য তৈরি হচ্ছে। এসব পণ্য রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্রেতা অনলাইনের মাধ্যমে অর্ডার দিচ্ছেন। বায়ারদের মাধ্যমে এসব পণ্যের একটি অংশ ইউরোপের বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে।এই উদ্যোগ শুধু হাজিমুল ইসলামকে স্বাবলম্বী করেনি; তাঁর কারখানায় বর্তমানে নিয়মিত কাজ করছেন প্রায় ১৫ জন নারী ও পুরুষ শ্রমিক। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় অনেক পরিবারের।কারখানার শ্রমিক মনোয়ারা বেগম বলেন, “আগে সংসারে অভাব ছিল। ঘরে বসেই সময় কাটত। এখন এই কারখানায় কাজ করে যা আয় করি, তা দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছি এবং সংসারেও সহযোগিতা করতে পারছি।”শ্রমিক হেলাল উদ্দিন বলেন, “একসময় নিজেই বাঁশের বিভিন্ন পণ্য তৈরি করতাম। কিন্তু প্লাস্টিকের পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় সেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এখন হাজিমুল ভাইয়ের কারখানায় কাজ করে নিয়মিত আয় করছি এবং পরিবার নিয়ে ভালো আছি।”আরেক শ্রমিক ববিতা রানি রায় বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। এখানে কাজ করে যে আয় হয়, তা দিয়ে সন্তানের পড়াশোনা ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারছি।”উদ্যোক্তা হাজিমুল ইসলাম বলেন, “একসময় দিনমজুর হিসেবে অন্যের বাড়িতে বাঁশের সিলিং তৈরির কাজ করতাম। পরে ইউটিউব দেখে বাঁশের মগ তৈরি শুরু করি। সেখান থেকেই আমার নতুন পথচলা। এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় পণ্য যাচ্ছে, পাশাপাশি বায়ারের মাধ্যমে ইউরোপেও রপ্তানি হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুধু আমার নয়, আরও অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে।”তিনি আরও বলেন, “সরকারি প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সহজ শর্তে সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করা হলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দক্ষ জনবল তৈরি এবং বৈদেশিক বাজারে রপ্তানি আরও সম্প্রসারণ করা যাবে।” স্থানীয়দের মতে, হাজিমুল ইসলামের এই উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বাঁশশিল্পের সম্ভাবনাও নতুনভাবে তুলে ধরেছে। প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও রপ্তানি সহায়তা পেলে এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

বিনোদন ১৭ ঘন্টা আগে