আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনা ও দলীয় প্রভাবের মাধ্যমে পুলিশে নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের শনাক্ত করতে পুলিশের বিশেষ তদন্ত কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। জেলা পর্যায়ের তদন্ত কমিটির জমা দেওয়া প্রতিবেদন বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রাথমিক অনুসন্ধানে কনস্টেবল, উপপরিদর্শক (এসআই), সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই)সহ বিভিন্ন পদে প্রায় ২২ হাজার নিয়োগে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১০টি জেলা থেকে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক সদস্য পুলিশে নিয়োগ পান। অভিযোগ রয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়া প্রভাবশালী নেতাদের ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেও অনেকের চাকরি হয়েছে বলে তদন্তে তথ্য মিলেছে। এসব নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানা গেছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, বাহিনীতে স্বচ্ছতা ও চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কনস্টেবল নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির। একই সঙ্গে পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার, ইন্সপেক্টর, এসআই ও এএসআই পদে নিয়োগ এবং পদোন্নতির বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা হয়।
এরপর প্রতিটি জেলায় পুলিশ সুপারকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ডিএসবি কর্মকর্তারা এসব কমিটিকে সহায়তা করেন। জেলা কমিটিগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ সদর দপ্তরের একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে। তদন্ত শেষে সব জেলার প্রতিবেদন এখন সদর দপ্তরে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
তদন্ত কমিটিগুলো নিয়োগে ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে কারসাজি, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ যাচাই করেছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ হাজার পুলিশ সদস্যের নিয়োগসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা হয়েছে। নিয়োগের পাশাপাশি পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়নে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের স্বজনদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং আওয়ামী লীগ আমলের তিনটি জাতীয় নির্বাচনে পুলিশ সদস্যদের ভূমিকার বিষয়ও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তদন্তে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়ার বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য, এ পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার সদস্যের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তদন্তে সহকারী পুলিশ সুপার, এসআই ও কনস্টেবল পদে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বেশি পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব পদের অনেক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি আওয়ামী লীগ বা এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী কিংবা সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য ছিলেন। জেলা কোটা লঙ্ঘন এবং স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে নিয়োগ পাওয়ার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে। গত ১৫ বছরে পুলিশে ৪৫ হাজারের বেশি সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, ওই সময়ে পুলিশে ব্যাপক দলীয়করণ করা হয়েছিল এবং বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে পুলিশের একাংশের ভূমিকা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বর্তমানে মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ চলছে। প্রতিবেদনটি শিগগিরই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
সূত্র আরও জানায়, আওয়ামী লীগ আমলের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দায়িত্ব পালনকারী কিছু পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া কর্মকর্তাদের তালিকাও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তদন্তে দেখা গেছে, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কিশোরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ঢাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও কক্সবাজার—এই ১০ জেলার প্রার্থীরা নিয়োগে তুলনামূলক বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, অন্য জেলার যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে এসব জেলা থেকে বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে জেলা কোটাও পরিবর্তন করা হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকের নথিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য, জেলা সভাপতি কিংবা কেন্দ্রীয় নেতাদের ডিও লেটার সংযুক্ত ছিল। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ পরীক্ষার আগেই নির্বাচিত প্রার্থীদের তালিকা জেলা পুলিশ লাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও দালালদের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ এবং মেধা ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
তদন্তে চিহ্নিত প্রায় ২২ হাজার সদস্যের মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার কনস্টেবল, প্রায় ৪ হাজার এসআই ও এএসআই এবং বাকিরা ইন্সপেক্টর, সহকারী পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও পুলিশ সুপার পদমর্যাদার।
পুলিশের একটি ইউনিটের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কনস্টেবল ও এসআই পদে সরাসরি মাঠপর্যায়ে নিয়োগ হওয়ায় এসব পদে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সবচেয়ে বেশি ছিল। অন্যদিকে এএসপি পদে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ হলেও অধস্তন পদগুলোতে তৎকালীন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রভাবের তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, যাদের নিয়োগে সরাসরি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলবে, চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতির সুপারিশ করা হতে পারে। তবে তালিকাভুক্ত সবাইকে চাকরিচ্যুত করা হবে না এবং নিরীহ কাউকে হয়রানি না করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত সরকারের সময়ে পুলিশের নিয়োগে বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি ও অনিয়মের বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। কেউ কেউ স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করে নিয়োগ পেয়েছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নিরীহ ব্যক্তিরা যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনা ও দলীয় প্রভাবের মাধ্যমে পুলিশে নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের শনাক্ত করতে পুলিশের বিশেষ তদন্ত কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। জেলা পর্যায়ের তদন্ত কমিটির জমা দেওয়া প্রতিবেদন বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রাথমিক অনুসন্ধানে কনস্টেবল, উপপরিদর্শক (এসআই), সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই)সহ বিভিন্ন পদে প্রায় ২২ হাজার নিয়োগে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১০টি জেলা থেকে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক সদস্য পুলিশে নিয়োগ পান। অভিযোগ রয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়া প্রভাবশালী নেতাদের ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেও অনেকের চাকরি হয়েছে বলে তদন্তে তথ্য মিলেছে। এসব নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানা গেছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, বাহিনীতে স্বচ্ছতা ও চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কনস্টেবল নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির। একই সঙ্গে পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার, ইন্সপেক্টর, এসআই ও এএসআই পদে নিয়োগ এবং পদোন্নতির বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা হয়।
এরপর প্রতিটি জেলায় পুলিশ সুপারকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ডিএসবি কর্মকর্তারা এসব কমিটিকে সহায়তা করেন। জেলা কমিটিগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ সদর দপ্তরের একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে। তদন্ত শেষে সব জেলার প্রতিবেদন এখন সদর দপ্তরে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
তদন্ত কমিটিগুলো নিয়োগে ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে কারসাজি, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ যাচাই করেছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ হাজার পুলিশ সদস্যের নিয়োগসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা হয়েছে। নিয়োগের পাশাপাশি পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়নে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের স্বজনদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং আওয়ামী লীগ আমলের তিনটি জাতীয় নির্বাচনে পুলিশ সদস্যদের ভূমিকার বিষয়ও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তদন্তে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়ার বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য, এ পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার সদস্যের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তদন্তে সহকারী পুলিশ সুপার, এসআই ও কনস্টেবল পদে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বেশি পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব পদের অনেক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি আওয়ামী লীগ বা এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী কিংবা সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য ছিলেন। জেলা কোটা লঙ্ঘন এবং স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে নিয়োগ পাওয়ার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে। গত ১৫ বছরে পুলিশে ৪৫ হাজারের বেশি সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, ওই সময়ে পুলিশে ব্যাপক দলীয়করণ করা হয়েছিল এবং বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে পুলিশের একাংশের ভূমিকা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বর্তমানে মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ চলছে। প্রতিবেদনটি শিগগিরই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
সূত্র আরও জানায়, আওয়ামী লীগ আমলের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দায়িত্ব পালনকারী কিছু পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া কর্মকর্তাদের তালিকাও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তদন্তে দেখা গেছে, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কিশোরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ঢাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও কক্সবাজার—এই ১০ জেলার প্রার্থীরা নিয়োগে তুলনামূলক বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, অন্য জেলার যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে এসব জেলা থেকে বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে জেলা কোটাও পরিবর্তন করা হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকের নথিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য, জেলা সভাপতি কিংবা কেন্দ্রীয় নেতাদের ডিও লেটার সংযুক্ত ছিল। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ পরীক্ষার আগেই নির্বাচিত প্রার্থীদের তালিকা জেলা পুলিশ লাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও দালালদের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ এবং মেধা ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
তদন্তে চিহ্নিত প্রায় ২২ হাজার সদস্যের মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার কনস্টেবল, প্রায় ৪ হাজার এসআই ও এএসআই এবং বাকিরা ইন্সপেক্টর, সহকারী পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও পুলিশ সুপার পদমর্যাদার।
পুলিশের একটি ইউনিটের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কনস্টেবল ও এসআই পদে সরাসরি মাঠপর্যায়ে নিয়োগ হওয়ায় এসব পদে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সবচেয়ে বেশি ছিল। অন্যদিকে এএসপি পদে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ হলেও অধস্তন পদগুলোতে তৎকালীন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রভাবের তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, যাদের নিয়োগে সরাসরি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলবে, চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতির সুপারিশ করা হতে পারে। তবে তালিকাভুক্ত সবাইকে চাকরিচ্যুত করা হবে না এবং নিরীহ কাউকে হয়রানি না করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত সরকারের সময়ে পুলিশের নিয়োগে বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি ও অনিয়মের বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। কেউ কেউ স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করে নিয়োগ পেয়েছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নিরীহ ব্যক্তিরা যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন