পাহাড়, ঝিরি, খাল আর ঝর্ণার অপূর্ব মেলবন্ধনে প্রকৃতির এক অনন্য সৌন্দর্যের নাম বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার থানকোয়াইন ঝর্ণা। তেমনই একটি আকর্ষণীয় পর্যটনস্থল এটি। পাহাড়ি সবুজের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ জলের ধারা আর নিরিবিলি পরিবেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের সহজেই মুগ্ধ করে।আলীকদম বাজার থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে থানকোয়াইন ঝিরি থেকে উৎপন্ন এই ঝর্ণার অবস্থান। তুলনামূলক সহজ ট্রেকিং পথ হওয়ায় অভিজ্ঞ ও নতুন—দুই ধরনের ভ্রমণকারীর কাছেই স্থানটি দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ঝর্ণার শীতল পানিতে শরীর জুড়ানোর পাশাপাশি পাহাড়ি পথের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ রয়েছে।পথেই প্রকৃতির নানা রূপ:থানকোয়াইন ঝর্ণায় যাওয়ার যাত্রাপথও কম আকর্ষণীয় নয়। পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা টোয়াইন খালে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ভ্রমণের পর শুরু হয় ট্রেকিং। খালের পাশ দিয়ে পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটার সময় চারপাশের সবুজ প্রকৃতি, পাহাড়ি ছড়া ও নির্জন পরিবেশ ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে।ঝর্ণার পাদদেশে পৌঁছালে দেখা মেলে স্বচ্ছ পানির প্রাকৃতিক জলাধারের। আবহাওয়া ও পানির পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে সেখানে গোসল করে ট্রেকিংয়ের ক্লান্তি দূর করার সুযোগও রয়েছে। হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকলে পাহাড়ে তাঁবু টাঙিয়ে ক্যাম্পিং করার অভিজ্ঞতাও নেওয়া যায়।যেভাবে যাওয়া যায়:থানকোয়াইন ঝর্ণায় যেতে প্রথমে আসতে হবে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায়। আলীকদম থেকে সড়কপথে আমতলী (লংঘাট) বাজারে যাওয়া যায়। সেখানকার আমতলী (লংঘাট) থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় টোয়াইন খাল পাড়ি দিয়ে দোছড়ি বাজারে যেতে হয়।দোছড়ি বাজারের সেনা ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় অনুমতি ও স্থানীয় গাইডের সহায়তা নিয়ে এরপর শুরু করতে হয় ঝর্ণার উদ্দেশে ট্রেকিং। পাহাড়ি পথ ধরে প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটার পর পৌঁছানো যায় থানকোয়াইন ঝর্ণায়।তবে পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াতের নিয়ম, নিরাপত্তা নির্দেশনা ও অনুমতির বিষয়টি ভ্রমণের আগে স্থানীয় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জেনে নেওয়া জরুরি।ঢাকা থেকে আলীকদম:ঢাকা থেকে সড়কপথে আলীকদমে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন পরিবহনের বাসে আলীকদমে পৌঁছানো যায়। ভ্রমণের আগে বাসের বর্তমান সময়সূচি ও ভাড়া সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা:থানকোয়াইন ঝর্ণা একদিনে ঘুরে ফিরে আসা সম্ভব হলেও ভ্রমণকারীরা চাইলে রাতে আলীকদমে থাকতে পারেন। উপজেলায় বিভিন্ন আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে খাবারের হোটেলেও ভাত, মাছ, মাংস, মুরগিসহ দেশীয় খাবার পাওয়া যায়।ভ্রমণে সতর্কতা:থানকোয়াইন ঝর্ণার পথ পাহাড়ি ও দুর্গম হওয়ায় ভ্রমণের সময় বাড়তি সতর্কতা জরুরি। ভালো গ্রিপের জুতা ব্যবহার, পর্যাপ্ত পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা উচিত। মোবাইল ফোনসহ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের জন্য পাওয়ার ব্যাংক, টর্চলাইট ও ফার্স্ট এইড কিট সঙ্গে রাখা যেতে পারে।ঝর্ণার পাথর ও পাহাড়ি পথে পা পিছলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না যাওয়াই নিরাপদ। বিশেষ করে বর্ষাকালে পানির স্রোত বেড়ে গেলে ঝর্ণার কাছে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ভ্রমণের সময় পাহাড়ি প্রকৃতি, ঝিরি ও ঝর্ণার পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না। প্লাস্টিক, বোতল বা ময়লা-আবর্জনা যেখানে-সেখানে না ফেলে পরিবেশ পরিষ্কার রাখা সবার দায়িত্ব।প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে চাইলে থানকোয়াইন ঝর্ণা হতে পারে দারুণ এক গন্তব্য। পাহাড়ি পথের রোমাঞ্চ, খালের নৌভ্রমণ আর ঝর্ণার শীতল জলের মিলিত অভিজ্ঞতা ভ্রমণপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিনের স্মৃতি হয়ে থাকার মতো।
রেস্টুরেন্টের কোণার টেবিলটা মুছতে মুছতে রাত সাড়ে এগারোটা বাজলো রফিকের। বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে তখনো বিরিয়ানির গন্ধ। সারাদিনে এই গন্ধটা এখন আর নাকে লাগে না ওর।রফিকের বয়স বাইশ। তিন বছর আগে যশোর থেকে মালয়েশিয়াতে এসেছিল পড়াশোনার ভিসায়। কিন্তু পড়াশোনার ভিসায় পার্টটাইম কাজ করা যায় ও তাতে পড়াশোনার পাশাপাশি ভাল ভাবে থাকা খাওয়া এমন কি দেশেও কিছু টাকা পাঠানো যায়, রিক্রুটিং এজেন্সির এমন কথায় বিশ্বাস করে রফিক সোনালী স্বপ্নের নিয়ে মালোয়েশিয়াতে পাড়ি জমিয়ে ছিল। কিন্তু পড়াশোনার ভিসায় পার্টটাইম কাজ করা যায় না, যা রিক্রুটিং এজেন্সি লুকিয়েছিল। কিন্তু মালোয়েশিয়াতে পৌছানোর পর সে বুঝলো থাকা- খাওয়া ব্যবস্থা করতে হলে পড়াশোনা হয় না আবার পড়াশোনা করতে হলে থাকা- খাওয়া ব্যবস্থা করা যায় না। বছর না পেরুতে তার সোনালী স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসে, সে ইতোমধ্যেই বুঝে নেয় বিদেশের মাটিতে তার বেঁচে থাকা দায়, তাই একটা যেকোন কাজ চাই। অনেক চেষ্টায় এখন সে মধ্যম শ্রেনীর এক রেস্টুরেন্টের সিনিয়র ওয়েটার। সিনিয়র মানে, নতুন ছেলেটা পানি ঢালতে গিয়ে ফেলে দিলে মালিকের বকাটা তাকেই শুনতে হয়।তার জীবন চলে ঘড়ির কাঁটায় না, চলে মানুষের ক্ষুধায়। দুপুর বারোটা থেকে রাত বারোটা। কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, কাঁধে একটা গামছার মতো সাদা তোয়ালে। পকেটে সব সময় একটা ছোট নোটবুক আর একটা কলম, যে কলমটির ক্যাপটা হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। রেস্টুরেন্টের গেষ্টদের সম্পর্কে তার কিছুটা আইডিয়া ইতোমধ্যে সে রপ্ত করে ফেলেছে। সে মানুষ চেনে অর্ডার দেখে। যে লোকটা একা এসে এক কাপ চা নিয়ে দুই ঘণ্টা বসে থাকে, সে প্রেমে ব্যর্থ। যে পরিবারটা এসে সবচেয়ে দামি খাবারের আগে দাম জিজ্ঞেস করে তিনবার, তারা সারা মাস টাকা জমিয়ে আজ এসেছে। যে কলেজের ছেলেগুলো হাসতে হাসতে বলে, "মামা, একটু ঝোল বাড়ায়ে দিয়েন", তারা-ই বিল দেওয়ার সময় পকেট হাতড়ায়।কেউ তার মুখ পানে দেখে না, সবাই তার হাত দেখে। হাত ভর্তি প্লেট, গ্লাস, টিস্যু। কেউ বলে না "কেমন আছো রফিক?" বলে, "এই, পানি দাও। এই, বিল আনো। এই, এত দেরি কেন?"কিন্তু রফিক রাগ করে না। তার মনে আছে, গত ঈদে এক বাচ্চা মেয়ে তাকে বলেছিল, "তুমি জাদু জানো? এতগুলো প্লেট একসাথে নিয়ে হাঁটো কীভাবে?" ওই একটা কথায় তার পুরো মাসের ক্লান্তি উড়ে গিয়েছিল। আশ্রয় স্থলে ফিরে একটু ফ্রেস হয়ে ক্রান্ত শরীরে ঘুমঘুম চোখে যখন সে একটা ডিম দিয়ে ভাত মাখে, তখনোও তার কানে বাজে, "অর্ডার রেডি", "টেবিল থ্রি পরিষ্কার কর" ইত্যাদি। দেশে অপেক্ষারত মা- বাবা এর ফোন, "বাবা, খেয়েছিস?" সে বলে, "হ্যাঁ মা, মুরগির রোস্ট দিয়ে খেলাম।" মা জানে না, ওয়েটারদের ভাগ্যে রোস্ট জোটে না, জোটে দুপুরের বেঁচে যাওয়া ডাল আর ঠান্ডা ভাত। বাবা তো যেমন তেমন মা তো নাছোড় বান্দা হাজারো প্রশ্ন, উপায় একটা- রফিক বললো, মা আগামিকাল অনেক কথা বলবো, আজ রাখি ঘুম পাচ্ছে। আহত পাখির মত মায়ের করুন স্বরে উত্তর আ....চ্ছা রাখো। সকাল ৮টার মধ্যে কাজের গন্তব্যে পৌছাতে হবে নইলে দিনের বেতন কাটা যাবে, তড়িঘোড়ি করে বাইরে থেকে একটা বার্গার খেয়ে নিল, কখন যে দুপুরের খাবার খাবে জানে না। খেতে আসা কাষ্টমারের প্রসংশাতে সে খুশি ।নানান খাবার পরিবেবেশন করতে করতে ক্ষিধাটা অনুভব হয় না তার। রফিকের একটাই লক্ষ্য রাত ১২টা বাজলে ছুটি, ডিউটি ১২-১৩ ঘন্টা। সপ্তাহে ৬দিন কাজ একদিন ছুটি , সাপ্তাহিক বেতন পরিশোধের দিন মালিক বেচাকেনা ভাল না অজুহাতে হাফ পেমেন্ট দেয়, বাকিটা পরে দেওয়ার আশ্বাস, যা আর পরে পাওয়া যায় না । তারপরও রফিক কাজে অবহেলা করে না কারন, নতুন কাজের সন্ধান করার সময় নেই, আর বিদেশ বিভূয়ে তাকে সাহায্য করারও কেউ নেই। তার এখন শুধু বেঁচে থাকার লড়াই। ছুটির দিন কেন যেনো তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। মায়ের কাছে ফোন দেওয়া হলো না। মায়ের কাছে আত্মীয় স্বজনের অভিযোগ রফিক ফোন করে না, টাকা হলে মানুষ বদলে যায়। মনে পড়ে বিদেশে আসার সময় ছোট বোনের হাজারো আব্দার। নানা চিন্তা করতে করতে রাত হয় ছুটির দিনটাও শেষ হয়............. সকালে কাজে যেতে হবে... ঘুম। রফিকের বাড়িতে একদির রাতে- রফিকের বাবা তার স্ত্রীকে বলল, ঘুমিয়ে গেলে নাকি?উত্তরে রফিকের মা বলল, নাহ ঘুম আসছে না, ছেলেটার কথা মনে পড়ছে। রফিকের বাবা বললেন, চিন্তা করো না আমাদের ছেলে ভাল আছে, ও একদিন রাজার বেশে দেশে ফিরবে। কথাটা শুনে রফিকের মা বুঝলো তার স্বামি তাকে স্বাত্তনা দিচ্ছে, যে যাই বলুক মায়ের মন সহজে সব কিছু মানতে পারে না, মা-ই জানে ছেলে কেমন আছে। তাই তো আমাদের নবী(সা:) শত আঘাত ,দু:খ, বেদনা কষ্ট সহ্য করেছেন কিন্তু কখনো কাঁদেন নি। কিন্তু তিনি মায়ের কবরে কাছে গিয়ে একদিন হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন, সেদিন স্বয়ং আল্লাহপাক নবী( সা:)সাত্ত্বনা দিয়েছিলেন। রফিকের মা তার স্বামিকে বলল , দেখ আমি মূখ্য সূখ্য মানুষ, তুমি তো লেখাপড়া করেছো তোমার জ্ঞান আমার চেয়ে বেশী, তো তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই, স্বামি বললেন, আচ্ছা বলো। স্ত্রী তার স্বামিকে বলল, “ বিধাতা সব কিছু ওদের দিয়ে দিলো, তো আমাদের মত অসহায় মানুষ পৃথিবীতে পাঠিয়ে বিধার কি লাভ হলো”? প্রশ্ন শুনে রফিকের বাবার দ’চোখ অশ্রু সিক্ত হয়ে উঠলো, নিরব রইলো। তিনি বললেন, রাত অনেক হলো ঘুমাও। স্ত্রী বললেন, কই? আমার প্রশ্নের উত্তরটা তো দাও? ঝিঝি পোকার ডাক, হালকা বাতাসের শো...শো শব্দ কি বলবো...এবার নীরবতা ভেঙ্গে রফিকের বাবা বললেন, লেখাপড়া বেশী শিখতে পারিনি, যতটুকু শিখেছি তাতে ক্লাসের খুব খারাপ ছাত্র ছিলাম, সেজন্য তোর প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই বউ। রফিক মালোয়েশিয়া -বিকালে রেস্টুরেন্টের কাজের ফাঁকে গতরাতে মায়ের নির্দেশটা মনে পড়ে গেলো, মা বলেছিল, বাবা আগামিকাল রাত ৯ টায় চন্দ্রগহন , রাত ৯টার আগেই রাতের খাবার খেয়ে নিস। হঠাৎ ম্যানেজারের কলিং বেলের শব্দ রফিক— রফিক , সম্বিৎ ফিরে কাঁধের তোয়ালেটা ঝাড়া দেয় রফিক। নতুন কাস্টমার ঢুকেছে। মুখে হাসিটা আবার পরে নেয় ঠোটের ফাঁকে, যে হাসিটা তার ইউনিফর্মেরই একটা অংশ। দিন মাস বছর , নন স্টপ চলছে রফিকের প্রবাস জীবন।