এ ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে কে জয়ী হবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—মানুষ কীভাবে যন্ত্রের সক্ষমতাকে কাজে লাগাবে এবং একই সঙ্গে যে সমাজের কল্যাণের জন্য এসব প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে, সেই সমাজের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে বজায় থাকবে।
এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে বর্তমানে দুটি বিপরীত ধারণা দেখা যাচ্ছে। একটি পক্ষ মনে করে, এআই মানবজাতির প্রায় সব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ এটিকে সামাজিক কাঠামো ও মানবসভ্যতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে এই দুই চরম অবস্থানের বাইরে গিয়ে এআইয়ের সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি—দুটিকেই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন লেখক।
প্রযুক্তি নিজে ভালো কিংবা খারাপ নয়। এটি কীভাবে তৈরি করা হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে—তার ওপরই এর প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করবে। এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। এসব প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে, তবে সেই পরিবর্তনের সবগুলো ইতিবাচক ছিল না।
এআইয়ের প্রভাব এরই মধ্যে কর্মক্ষেত্রেও দৃশ্যমান হচ্ছে। নথি যাচাই, ই-মেইল লেখা কিংবা বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা তৈরির মতো কাজ এআই করতে সক্ষম হলে প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক চাকরির সুযোগ কমে যেতে পারে। এর প্রভাব শুধু বেকারত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; মানুষের আয়, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে মানুষ নিজেকে পিছিয়ে পড়া মনে করলে অসন্তোষ ও সামাজিক ক্ষোভ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে এআইয়ের সম্ভাব্য ইতিবাচক দিকও রয়েছে। চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এটি চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হলে মানুষের জীবন রক্ষা করা যেতে পারে। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে মানুষের ভুলের পরিমাণও কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
তবে এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে। এআই মানুষের ভুল কমাতে সক্ষম হলেও মানুষের বিচারবোধকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যদি সম্পূর্ণভাবে যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের দায়ভার কার ওপর বর্তাবে—তা সবসময় সহজে নির্ধারণ করা সম্ভব নাও হতে পারে।
এআইয়ের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হওয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় দ্রুত ও কম খরচে, অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় গোপন রেখেও ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। এর ফলে সত্য তথ্য এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি তথ্যের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নজরদারি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
এআই ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নগুলোর একটি সামরিক ক্ষেত্রকে ঘিরে। যুদ্ধকে আরও নির্ভুল করা এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে এআই সহায়ক হতে পারে। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থায় মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কমে গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিতে পারে। কোনো যন্ত্র নিজস্ব সিদ্ধান্তে কাউকে হত্যা করলে সেই সিদ্ধান্তের দায় কার—প্রোগ্রামার, সেনা কমান্ডার, অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব নাকি রাষ্ট্র—এ প্রশ্ন সামনে আসবে।
এআইয়ের কারণে আন্তর্জাতিক সংঘাত আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সংকটের সময় এক পক্ষের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যদি অন্য পক্ষের ব্যবস্থার জবাব দিতে শুরু করে, তাহলে মানুষের বিচার-বিবেচনা প্রয়োগের সুযোগ কমে যেতে পারে।
এসব ঝুঁকি মোকাবিলার অর্থ এআই নিয়ে গবেষণা বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং সমাজকে বোঝার ও প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে—কোথায় এআই ব্যবহার করা উচিত, কোথায় এর ব্যবহার করা উচিত নয় এবং কী গতিতে এর ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হবে। এআইয়ের বিকাশের পাশাপাশি কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় নীতিমালা এবং মানবিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মানুষ বনাম যন্ত্রের কোনো লড়াই নয়। আসল প্রশ্ন হলো—মানুষ কি যন্ত্রের শক্তিকে নিজের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারবে, নাকি কোনো একসময় যন্ত্র মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে। এআইকে মানুষের হাতে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখাই ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো।
সূত্র: আরব নিউজ

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬
এ ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে কে জয়ী হবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—মানুষ কীভাবে যন্ত্রের সক্ষমতাকে কাজে লাগাবে এবং একই সঙ্গে যে সমাজের কল্যাণের জন্য এসব প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে, সেই সমাজের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে বজায় থাকবে।
এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে বর্তমানে দুটি বিপরীত ধারণা দেখা যাচ্ছে। একটি পক্ষ মনে করে, এআই মানবজাতির প্রায় সব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ এটিকে সামাজিক কাঠামো ও মানবসভ্যতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে এই দুই চরম অবস্থানের বাইরে গিয়ে এআইয়ের সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি—দুটিকেই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন লেখক।
প্রযুক্তি নিজে ভালো কিংবা খারাপ নয়। এটি কীভাবে তৈরি করা হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে—তার ওপরই এর প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করবে। এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। এসব প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে, তবে সেই পরিবর্তনের সবগুলো ইতিবাচক ছিল না।
এআইয়ের প্রভাব এরই মধ্যে কর্মক্ষেত্রেও দৃশ্যমান হচ্ছে। নথি যাচাই, ই-মেইল লেখা কিংবা বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা তৈরির মতো কাজ এআই করতে সক্ষম হলে প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক চাকরির সুযোগ কমে যেতে পারে। এর প্রভাব শুধু বেকারত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; মানুষের আয়, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে মানুষ নিজেকে পিছিয়ে পড়া মনে করলে অসন্তোষ ও সামাজিক ক্ষোভ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে এআইয়ের সম্ভাব্য ইতিবাচক দিকও রয়েছে। চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এটি চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হলে মানুষের জীবন রক্ষা করা যেতে পারে। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে মানুষের ভুলের পরিমাণও কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
তবে এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে। এআই মানুষের ভুল কমাতে সক্ষম হলেও মানুষের বিচারবোধকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যদি সম্পূর্ণভাবে যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের দায়ভার কার ওপর বর্তাবে—তা সবসময় সহজে নির্ধারণ করা সম্ভব নাও হতে পারে।
এআইয়ের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হওয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় দ্রুত ও কম খরচে, অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় গোপন রেখেও ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। এর ফলে সত্য তথ্য এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি তথ্যের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নজরদারি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
এআই ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নগুলোর একটি সামরিক ক্ষেত্রকে ঘিরে। যুদ্ধকে আরও নির্ভুল করা এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে এআই সহায়ক হতে পারে। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থায় মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কমে গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিতে পারে। কোনো যন্ত্র নিজস্ব সিদ্ধান্তে কাউকে হত্যা করলে সেই সিদ্ধান্তের দায় কার—প্রোগ্রামার, সেনা কমান্ডার, অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব নাকি রাষ্ট্র—এ প্রশ্ন সামনে আসবে।
এআইয়ের কারণে আন্তর্জাতিক সংঘাত আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সংকটের সময় এক পক্ষের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যদি অন্য পক্ষের ব্যবস্থার জবাব দিতে শুরু করে, তাহলে মানুষের বিচার-বিবেচনা প্রয়োগের সুযোগ কমে যেতে পারে।
এসব ঝুঁকি মোকাবিলার অর্থ এআই নিয়ে গবেষণা বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং সমাজকে বোঝার ও প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে—কোথায় এআই ব্যবহার করা উচিত, কোথায় এর ব্যবহার করা উচিত নয় এবং কী গতিতে এর ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হবে। এআইয়ের বিকাশের পাশাপাশি কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় নীতিমালা এবং মানবিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মানুষ বনাম যন্ত্রের কোনো লড়াই নয়। আসল প্রশ্ন হলো—মানুষ কি যন্ত্রের শক্তিকে নিজের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারবে, নাকি কোনো একসময় যন্ত্র মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে। এআইকে মানুষের হাতে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখাই ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো।
সূত্র: আরব নিউজ

আপনার মতামত লিখুন