২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক পরিপত্রে যাত্রীর নাম ও পাসপোর্ট নম্বর ছাড়া বুকিং না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যগামী রুটে গ্রুপ বুকিংয়ের ক্ষেত্রেও ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রীর নাম উল্লেখ করে বুকিং নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে এসব নির্দেশনার কোনোটি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
নামবিহীন গ্রুপ বুকিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় আসন আটকে রাখার প্রবণতাও রয়েছে। একই সঙ্গে টিকিটে ট্রাভেল এজেন্সির নাম এবং মূল মূল্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।
কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হলেও সংশ্লিষ্টরা পরে হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নেন। এরপর বিষয়টি তদারকিতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
এদিকে গ্রাহকসেবা নিশ্চিত, ন্যায্যমূল্য বজায় রাখা, আকাশপথে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসী কর্মীদের হয়রানি বন্ধের লক্ষ্যে ‘ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার টিকিট সিন্ডিকেট বন্ধে প্রায় ৪ হাজার ট্রাভেল এজেন্সির মধ্যে অনিয়মে জড়িত ৩০টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল। তবে বর্তমান সরকারের সময়ে এই মনিটরিং ব্যবস্থা কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।
আকাশপথে যাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। টিকিটের কারসাজি ঠেকাতে ওই টাস্কফোর্স বেশ কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বর্তমানে এর কোনো কার্যকর কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও মনিটরিংও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল—জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) ও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের কার্যালয়ে সার্ভেইলেন্স কমিটির পরিদর্শন করা; কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ছোট উড়োজাহাজ পরিচালনা হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা; নাম ও পাসপোর্ট ছাড়া ৭২ ঘণ্টার বেশি সময় টিকিট আটকে রাখার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া; বিমানবন্দরে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, পররাষ্ট্র, ধর্ম, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ডিজিএফআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে যুক্ত করে টাস্কফোর্সকে আরও শক্তিশালী করা, জিএসএগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো, প্রতারক এজেন্সির বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া এবং গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিত তদারকির সিদ্ধান্তও ছিল। তবে বর্তমানে এসব সিদ্ধান্তের কোনোটিই মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
জানা গেছে, প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি চাকরির ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক ও কর্মী হিসেবে যান।
এ ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বিদেশগামী কর্মীদের কাছে প্যাকেজ বিক্রি করে। ওই প্যাকেজে রিক্রুটিং এজেন্সির কমিশন ও বিমানভাড়া আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকায় ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণের সুযোগ থাকে। ফলে প্রকৃত ন্যায্যমূল্যের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ নেওয়া হয়।
এ কারণে বিমানভাড়া কমলেও অনেক সময় যাত্রীরা এর সুফল পান না।
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেশি চাহিদার রুটগুলোতে গ্রুপ বুকিংয়ের নামে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করে টিকিট অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্লক করে রাখার ঘটনা রয়েছে।
পরে এসব টিকিট হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রচার করে অননুমোদিত এজেন্টদের মাধ্যমে বেশি দামে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সি ও জিএসএর সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে আসে। অভিযোগের ভিত্তিতে আত-তাইয়্যারা ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনাল, এনএমএসএস ইন্টারন্যাশনাল, আরবিসি ইন্টারন্যাশনাল, কিং এয়ার, সিটিকম, কাজী এয়ার ও আল গাজী এয়ারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে আবার সক্রিয় হয়ে বিভিন্ন উপায়ে টিকিট ব্লক করার কাজে যুক্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, গত আট মাসে কাজের উদ্দেশ্যে প্রায় আড়াই লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরবে গেছেন। তাদের বড় অংশই রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে গেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, টিকিট প্রথমে ছোট এজেন্সি থেকে মাঝারি এবং পরে বড় এজেন্সির হাতে যায়। প্রতিটি পর্যায়ে টিকিটের মূল্যের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত হয়।
রিক্রুটিং এজেন্সির প্যাকেজ নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। প্যাকেজে বিমানভাড়া ও এজেন্সির কমিশন আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকায় মোট মূল্য নিজেদের মতো নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়।
ফলে বিমানভাড়া কমলেও শ্রমিকরা সব সময় সেই সুবিধা পান না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। তাদের মতে, নামবিহীন গ্রুপ টিকিট ব্লক করার প্রক্রিয়া বন্ধ করা গেলে আসন সংকট কমবে এবং একই সঙ্গে টিকিটের দামও নিয়ন্ত্রণে আসবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমান টিকিটের দাম কেবল সিন্ডিকেটের কারণে নির্ধারিত হয় না। চাহিদা, মৌসুম, আসন প্রাপ্যতা ও সময়ের ওপরও টিকিটের মূল্য ওঠানামা করে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ওমরাহর টিকিটের দাম ছিল প্রায় ৫৫০ থেকে ৭৩৫ ডলার। শ্রমিকদের টিকিটের মূল্য ছিল ৩৭০ থেকে ৫৪০ ডলার।
২০২৫ সালে ওমরাহর টিকিটের গড় মূল্য ছিল প্রায় ৪৭০ ডলার। রমজান মাসে তা বেড়ে ৬০০ থেকে ৯০০ ডলারে পৌঁছায়। শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ভাড়া ছিল ৪০০ থেকে ৬০০ ডলার।
২০২৬ সালে ওমরাহর টিকিটের দাম ৫১০ থেকে ৮০০ ডলারের মধ্যে ছিল। বর্তমানে সৌদি আরবে চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের যাতায়াতও কিছুটা কমেছে। ফলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, শ্রমিকদের টিকিটের দাম এখন ২৫০ থেকে ৫৩০ ডলারের মধ্যে রয়েছে।
এ কারণে এই সময়ে সিন্ডিকেটের প্রভাব কিছুটা কম থাকলেও সুযোগ পেলেই টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালে তৎকালীন আটাব সভাপতি আব্দুস সালাম আরেফ জানিয়েছিলেন, নামবিহীন গ্রুপ টিকিট বুকিং কৃত্রিম সংকট তৈরির অন্যতম কারণ।
তার অভিযোগ ছিল, মধ্যপ্রাচ্যগামী কিছু এয়ারলাইন্স পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট বা যাত্রী তালিকা ছাড়াই নির্দিষ্ট এজেন্সির নামে আগাম গ্রুপ সিট ব্লক করে রাখে। পরে এসব টিকিট বেশি দামে বিক্রি করা হয়।
এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে টিকিটের দাম ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে দাম দ্বিগুণ বা তিনগুণ হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তার মতে, গ্রুপ টিকিট বুকিং বন্ধ করা গেলে টিকিটের সংকট যেমন কমবে, তেমনি দামও কমে আসবে।
২০২৫ সালের ৪ মে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের একটি সভাতেও বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বিমানভাড়া ও কমিশন আলাদাভাবে উল্লেখ না করে এককালীন প্যাকেজ বিক্রি করায় বিদেশগামী কর্মীরা বিমানভাড়া কমার সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে পুরো মুনাফা এজেন্সির কাছে থেকে যাচ্ছে।
সরকারি তদন্তে ১১টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স, তাদের জিএসএ এবং ৩০টি ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে যাত্রীর নাম ছাড়া টিকিট ব্লক করে শতকোটি টাকা অবৈধভাবে আয়ের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা থেকে জেদ্দা, রিয়াদ, মদিনা ও দাম্মাম রুটে টিকিটের দাম সর্বোচ্চ ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
বর্তমান সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে টিকিট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত মনিটরিং না থাকা এবং গঠিত টাস্কফোর্সের নিষ্ক্রিয়তার কারণে যাত্রী ও প্রবাসীরা এখনো সিন্ডিকেটের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
টিকিট সিন্ডিকেট বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রীতা ‘আমার দেশ’কে বলেন, অভ্যন্তরীণ রুটসহ বিমান টিকিটের মূল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা ডাইনামিক প্রাইসিং পদ্ধতিতে নির্ধারিত হয়।
এই ব্যবস্থায় চাহিদা, সময়, মৌসুম, আসন প্রাপ্যতা ও বাজার পরিস্থিতির ভিত্তিতে টিকিটের দাম পরিবর্তিত হয়।
তিনি জানান, যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা ও টিকিটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল আইন, ২০১৭ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি ১০ দফা নির্দেশনাসংবলিত একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। ওই পরিপত্র অনুযায়ী টিকিটে মূল্য, এজেন্সির নাম ও লাইসেন্স নম্বর উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার যেকোনো ধরনের টিকিট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কোনো এজেন্সি অস্বাভাবিক মূল্য আদায় কিংবা সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাদের নিবন্ধন বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
টিকিটের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে মন্ত্রণালয় ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) নিয়মিতভাবে ট্রাভেল এজেন্সি ও এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করছে বলেও জানান তিনি।
সূত্র: আমার দেশ

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক পরিপত্রে যাত্রীর নাম ও পাসপোর্ট নম্বর ছাড়া বুকিং না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যগামী রুটে গ্রুপ বুকিংয়ের ক্ষেত্রেও ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রীর নাম উল্লেখ করে বুকিং নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে এসব নির্দেশনার কোনোটি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
নামবিহীন গ্রুপ বুকিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় আসন আটকে রাখার প্রবণতাও রয়েছে। একই সঙ্গে টিকিটে ট্রাভেল এজেন্সির নাম এবং মূল মূল্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।
কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হলেও সংশ্লিষ্টরা পরে হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নেন। এরপর বিষয়টি তদারকিতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
এদিকে গ্রাহকসেবা নিশ্চিত, ন্যায্যমূল্য বজায় রাখা, আকাশপথে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসী কর্মীদের হয়রানি বন্ধের লক্ষ্যে ‘ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার টিকিট সিন্ডিকেট বন্ধে প্রায় ৪ হাজার ট্রাভেল এজেন্সির মধ্যে অনিয়মে জড়িত ৩০টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল। তবে বর্তমান সরকারের সময়ে এই মনিটরিং ব্যবস্থা কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।
আকাশপথে যাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। টিকিটের কারসাজি ঠেকাতে ওই টাস্কফোর্স বেশ কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বর্তমানে এর কোনো কার্যকর কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও মনিটরিংও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল—জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) ও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের কার্যালয়ে সার্ভেইলেন্স কমিটির পরিদর্শন করা; কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ছোট উড়োজাহাজ পরিচালনা হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা; নাম ও পাসপোর্ট ছাড়া ৭২ ঘণ্টার বেশি সময় টিকিট আটকে রাখার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া; বিমানবন্দরে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, পররাষ্ট্র, ধর্ম, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ডিজিএফআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে যুক্ত করে টাস্কফোর্সকে আরও শক্তিশালী করা, জিএসএগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো, প্রতারক এজেন্সির বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া এবং গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিত তদারকির সিদ্ধান্তও ছিল। তবে বর্তমানে এসব সিদ্ধান্তের কোনোটিই মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
জানা গেছে, প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি চাকরির ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক ও কর্মী হিসেবে যান।
এ ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বিদেশগামী কর্মীদের কাছে প্যাকেজ বিক্রি করে। ওই প্যাকেজে রিক্রুটিং এজেন্সির কমিশন ও বিমানভাড়া আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকায় ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণের সুযোগ থাকে। ফলে প্রকৃত ন্যায্যমূল্যের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ নেওয়া হয়।
এ কারণে বিমানভাড়া কমলেও অনেক সময় যাত্রীরা এর সুফল পান না।
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেশি চাহিদার রুটগুলোতে গ্রুপ বুকিংয়ের নামে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করে টিকিট অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্লক করে রাখার ঘটনা রয়েছে।
পরে এসব টিকিট হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রচার করে অননুমোদিত এজেন্টদের মাধ্যমে বেশি দামে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সি ও জিএসএর সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে আসে। অভিযোগের ভিত্তিতে আত-তাইয়্যারা ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনাল, এনএমএসএস ইন্টারন্যাশনাল, আরবিসি ইন্টারন্যাশনাল, কিং এয়ার, সিটিকম, কাজী এয়ার ও আল গাজী এয়ারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে আবার সক্রিয় হয়ে বিভিন্ন উপায়ে টিকিট ব্লক করার কাজে যুক্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, গত আট মাসে কাজের উদ্দেশ্যে প্রায় আড়াই লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরবে গেছেন। তাদের বড় অংশই রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে গেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, টিকিট প্রথমে ছোট এজেন্সি থেকে মাঝারি এবং পরে বড় এজেন্সির হাতে যায়। প্রতিটি পর্যায়ে টিকিটের মূল্যের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত হয়।
রিক্রুটিং এজেন্সির প্যাকেজ নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। প্যাকেজে বিমানভাড়া ও এজেন্সির কমিশন আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকায় মোট মূল্য নিজেদের মতো নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়।
ফলে বিমানভাড়া কমলেও শ্রমিকরা সব সময় সেই সুবিধা পান না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। তাদের মতে, নামবিহীন গ্রুপ টিকিট ব্লক করার প্রক্রিয়া বন্ধ করা গেলে আসন সংকট কমবে এবং একই সঙ্গে টিকিটের দামও নিয়ন্ত্রণে আসবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমান টিকিটের দাম কেবল সিন্ডিকেটের কারণে নির্ধারিত হয় না। চাহিদা, মৌসুম, আসন প্রাপ্যতা ও সময়ের ওপরও টিকিটের মূল্য ওঠানামা করে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ওমরাহর টিকিটের দাম ছিল প্রায় ৫৫০ থেকে ৭৩৫ ডলার। শ্রমিকদের টিকিটের মূল্য ছিল ৩৭০ থেকে ৫৪০ ডলার।
২০২৫ সালে ওমরাহর টিকিটের গড় মূল্য ছিল প্রায় ৪৭০ ডলার। রমজান মাসে তা বেড়ে ৬০০ থেকে ৯০০ ডলারে পৌঁছায়। শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ভাড়া ছিল ৪০০ থেকে ৬০০ ডলার।
২০২৬ সালে ওমরাহর টিকিটের দাম ৫১০ থেকে ৮০০ ডলারের মধ্যে ছিল। বর্তমানে সৌদি আরবে চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের যাতায়াতও কিছুটা কমেছে। ফলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, শ্রমিকদের টিকিটের দাম এখন ২৫০ থেকে ৫৩০ ডলারের মধ্যে রয়েছে।
এ কারণে এই সময়ে সিন্ডিকেটের প্রভাব কিছুটা কম থাকলেও সুযোগ পেলেই টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালে তৎকালীন আটাব সভাপতি আব্দুস সালাম আরেফ জানিয়েছিলেন, নামবিহীন গ্রুপ টিকিট বুকিং কৃত্রিম সংকট তৈরির অন্যতম কারণ।
তার অভিযোগ ছিল, মধ্যপ্রাচ্যগামী কিছু এয়ারলাইন্স পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট বা যাত্রী তালিকা ছাড়াই নির্দিষ্ট এজেন্সির নামে আগাম গ্রুপ সিট ব্লক করে রাখে। পরে এসব টিকিট বেশি দামে বিক্রি করা হয়।
এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে টিকিটের দাম ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে দাম দ্বিগুণ বা তিনগুণ হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তার মতে, গ্রুপ টিকিট বুকিং বন্ধ করা গেলে টিকিটের সংকট যেমন কমবে, তেমনি দামও কমে আসবে।
২০২৫ সালের ৪ মে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের একটি সভাতেও বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বিমানভাড়া ও কমিশন আলাদাভাবে উল্লেখ না করে এককালীন প্যাকেজ বিক্রি করায় বিদেশগামী কর্মীরা বিমানভাড়া কমার সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে পুরো মুনাফা এজেন্সির কাছে থেকে যাচ্ছে।
সরকারি তদন্তে ১১টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স, তাদের জিএসএ এবং ৩০টি ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে যাত্রীর নাম ছাড়া টিকিট ব্লক করে শতকোটি টাকা অবৈধভাবে আয়ের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা থেকে জেদ্দা, রিয়াদ, মদিনা ও দাম্মাম রুটে টিকিটের দাম সর্বোচ্চ ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
বর্তমান সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে টিকিট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত মনিটরিং না থাকা এবং গঠিত টাস্কফোর্সের নিষ্ক্রিয়তার কারণে যাত্রী ও প্রবাসীরা এখনো সিন্ডিকেটের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
টিকিট সিন্ডিকেট বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রীতা ‘আমার দেশ’কে বলেন, অভ্যন্তরীণ রুটসহ বিমান টিকিটের মূল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা ডাইনামিক প্রাইসিং পদ্ধতিতে নির্ধারিত হয়।
এই ব্যবস্থায় চাহিদা, সময়, মৌসুম, আসন প্রাপ্যতা ও বাজার পরিস্থিতির ভিত্তিতে টিকিটের দাম পরিবর্তিত হয়।
তিনি জানান, যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা ও টিকিটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল আইন, ২০১৭ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি ১০ দফা নির্দেশনাসংবলিত একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। ওই পরিপত্র অনুযায়ী টিকিটে মূল্য, এজেন্সির নাম ও লাইসেন্স নম্বর উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার যেকোনো ধরনের টিকিট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কোনো এজেন্সি অস্বাভাবিক মূল্য আদায় কিংবা সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাদের নিবন্ধন বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
টিকিটের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে মন্ত্রণালয় ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) নিয়মিতভাবে ট্রাভেল এজেন্সি ও এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করছে বলেও জানান তিনি।
সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন