উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবল স্রোতে মুন্সীগঞ্জের পদ্মা নদী এখন উত্তাল। তীব্র স্রোতের কারণে নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে বসতভিটা, বিভিন্ন স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সরেজমিনে সদর উপজেলার দেওয়ানকান্দি, রাকিরকান্দি ও পূর্বরাখী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পদ্মার তীরজুড়ে ব্যাপক ভাঙন চলছে। ভাঙন ঠেকাতে এসব এলাকায় অস্থায়ীভাবে বালুর বস্তা ফেলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনের প্রবল স্রোতে সেই প্রতিরোধব্যবস্থার বড় একটি অংশ ধসে পড়েছে।
ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড এখনো বালুর বস্তা ফেলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে নদীর স্রোত এতটাই প্রবল যে অস্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত দুই দিনের ভয়াবহ ভাঙনে রাকিরকান্দি এলাকার মাদানী কমপ্লেক্স মাদ্রাসার ইমাম আবু হানিফা জামে মসজিদটিও পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। যে মসজিদে রাতের এশার নামাজ আদায় করেছিলেন মুসল্লিরা, কয়েক ঘণ্টা পর ফজরের নামাজের সময় সেখানে গিয়ে মসজিদটির কোনো অস্তিত্বই দেখতে পাননি তারা।
মাদ্রাসার ছাত্র সোহেল বলেন, শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতে মসজিদে এশার নামাজ আদায় করে তারা মাদ্রাসার ভেতরে ঘুমিয়ে ছিলেন। পরে ফজরের নামাজ পড়তে এসে দেখেন, মসজিদটি আর নেই। নদীর ভাঙনে সেটি বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে তারা মাঠে নামাজ আদায় করছেন।
স্থানীয় সাবেক জনপ্রতিনিধি ও ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান দুদু বলেন, একসময় এখানে ছোট একটি নদী ছিল। স্থানীয় কিছু লোক ড্রেজার দিয়ে এখান থেকে মাটি কাটায় নদীটি আরও গভীর ও প্রশস্ত হয়ে গেছে। এর ফলে এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাদের খানকা মাদ্রাসারও বড় একটি অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। গত শুক্রবার খানকার মসজিদে এশার নামাজ পড়লেও ফজরের নামাজ সেখানে পড়তে পারেননি, কারণ এর আগেই মসজিদটি নদীতে ধসে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলার নদীগুলোতে পানির উচ্চতা বাড়ছে এবং নদীতে তীব্র স্রোত রয়েছে। তবে পানির স্তর এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।
সরেজমিনে টঙ্গিবাড়ী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নদীতে পানির প্রবল প্রবাহ দেখা গেছে। ভাঙনের কারণে নদীর স্রোতের বিপরীতে চলাচল করতে ছোট নৌযানগুলোকে বেগ পেতে হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক দিনে স্রোতের তীব্রতা আরও বেড়েছে। সদর উপজেলার পাশাপাশি টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বানারী এলাকাতেও তীব্র নদীভাঙন চলছে। ভাঙনে বানারী গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মিয়া বাড়িও বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় মো. হোসেন লিটন খান বলেন, পদ্মার ভাঙন থেকে তারা কোনোভাবেই রক্ষা পাচ্ছেন না। মাদানী কমপ্লেক্সের মসজিদসহ এলাকার একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। সেখানে প্রতিবছর মাহফিলের সময় অনেক মানুষের সমাগম হয়। মাহফিলের জন্য ব্যবহৃত মাঠটিও নদীগর্ভে চলে গেছে। মাদানী কমপ্লেক্স গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে তিনি এটি রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
স্থানীয় জামাল বলেন, আগে নদীটি ছোট ছিল। গত কয়েক বছরে আশপাশের অনেক বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। এখানকার মানুষের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। স্থানীয় শিক্ষার্থীরা একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে, সেই মাদ্রাসার মসজিদটিও নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে।
মাদানী কমপ্লেক্স মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. খালেক সাইফুল বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে এখানে নদীভাঙনে কোনো না কোনো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মাদ্রাসার ১০০ শতাংশ জমি ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কথা শোনা গেলেও এখনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। মানুষের বাড়িঘর ও মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা পদ্মায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
রোববার বিকেলে ভাঙনকবলিত সদর উপজেলার দেওয়ানকান্দি এলাকা পরিদর্শন করেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের এমপি কামরুজ্জামান রতন ও মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক নুর মহল আশরাফী। এ সময় তারা বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকাতে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন।
জেলা প্রশাসক নুর মহল আশরাফী বলেন, এলাকার ভাঙন প্রতিরোধে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের নিয়ে ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা ৪০০ মিটার এলাকা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের এমপি কামরুজ্জামান রতন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে। তীব্র স্রোতের কারণে একটি মসজিদ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন ঠেকাতে তারা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, পদ্মা নদীতে পানির স্রোত বেড়েছে। এ কারণে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো কাজ করা হচ্ছে।
সূত্র: ইত্তেফাক/এমএস

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবল স্রোতে মুন্সীগঞ্জের পদ্মা নদী এখন উত্তাল। তীব্র স্রোতের কারণে নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে বসতভিটা, বিভিন্ন স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সরেজমিনে সদর উপজেলার দেওয়ানকান্দি, রাকিরকান্দি ও পূর্বরাখী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পদ্মার তীরজুড়ে ব্যাপক ভাঙন চলছে। ভাঙন ঠেকাতে এসব এলাকায় অস্থায়ীভাবে বালুর বস্তা ফেলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনের প্রবল স্রোতে সেই প্রতিরোধব্যবস্থার বড় একটি অংশ ধসে পড়েছে।
ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড এখনো বালুর বস্তা ফেলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে নদীর স্রোত এতটাই প্রবল যে অস্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত দুই দিনের ভয়াবহ ভাঙনে রাকিরকান্দি এলাকার মাদানী কমপ্লেক্স মাদ্রাসার ইমাম আবু হানিফা জামে মসজিদটিও পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। যে মসজিদে রাতের এশার নামাজ আদায় করেছিলেন মুসল্লিরা, কয়েক ঘণ্টা পর ফজরের নামাজের সময় সেখানে গিয়ে মসজিদটির কোনো অস্তিত্বই দেখতে পাননি তারা।
মাদ্রাসার ছাত্র সোহেল বলেন, শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতে মসজিদে এশার নামাজ আদায় করে তারা মাদ্রাসার ভেতরে ঘুমিয়ে ছিলেন। পরে ফজরের নামাজ পড়তে এসে দেখেন, মসজিদটি আর নেই। নদীর ভাঙনে সেটি বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে তারা মাঠে নামাজ আদায় করছেন।
স্থানীয় সাবেক জনপ্রতিনিধি ও ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান দুদু বলেন, একসময় এখানে ছোট একটি নদী ছিল। স্থানীয় কিছু লোক ড্রেজার দিয়ে এখান থেকে মাটি কাটায় নদীটি আরও গভীর ও প্রশস্ত হয়ে গেছে। এর ফলে এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাদের খানকা মাদ্রাসারও বড় একটি অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। গত শুক্রবার খানকার মসজিদে এশার নামাজ পড়লেও ফজরের নামাজ সেখানে পড়তে পারেননি, কারণ এর আগেই মসজিদটি নদীতে ধসে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলার নদীগুলোতে পানির উচ্চতা বাড়ছে এবং নদীতে তীব্র স্রোত রয়েছে। তবে পানির স্তর এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।
সরেজমিনে টঙ্গিবাড়ী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নদীতে পানির প্রবল প্রবাহ দেখা গেছে। ভাঙনের কারণে নদীর স্রোতের বিপরীতে চলাচল করতে ছোট নৌযানগুলোকে বেগ পেতে হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক দিনে স্রোতের তীব্রতা আরও বেড়েছে। সদর উপজেলার পাশাপাশি টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বানারী এলাকাতেও তীব্র নদীভাঙন চলছে। ভাঙনে বানারী গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মিয়া বাড়িও বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় মো. হোসেন লিটন খান বলেন, পদ্মার ভাঙন থেকে তারা কোনোভাবেই রক্ষা পাচ্ছেন না। মাদানী কমপ্লেক্সের মসজিদসহ এলাকার একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। সেখানে প্রতিবছর মাহফিলের সময় অনেক মানুষের সমাগম হয়। মাহফিলের জন্য ব্যবহৃত মাঠটিও নদীগর্ভে চলে গেছে। মাদানী কমপ্লেক্স গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে তিনি এটি রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
স্থানীয় জামাল বলেন, আগে নদীটি ছোট ছিল। গত কয়েক বছরে আশপাশের অনেক বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। এখানকার মানুষের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। স্থানীয় শিক্ষার্থীরা একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে, সেই মাদ্রাসার মসজিদটিও নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে।
মাদানী কমপ্লেক্স মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. খালেক সাইফুল বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে এখানে নদীভাঙনে কোনো না কোনো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মাদ্রাসার ১০০ শতাংশ জমি ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কথা শোনা গেলেও এখনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। মানুষের বাড়িঘর ও মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা পদ্মায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
রোববার বিকেলে ভাঙনকবলিত সদর উপজেলার দেওয়ানকান্দি এলাকা পরিদর্শন করেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের এমপি কামরুজ্জামান রতন ও মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক নুর মহল আশরাফী। এ সময় তারা বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকাতে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন।
জেলা প্রশাসক নুর মহল আশরাফী বলেন, এলাকার ভাঙন প্রতিরোধে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের নিয়ে ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা ৪০০ মিটার এলাকা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের এমপি কামরুজ্জামান রতন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে। তীব্র স্রোতের কারণে একটি মসজিদ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন ঠেকাতে তারা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, পদ্মা নদীতে পানির স্রোত বেড়েছে। এ কারণে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো কাজ করা হচ্ছে।
সূত্র: ইত্তেফাক/এমএস

আপনার মতামত লিখুন