ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

জাতীয়

ঢাকার বাইরে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, পাঁচ জেলায় সংক্রমণ বেশি

ঢাকার বাইরে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, পাঁচ জেলায় সংক্রমণ বেশি
ঢাকার বাইরে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, পাঁচ জেলায় সংক্রমণ বেশি

বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা জুলাই থেকেই বাড়ছে। তবে আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই জুলাই মাসের তুলনায় বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট পর্যন্ত চলতি মাসে প্রায় ১১ হাজার ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০০-এর বেশি।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সাড়ে ২৬ হাজারের বেশি রোগী।

অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ শুধু রাজধানী ঢাকা ঘিরে নেই। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলাতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে কোন এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে এবং সামনে কোথায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বর্ষাকালে এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। বৃষ্টির পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। ফলে সামনে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ঢাকার বাইরে পাঁচ জেলায় বেশি সংক্রমণ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৭ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে ঢাকায় মারা গেছেন ৩৪ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা—দুই দিক থেকেই ঢাকা শীর্ষে।

ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে খুলনা জেলায়। সেখানে ১ হাজার ৬০০ জনের বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুর সংখ্যাতেও খুলনা এগিয়ে; এ জেলায় মারা গেছেন ১৪ জন।

এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৯১ জন। মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।

আক্রান্তের হিসাবে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশালের পিরোজপুর। চলতি বছর এখন পর্যন্ত জেলাটিতে ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন একজন।

চতুর্থ অবস্থানে থাকা ময়মনসিংহ জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯২৪ জন। সেখানে মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের।

ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে গাজীপুরে আক্রান্তের সংখ্যা ৭২০। তবে এ জেলায় ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি। একই বিভাগের মানিকগঞ্জে একজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

কেন ঝুঁকিতে এসব জেলা

একসময় ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি দেখা গেলেও এবার ঢাকার বাইরের কয়েকটি জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে।

জনস্বাস্থ্য ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে বলেন, এ বছর উপকূলীয় অঞ্চলে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বরগুনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে এর উপস্থিতি বেশি।

এর কারণ হিসেবে তিনি উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা এবং বছরজুড়ে বৃষ্টির পানি মাটির পাত্রে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।

ডা. মুশতাকের মতে, কোনো পাত্র বা স্থানে ৪৮ ঘণ্টার বেশি পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে এবং লার্ভা তৈরি হতে পারে। সংরক্ষিত পানিতে ক্লোরিন ট্যাবলেট ব্যবহার করলে মশার লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব। কিছু এলাকায় এ বিষয়ে প্রচার চালানো হলেও সব লবণাক্ত এলাকায় একইভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম হয়নি।

গাজীপুরে ডেঙ্গুর বিস্তারের ক্ষেত্রে ঘনবসতি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন ডা. মুশতাক। তাঁর মতে, নিম্ন আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করায় ব্যক্তিগতভাবে এলাকার পরিবেশ পরিষ্কার রাখা সম্ভব হয় না। পরিবেশের মান উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ প্রয়োজন।

ময়মনসিংহেও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকার বিষয়টি ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশের আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাহাড় রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এবার ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে চট্টগ্রাম জেলা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও গাছপালায় ঘেরা এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে। তবে শুধু এ কারণেই ডেঙ্গু ছড়ায় না।

ডা. মুশতাক বলেন, চট্টগ্রাম ও ঢাকা একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পাহাড়ি এলাকা জনবিরল হলে ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু এসব এলাকায় ঘনবসতি থাকলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ে।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাতীয় নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরীর মতে, উপকূলীয় এলাকার পাশাপাশি যেসব অঞ্চলের পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ বেশি, সেসব জায়গাতেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, আর্সেনিকপ্রবণ এলাকার মানুষ অনেক সময় নিরাপদ নলকূপের পানি বিভিন্ন পাত্রে সংরক্ষণ করেন। দীর্ঘ সময় পানি জমিয়ে রাখলে এসব পাত্র এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে।

ডেঙ্গু বাড়ার পেছনে আরও যেসব কারণ

বিশ্বে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশা রয়েছে। বাংলাদেশে বেশি দেখা যায় এমন ক্ষতিকর মশার মধ্যে অ্যানোফিলিস, এডিস ও কিউলেক্স অন্যতম।

স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া ছড়ায়। এডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ছড়ায়। কিউলেক্স মশার কামড়ে হতে পারে ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ।

ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস এলবোপিকটাস প্রজাতির মশা।

কীটতত্ত্ববিদ মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, এডিস ইজিপ্টাই মূলত শহরকেন্দ্রিক। অন্যদিকে এডিস এলবোপিকটাস বেশি দেখা যায় গাছপালাসমৃদ্ধ গ্রামীণ এলাকায়।

হাঁড়ি-পাতিল, প্লাস্টিকের বোতল, ক্যান, দইয়ের পাত্রসহ বিভিন্ন কৃত্রিম পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস ইজিপ্টাই বংশবিস্তার করে। এ কারণে এই মশাকে ‘কন্টেইনার ব্রিডিং মসকুইটো’ বলা হয়।

অন্যদিকে গাছের কোটর কিংবা কচুপাতার গোড়ার মতো প্রাকৃতিকভাবে পানি জমে থাকা জায়গায় এডিস এলবোপিকটাসের প্রজনন ঘটে।

মনজুর আহমেদ চৌধুরীর মতে, ডেঙ্গু ছড়ানোর ক্ষেত্রে এডিস ইজিপ্টাই তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর বাহক। তবে কোনো কোনো এলাকায় এডিস এলবোপিকটাসও প্রধান বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে।

এমন এলাকাও রয়েছে যেখানে এডিস ইজিপ্টাই পাওয়া না গেলেও ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। তাই ডেঙ্গুকে এখন আর কেবল শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, আগে শহরাঞ্চলে এডিস মশার বিস্তার বেশি থাকলেও নগরায়নের প্রভাবে এখন গ্রামেও এই মশা ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামাঞ্চলেও এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, দুই-তিন দশক আগে ঢাকার যেসব এলাকায় নিয়মিত পানির সংকট ছিল, সেখানে মানুষ ড্রামসহ বিভিন্ন পাত্রে পানি সংরক্ষণ করতেন। পুরান ঢাকার কিছু এলাকা ও এলিফ্যান্ট রোডের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, পানির সংকটের কারণে এসব এলাকায় ড্রামে পানি রাখা হতো। এতে মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হতো।

বর্তমানে পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হয়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় ও ভোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পাত্রের ব্যবহারও বেড়েছে। আগের তুলনায় হাড়িপাতিল ও পাত্রের সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ছাদবাগান। গ্রামেও অনেকে প্লাস্টিকের বোতলে পানি পান করেন। বিশেষ করে সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক শহর ও গ্রামের ব্যবধান কমিয়ে দিয়েছে।

ফলে শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকাতেই এডিস মশার জন্য নতুন নতুন প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে।

এ ছাড়া সারাদেশে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার পেছনে আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ঘাটতির কথাও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, বেশি তাপমাত্রা এবং ঘন ঘন বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমছে। এতে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

তাঁর মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সারাদেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে সিটি করপোরেশন বা উপজেলায় জনপ্রতিনিধি নেই। ফলে মশা নিধন কার্যক্রমও যথাযথভাবে হয়নি। এতে মশার সংখ্যা বেড়েছে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু কবে

বাংলাদেশে ঠিক কবে থেকে এডিস মশার উপস্থিতি রয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

১৯৯৮ সালে কয়েকজন রোগীর শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত হয়। পরের বছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর অনেক রোগীর শরীরেও ডেঙ্গুর জীবাণু পাওয়া যায়।

২০০০ সালের দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে থাকে। তখন থেকেই এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের উপায় এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতামূলক প্রচারণা ধীরে ধীরে শুরু হয়।

অধ্যাপক মুশতাক হোসেন বলেন, অতীতেও এডিস মশার উপস্থিতি ছিল। কিন্তু ডেঙ্গু শনাক্তের সুযোগ কম থাকায় তখন মশাটির উপস্থিতি নিয়ে এত গবেষণা বা উদ্বেগের সুযোগ ছিল না। বর্তমানে সেই সুযোগ বেড়েছে।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করে ২০১৯ সালে। ওই বছর এক লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং ১৭৯ জন মারা যান।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬


ঢাকার বাইরে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, পাঁচ জেলায় সংক্রমণ বেশি

প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা জুলাই থেকেই বাড়ছে। তবে আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই জুলাই মাসের তুলনায় বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট পর্যন্ত চলতি মাসে প্রায় ১১ হাজার ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০০-এর বেশি।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সাড়ে ২৬ হাজারের বেশি রোগী।

অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ শুধু রাজধানী ঢাকা ঘিরে নেই। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলাতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে কোন এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে এবং সামনে কোথায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বর্ষাকালে এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। বৃষ্টির পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। ফলে সামনে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ঢাকার বাইরে পাঁচ জেলায় বেশি সংক্রমণ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৭ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে ঢাকায় মারা গেছেন ৩৪ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা—দুই দিক থেকেই ঢাকা শীর্ষে।

ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে খুলনা জেলায়। সেখানে ১ হাজার ৬০০ জনের বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুর সংখ্যাতেও খুলনা এগিয়ে; এ জেলায় মারা গেছেন ১৪ জন।

এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৯১ জন। মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।

আক্রান্তের হিসাবে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশালের পিরোজপুর। চলতি বছর এখন পর্যন্ত জেলাটিতে ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন একজন।

চতুর্থ অবস্থানে থাকা ময়মনসিংহ জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯২৪ জন। সেখানে মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের।

ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে গাজীপুরে আক্রান্তের সংখ্যা ৭২০। তবে এ জেলায় ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি। একই বিভাগের মানিকগঞ্জে একজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

কেন ঝুঁকিতে এসব জেলা

একসময় ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি দেখা গেলেও এবার ঢাকার বাইরের কয়েকটি জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে।

জনস্বাস্থ্য ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে বলেন, এ বছর উপকূলীয় অঞ্চলে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বরগুনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে এর উপস্থিতি বেশি।

এর কারণ হিসেবে তিনি উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা এবং বছরজুড়ে বৃষ্টির পানি মাটির পাত্রে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।

ডা. মুশতাকের মতে, কোনো পাত্র বা স্থানে ৪৮ ঘণ্টার বেশি পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে এবং লার্ভা তৈরি হতে পারে। সংরক্ষিত পানিতে ক্লোরিন ট্যাবলেট ব্যবহার করলে মশার লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব। কিছু এলাকায় এ বিষয়ে প্রচার চালানো হলেও সব লবণাক্ত এলাকায় একইভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম হয়নি।

গাজীপুরে ডেঙ্গুর বিস্তারের ক্ষেত্রে ঘনবসতি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন ডা. মুশতাক। তাঁর মতে, নিম্ন আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করায় ব্যক্তিগতভাবে এলাকার পরিবেশ পরিষ্কার রাখা সম্ভব হয় না। পরিবেশের মান উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ প্রয়োজন।

ময়মনসিংহেও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকার বিষয়টি ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশের আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাহাড় রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এবার ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে চট্টগ্রাম জেলা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও গাছপালায় ঘেরা এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে। তবে শুধু এ কারণেই ডেঙ্গু ছড়ায় না।

ডা. মুশতাক বলেন, চট্টগ্রাম ও ঢাকা একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পাহাড়ি এলাকা জনবিরল হলে ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু এসব এলাকায় ঘনবসতি থাকলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ে।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাতীয় নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরীর মতে, উপকূলীয় এলাকার পাশাপাশি যেসব অঞ্চলের পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ বেশি, সেসব জায়গাতেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, আর্সেনিকপ্রবণ এলাকার মানুষ অনেক সময় নিরাপদ নলকূপের পানি বিভিন্ন পাত্রে সংরক্ষণ করেন। দীর্ঘ সময় পানি জমিয়ে রাখলে এসব পাত্র এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে।

ডেঙ্গু বাড়ার পেছনে আরও যেসব কারণ

বিশ্বে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশা রয়েছে। বাংলাদেশে বেশি দেখা যায় এমন ক্ষতিকর মশার মধ্যে অ্যানোফিলিস, এডিস ও কিউলেক্স অন্যতম।

স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া ছড়ায়। এডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ছড়ায়। কিউলেক্স মশার কামড়ে হতে পারে ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ।

ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস এলবোপিকটাস প্রজাতির মশা।

কীটতত্ত্ববিদ মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, এডিস ইজিপ্টাই মূলত শহরকেন্দ্রিক। অন্যদিকে এডিস এলবোপিকটাস বেশি দেখা যায় গাছপালাসমৃদ্ধ গ্রামীণ এলাকায়।

হাঁড়ি-পাতিল, প্লাস্টিকের বোতল, ক্যান, দইয়ের পাত্রসহ বিভিন্ন কৃত্রিম পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস ইজিপ্টাই বংশবিস্তার করে। এ কারণে এই মশাকে ‘কন্টেইনার ব্রিডিং মসকুইটো’ বলা হয়।

অন্যদিকে গাছের কোটর কিংবা কচুপাতার গোড়ার মতো প্রাকৃতিকভাবে পানি জমে থাকা জায়গায় এডিস এলবোপিকটাসের প্রজনন ঘটে।

মনজুর আহমেদ চৌধুরীর মতে, ডেঙ্গু ছড়ানোর ক্ষেত্রে এডিস ইজিপ্টাই তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর বাহক। তবে কোনো কোনো এলাকায় এডিস এলবোপিকটাসও প্রধান বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে।

এমন এলাকাও রয়েছে যেখানে এডিস ইজিপ্টাই পাওয়া না গেলেও ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। তাই ডেঙ্গুকে এখন আর কেবল শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, আগে শহরাঞ্চলে এডিস মশার বিস্তার বেশি থাকলেও নগরায়নের প্রভাবে এখন গ্রামেও এই মশা ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামাঞ্চলেও এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, দুই-তিন দশক আগে ঢাকার যেসব এলাকায় নিয়মিত পানির সংকট ছিল, সেখানে মানুষ ড্রামসহ বিভিন্ন পাত্রে পানি সংরক্ষণ করতেন। পুরান ঢাকার কিছু এলাকা ও এলিফ্যান্ট রোডের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, পানির সংকটের কারণে এসব এলাকায় ড্রামে পানি রাখা হতো। এতে মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হতো।

বর্তমানে পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হয়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় ও ভোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পাত্রের ব্যবহারও বেড়েছে। আগের তুলনায় হাড়িপাতিল ও পাত্রের সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ছাদবাগান। গ্রামেও অনেকে প্লাস্টিকের বোতলে পানি পান করেন। বিশেষ করে সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক শহর ও গ্রামের ব্যবধান কমিয়ে দিয়েছে।

ফলে শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকাতেই এডিস মশার জন্য নতুন নতুন প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে।

এ ছাড়া সারাদেশে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার পেছনে আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ঘাটতির কথাও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, বেশি তাপমাত্রা এবং ঘন ঘন বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমছে। এতে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

তাঁর মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সারাদেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে সিটি করপোরেশন বা উপজেলায় জনপ্রতিনিধি নেই। ফলে মশা নিধন কার্যক্রমও যথাযথভাবে হয়নি। এতে মশার সংখ্যা বেড়েছে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু কবে

বাংলাদেশে ঠিক কবে থেকে এডিস মশার উপস্থিতি রয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

১৯৯৮ সালে কয়েকজন রোগীর শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত হয়। পরের বছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর অনেক রোগীর শরীরেও ডেঙ্গুর জীবাণু পাওয়া যায়।

২০০০ সালের দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে থাকে। তখন থেকেই এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের উপায় এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতামূলক প্রচারণা ধীরে ধীরে শুরু হয়।

অধ্যাপক মুশতাক হোসেন বলেন, অতীতেও এডিস মশার উপস্থিতি ছিল। কিন্তু ডেঙ্গু শনাক্তের সুযোগ কম থাকায় তখন মশাটির উপস্থিতি নিয়ে এত গবেষণা বা উদ্বেগের সুযোগ ছিল না। বর্তমানে সেই সুযোগ বেড়েছে।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করে ২০১৯ সালে। ওই বছর এক লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং ১৭৯ জন মারা যান।

সূত্র: বিবিসি বাংলা


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - মোঃ আতিকুল ইসলাম
প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক - মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয় 
সহ-সম্পাদক- মোঃ জাকারিয়া হোসেন
বার্তা সম্পাদক - মোঃ ওলিউল্লাহ

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ঢাকার বাইরে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, পাঁচ জেলায় সংক্রমণ বেশি
0:00 0:00
1.0x