ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে এবং ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় ইরগুন একটি সক্রিয় ইহুদি আধাসামরিক সংগঠন হিসেবে কাজ করেছিল। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডে সংগঠনটির সম্পৃক্ততার ইতিহাস রয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সময় ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন। ফিলিস্তিনিদের কাছে ওই ঘটনা ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয় নামে পরিচিত।
সোমবার আলতালেনার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার কথা জানান বেন-গভির। এরপর বিষয়টি রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়। নেতানিয়াহুও দ্রুত সেখানে যান। পরে একই স্থান থেকে দুই নেতা পৃথক ভিডিও বার্তা দেন।
জাফার কাছে ইরগুনের হিব্রু নাম ‘এতজেল’-এর নামে প্রতিষ্ঠিত এতজেল জাদুঘরে গিয়ে নেতানিয়াহু আলতালেনার ইতিহাস তুলে ধরেন। তার রাজনৈতিক দল লিকুদ নিজেদের ইরগুনের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে পরিচয় দেয়।
১৯৪৮ সালের জুনে ইরগুনের জন্য অস্ত্র নিয়ে ফ্রান্স থেকে ইসরাইলে পৌঁছায় আলতালেনা। কিন্তু অস্ত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরগুন ও সদ্য গঠিত ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের নির্দেশে জাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসরাইলিদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে সে সময়ের ইরগুন কমান্ডার মেনাখেম বেগিনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইসরাইলি বাহিনী গুলি চালালেও বেগিন তার যোদ্ধাদের পাল্টা গুলি না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পরে ওই ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে বর্তমান রাজনীতির তুলনা করেন নেতানিয়াহু। নিজের এবং লিকুদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও ইসরাইলিরা একে অপরের ভাই।
ইরগুনের সঙ্গে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতার ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে।
১৯৪৮ সালের এপ্রিলে জেরুজালেমের কাছে দেইর ইয়াসিন গ্রামে ইরগুন ও আরেক উগ্রপন্থি আধাসামরিক সংগঠন লেহির যোদ্ধারা হামলা চালান। নারী ও শিশুসহ শতাধিক গ্রামবাসী নিহত হন। ইতিহাসবিদদের মতে, এর আগে গ্রামটির সঙ্গে নবগঠিত ইসরাইলি বাহিনীর অনাক্রমণ চুক্তি হয়েছিল।
কয়েক সপ্তাহ পর জাফায় অভিযান চালায় ইরগুন। শহরের প্রান্তে গোলাবর্ষণসহ ওই অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি বাসিন্দা জাফা ছেড়ে চলে যান।
ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগেও ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান চালিয়েছিল ইরগুন। ১৯৪৬ সালে জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে চালানো বোমা হামলায় ৯০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
তবে ইসরাইলি সমাজবিজ্ঞানী ইয়েহুদা শেনহাভ-শাহরাবানি মনে করেন, নাকবার জন্য পুরো দায় শুধু ইরগুনের ওপর দেওয়া সঠিক নয়। তার মতে, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার ঘটনায় লেবার আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জায়নবাদী আধাসামরিক সংগঠনগুলোরও বড় ভূমিকা ছিল।
অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহু যখন রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছেন, ঠিক তখনই আলতালেনার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি সামনে এলো। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তার দল লিকুদ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
নির্বাচনে কট্টর উগ্রপন্থি ভোটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ওই ভোটারদের মধ্যে বেন-গভিরেরও শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল বার-তালের মতে, আলতালেনাকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরির মূল কারণ নেতানিয়াহু ও বেন-গভিরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অধিকাংশ ইসরাইলি ভোটারের কাছে বিষয়টির গুরুত্ব খুব বেশি নয় বলেও মনে করেন তিনি।
বার-তালের ভাষ্য, আলতালেনা আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে বেন-গভির নেতানিয়াহুকে কিছুটা চাপের মধ্যে ফেলেছেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে একই মঞ্চে ছবি তুলতে রাজি হননি—এ বিষয়টিও সামনে আনেন বেন-গভির।
নিজেকে মেনাখেম বেগিনের সঙ্গে তুলনা করে বেন-গভির বলেন, অন্যরা যখন তার সঙ্গে একই মঞ্চে ছবি তুলতে চায় না, তখন বেগিনের মতো তিনিও সেই পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।
চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, ‘বেন-গভির নেতানিয়াহুর চেয়েও বেশি নেতানিয়াহু হয়ে উঠছেন।’
তার ভাষ্য, অন্যান্য দেশের জনতুষ্টিবাদী নেতাদের মতো নেতানিয়াহু ও বেন-গভিরও নিজেদের সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত ও অন্যায়ের শিকার হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
ইসরাইলে রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধির সময়ে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কার কথা বলা মূলত রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারণার অংশ বলে মনে করেন মেকেলবার্গ। তবে এ ধরনের বক্তব্য বিপজ্জনক বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
১৯৯৫ সালে প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন হত্যার আগে ইসরাইলে উসকানিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে নেতানিয়াহুর ভূমিকা ছিল—এমন দীর্ঘদিনের অভিযোগের কথাও স্মরণ করেন মেকেলবার্গ।
তার মতে, নেতানিয়াহু সংকটের অনুভূতি ধরে রাখতে এ ধরনের বক্তব্য ব্যবহার করেন। এরপর নিজেকেই সেই সংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করার নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন।
সূত্র: আমার দেশ

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ আগস্ট ২০২৬
ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে এবং ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় ইরগুন একটি সক্রিয় ইহুদি আধাসামরিক সংগঠন হিসেবে কাজ করেছিল। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডে সংগঠনটির সম্পৃক্ততার ইতিহাস রয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সময় ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন। ফিলিস্তিনিদের কাছে ওই ঘটনা ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয় নামে পরিচিত।
সোমবার আলতালেনার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার কথা জানান বেন-গভির। এরপর বিষয়টি রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়। নেতানিয়াহুও দ্রুত সেখানে যান। পরে একই স্থান থেকে দুই নেতা পৃথক ভিডিও বার্তা দেন।
জাফার কাছে ইরগুনের হিব্রু নাম ‘এতজেল’-এর নামে প্রতিষ্ঠিত এতজেল জাদুঘরে গিয়ে নেতানিয়াহু আলতালেনার ইতিহাস তুলে ধরেন। তার রাজনৈতিক দল লিকুদ নিজেদের ইরগুনের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে পরিচয় দেয়।
১৯৪৮ সালের জুনে ইরগুনের জন্য অস্ত্র নিয়ে ফ্রান্স থেকে ইসরাইলে পৌঁছায় আলতালেনা। কিন্তু অস্ত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরগুন ও সদ্য গঠিত ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের নির্দেশে জাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসরাইলিদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে সে সময়ের ইরগুন কমান্ডার মেনাখেম বেগিনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইসরাইলি বাহিনী গুলি চালালেও বেগিন তার যোদ্ধাদের পাল্টা গুলি না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পরে ওই ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে বর্তমান রাজনীতির তুলনা করেন নেতানিয়াহু। নিজের এবং লিকুদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও ইসরাইলিরা একে অপরের ভাই।
ইরগুনের সঙ্গে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতার ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে।
১৯৪৮ সালের এপ্রিলে জেরুজালেমের কাছে দেইর ইয়াসিন গ্রামে ইরগুন ও আরেক উগ্রপন্থি আধাসামরিক সংগঠন লেহির যোদ্ধারা হামলা চালান। নারী ও শিশুসহ শতাধিক গ্রামবাসী নিহত হন। ইতিহাসবিদদের মতে, এর আগে গ্রামটির সঙ্গে নবগঠিত ইসরাইলি বাহিনীর অনাক্রমণ চুক্তি হয়েছিল।
কয়েক সপ্তাহ পর জাফায় অভিযান চালায় ইরগুন। শহরের প্রান্তে গোলাবর্ষণসহ ওই অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি বাসিন্দা জাফা ছেড়ে চলে যান।
ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগেও ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান চালিয়েছিল ইরগুন। ১৯৪৬ সালে জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে চালানো বোমা হামলায় ৯০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
তবে ইসরাইলি সমাজবিজ্ঞানী ইয়েহুদা শেনহাভ-শাহরাবানি মনে করেন, নাকবার জন্য পুরো দায় শুধু ইরগুনের ওপর দেওয়া সঠিক নয়। তার মতে, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার ঘটনায় লেবার আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জায়নবাদী আধাসামরিক সংগঠনগুলোরও বড় ভূমিকা ছিল।
অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহু যখন রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছেন, ঠিক তখনই আলতালেনার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি সামনে এলো। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তার দল লিকুদ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
নির্বাচনে কট্টর উগ্রপন্থি ভোটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ওই ভোটারদের মধ্যে বেন-গভিরেরও শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল বার-তালের মতে, আলতালেনাকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরির মূল কারণ নেতানিয়াহু ও বেন-গভিরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অধিকাংশ ইসরাইলি ভোটারের কাছে বিষয়টির গুরুত্ব খুব বেশি নয় বলেও মনে করেন তিনি।
বার-তালের ভাষ্য, আলতালেনা আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে বেন-গভির নেতানিয়াহুকে কিছুটা চাপের মধ্যে ফেলেছেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে একই মঞ্চে ছবি তুলতে রাজি হননি—এ বিষয়টিও সামনে আনেন বেন-গভির।
নিজেকে মেনাখেম বেগিনের সঙ্গে তুলনা করে বেন-গভির বলেন, অন্যরা যখন তার সঙ্গে একই মঞ্চে ছবি তুলতে চায় না, তখন বেগিনের মতো তিনিও সেই পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।
চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, ‘বেন-গভির নেতানিয়াহুর চেয়েও বেশি নেতানিয়াহু হয়ে উঠছেন।’
তার ভাষ্য, অন্যান্য দেশের জনতুষ্টিবাদী নেতাদের মতো নেতানিয়াহু ও বেন-গভিরও নিজেদের সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত ও অন্যায়ের শিকার হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
ইসরাইলে রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধির সময়ে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কার কথা বলা মূলত রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারণার অংশ বলে মনে করেন মেকেলবার্গ। তবে এ ধরনের বক্তব্য বিপজ্জনক বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
১৯৯৫ সালে প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন হত্যার আগে ইসরাইলে উসকানিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে নেতানিয়াহুর ভূমিকা ছিল—এমন দীর্ঘদিনের অভিযোগের কথাও স্মরণ করেন মেকেলবার্গ।
তার মতে, নেতানিয়াহু সংকটের অনুভূতি ধরে রাখতে এ ধরনের বক্তব্য ব্যবহার করেন। এরপর নিজেকেই সেই সংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করার নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন।
সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন