ঢাকা    সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

আন্তর্জাতিক

যুদ্ধের ছয় মাসে আমূল বদলে গেছে ইরানিদের জীবন

যুদ্ধের ছয় মাসে আমূল বদলে গেছে ইরানিদের জীবন
যুদ্ধের ছয় মাসে আমূল বদলে গেছে ইরানিদের জীবন

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর ছয় মাসেরও বেশি সময় পেরিয়েছে। এই সময়ে দেশটির অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে গেছে। একই সঙ্গে ইরানের মুদ্রার মূল্যও রেকর্ড নিম্নস্তরে পৌঁছেছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানিয়ে নিতে পারলেও নিজেদের আদর্শগত অবস্থান থেকে তারা বড় ধরনের কোনো ছাড় দেয়নি। তবে প্রায় ৯ কোটি ইরানির কাছে দৈনন্দিন জীবন এখন টিকে থাকার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

তেহরানের তরুণী মারজান বলেন, তিনি এমন জীবন চান যেখানে প্রতিনিয়ত অন্যদের সঙ্গে বিরোধে জড়াতে হবে না, বিশ্বের কাছ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হবে না এবং প্রতিদিন কীভাবে জীবন চালাবেন তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।

নিরাপত্তাজনিত কারণে ওই তরুণী শুধু নিজের প্রথম নাম প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, এমন একটি জীবনের কথা তিনি বারবার কল্পনা করেন। কিন্তু সেই জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ না থাকায় হতাশ হন এবং পরের দিনটি পার করার আশায় আবারও একই বাস্তবতায় ফিরে যেতে হয়।

রাজনীতি ও কূটনীতি

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হন।

এর পরও ইরানের সরকার টিকে থাকে। নিহত নেতার ছেলে মোজতাবা খামেনি দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। তবে এখনো তাকে জনসম্মুখে খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর কয়েকজন কমান্ডারকেও পরিবর্তন করা হয়েছে।

ইরানের ক্ষমতাসীন মহলের মধ্যে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। এক পক্ষ কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে, অন্য পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হয়ে পিছু না হটা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছে। তবে দুই পক্ষই একটি বিষয়ে একমত—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কাছে ‘আত্মসমর্পণ’ করা হবে না।

এদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর দাবি করেছে ইরান। যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় অনেক কমে গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ওই সমঝোতার বিরোধিতা করছে। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে এবং কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই উন্মুক্ত রাখতে হবে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বড় মতবিরোধ এখনো রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা আবার শুরু করতে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এ যাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় আলোচনায় এখনো বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

কমেছে বেতন, বেড়েছে মূল্যস্ফীতি

দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বাইরের চাপের কারণে ইরানের অর্থনীতি তার সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম সক্ষমতায় চলছে।

ইরানের মর্দাদ মাস ২২ আগস্ট শেষ হয়েছে। ওই মাসে দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের হিসাবে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মূল্যস্ফীতি ৮৯ শতাংশ বেশি ছিল। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১২৭ শতাংশেরও বেশি।

তেহরানের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত বিজান জানান, প্রায় তিন বছর আগে ওই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সময় তার মাসিক বেতন ১ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের সমান ছিল। কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে সেই বেতনের প্রকৃত মূল্য অনেক কমে গেছে।

তিনি বলেন, তিনবার বেতন বাড়লেও বর্তমানে তার বেতনের মূল্য ৫০০ ডলারের নিচে নেমে গেছে।

৩৩ বছর বয়সী বিজান জানান, পরিস্থিতি প্রতিদিন আরও খারাপ হওয়ায় মাঝে মাঝে তার মনে হয়, এক দশকেরও বেশি সময় আগে স্নাতক শেষ করার পর যদি ইরান ছেড়ে চলে যেতেন, তাহলে তার জীবন কেমন হতো।

ইরানের মুদ্রা রিয়ালও বড় ধরনের দরপতনের শিকার হয়েছে। শনিবার তেহরানের খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে ২০ লাখ ৬০ হাজার রিয়ালে পৌঁছায়। রিয়ালের ইতিহাসে এটিই সর্বনিম্ন মূল্য।

তেল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট

যুদ্ধ চলাকালে ইরানের তেল ও গ্যাস স্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল ও ইস্পাত কারখানা, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য পরিষেবা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়িঘর, বন্দর, বিমানবন্দর ও সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

বিশ্বের অন্যতম সম্পদসমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরান বর্তমানে অবনতিশীল জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে রয়েছে। শীত মৌসুম সামনে রেখে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ইতোমধ্যে জ্বালানি বরাদ্দ কমানো হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পেট্রলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।

সমাজে বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ

ইরানি কর্তৃপক্ষ যুদ্ধের বিষয়ে বিশ্বের সামনে ‘পবিত্র ঐক্যের’ বার্তা তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে নিজেদের মতামত প্রকাশে সতর্ক থাকলেও রাজনীতিবিদদের বক্তব্যে সরকারের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য প্রকাশ পাচ্ছে।

শুক্রবার মোজতাবা খামেনির নামে প্রকাশিত এক লিখিত বার্তায় বলা হয়, সামাজিক সংহতি ক্ষতিগ্রস্ত করে—এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ।

এর কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, সরকার ভয়াবহ আর্থিক সংকটে রয়েছে। অবরুদ্ধ জনগণের জীবনযাত্রার উন্নতি করা তো দূরের কথা, সরকার তেল বিক্রি করতেও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

এদিকে বিচার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারি অবস্থানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করেছে।

প্রতি সপ্তাহেই নতুন করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণা আসছে। এসব দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং জানুয়ারিতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব মৃত্যুদণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। পাশাপাশি বাধ্যতামূলক হিজাব আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাধ্যতামূলক পোশাকবিধির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের কয়েক বছর পর আবারও আইনটি প্রয়োগে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই সপ্তাহেই ইসলামি আইন ও প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত নীতিমালা না মানার অভিযোগে আরও কয়েকটি ক্যাফে, আইসক্রিমের দোকান এবং ব্যক্তিগত অনলাইন বিক্রেতার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

তেহরানের আরেক তরুণ বাসিন্দা সাসান বলেন, অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, দেশের ওপর বাইরের চাপ বাড়লে কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে।

তিনি বলেন, কখনো কখনো হতাশার কষ্ট অনুভব করেন। সবসময় চেষ্টা করেও তার মনে হয়, সবকিছু যেন তার বিপক্ষে কাজ করছে এবং ভবিষ্যৎ মূলত নিজের হাতে নেই।

সূত্র: যুগান্তর

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬


যুদ্ধের ছয় মাসে আমূল বদলে গেছে ইরানিদের জীবন

প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর ছয় মাসেরও বেশি সময় পেরিয়েছে। এই সময়ে দেশটির অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে গেছে। একই সঙ্গে ইরানের মুদ্রার মূল্যও রেকর্ড নিম্নস্তরে পৌঁছেছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানিয়ে নিতে পারলেও নিজেদের আদর্শগত অবস্থান থেকে তারা বড় ধরনের কোনো ছাড় দেয়নি। তবে প্রায় ৯ কোটি ইরানির কাছে দৈনন্দিন জীবন এখন টিকে থাকার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

তেহরানের তরুণী মারজান বলেন, তিনি এমন জীবন চান যেখানে প্রতিনিয়ত অন্যদের সঙ্গে বিরোধে জড়াতে হবে না, বিশ্বের কাছ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হবে না এবং প্রতিদিন কীভাবে জীবন চালাবেন তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।

নিরাপত্তাজনিত কারণে ওই তরুণী শুধু নিজের প্রথম নাম প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, এমন একটি জীবনের কথা তিনি বারবার কল্পনা করেন। কিন্তু সেই জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ না থাকায় হতাশ হন এবং পরের দিনটি পার করার আশায় আবারও একই বাস্তবতায় ফিরে যেতে হয়।

রাজনীতি ও কূটনীতি

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হন।

এর পরও ইরানের সরকার টিকে থাকে। নিহত নেতার ছেলে মোজতাবা খামেনি দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। তবে এখনো তাকে জনসম্মুখে খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর কয়েকজন কমান্ডারকেও পরিবর্তন করা হয়েছে।

ইরানের ক্ষমতাসীন মহলের মধ্যে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। এক পক্ষ কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে, অন্য পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হয়ে পিছু না হটা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছে। তবে দুই পক্ষই একটি বিষয়ে একমত—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কাছে ‘আত্মসমর্পণ’ করা হবে না।

এদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর দাবি করেছে ইরান। যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় অনেক কমে গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ওই সমঝোতার বিরোধিতা করছে। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে এবং কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই উন্মুক্ত রাখতে হবে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বড় মতবিরোধ এখনো রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা আবার শুরু করতে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এ যাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় আলোচনায় এখনো বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

কমেছে বেতন, বেড়েছে মূল্যস্ফীতি

দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বাইরের চাপের কারণে ইরানের অর্থনীতি তার সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম সক্ষমতায় চলছে।

ইরানের মর্দাদ মাস ২২ আগস্ট শেষ হয়েছে। ওই মাসে দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের হিসাবে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মূল্যস্ফীতি ৮৯ শতাংশ বেশি ছিল। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১২৭ শতাংশেরও বেশি।

তেহরানের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত বিজান জানান, প্রায় তিন বছর আগে ওই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সময় তার মাসিক বেতন ১ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের সমান ছিল। কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে সেই বেতনের প্রকৃত মূল্য অনেক কমে গেছে।

তিনি বলেন, তিনবার বেতন বাড়লেও বর্তমানে তার বেতনের মূল্য ৫০০ ডলারের নিচে নেমে গেছে।

৩৩ বছর বয়সী বিজান জানান, পরিস্থিতি প্রতিদিন আরও খারাপ হওয়ায় মাঝে মাঝে তার মনে হয়, এক দশকেরও বেশি সময় আগে স্নাতক শেষ করার পর যদি ইরান ছেড়ে চলে যেতেন, তাহলে তার জীবন কেমন হতো।

ইরানের মুদ্রা রিয়ালও বড় ধরনের দরপতনের শিকার হয়েছে। শনিবার তেহরানের খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে ২০ লাখ ৬০ হাজার রিয়ালে পৌঁছায়। রিয়ালের ইতিহাসে এটিই সর্বনিম্ন মূল্য।

তেল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট

যুদ্ধ চলাকালে ইরানের তেল ও গ্যাস স্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল ও ইস্পাত কারখানা, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য পরিষেবা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়িঘর, বন্দর, বিমানবন্দর ও সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

বিশ্বের অন্যতম সম্পদসমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরান বর্তমানে অবনতিশীল জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে রয়েছে। শীত মৌসুম সামনে রেখে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ইতোমধ্যে জ্বালানি বরাদ্দ কমানো হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পেট্রলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।

সমাজে বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ

ইরানি কর্তৃপক্ষ যুদ্ধের বিষয়ে বিশ্বের সামনে ‘পবিত্র ঐক্যের’ বার্তা তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে নিজেদের মতামত প্রকাশে সতর্ক থাকলেও রাজনীতিবিদদের বক্তব্যে সরকারের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য প্রকাশ পাচ্ছে।

শুক্রবার মোজতাবা খামেনির নামে প্রকাশিত এক লিখিত বার্তায় বলা হয়, সামাজিক সংহতি ক্ষতিগ্রস্ত করে—এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ।

এর কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, সরকার ভয়াবহ আর্থিক সংকটে রয়েছে। অবরুদ্ধ জনগণের জীবনযাত্রার উন্নতি করা তো দূরের কথা, সরকার তেল বিক্রি করতেও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

এদিকে বিচার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারি অবস্থানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করেছে।

প্রতি সপ্তাহেই নতুন করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণা আসছে। এসব দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং জানুয়ারিতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব মৃত্যুদণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। পাশাপাশি বাধ্যতামূলক হিজাব আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাধ্যতামূলক পোশাকবিধির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের কয়েক বছর পর আবারও আইনটি প্রয়োগে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই সপ্তাহেই ইসলামি আইন ও প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত নীতিমালা না মানার অভিযোগে আরও কয়েকটি ক্যাফে, আইসক্রিমের দোকান এবং ব্যক্তিগত অনলাইন বিক্রেতার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

তেহরানের আরেক তরুণ বাসিন্দা সাসান বলেন, অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, দেশের ওপর বাইরের চাপ বাড়লে কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে।

তিনি বলেন, কখনো কখনো হতাশার কষ্ট অনুভব করেন। সবসময় চেষ্টা করেও তার মনে হয়, সবকিছু যেন তার বিপক্ষে কাজ করছে এবং ভবিষ্যৎ মূলত নিজের হাতে নেই।

সূত্র: যুগান্তর


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - মোঃ আতিকুল ইসলাম
প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক - মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয় 
সহ-সম্পাদক- মোঃ জাকারিয়া হোসেন
বার্তা সম্পাদক - মোঃ ওলিউল্লাহ

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
যুদ্ধের ছয় মাসে আমূল বদলে গেছে ইরানিদের জীবন
0:00 0:00
1.0x