ঢাকা    সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

জুলাই বিপ্লব

৩৬ জুলাই সাধারণ মানুষকে কী দিয়েছে?

৩৬ জুলাই সাধারণ মানুষকে কী দিয়েছে?
৩৬ জুলাই সাধারণ মানুষকে কী দিয়েছে?

অভ্যুত্থান বলতে বোঝায় গণমানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের আকস্মিক বিস্ফোরণ, যার মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটে। আর বিপ্লবের অর্থ শুধু একজন শাসককে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা। সেই বিবেচনায় জুলাইয়ে যা ঘটেছিল, সেটিকে কী বলা হবে—বিপ্লব, নাকি অন্যান্য আন্দোলনের মতো আরেকটি গণঅভ্যুত্থান?

জুলাইয়ের আন্দোলনে রাজপথে রক্ত ঝরেছে। জনগণের অর্থে কেনা অস্ত্রের গুলিই নিক্ষেপ করা হয়েছে জনগণের ওপর। সেই গুলিতে শত শত তরুণের বুক ও মাথা ঝাঁঝরা হয়েছে। যারা প্রাণ দিয়েছেন, তারা কি কেবল একজন স্বৈরশাসকের পতন দেখতেই জীবন দিয়েছিলেন? নিশ্চয়ই নয়। তাদের প্রত্যাশা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং এমন বাক্‌স্বাধীনতা, যেখানে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করার সুযোগ থাকবে। তারা স্বাধীন বিচারব্যবস্থা চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পচনও দূর করার দাবি ছিল তাদের।

কিন্তু এরপর সাধারণ মানুষ কী পেয়েছে—তার উত্তর অনেকেরই জানা। জুলাইয়ের ঘটনাকে গণঅভ্যুত্থান থেকে বিপ্লবে রূপ দেওয়ার জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে জরুরি ছিল, সেটিই বাস্তবায়িত হয়নি। সেটি হলো সংস্কার।

আন্দোলনের কৃতিত্ব ভাগাভাগি নিয়ে তৈরি হওয়া বিভাজন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে দেয়নি। দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবল আকাঙ্ক্ষাও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শহীদ পরিবারের সহায়তা কিংবা আহতদের চিকিৎসার বিষয়গুলোও তখন যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বড় ধরনের ব্যর্থতা রয়েছে। যে সরকার জুলাইয়ের রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের উদাসীনতার কারণে আন্দোলনে আহত অনেককে হারাতে হয়েছে। বিশেষ করে যেসব আহত ব্যক্তির উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তাদের অনেককেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বিষয়টি অত্যন্ত লজ্জার।

সংস্কারের কথা বলতে বলতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেড় বছর পার করেছে। সংস্কারের কথা সামনে রেখে জনগণকে তখনও আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি। কেবল সংস্কারের কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে, যা এখন মূল্যহীন হয়ে পড়েছে।

সংস্কার নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। কিন্তু সংস্কারের সময় সরকারি দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া প্রস্তাবগুলো কেন বাদ দেওয়া হলো—সে প্রশ্ন থেকেই যায়। জনগণ তো সব সংস্কারের পক্ষেই ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল। তাহলে কোনো সংস্কার নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থি হলে সেটিকে কি হিমাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে?

এরপর গুমবিরোধী আইনের মতো মৌলিক মানবাধিকারের আইন বাতিলের ঘটনাও সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে মানুষ কীভাবে নিজের অধিকার দাবি করবে? আবারও কি সেই পুরোনো গোলকধাঁধায় ফিরে যেতে হবে, যেখানে অধিকার চাইতে গিয়ে মানুষের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে?

চব্বিশের পর ক্ষমতার চেয়ারে বসা ব্যক্তিদের মুখ পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু ব্যবস্থার মালিকানা বদলালেও দাসত্বের নিয়ম বদলায়নি। চাটুকারদের তৎপরতা এখনও রয়েছে। পুলিশ এখনও লাঠিচার্জ করে। আমলাতন্ত্রের পুরোনো জটও কাটেনি। ফাইল এখনও অনিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকে। রাষ্ট্রের অলিন্দ-নিলয়ে সিন্ডিকেটও আগের মতোই সক্রিয়।

গণমানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে কেবল একজন স্বৈরশাসকের মন্ত্রিসভার পতন ঘটেছে। এর বাইরে দেশের কাঠামোতে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাহলে শুধু ক্ষমতার হাতবদলকে কেন বিপ্লব বলা হবে? বিপ্লব কোনো এক দিনের রাজপথের বিজয় উৎসব নয়; বিপ্লব হলো আমূল পরিবর্তনের নাম।

জুলাইয়ের শহীদদের রক্তকে কেন্দ্র করে অনেকের সুবিধা ও মধু খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যে অবস্থায় ছিল, অনেকটা সেই অবস্থাতেই রয়ে গেছে। রাষ্ট্রকাঠামো ও ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন না এলে চব্বিশের আন্দোলনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা চায় ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ হোক এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হোক। কিন্তু এসব সমস্যাও আগের মতোই চলমান রয়েছে। তাহলে এত ত্যাগের বিনিময়ে সাধারণ মানুষের প্রাপ্তি কী?

প্রত্যাশিত সংস্কার বাস্তবায়িত না হওয়ায় জুলাই শেষ পর্যন্ত স্বৈরশাসকের পতন তথা গণঅভ্যুত্থানের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে। জুলাইকে বিপ্লবে রূপ দেওয়া সম্ভব না হলে, জুলাই যদি বিপ্লবে পরিণত না হয়, তাহলে আবু সাঈদ ও মুগ্ধদের রক্ত বৃথা যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আর মানুষের মুক্তির দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষাও কেবল স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে।

সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬


৩৬ জুলাই সাধারণ মানুষকে কী দিয়েছে?

প্রকাশের তারিখ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

অভ্যুত্থান বলতে বোঝায় গণমানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের আকস্মিক বিস্ফোরণ, যার মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটে। আর বিপ্লবের অর্থ শুধু একজন শাসককে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা। সেই বিবেচনায় জুলাইয়ে যা ঘটেছিল, সেটিকে কী বলা হবে—বিপ্লব, নাকি অন্যান্য আন্দোলনের মতো আরেকটি গণঅভ্যুত্থান?

জুলাইয়ের আন্দোলনে রাজপথে রক্ত ঝরেছে। জনগণের অর্থে কেনা অস্ত্রের গুলিই নিক্ষেপ করা হয়েছে জনগণের ওপর। সেই গুলিতে শত শত তরুণের বুক ও মাথা ঝাঁঝরা হয়েছে। যারা প্রাণ দিয়েছেন, তারা কি কেবল একজন স্বৈরশাসকের পতন দেখতেই জীবন দিয়েছিলেন? নিশ্চয়ই নয়। তাদের প্রত্যাশা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং এমন বাক্‌স্বাধীনতা, যেখানে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করার সুযোগ থাকবে। তারা স্বাধীন বিচারব্যবস্থা চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পচনও দূর করার দাবি ছিল তাদের।

কিন্তু এরপর সাধারণ মানুষ কী পেয়েছে—তার উত্তর অনেকেরই জানা। জুলাইয়ের ঘটনাকে গণঅভ্যুত্থান থেকে বিপ্লবে রূপ দেওয়ার জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে জরুরি ছিল, সেটিই বাস্তবায়িত হয়নি। সেটি হলো সংস্কার।

আন্দোলনের কৃতিত্ব ভাগাভাগি নিয়ে তৈরি হওয়া বিভাজন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে দেয়নি। দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবল আকাঙ্ক্ষাও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শহীদ পরিবারের সহায়তা কিংবা আহতদের চিকিৎসার বিষয়গুলোও তখন যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বড় ধরনের ব্যর্থতা রয়েছে। যে সরকার জুলাইয়ের রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের উদাসীনতার কারণে আন্দোলনে আহত অনেককে হারাতে হয়েছে। বিশেষ করে যেসব আহত ব্যক্তির উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তাদের অনেককেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বিষয়টি অত্যন্ত লজ্জার।

সংস্কারের কথা বলতে বলতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেড় বছর পার করেছে। সংস্কারের কথা সামনে রেখে জনগণকে তখনও আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি। কেবল সংস্কারের কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে, যা এখন মূল্যহীন হয়ে পড়েছে।

সংস্কার নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। কিন্তু সংস্কারের সময় সরকারি দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া প্রস্তাবগুলো কেন বাদ দেওয়া হলো—সে প্রশ্ন থেকেই যায়। জনগণ তো সব সংস্কারের পক্ষেই ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল। তাহলে কোনো সংস্কার নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থি হলে সেটিকে কি হিমাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে?

এরপর গুমবিরোধী আইনের মতো মৌলিক মানবাধিকারের আইন বাতিলের ঘটনাও সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে মানুষ কীভাবে নিজের অধিকার দাবি করবে? আবারও কি সেই পুরোনো গোলকধাঁধায় ফিরে যেতে হবে, যেখানে অধিকার চাইতে গিয়ে মানুষের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে?

চব্বিশের পর ক্ষমতার চেয়ারে বসা ব্যক্তিদের মুখ পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু ব্যবস্থার মালিকানা বদলালেও দাসত্বের নিয়ম বদলায়নি। চাটুকারদের তৎপরতা এখনও রয়েছে। পুলিশ এখনও লাঠিচার্জ করে। আমলাতন্ত্রের পুরোনো জটও কাটেনি। ফাইল এখনও অনিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকে। রাষ্ট্রের অলিন্দ-নিলয়ে সিন্ডিকেটও আগের মতোই সক্রিয়।

গণমানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে কেবল একজন স্বৈরশাসকের মন্ত্রিসভার পতন ঘটেছে। এর বাইরে দেশের কাঠামোতে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাহলে শুধু ক্ষমতার হাতবদলকে কেন বিপ্লব বলা হবে? বিপ্লব কোনো এক দিনের রাজপথের বিজয় উৎসব নয়; বিপ্লব হলো আমূল পরিবর্তনের নাম।

জুলাইয়ের শহীদদের রক্তকে কেন্দ্র করে অনেকের সুবিধা ও মধু খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যে অবস্থায় ছিল, অনেকটা সেই অবস্থাতেই রয়ে গেছে। রাষ্ট্রকাঠামো ও ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন না এলে চব্বিশের আন্দোলনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা চায় ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ হোক এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হোক। কিন্তু এসব সমস্যাও আগের মতোই চলমান রয়েছে। তাহলে এত ত্যাগের বিনিময়ে সাধারণ মানুষের প্রাপ্তি কী?

প্রত্যাশিত সংস্কার বাস্তবায়িত না হওয়ায় জুলাই শেষ পর্যন্ত স্বৈরশাসকের পতন তথা গণঅভ্যুত্থানের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে। জুলাইকে বিপ্লবে রূপ দেওয়া সম্ভব না হলে, জুলাই যদি বিপ্লবে পরিণত না হয়, তাহলে আবু সাঈদ ও মুগ্ধদের রক্ত বৃথা যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আর মানুষের মুক্তির দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষাও কেবল স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে।

সূত্র: আমার দেশ


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩৬ জুলাই সাধারণ মানুষকে কী দিয়েছে?
0:00 0:00
1.0x