২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় ঢাকার সাভারের নিউমার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন আব্দুল কাইয়ুম। পরদিন ৬ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
কাইয়ুমের মৃত্যুর দুই বছর পেরিয়ে গেছে। বর্তমানে সাভারের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তার বাবা-মা। পরিবারের সবচেয়ে বড় অবলম্বনকে হারিয়ে সরকারি ভাতা, সীমিত সহায়তা এবং ছেলের স্মৃতি নিয়েই তাদের দিন কাটছে।
কাইয়ুমের মা কুলসুম বলেন, সংসার চালাতে তাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। ছেলে জীবিত থাকাকালেও অনেক কষ্ট করে সংসার চালিয়েছেন, এখনও একইভাবে কষ্ট করে চলতে হচ্ছে। বর্তমানে মাসিক ২০ হাজার টাকার ভাতার ওপরই মূলত সংসার নির্ভর করছে। তার স্বামীর কানের সমস্যা ছাড়াও শরীরে নানা ধরনের অসুস্থতা রয়েছে। ফলে তিনি কাজ করতে পারেন না।
তিনি বলেন, পরিবারের আর কেউ আয় করেন না। বড় ছেলে যে অর্থ উপার্জন করেন, তা তার নিজের স্ত্রী-সন্তানদের সংসারেই ব্যয় হয়। তাদের কাছে কখনো কিছু চাননি তারা। বড় ছেলে নিজের ইচ্ছায় কখনো দুই-চারশ টাকা দিলে তা নেন।
কাইয়ুমের বাবা কফিল উদ্দিন জানান, তারা বর্তমানে সাভারে ভাড়া বাসায় থাকেন। সরকারি ভাতার টাকা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলছে। তবে ওই অর্থে সব খরচ মেটানো সম্ভব নয়। শুধু বাসা ভাড়াতেই মাসে আট হাজার টাকা দিতে হয়।
কাইয়ুমের মা জানান, ছেলে জীবিত থাকাকালে অনেক কষ্ট করে পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতেন। কুমিল্লায় তিনদিন থাকার পর আবার তিনদিন সাভারে থাকতেন। সাভারে এসে টিউশনি করাতেন। ভোরে উঠে দুধ সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। দইয়ের অর্ডার নিয়ে দই বিক্রি করতেন এবং ভর্তি কোচিংও পরিচালনা করতেন।
বছরের অন্যান্য সময় টিউশনি এবং ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে পরিবারের খরচ চালাতে সহযোগিতা করতেন কাইয়ুম।
কাইয়ুম শহীদ হওয়ার পর তার পরিবার সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছে। কাইয়ুমের মা জানান, পরিবারভিত্তিক এই মাসিক ভাতাই তারা পাচ্ছেন।
সরকারের কাছে কোনো প্রত্যাশা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের চাওয়া-পাওয়া পূরণ হওয়ার মতো কিছু নেই। তারা অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। নিজেদের একটি বাড়ি থাকলে ভালো হতো। ছেলে বেঁচে থাকলে অনেক উপার্জন করত এবং পরিবারের জন্য অনেক কিছু করতে পারত বলেও তিনি জানান।
সন্তান হারানোর বেদনা এখনো পরিবারটির প্রতিটি মুহূর্তকে তাড়া করে। কাইয়ুমের মা বলেন, ছেলে থাকলে তাদের সংসারের পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। তাকে মনে পড়লেই বুক ভার হয়ে আসে। তারপরও জীবন থেমে থাকে না, তাই কষ্টের মধ্যেই দিন পার করতে হচ্ছে।
কাইয়ুমের বাবা বলেন, আল্লাহ যেভাবে চালাচ্ছেন, সেভাবেই তাদের জীবন চলছে। আল্লাহ না চালালে তাদের পক্ষে চলা সম্ভব নয়।
কাইয়ুমের মা জানান, সরকারি ভাতার পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেও তারা সহায়তা পেয়েছেন।
তার ভাষ্য, কাইয়ুম শহীদ হওয়ার প্রায় এক মাস পর জামায়াতে ইসলামী এক লাখ টাকা দেয়। এরপর দুই-তিন মাস পর আরও এক লাখ টাকা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ঈদ উপলক্ষে সহায়তাও পেয়েছেন বলে জানান তিনি। দুই রোজার ঈদে জামায়াতের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা করে পেয়েছেন। কোরবানির ঈদে খাসির মাংস এবং এবার গরুর মাংস দেওয়া হয়েছে বলেও জানান কুলসুম।
বিএনপি ও ছাত্রদলের সহযোগিতার বিষয়ে তিনি জানান, রোজার ঈদের আগে একজন তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নম্বর নিয়েছিলেন এবং টাকা দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরে টাকা দেওয়া হয়নি। পরে ওই এলাকার এমপি তাকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। আরেকবার একটি অনুষ্ঠানে চিনি, সেমাই, তেলসহ কিছু বাজারসামগ্রী দেওয়া হয়েছিল।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকেও একবার বাজারসামগ্রী পাঠানো হয়েছিল বলে জানান তিনি। এরপর আর কোনো সহযোগিতা পাননি।
২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলীর সময়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ যৌথভাবে কাইয়ুমের পরিবারকে সাত লাখ টাকার একটি চেক দেয়।
কাইয়ুমের মা জানান, ছেলে মারা যাওয়ার পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ওই অর্থ দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১তম সিন্ডিকেট সভায় নতুন ক্যাম্পাসের ‘ছাত্র হল-১’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ আব্দুল কাইয়ুম হল’ রাখা হয়েছে।
কাইয়ুমের মৃত্যুর ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন তার মা। তিনি বলেন, এখনো তারা বিচার পাননি। কোনো আসামিকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি। এমনকি তাদের একবারও আদালতে ডাকা হয়নি।
তিনি বলেন, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পান, সেটি তিনি চান না। যারা প্রকৃতপক্ষে দোষী, শুধু তাদেরই যেন শাস্তি দেওয়া হয়—এটাই তার প্রত্যাশা।
ছেলের মৃত্যুর প্রসঙ্গে কাইয়ুমের মা বারবার একটি কথাই বলেছেন—তিনি যে কষ্ট পেয়েছেন, এমন কষ্ট যেন আল্লাহ আর কোনো মা-বাবাকে না দেন।
ছেলের হত্যার বিচার চান তিনি। তবে নির্দোষ কারও শাস্তি হোক, সেটি চান না। একদিকে পরিবারের আর্থিক সংকট, অন্যদিকে সন্তান হারানোর গভীর বেদনা—এই দুইয়ের মধ্যেই প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে শহীদ আব্দুল কাইয়ুমের পরিবার।
সূত্র: আমার দেশ

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় ঢাকার সাভারের নিউমার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন আব্দুল কাইয়ুম। পরদিন ৬ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
কাইয়ুমের মৃত্যুর দুই বছর পেরিয়ে গেছে। বর্তমানে সাভারের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তার বাবা-মা। পরিবারের সবচেয়ে বড় অবলম্বনকে হারিয়ে সরকারি ভাতা, সীমিত সহায়তা এবং ছেলের স্মৃতি নিয়েই তাদের দিন কাটছে।
কাইয়ুমের মা কুলসুম বলেন, সংসার চালাতে তাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। ছেলে জীবিত থাকাকালেও অনেক কষ্ট করে সংসার চালিয়েছেন, এখনও একইভাবে কষ্ট করে চলতে হচ্ছে। বর্তমানে মাসিক ২০ হাজার টাকার ভাতার ওপরই মূলত সংসার নির্ভর করছে। তার স্বামীর কানের সমস্যা ছাড়াও শরীরে নানা ধরনের অসুস্থতা রয়েছে। ফলে তিনি কাজ করতে পারেন না।
তিনি বলেন, পরিবারের আর কেউ আয় করেন না। বড় ছেলে যে অর্থ উপার্জন করেন, তা তার নিজের স্ত্রী-সন্তানদের সংসারেই ব্যয় হয়। তাদের কাছে কখনো কিছু চাননি তারা। বড় ছেলে নিজের ইচ্ছায় কখনো দুই-চারশ টাকা দিলে তা নেন।
কাইয়ুমের বাবা কফিল উদ্দিন জানান, তারা বর্তমানে সাভারে ভাড়া বাসায় থাকেন। সরকারি ভাতার টাকা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলছে। তবে ওই অর্থে সব খরচ মেটানো সম্ভব নয়। শুধু বাসা ভাড়াতেই মাসে আট হাজার টাকা দিতে হয়।
কাইয়ুমের মা জানান, ছেলে জীবিত থাকাকালে অনেক কষ্ট করে পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতেন। কুমিল্লায় তিনদিন থাকার পর আবার তিনদিন সাভারে থাকতেন। সাভারে এসে টিউশনি করাতেন। ভোরে উঠে দুধ সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। দইয়ের অর্ডার নিয়ে দই বিক্রি করতেন এবং ভর্তি কোচিংও পরিচালনা করতেন।
বছরের অন্যান্য সময় টিউশনি এবং ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে পরিবারের খরচ চালাতে সহযোগিতা করতেন কাইয়ুম।
কাইয়ুম শহীদ হওয়ার পর তার পরিবার সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছে। কাইয়ুমের মা জানান, পরিবারভিত্তিক এই মাসিক ভাতাই তারা পাচ্ছেন।
সরকারের কাছে কোনো প্রত্যাশা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের চাওয়া-পাওয়া পূরণ হওয়ার মতো কিছু নেই। তারা অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। নিজেদের একটি বাড়ি থাকলে ভালো হতো। ছেলে বেঁচে থাকলে অনেক উপার্জন করত এবং পরিবারের জন্য অনেক কিছু করতে পারত বলেও তিনি জানান।
সন্তান হারানোর বেদনা এখনো পরিবারটির প্রতিটি মুহূর্তকে তাড়া করে। কাইয়ুমের মা বলেন, ছেলে থাকলে তাদের সংসারের পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। তাকে মনে পড়লেই বুক ভার হয়ে আসে। তারপরও জীবন থেমে থাকে না, তাই কষ্টের মধ্যেই দিন পার করতে হচ্ছে।
কাইয়ুমের বাবা বলেন, আল্লাহ যেভাবে চালাচ্ছেন, সেভাবেই তাদের জীবন চলছে। আল্লাহ না চালালে তাদের পক্ষে চলা সম্ভব নয়।
কাইয়ুমের মা জানান, সরকারি ভাতার পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেও তারা সহায়তা পেয়েছেন।
তার ভাষ্য, কাইয়ুম শহীদ হওয়ার প্রায় এক মাস পর জামায়াতে ইসলামী এক লাখ টাকা দেয়। এরপর দুই-তিন মাস পর আরও এক লাখ টাকা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ঈদ উপলক্ষে সহায়তাও পেয়েছেন বলে জানান তিনি। দুই রোজার ঈদে জামায়াতের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা করে পেয়েছেন। কোরবানির ঈদে খাসির মাংস এবং এবার গরুর মাংস দেওয়া হয়েছে বলেও জানান কুলসুম।
বিএনপি ও ছাত্রদলের সহযোগিতার বিষয়ে তিনি জানান, রোজার ঈদের আগে একজন তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নম্বর নিয়েছিলেন এবং টাকা দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরে টাকা দেওয়া হয়নি। পরে ওই এলাকার এমপি তাকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। আরেকবার একটি অনুষ্ঠানে চিনি, সেমাই, তেলসহ কিছু বাজারসামগ্রী দেওয়া হয়েছিল।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকেও একবার বাজারসামগ্রী পাঠানো হয়েছিল বলে জানান তিনি। এরপর আর কোনো সহযোগিতা পাননি।
২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলীর সময়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ যৌথভাবে কাইয়ুমের পরিবারকে সাত লাখ টাকার একটি চেক দেয়।
কাইয়ুমের মা জানান, ছেলে মারা যাওয়ার পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ওই অর্থ দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১তম সিন্ডিকেট সভায় নতুন ক্যাম্পাসের ‘ছাত্র হল-১’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ আব্দুল কাইয়ুম হল’ রাখা হয়েছে।
কাইয়ুমের মৃত্যুর ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন তার মা। তিনি বলেন, এখনো তারা বিচার পাননি। কোনো আসামিকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি। এমনকি তাদের একবারও আদালতে ডাকা হয়নি।
তিনি বলেন, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পান, সেটি তিনি চান না। যারা প্রকৃতপক্ষে দোষী, শুধু তাদেরই যেন শাস্তি দেওয়া হয়—এটাই তার প্রত্যাশা।
ছেলের মৃত্যুর প্রসঙ্গে কাইয়ুমের মা বারবার একটি কথাই বলেছেন—তিনি যে কষ্ট পেয়েছেন, এমন কষ্ট যেন আল্লাহ আর কোনো মা-বাবাকে না দেন।
ছেলের হত্যার বিচার চান তিনি। তবে নির্দোষ কারও শাস্তি হোক, সেটি চান না। একদিকে পরিবারের আর্থিক সংকট, অন্যদিকে সন্তান হারানোর গভীর বেদনা—এই দুইয়ের মধ্যেই প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে শহীদ আব্দুল কাইয়ুমের পরিবার।
সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন