প্রায় এক বছর ধরে বিচারক না থাকায় সাতক্ষীরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার জট ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের দাবি, বর্তমানে এ আদালতে প্রায় ৫ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বিচারক না থাকায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলার পাশাপাশি শিশু আদালত ও মানব পাচারসংক্রান্ত মামলার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে বিচারপ্রার্থীরা আসছেন সাতক্ষীরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের আট তলায়। কেউ আসছেন সাক্ষী নিয়ে, কেউ শিশু সন্তানকে সঙ্গে করে। আদালতে এসে অনেকেই জানতে পারছেন, বিচারক না থাকায় নির্ধারিত দিনে মামলার শুনানি হচ্ছে না। ফলে নতুন তারিখ নিয়ে আবার বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তাদের।
এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস মামলার তারিখে আদালতে আসতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের। এতে যাতায়াতের খরচ, আইনজীবীর ফি এবং কর্মদিবস নষ্ট হওয়ার কারণে বাড়ছে আর্থিক চাপ। বিশেষ করে আশাশুনি, শ্যামনগরসহ জেলার প্রত্যন্ত এলাকার বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শেখ আলমগীর আশরাফ বলেন, ‘সাতক্ষীরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞ বিচারক নেই। মামলার অসংখ্য জট পড়ে গেছে। প্রায় ৫ হাজার মামলা এ আদালতে পেন্ডিং আছে। এ আদালত শিশু আদালত ও মানব পাচার আদালতেরও দায়িত্ব পালন করে। ভুক্তভোগীরা এর শিকার হচ্ছেন। কর্তৃপক্ষের কাছে অতি দ্রুত একজন বিচারক নিয়োগের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।’
আশাশুনির তেঁতুলিয়া গ্রাম থেকে মায়ের মামলার বিষয়ে আদালতে এসেছিলেন এক নারী। তিনি বলেন, ‘আমার মায়ের বিচারের জন্য এসেছি। কোর্টে আমাদের ডাক হয়নি। এখন এভাবেই বসে আছি।’
আরেক বিচারপ্রার্থী বলেন, একটি মামলার কাজে সকাল থেকে আদালতে অপেক্ষা করছেন। তার ভাষায়, ‘অনেক কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কোর্টে যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়, সেই সুযোগ আমরা পাচ্ছি না।’
তারেক মনোয়ার নামের এক বিচারপ্রার্থী বলেন, পর্যাপ্ত বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় বিচারপ্রার্থীদের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আদালতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দ্রুত বিচারক নিয়োগ করে এই ভোগান্তি কমানোর দাবি জানান তিনি।
শহিদুল ইসলাম নামের আরেক বিচারপ্রার্থী বলেন, ‘বিচারক না থাকার কারণে হয়রানি হচ্ছি। বারবার একই মামলায় আসতে হচ্ছে। আমরা গরিব মানুষ, এভাবে বারবার হয়রানি হতে চাই না। সুস্থভাবে বিচার চাই।’
শিশু সন্তানকে নিয়ে আদালতে আসা এক নারী বলেন, ‘বিচারক না থাকার কারণে সমস্যা হচ্ছে। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে গরমের মধ্যে এভাবে হয়রানি করা যায় না। আমরা যেন দ্রুত বিচার পাই, সরকার সেই ব্যবস্থা করুক।’
আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাতক্ষীরায় শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালেই নয়, আরও কয়েকটি আদালতে বিচারক সংকট রয়েছে। এতে জেলার বিচারব্যবস্থায় সামগ্রিকভাবে চাপ তৈরি হয়েছে বলে দাবি জেলা আইনজীবী সমিতির নেতাদের।
আইনজীবী বদিউজ্জামান বলেন, সাতক্ষীরায় প্রায় ২২ লাখ মানুষের বসবাস। অথচ প্রয়োজনের তুলনায় বিচারকের পদ শূন্য রয়েছে। দ্রুত বিচারক নিয়োগ না হলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
শিমুল হোসেন নামের এক আইনজীবী সহকারী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত মামলায় বাদীপক্ষকে নিয়মিত আদালতে হাজির হতে হচ্ছে। কিন্তু বিচারক না থাকায় মামলার কার্যক্রম এগোচ্ছে না। এতে বাদীরা হতাশ হচ্ছেন এবং তাদের সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হচ্ছে।
মামলার জট কমাতে দ্রুত বিচারক নিয়োগের দাবিতে গত ২৩ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে লিখিত আবেদন করেছে সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতি।
আইনজীবী সমিতির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, শূন্য থাকা ট্রাইব্যুনালে বিচারক নিয়োগের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রায় এক বছর ধরে বিচারক না থাকায় সাতক্ষীরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার জট ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের দাবি, বর্তমানে এ আদালতে প্রায় ৫ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বিচারক না থাকায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলার পাশাপাশি শিশু আদালত ও মানব পাচারসংক্রান্ত মামলার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে বিচারপ্রার্থীরা আসছেন সাতক্ষীরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের আট তলায়। কেউ আসছেন সাক্ষী নিয়ে, কেউ শিশু সন্তানকে সঙ্গে করে। আদালতে এসে অনেকেই জানতে পারছেন, বিচারক না থাকায় নির্ধারিত দিনে মামলার শুনানি হচ্ছে না। ফলে নতুন তারিখ নিয়ে আবার বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তাদের।
এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস মামলার তারিখে আদালতে আসতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের। এতে যাতায়াতের খরচ, আইনজীবীর ফি এবং কর্মদিবস নষ্ট হওয়ার কারণে বাড়ছে আর্থিক চাপ। বিশেষ করে আশাশুনি, শ্যামনগরসহ জেলার প্রত্যন্ত এলাকার বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শেখ আলমগীর আশরাফ বলেন, ‘সাতক্ষীরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞ বিচারক নেই। মামলার অসংখ্য জট পড়ে গেছে। প্রায় ৫ হাজার মামলা এ আদালতে পেন্ডিং আছে। এ আদালত শিশু আদালত ও মানব পাচার আদালতেরও দায়িত্ব পালন করে। ভুক্তভোগীরা এর শিকার হচ্ছেন। কর্তৃপক্ষের কাছে অতি দ্রুত একজন বিচারক নিয়োগের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।’
আশাশুনির তেঁতুলিয়া গ্রাম থেকে মায়ের মামলার বিষয়ে আদালতে এসেছিলেন এক নারী। তিনি বলেন, ‘আমার মায়ের বিচারের জন্য এসেছি। কোর্টে আমাদের ডাক হয়নি। এখন এভাবেই বসে আছি।’
আরেক বিচারপ্রার্থী বলেন, একটি মামলার কাজে সকাল থেকে আদালতে অপেক্ষা করছেন। তার ভাষায়, ‘অনেক কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কোর্টে যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়, সেই সুযোগ আমরা পাচ্ছি না।’
তারেক মনোয়ার নামের এক বিচারপ্রার্থী বলেন, পর্যাপ্ত বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় বিচারপ্রার্থীদের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আদালতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দ্রুত বিচারক নিয়োগ করে এই ভোগান্তি কমানোর দাবি জানান তিনি।
শহিদুল ইসলাম নামের আরেক বিচারপ্রার্থী বলেন, ‘বিচারক না থাকার কারণে হয়রানি হচ্ছি। বারবার একই মামলায় আসতে হচ্ছে। আমরা গরিব মানুষ, এভাবে বারবার হয়রানি হতে চাই না। সুস্থভাবে বিচার চাই।’
শিশু সন্তানকে নিয়ে আদালতে আসা এক নারী বলেন, ‘বিচারক না থাকার কারণে সমস্যা হচ্ছে। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে গরমের মধ্যে এভাবে হয়রানি করা যায় না। আমরা যেন দ্রুত বিচার পাই, সরকার সেই ব্যবস্থা করুক।’
আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাতক্ষীরায় শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালেই নয়, আরও কয়েকটি আদালতে বিচারক সংকট রয়েছে। এতে জেলার বিচারব্যবস্থায় সামগ্রিকভাবে চাপ তৈরি হয়েছে বলে দাবি জেলা আইনজীবী সমিতির নেতাদের।
আইনজীবী বদিউজ্জামান বলেন, সাতক্ষীরায় প্রায় ২২ লাখ মানুষের বসবাস। অথচ প্রয়োজনের তুলনায় বিচারকের পদ শূন্য রয়েছে। দ্রুত বিচারক নিয়োগ না হলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
শিমুল হোসেন নামের এক আইনজীবী সহকারী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত মামলায় বাদীপক্ষকে নিয়মিত আদালতে হাজির হতে হচ্ছে। কিন্তু বিচারক না থাকায় মামলার কার্যক্রম এগোচ্ছে না। এতে বাদীরা হতাশ হচ্ছেন এবং তাদের সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হচ্ছে।
মামলার জট কমাতে দ্রুত বিচারক নিয়োগের দাবিতে গত ২৩ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে লিখিত আবেদন করেছে সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতি।
আইনজীবী সমিতির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, শূন্য থাকা ট্রাইব্যুনালে বিচারক নিয়োগের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন