ঢাকা    শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

জাতীয়

অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণে সংকুচিত হচ্ছে চলনবিল

অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণে সংকুচিত হচ্ছে চলনবিল
অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণে সংকুচিত হচ্ছে চলনবিল

একসময় বর্ষা মৌসুমে দিগন্তজোড়া জলরাশিতে ভরে উঠত চলনবিল। নদ-নদী ও খালের পানিতে প্রাণ ফিরে পেত উত্তরাঞ্চলের এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি। তখন নৌকাই ছিল মানুষের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। জেলেদের জালে ধরা পড়ত নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ, আর শীত এলেই হাজারো অতিথি পাখির কোলাহলে মুখর থাকত বিলাঞ্চল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচিত রূপ হারাতে বসেছে চলনবিল।

অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদ-খালের নাব্যতা কমে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট, নির্বিচারে পুকুর খনন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বৃহত্তম এই জলাভূমি এখন অস্তিত্ব সংকটে। একসময় রাজশাহী বিভাগের ছয়টি জেলা নিয়ে বিস্তৃত থাকলেও বর্তমানে চলনবিল নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৬০০টি গ্রামজুড়ে বিস্তৃত। আগে এর আয়তন ছিল ১ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। তবে পলি জমার কারণে বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে এর আয়তন প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে কমে দাঁড়িয়েছে ৮৫ বর্গকিলোমিটারে।

চলনবিলে ৪৭টি ছোট-বড় নদী রয়েছে। তবে পলি জমে ভরাট হওয়া এবং নাব্য সংকটের কারণে অনেক নদী স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। এসব নদ-নদী ও খালে মাছ আহরণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার জেলে যুক্ত ছিলেন। বর্ষাকালে আশপাশের বিভিন্ন পেশার মানুষও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। চলনবিলের মিঠাপানির বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, গজার, শোল, দেশি পুঁটি, টেংরা, খলসা, চেলা, বাতাসি, মলা, জিয়ল, দেশি শিং, মাগুর, কই, টাকি, বাইন, কাঁকলা, আইড় ও পাবদা মাছ ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।

নদ-নদীর পানি পর্যাপ্ত পরিমাণে বিলে প্রবেশ না করা এবং অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের ব্যবহারের কারণে এসব দেশীয় মাছ ধীরে ধীরে বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। ফলে অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। চলনবিলের দেশীয় শুঁটকি মাছ বিদেশেও রপ্তানি হয় এবং এই শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে হাজারো পরিবার জড়িত। আগে বর্ষা মৌসুমে মাছ বিক্রির আয় দিয়েই জেলেরা সারা বছরের খোরাকের ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় শুঁটকি উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে।

১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের ফলে চলনবিলের পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এরপর ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণের কারণে চলনবিলের ওপর আরও বড় প্রভাব পড়ে। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৫ বছরে চলনবিলে ১ হাজার ১৮৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার এবং ২১টি ব্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে।

চলনবিলের মধ্যে ১৫টি পোল্ডার গড়ে তুলতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পানির স্বাভাবিক গতিপথ বন্ধ করে সিংড়া শেরকোল এলাকায় ১৫ একর জমির ওপর হাইটেক পার্ক ও আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার বিঘা জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি চলনবিলের বুক চিরে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য উঁচু ঢালাই সড়ক। অন্যদিকে পুকুর খননের মাধ্যমে পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মাত্র ১২ বছরের ব্যবধানে চলনবিলজুড়ে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার পুকুর খনন করা হয়েছে।

সিংড়া চলনবিল পরিবেশ ও প্রকৃতি আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ ও উন্নয়ন, জলাভূমি ভরাট এবং পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ার কারণে চলনবিলের আয়তন প্রতিনিয়ত কমছে। একই সঙ্গে অবৈধ জালের ব্যবহারে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছও কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, চলনবিল সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত, অন্যথায় বিলটি তার ঐতিহ্য হারাবে।

নাটোর বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, চলনবিলের আয়তন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। অসময়ে বৃষ্টিপাত, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, পলি জমে ভরাট হওয়া এবং খালের মুখে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ায় চলনবিল তার আগের গৌরব হারিয়েছে। এছাড়া চলনবিলের ভেতরে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণেও এর পরিধি কমছে।

তিনি আরও বলেন, চলনবিলের ভেতরে থাকা অসংখ্য খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত পলি অপসারণ করতে হবে। পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে চলনবিলকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

ছবি: দৈনিক ইত্তেফাক থেকে সংগৃহীত

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬


অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণে সংকুচিত হচ্ছে চলনবিল

প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬

featured Image

একসময় বর্ষা মৌসুমে দিগন্তজোড়া জলরাশিতে ভরে উঠত চলনবিল। নদ-নদী ও খালের পানিতে প্রাণ ফিরে পেত উত্তরাঞ্চলের এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি। তখন নৌকাই ছিল মানুষের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। জেলেদের জালে ধরা পড়ত নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ, আর শীত এলেই হাজারো অতিথি পাখির কোলাহলে মুখর থাকত বিলাঞ্চল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচিত রূপ হারাতে বসেছে চলনবিল।

অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদ-খালের নাব্যতা কমে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট, নির্বিচারে পুকুর খনন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বৃহত্তম এই জলাভূমি এখন অস্তিত্ব সংকটে। একসময় রাজশাহী বিভাগের ছয়টি জেলা নিয়ে বিস্তৃত থাকলেও বর্তমানে চলনবিল নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৬০০টি গ্রামজুড়ে বিস্তৃত। আগে এর আয়তন ছিল ১ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। তবে পলি জমার কারণে বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে এর আয়তন প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে কমে দাঁড়িয়েছে ৮৫ বর্গকিলোমিটারে।

চলনবিলে ৪৭টি ছোট-বড় নদী রয়েছে। তবে পলি জমে ভরাট হওয়া এবং নাব্য সংকটের কারণে অনেক নদী স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। এসব নদ-নদী ও খালে মাছ আহরণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার জেলে যুক্ত ছিলেন। বর্ষাকালে আশপাশের বিভিন্ন পেশার মানুষও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। চলনবিলের মিঠাপানির বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, গজার, শোল, দেশি পুঁটি, টেংরা, খলসা, চেলা, বাতাসি, মলা, জিয়ল, দেশি শিং, মাগুর, কই, টাকি, বাইন, কাঁকলা, আইড় ও পাবদা মাছ ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।

নদ-নদীর পানি পর্যাপ্ত পরিমাণে বিলে প্রবেশ না করা এবং অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের ব্যবহারের কারণে এসব দেশীয় মাছ ধীরে ধীরে বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। ফলে অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। চলনবিলের দেশীয় শুঁটকি মাছ বিদেশেও রপ্তানি হয় এবং এই শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে হাজারো পরিবার জড়িত। আগে বর্ষা মৌসুমে মাছ বিক্রির আয় দিয়েই জেলেরা সারা বছরের খোরাকের ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় শুঁটকি উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে।

১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের ফলে চলনবিলের পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এরপর ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণের কারণে চলনবিলের ওপর আরও বড় প্রভাব পড়ে। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৫ বছরে চলনবিলে ১ হাজার ১৮৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার এবং ২১টি ব্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে।

চলনবিলের মধ্যে ১৫টি পোল্ডার গড়ে তুলতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পানির স্বাভাবিক গতিপথ বন্ধ করে সিংড়া শেরকোল এলাকায় ১৫ একর জমির ওপর হাইটেক পার্ক ও আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার বিঘা জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি চলনবিলের বুক চিরে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য উঁচু ঢালাই সড়ক। অন্যদিকে পুকুর খননের মাধ্যমে পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মাত্র ১২ বছরের ব্যবধানে চলনবিলজুড়ে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার পুকুর খনন করা হয়েছে।

সিংড়া চলনবিল পরিবেশ ও প্রকৃতি আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ ও উন্নয়ন, জলাভূমি ভরাট এবং পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ার কারণে চলনবিলের আয়তন প্রতিনিয়ত কমছে। একই সঙ্গে অবৈধ জালের ব্যবহারে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছও কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, চলনবিল সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত, অন্যথায় বিলটি তার ঐতিহ্য হারাবে।

নাটোর বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, চলনবিলের আয়তন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। অসময়ে বৃষ্টিপাত, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, পলি জমে ভরাট হওয়া এবং খালের মুখে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ায় চলনবিল তার আগের গৌরব হারিয়েছে। এছাড়া চলনবিলের ভেতরে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণেও এর পরিধি কমছে।

তিনি আরও বলেন, চলনবিলের ভেতরে থাকা অসংখ্য খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত পলি অপসারণ করতে হবে। পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে চলনবিলকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।


সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

ছবি: দৈনিক ইত্তেফাক থেকে সংগৃহীত


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - মোঃ আতিকুল ইসলাম
প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক - মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয় 
সহ-সম্পাদক- মোঃ জাকারিয়া হোসেন
বার্তা সম্পাদক - সর্বজিৎ চাকমা

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণে সংকুচিত হচ্ছে চলনবিল
0:00 0:00
1.0x