১২০০ শিক্ষার্থীর জন্য একযুগ আগের ল্যাবে মাত্র দশটি কম্পিউটার! নেই আইসিটি শিক্ষকও! এটি ২০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যশোর জিলা স্কুলের কম্পিউটার শিক্ষার চিত্র।
শুধু এটিই নয়; আরও কিছু সংকট রয়েছে। তবে তারপরও যশোর জিলা স্কুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে হাজার হাজার শিক্ষার্থী দেশে-বিদেশে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। এই অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের এই সূতিকাগার বিভিন্ন সমস্যা-সংকটে ভুগলেও সামগ্রিক ফলাফলে ঈর্ষণীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, বিজ্ঞান গবেষণা, স্কাউটিং, খেলাধুলা, বিতর্কসহ নানান কর্মকাণ্ডে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে অনন্য অবস্থান।
সংকটেও সাফল্যের শীর্ষে
স্কুল সূত্রে জানা যায়, ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত যশোর জিলা স্কুলে চলতি শিক্ষাবর্ষে (২০২৬) এক হাজার ৯০২ জন ছাত্র লেখাপড়া করছে। প্রভাতী ও দিবা দুই শিফটে এই শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন ৫০ জন শিক্ষক। তবে শিক্ষক সংকট না থাকলেও আছে কর্মচারী সংকট। ১২ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র দু’জন। ফলে এতবড় প্রতিষ্ঠানকে সুচারুরূপে পরিচালনা করতে গলদঘর্ম হয়ে হয় শিক্ষকদের। আর চারটি ভবনে ২৪টি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম চলছে। এর সঙ্গে নতুন দশতলা ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে। এটি নির্মাণ সম্পন্ন হলে পর্যাপ্ত ক্লাসরুম, ল্যাবসহ শিক্ষা কার্যক্রমের নানা ধরনের কক্ষের প্রয়োজনীয়তা পূরণ সম্ভব হবে।
স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নানা সমস্যা, সংকট মোকাবিলা করেও যশোর জিলা স্কুল বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ঈর্ষণীয় ফলাফল ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় যশোর জিলা স্কুল থেকে ২৬৩ জন ছাত্র অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ২৬১ জন। এর মধ্যে ১৮২ জন জিপিএ-৫ এবং বৃত্তি পেয়েছে ৩৪ জন। যা জেলার সার্বিক ফলাফলের মধ্যে শীর্ষে।
স্মৃতিপটে জিলা স্কুল / যে মাঠে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর পদচিহ্ন সেখানে আজ কেবলই সংকট
একই বছর জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় (৮ম শ্রেণি) ৯৬ জন অবতীর্ণ হয়ে বৃত্তি পেয়েছে ৮৪ জন। এই ফলাফল যশোর শিক্ষাবোর্ডের মধ্যে সেরা। আর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ১১০ জন ছাত্র অংশ নিয়ে বৃত্তি পেয়েছে ৫৬ জন। এই ফলাফল জেলার মধ্যে সেরা। শুধু এই শিক্ষাবর্ষই নয়; বরং প্রতিবছরই স্কুল এই ফলাফল অর্জন করে চলেছে বলে জানিয়েছেন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন।
ছাত্রদের কথা
তবে ঈর্ষণীয় ফলাফল ধরে রাখলেও নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে স্কুলের সাফল্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন স্কুল সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে প্রতি শ্রেণিকক্ষে ছাত্রসংখ্যার বিষয়টিও রয়েছে। স্কুলের ৩য় শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ৮টি শ্রেণিতে (দুই শিফটে) ৩২টি শাখার সিংহভাগ ক্লাসে ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। কোনো
কোনো ক্লাসে এই সংখ্যা ৭০এর অধিক। ফলে এক ক্লাসে তাদের পাঠদান করা দুরূহ হয়ে পড়ে। কারণ ক্লাসে পাঠদান এখনও পুরোনো হোয়াইট বোর্ড নির্ভর এবং নেই কোনো সাউন্ড সিস্টেম।
তেমনই একটি শ্রেণি স্কুলের প্রভাতী শাখার ৬ষ্ঠ- (খ)। এবছর এই শাখায় ছাত্র রয়েছে ৭০ জন। অধিকাংশ দিনই ৬০ জনের বেশি ছাত্র ক্লাসে উপস্থিত থাকে। ফলে এই সংখ্যক ছাত্রকে একসঙ্গে পাঠদান বেশ কষ্টসাধ্য।
কয়েকজন ছাত্র জানায়, অনেক সময় স্যার সামনে থেকে যা পড়ান, তা ঠিকমতো শোনা যায় না। আবার বোর্ডের লেখাও শেষ বেঞ্চ থেকে পড়া বা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য ক্লাসে ডিজিটাল বোর্ড এবং সাউন্ডবক্স হলে ক্লাস আরও ভালো হয় বলে তারা জানায়।
প্রভাতী শাখার ৬ষ্ঠ- খ শাখার শ্রেণি শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী এখন প্রতিক্লাসে শিক্ষক ছাত্রের অনুপাত হওয়ার কথা ১:৫৫। সেখানে কোনো ক্লাসে সংখ্যাটা একটু বেশি। তার ক্লাসে এখন ৭০ জন ছাত্র রয়েছে। তবে ক্লাসরুম ছোট হওয়ায় ২০ থেকে ২২টি বেঞ্চে শিক্ষার্থীরা সবাই বসতে পারে। শিক্ষকরাও পাঠদান করছেন।
বড় সংকট আইসিটি
সূত্র আরও জানায়, স্কুলের একটি বড় সংকটের জায়গা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়। স্কুলের কোনো শাখাতেই আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক নেই। এমনকি স্কুলে এই বিষয়ের কোনো পদই নেই। তাই প্রভাতী শাখায় সিনিয়র শিক্ষক (গণিত) রফিকুল ইসলাম এবং দিবা শাখায় সিনিয়র শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) কামরুজ্জমান আইসিটি বিষয়টির পাঠদান করছেন। তারা আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিলেও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নন এবং তাদের নিজ বিষয়ে পাঠদানের পাশাপাশি এই বাড়তি বিষয়টিতেও পাঠদান করতে হয়। এছাড়া কম্পিউটার ল্যাবটির অবস্থাও ভয়াবহ। প্রায় একযুগ আগে তৈরি করা ল্যাবে সেই সময়ের পাঁচটি কম্পিউটার সচল রয়েছে, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৫টি ল্যাপটপ। এই দশটি কম্পিউটার দিয়েই চলছে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ১২০০ শিক্ষার্থীর আইসিটি ক্লাস। এতে এই বিপুল শিক্ষার্থীর হাতেকলমে কম্পিউটার শিক্ষা গ্রহণ নামমাত্রই হচ্ছে বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে। এছাড়া স্কুলে গ্রন্থাগারিক পদও নেই। ফলে সারা বছর জুড়ে লাইব্রেরিও থাকে তালাবদ্ধ।
স্মৃতিপটে জিলা স্কুল / ২০০ বছরের রংপুর জিলা স্কুলের মাঠজুড়ে সাজানো রঙিন শৈশব
স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আইয়ান মাশারাত চৌধুরী ও ফারহান সাজিদ জানায়, কম্পিউটার ল্যাবে মাত্র ১০টি ল্যাপটপ-কম্পিউটার। আর তারা একসঙ্গে কমপক্ষে ৬০ জন ছাত্র আইসিটি ক্লাস করতে যায়। ফলে হাতে-কলমে শিক্ষাটা ঠিক হাতেকলমে হচ্ছে না।
বিপাকে শিক্ষকরা
স্কুলের দিবা শাখায় আইসিটি ক্লাস নেওয়া সিনিয়র শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) কামরুজ্জমান জানান, তিনি আইসিটির শিক্ষক নন; তবে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি ক্লাসটি নিচ্ছেন। ৬০ জন ছাত্রের একটি ক্লাস নিতে ন্যূনতম ৩০টি কম্পিউটার দরকার। কিন্তু আছে তার তিনভাগের একভাগ। তাও অনেক পুরোনো। শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে আইসিটি শিক্ষা দেওয়ার জন্য একটি অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব দরকার।
স্কুলের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে সিনিয়র শিক্ষক (ভৌত বিজ্ঞান) উত্তম কুমার মন্ডল জানান, শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল স্মার্ট বোর্ড এবং সাউন্ড সিস্টেম দরকার। তাহলে শিক্ষার্থীদের আরও সুন্দরভাবে পাঠদান করা সম্ভব। পাশাপাশি কম্পিউটার ও সায়েন্স ল্যাবগুলোরও আধুনিকায়ন দরকার।
সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হয় যশোর জিলা স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষাবিস্তারে বরাবরই এই অঞ্চলের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। কিছু সংকট, সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা মোকাবিলা করে শিক্ষা কার্যক্রমকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ক্লাসে ছাত্রসংখ্যা কিছুটা বেশি থাকলেও শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করে সেটি পুষিয়ে দিচ্ছেন।
তবে শুধু জিলা স্কুল নয়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও আইসিটি শিক্ষক বা গ্রন্থাগারিক পদ নেই। পদ সৃষ্টি করে এই ঘাটতি পূরণ করা দরকার। এছাড়া স্কুলে অত্যাধুনিক কম্পিউটার ও সায়েন্স ল্যাব, স্মার্ট বোর্ড, ক্লাসে সাউন্ড সিস্টেম, সোলারপ্লান্ট স্থাপনসহ আরও কিছু সহায়ক উপকরণ প্রদান করা হলে পাঠদান আরও আধুনিক করা সম্ভব। এই চাহিদাগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তারা জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
যশোর জেলা শিক্ষা অফিসার মো. মাহফুজুল হোসেন বলেন, বর্তমানে স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৫৫ থাকার কথা। জিলা স্কুলের কোনো কোনো ক্লাসে ছাত্র দু’একজন বেশি থাকতে পারে, তবে পাঠদান স্বাভাবিকভাবে চলছে। আর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আইসিটি শিক্ষক বা গ্রন্থাগারিক পদ নেই। এই পদ সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। এর বাইরে যেসব প্রয়োজন বা ঘাটতি রয়েছে, তা স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তার আওতাধীন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন জেলার এই শিক্ষা কর্মকর্তা।
স্মৃতিতে অটুট জিলা স্কুল
বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক ব্যাটসম্যান তুষার ইমরান এখন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ। এই কৃতী খেলোয়াড় যশোর জিলা স্কুলের ১৯৯৮ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। স্কুলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এই কৃতী ক্রিকেটার বলেন, খেলাধুলার জন্য স্যারেরা আদর করলেও স্কুল ফাঁকি দেওয়ার জন্য অনেক শাস্তির শিকার হয়েছেন।
তুষার ইমরান বলেন, ‘আসলে স্কুলে ভালো ছাত্র হওয়া বা ভালো ফলাফলের ইচ্ছা কখনই আমার ছিল না। আমার ধ্যান-জ্ঞান ছিল খেলাধুলা। তাই টিফিনের পর কখন স্কুল থেকে পালাবো আর খেলতে যাবো- এটাই ছিল লক্ষ্য।’
তিনি বলেন, ‘স্কুল পালানোর জন্য অনেক মার খেয়েছি। স্কুল পালানোর জন্য হালিম স্যারের মার খেয়েছি, মতিন স্যারের বাম হাতের চড়ও খেয়েছি। কিন্তু খেলার টানে এই স্কুল পালানো বন্ধ হয়নি। সম্ভবত ৯৪ সালে জিলা স্কুল ক্রিকেটে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হয়, ওই টিমেরও সদস্য ছিলাম- তখন আমি ক্লাস সেভেনের ছাত্র। ভালো খেলার জন্য জুলফিকার স্যার খুব আদর করতেন।
তাহিরপুরের প্রত্যন্ত এলাকায় স্কুলে পড়িয়ে প্রশংসায় ভাসছেন ববি হাজ্জাজ
তবে স্কুলের শৈশবের স্মৃতি রোমান্থন করতে করতে তুষার ইমরান বলেন, ‘স্কুলে প্রথম ও দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় অনেকবার আমি বাংলায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছি। এজন্য ভালো ছাত্ররা আমার খাতা দেখতে চাইতো। কিন্তু আমি দেখাতাম না, কারণ এর মধ্যে একটু কারসাজি থাকতো। যে প্রশ্নের উত্তরটি সবচেয়ে ভালো পারতাম সেটি প্রথমে একবার এবং শেষ দিকে আরেকবার লিখতাম। স্যারের চোখ এড়িয়ে গেলেই কেল্লাফতে! কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষায় এই চালাকি চলতো না। তাই ফাইনালে আর সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া হতো না।
যশোর জিলা স্কুল অঙ্গনকে প্রাণের প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে তুষার ইমরান আরও বলেন, ‘আসলে স্কুলে শৈশবের অনেক অনেক স্মৃতি গল্প জড়িয়ে আছে। একটি একটি করে বলতে গেলে, দিন ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু বলা শেষ হবে না।’

বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬
১২০০ শিক্ষার্থীর জন্য একযুগ আগের ল্যাবে মাত্র দশটি কম্পিউটার! নেই আইসিটি শিক্ষকও! এটি ২০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যশোর জিলা স্কুলের কম্পিউটার শিক্ষার চিত্র।
শুধু এটিই নয়; আরও কিছু সংকট রয়েছে। তবে তারপরও যশোর জিলা স্কুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে হাজার হাজার শিক্ষার্থী দেশে-বিদেশে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। এই অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের এই সূতিকাগার বিভিন্ন সমস্যা-সংকটে ভুগলেও সামগ্রিক ফলাফলে ঈর্ষণীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, বিজ্ঞান গবেষণা, স্কাউটিং, খেলাধুলা, বিতর্কসহ নানান কর্মকাণ্ডে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে অনন্য অবস্থান।
সংকটেও সাফল্যের শীর্ষে
স্কুল সূত্রে জানা যায়, ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত যশোর জিলা স্কুলে চলতি শিক্ষাবর্ষে (২০২৬) এক হাজার ৯০২ জন ছাত্র লেখাপড়া করছে। প্রভাতী ও দিবা দুই শিফটে এই শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন ৫০ জন শিক্ষক। তবে শিক্ষক সংকট না থাকলেও আছে কর্মচারী সংকট। ১২ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র দু’জন। ফলে এতবড় প্রতিষ্ঠানকে সুচারুরূপে পরিচালনা করতে গলদঘর্ম হয়ে হয় শিক্ষকদের। আর চারটি ভবনে ২৪টি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম চলছে। এর সঙ্গে নতুন দশতলা ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে। এটি নির্মাণ সম্পন্ন হলে পর্যাপ্ত ক্লাসরুম, ল্যাবসহ শিক্ষা কার্যক্রমের নানা ধরনের কক্ষের প্রয়োজনীয়তা পূরণ সম্ভব হবে।
স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নানা সমস্যা, সংকট মোকাবিলা করেও যশোর জিলা স্কুল বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ঈর্ষণীয় ফলাফল ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় যশোর জিলা স্কুল থেকে ২৬৩ জন ছাত্র অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ২৬১ জন। এর মধ্যে ১৮২ জন জিপিএ-৫ এবং বৃত্তি পেয়েছে ৩৪ জন। যা জেলার সার্বিক ফলাফলের মধ্যে শীর্ষে।
স্মৃতিপটে জিলা স্কুল / যে মাঠে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর পদচিহ্ন সেখানে আজ কেবলই সংকট
একই বছর জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় (৮ম শ্রেণি) ৯৬ জন অবতীর্ণ হয়ে বৃত্তি পেয়েছে ৮৪ জন। এই ফলাফল যশোর শিক্ষাবোর্ডের মধ্যে সেরা। আর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ১১০ জন ছাত্র অংশ নিয়ে বৃত্তি পেয়েছে ৫৬ জন। এই ফলাফল জেলার মধ্যে সেরা। শুধু এই শিক্ষাবর্ষই নয়; বরং প্রতিবছরই স্কুল এই ফলাফল অর্জন করে চলেছে বলে জানিয়েছেন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন।
ছাত্রদের কথা
তবে ঈর্ষণীয় ফলাফল ধরে রাখলেও নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে স্কুলের সাফল্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন স্কুল সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে প্রতি শ্রেণিকক্ষে ছাত্রসংখ্যার বিষয়টিও রয়েছে। স্কুলের ৩য় শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ৮টি শ্রেণিতে (দুই শিফটে) ৩২টি শাখার সিংহভাগ ক্লাসে ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। কোনো
কোনো ক্লাসে এই সংখ্যা ৭০এর অধিক। ফলে এক ক্লাসে তাদের পাঠদান করা দুরূহ হয়ে পড়ে। কারণ ক্লাসে পাঠদান এখনও পুরোনো হোয়াইট বোর্ড নির্ভর এবং নেই কোনো সাউন্ড সিস্টেম।
তেমনই একটি শ্রেণি স্কুলের প্রভাতী শাখার ৬ষ্ঠ- (খ)। এবছর এই শাখায় ছাত্র রয়েছে ৭০ জন। অধিকাংশ দিনই ৬০ জনের বেশি ছাত্র ক্লাসে উপস্থিত থাকে। ফলে এই সংখ্যক ছাত্রকে একসঙ্গে পাঠদান বেশ কষ্টসাধ্য।
কয়েকজন ছাত্র জানায়, অনেক সময় স্যার সামনে থেকে যা পড়ান, তা ঠিকমতো শোনা যায় না। আবার বোর্ডের লেখাও শেষ বেঞ্চ থেকে পড়া বা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য ক্লাসে ডিজিটাল বোর্ড এবং সাউন্ডবক্স হলে ক্লাস আরও ভালো হয় বলে তারা জানায়।
প্রভাতী শাখার ৬ষ্ঠ- খ শাখার শ্রেণি শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী এখন প্রতিক্লাসে শিক্ষক ছাত্রের অনুপাত হওয়ার কথা ১:৫৫। সেখানে কোনো ক্লাসে সংখ্যাটা একটু বেশি। তার ক্লাসে এখন ৭০ জন ছাত্র রয়েছে। তবে ক্লাসরুম ছোট হওয়ায় ২০ থেকে ২২টি বেঞ্চে শিক্ষার্থীরা সবাই বসতে পারে। শিক্ষকরাও পাঠদান করছেন।
বড় সংকট আইসিটি
সূত্র আরও জানায়, স্কুলের একটি বড় সংকটের জায়গা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়। স্কুলের কোনো শাখাতেই আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক নেই। এমনকি স্কুলে এই বিষয়ের কোনো পদই নেই। তাই প্রভাতী শাখায় সিনিয়র শিক্ষক (গণিত) রফিকুল ইসলাম এবং দিবা শাখায় সিনিয়র শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) কামরুজ্জমান আইসিটি বিষয়টির পাঠদান করছেন। তারা আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিলেও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নন এবং তাদের নিজ বিষয়ে পাঠদানের পাশাপাশি এই বাড়তি বিষয়টিতেও পাঠদান করতে হয়। এছাড়া কম্পিউটার ল্যাবটির অবস্থাও ভয়াবহ। প্রায় একযুগ আগে তৈরি করা ল্যাবে সেই সময়ের পাঁচটি কম্পিউটার সচল রয়েছে, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৫টি ল্যাপটপ। এই দশটি কম্পিউটার দিয়েই চলছে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ১২০০ শিক্ষার্থীর আইসিটি ক্লাস। এতে এই বিপুল শিক্ষার্থীর হাতেকলমে কম্পিউটার শিক্ষা গ্রহণ নামমাত্রই হচ্ছে বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে। এছাড়া স্কুলে গ্রন্থাগারিক পদও নেই। ফলে সারা বছর জুড়ে লাইব্রেরিও থাকে তালাবদ্ধ।
স্মৃতিপটে জিলা স্কুল / ২০০ বছরের রংপুর জিলা স্কুলের মাঠজুড়ে সাজানো রঙিন শৈশব
স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আইয়ান মাশারাত চৌধুরী ও ফারহান সাজিদ জানায়, কম্পিউটার ল্যাবে মাত্র ১০টি ল্যাপটপ-কম্পিউটার। আর তারা একসঙ্গে কমপক্ষে ৬০ জন ছাত্র আইসিটি ক্লাস করতে যায়। ফলে হাতে-কলমে শিক্ষাটা ঠিক হাতেকলমে হচ্ছে না।
বিপাকে শিক্ষকরা
স্কুলের দিবা শাখায় আইসিটি ক্লাস নেওয়া সিনিয়র শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) কামরুজ্জমান জানান, তিনি আইসিটির শিক্ষক নন; তবে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি ক্লাসটি নিচ্ছেন। ৬০ জন ছাত্রের একটি ক্লাস নিতে ন্যূনতম ৩০টি কম্পিউটার দরকার। কিন্তু আছে তার তিনভাগের একভাগ। তাও অনেক পুরোনো। শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে আইসিটি শিক্ষা দেওয়ার জন্য একটি অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব দরকার।
স্কুলের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে সিনিয়র শিক্ষক (ভৌত বিজ্ঞান) উত্তম কুমার মন্ডল জানান, শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল স্মার্ট বোর্ড এবং সাউন্ড সিস্টেম দরকার। তাহলে শিক্ষার্থীদের আরও সুন্দরভাবে পাঠদান করা সম্ভব। পাশাপাশি কম্পিউটার ও সায়েন্স ল্যাবগুলোরও আধুনিকায়ন দরকার।
সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হয় যশোর জিলা স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষাবিস্তারে বরাবরই এই অঞ্চলের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। কিছু সংকট, সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা মোকাবিলা করে শিক্ষা কার্যক্রমকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ক্লাসে ছাত্রসংখ্যা কিছুটা বেশি থাকলেও শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করে সেটি পুষিয়ে দিচ্ছেন।
তবে শুধু জিলা স্কুল নয়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও আইসিটি শিক্ষক বা গ্রন্থাগারিক পদ নেই। পদ সৃষ্টি করে এই ঘাটতি পূরণ করা দরকার। এছাড়া স্কুলে অত্যাধুনিক কম্পিউটার ও সায়েন্স ল্যাব, স্মার্ট বোর্ড, ক্লাসে সাউন্ড সিস্টেম, সোলারপ্লান্ট স্থাপনসহ আরও কিছু সহায়ক উপকরণ প্রদান করা হলে পাঠদান আরও আধুনিক করা সম্ভব। এই চাহিদাগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তারা জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
যশোর জেলা শিক্ষা অফিসার মো. মাহফুজুল হোসেন বলেন, বর্তমানে স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৫৫ থাকার কথা। জিলা স্কুলের কোনো কোনো ক্লাসে ছাত্র দু’একজন বেশি থাকতে পারে, তবে পাঠদান স্বাভাবিকভাবে চলছে। আর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আইসিটি শিক্ষক বা গ্রন্থাগারিক পদ নেই। এই পদ সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। এর বাইরে যেসব প্রয়োজন বা ঘাটতি রয়েছে, তা স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তার আওতাধীন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন জেলার এই শিক্ষা কর্মকর্তা।
স্মৃতিতে অটুট জিলা স্কুল
বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক ব্যাটসম্যান তুষার ইমরান এখন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ। এই কৃতী খেলোয়াড় যশোর জিলা স্কুলের ১৯৯৮ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। স্কুলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এই কৃতী ক্রিকেটার বলেন, খেলাধুলার জন্য স্যারেরা আদর করলেও স্কুল ফাঁকি দেওয়ার জন্য অনেক শাস্তির শিকার হয়েছেন।
তুষার ইমরান বলেন, ‘আসলে স্কুলে ভালো ছাত্র হওয়া বা ভালো ফলাফলের ইচ্ছা কখনই আমার ছিল না। আমার ধ্যান-জ্ঞান ছিল খেলাধুলা। তাই টিফিনের পর কখন স্কুল থেকে পালাবো আর খেলতে যাবো- এটাই ছিল লক্ষ্য।’
তিনি বলেন, ‘স্কুল পালানোর জন্য অনেক মার খেয়েছি। স্কুল পালানোর জন্য হালিম স্যারের মার খেয়েছি, মতিন স্যারের বাম হাতের চড়ও খেয়েছি। কিন্তু খেলার টানে এই স্কুল পালানো বন্ধ হয়নি। সম্ভবত ৯৪ সালে জিলা স্কুল ক্রিকেটে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হয়, ওই টিমেরও সদস্য ছিলাম- তখন আমি ক্লাস সেভেনের ছাত্র। ভালো খেলার জন্য জুলফিকার স্যার খুব আদর করতেন।
তাহিরপুরের প্রত্যন্ত এলাকায় স্কুলে পড়িয়ে প্রশংসায় ভাসছেন ববি হাজ্জাজ
তবে স্কুলের শৈশবের স্মৃতি রোমান্থন করতে করতে তুষার ইমরান বলেন, ‘স্কুলে প্রথম ও দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় অনেকবার আমি বাংলায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছি। এজন্য ভালো ছাত্ররা আমার খাতা দেখতে চাইতো। কিন্তু আমি দেখাতাম না, কারণ এর মধ্যে একটু কারসাজি থাকতো। যে প্রশ্নের উত্তরটি সবচেয়ে ভালো পারতাম সেটি প্রথমে একবার এবং শেষ দিকে আরেকবার লিখতাম। স্যারের চোখ এড়িয়ে গেলেই কেল্লাফতে! কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষায় এই চালাকি চলতো না। তাই ফাইনালে আর সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া হতো না।
যশোর জিলা স্কুল অঙ্গনকে প্রাণের প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে তুষার ইমরান আরও বলেন, ‘আসলে স্কুলে শৈশবের অনেক অনেক স্মৃতি গল্প জড়িয়ে আছে। একটি একটি করে বলতে গেলে, দিন ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু বলা শেষ হবে না।’

আপনার মতামত লিখুন