দুই বছর আগের সেই উত্তাল জুলাই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শহীদ মিনার প্রাঙ্গণও হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের প্রতীক। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও প্রাণহানির ঘটনার বিরুদ্ধে যখন অধিকাংশ শিক্ষক নীরব ছিলেন, তখন মাত্র তিনজন শিক্ষক প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে নিপীড়নবিরোধী সমাবেশে অংশ নেন। সময়ের পরিক্রমায় সেই তিন শিক্ষকই আজ দেশের তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন।
তাঁরা হলেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এবং অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নোবিপ্রবির শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন।
সেই সময় আন্দোলন ঘিরে দেশে একের পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটছিল। বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও প্রাণহানির খবর আসছিল। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক কিংবা ব্যক্তিগত ঝুঁকির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও এই তিন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের ভাষায়, এটি ছিল একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব পালনের অংশ।
দুই বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, তাঁদের তিনজনই এখন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছেন। আন্দোলনের পর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ প্রথমে নোবিপ্রবির ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম নোবিপ্রবির উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার সম্প্রতি সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ বলেন,
“সেসময় শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিল। একপর্যায়ে তারা সব শিক্ষকের কাছে ই-মেইল করে তাদের পাশে থাকার আহ্বান জানায়। আমরাও আগে থেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। শিক্ষার্থীদের ই-মেইল পাওয়ার পর আমি, জাহাঙ্গীর স্যার ও শফিক স্যার আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিই যে আমরা আন্দোলনে গিয়ে তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করব।”
তিনি আরও বলেন,
“তখন আমরা কোনো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় আন্দোলনে নামিনি। আমাদের ছাত্রদের ওপর নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। একজন শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে থাকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যৌক্তিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা যখন প্রাণ দিচ্ছে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চাকরিচ্যুত হওয়া, গ্রেপ্তার হওয়া কিংবা প্রাণ হারানোর আশঙ্কা—এসবের কথা চিন্তা না করেই আমরা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।”
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন,
“আমরা শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম তখনই, যখন দেখেছি আমাদের শিক্ষার্থীদের দাবি ন্যায্য। তারা যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছিল, অথচ তাদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছিল, নির্মম নির্যাতন করা হচ্ছিল। বিশেষ করে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার পর আমরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে প্রকাশ্যে সংহতি জানাই। তখন চাকরি থাকবে কি থাকবে না, কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষতির আশঙ্কা—এসব নিয়ে আমরা ভাবিনি।”
তিনি আরও বলেন,
“দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন যৌক্তিক আন্দোলনে আমরা রাজপথে ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমাদের জন্ম হয়নি, তাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারিনি। তবে ভবিষ্যতে দেশের প্রয়োজনে যদি আবারও দাঁড়াতে হয়, তাহলে অবশ্যই দাঁড়াব, ইনশাআল্লাহ।”
অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার বলেন,
“আমি আন্দোলন করেছি একটি বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায়, যেখানে প্রত্যেকে তার ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে। ব্যক্তিগত কোনো প্রাপ্তির আশায় আমি আন্দোলনে নামিনি। ছাত্রসমাজের ওপর হামলা, সারা দেশে গুম, খুন ও হত্যার প্রতিবাদ থেকেই আমি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম।”
তিনি আরও বলেন,
“আমি বিশ্বাস করি, আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামীর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তাই দায়িত্ববোধ থেকেই যা করার প্রয়োজন, আমি করেছি। আজ যে দায়িত্ব পেয়েছি, তার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি এবং সরকারকেও ধন্যবাদ জানাই। তবে দায়িত্ব পাওয়াই বড় কথা নয়; সেই দায়িত্ব সততা ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
দুই বছরের ব্যবধানে নোবিপ্রবির শহীদ মিনারের সেই ছোট্ট প্রতিবাদ আজ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। সেই সমাবেশে অংশ নেওয়া তিন শিক্ষক এখন দেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের অংশ। তাঁদের এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং সংকটময় সময়ে নৈতিক অবস্থান, শিক্ষকের সামাজিক দায়িত্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬
দুই বছর আগের সেই উত্তাল জুলাই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শহীদ মিনার প্রাঙ্গণও হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের প্রতীক। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও প্রাণহানির ঘটনার বিরুদ্ধে যখন অধিকাংশ শিক্ষক নীরব ছিলেন, তখন মাত্র তিনজন শিক্ষক প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে নিপীড়নবিরোধী সমাবেশে অংশ নেন। সময়ের পরিক্রমায় সেই তিন শিক্ষকই আজ দেশের তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন।
তাঁরা হলেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এবং অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নোবিপ্রবির শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন।
সেই সময় আন্দোলন ঘিরে দেশে একের পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটছিল। বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও প্রাণহানির খবর আসছিল। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক কিংবা ব্যক্তিগত ঝুঁকির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও এই তিন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের ভাষায়, এটি ছিল একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব পালনের অংশ।
দুই বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, তাঁদের তিনজনই এখন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছেন। আন্দোলনের পর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ প্রথমে নোবিপ্রবির ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম নোবিপ্রবির উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার সম্প্রতি সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ বলেন,
“সেসময় শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিল। একপর্যায়ে তারা সব শিক্ষকের কাছে ই-মেইল করে তাদের পাশে থাকার আহ্বান জানায়। আমরাও আগে থেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। শিক্ষার্থীদের ই-মেইল পাওয়ার পর আমি, জাহাঙ্গীর স্যার ও শফিক স্যার আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিই যে আমরা আন্দোলনে গিয়ে তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করব।”
তিনি আরও বলেন,
“তখন আমরা কোনো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় আন্দোলনে নামিনি। আমাদের ছাত্রদের ওপর নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। একজন শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে থাকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যৌক্তিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা যখন প্রাণ দিচ্ছে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চাকরিচ্যুত হওয়া, গ্রেপ্তার হওয়া কিংবা প্রাণ হারানোর আশঙ্কা—এসবের কথা চিন্তা না করেই আমরা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।”
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন,
“আমরা শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম তখনই, যখন দেখেছি আমাদের শিক্ষার্থীদের দাবি ন্যায্য। তারা যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছিল, অথচ তাদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছিল, নির্মম নির্যাতন করা হচ্ছিল। বিশেষ করে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার পর আমরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে প্রকাশ্যে সংহতি জানাই। তখন চাকরি থাকবে কি থাকবে না, কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষতির আশঙ্কা—এসব নিয়ে আমরা ভাবিনি।”
তিনি আরও বলেন,
“দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন যৌক্তিক আন্দোলনে আমরা রাজপথে ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমাদের জন্ম হয়নি, তাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারিনি। তবে ভবিষ্যতে দেশের প্রয়োজনে যদি আবারও দাঁড়াতে হয়, তাহলে অবশ্যই দাঁড়াব, ইনশাআল্লাহ।”
অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার বলেন,
“আমি আন্দোলন করেছি একটি বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায়, যেখানে প্রত্যেকে তার ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে। ব্যক্তিগত কোনো প্রাপ্তির আশায় আমি আন্দোলনে নামিনি। ছাত্রসমাজের ওপর হামলা, সারা দেশে গুম, খুন ও হত্যার প্রতিবাদ থেকেই আমি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম।”
তিনি আরও বলেন,
“আমি বিশ্বাস করি, আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামীর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তাই দায়িত্ববোধ থেকেই যা করার প্রয়োজন, আমি করেছি। আজ যে দায়িত্ব পেয়েছি, তার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি এবং সরকারকেও ধন্যবাদ জানাই। তবে দায়িত্ব পাওয়াই বড় কথা নয়; সেই দায়িত্ব সততা ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
দুই বছরের ব্যবধানে নোবিপ্রবির শহীদ মিনারের সেই ছোট্ট প্রতিবাদ আজ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। সেই সমাবেশে অংশ নেওয়া তিন শিক্ষক এখন দেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের অংশ। তাঁদের এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং সংকটময় সময়ে নৈতিক অবস্থান, শিক্ষকের সামাজিক দায়িত্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

আপনার মতামত লিখুন