হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে চালানো হামলাই এখন পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের একমাত্র নজির। এই দুই হামলা শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পথই তৈরি করেনি, একই সঙ্গে বিশ্বকে পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করিয়েছে।
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’ থেকে জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর ‘লিটল বয়’ নামের পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়।
সে সময় শহরটিতে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের বসবাস ছিল। বিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রচণ্ড তাপ, বিস্ফোরণের চাপ এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কারণে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
ধারণা করা হয়, ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ হিরোশিমায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
হিরোশিমায় হামলার তিন দিন পর, ৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র জাপানের নাগাসাকি শহরে ‘ফ্যাট ম্যান’ নামের দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ফেলে।
নাগাসাকি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও শিল্পনগরী। শহরের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কিছুটা সীমিত হলেও হামলার ধ্বংসযজ্ঞ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ।
১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ সেখানে প্রায় ৭৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জাপানকে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা এবং দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধ এড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছিল।
তবে সমালোচকদের দাবি, সে সময় জাপান অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং বেসামরিক মানুষের ওপর এমন বিধ্বংসী হামলা এড়ানোর বিকল্প উপায়ও ছিল।
পারমাণবিক হামলা প্রয়োজনীয় ছিল কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে।
সাধারণ বোমার তুলনায় পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা অনেক বেশি। পরমাণুর বিভাজন থেকে উৎপন্ন শক্তির কারণে এ ধরনের অস্ত্র মুহূর্তের মধ্যে একটি পুরো শহর ধ্বংস করার সক্ষমতা রাখে।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বিস্ফোরণ, তীব্র তাপ, অগ্নিকাণ্ড এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কারণে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়। এছাড়া অনেক জীবিত ব্যক্তি পরবর্তী বছরগুলোতে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা ও মানসিক আঘাতের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছেন।
জাপানি ভাষায় পারমাণবিক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ‘হিবাকুশা’ বলা হয়।
তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করে আসছেন। তাদের এই প্রচেষ্টা বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে হামলার মধ্য দিয়েই পারমাণবিক যুগের সূচনা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমদিকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই পারমাণবিক অস্ত্র ছিল। পরে ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। এরপর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীনসহ আরও কয়েকটি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে।
এর ফলে শুরু হয় পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা থেকেই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বর্তমান বিশ্বেও পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংঘাত, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির দুর্বলতা এবং পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো এগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করে। অন্যদিকে, নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের মতে, হিরোশিমা ও নাগাসাকির অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার মানবজাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সেই কারণেই হিরোশিমা ও নাগাসাকির ঘটনা আজও পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধে বিশ্বের জন্য একটি স্থায়ী সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সূত্র: কালবেলা

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে চালানো হামলাই এখন পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের একমাত্র নজির। এই দুই হামলা শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পথই তৈরি করেনি, একই সঙ্গে বিশ্বকে পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করিয়েছে।
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’ থেকে জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর ‘লিটল বয়’ নামের পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়।
সে সময় শহরটিতে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের বসবাস ছিল। বিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রচণ্ড তাপ, বিস্ফোরণের চাপ এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কারণে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
ধারণা করা হয়, ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ হিরোশিমায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
হিরোশিমায় হামলার তিন দিন পর, ৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র জাপানের নাগাসাকি শহরে ‘ফ্যাট ম্যান’ নামের দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ফেলে।
নাগাসাকি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও শিল্পনগরী। শহরের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কিছুটা সীমিত হলেও হামলার ধ্বংসযজ্ঞ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ।
১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ সেখানে প্রায় ৭৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জাপানকে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা এবং দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধ এড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছিল।
তবে সমালোচকদের দাবি, সে সময় জাপান অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং বেসামরিক মানুষের ওপর এমন বিধ্বংসী হামলা এড়ানোর বিকল্প উপায়ও ছিল।
পারমাণবিক হামলা প্রয়োজনীয় ছিল কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে।
সাধারণ বোমার তুলনায় পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা অনেক বেশি। পরমাণুর বিভাজন থেকে উৎপন্ন শক্তির কারণে এ ধরনের অস্ত্র মুহূর্তের মধ্যে একটি পুরো শহর ধ্বংস করার সক্ষমতা রাখে।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বিস্ফোরণ, তীব্র তাপ, অগ্নিকাণ্ড এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কারণে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়। এছাড়া অনেক জীবিত ব্যক্তি পরবর্তী বছরগুলোতে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা ও মানসিক আঘাতের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছেন।
জাপানি ভাষায় পারমাণবিক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ‘হিবাকুশা’ বলা হয়।
তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করে আসছেন। তাদের এই প্রচেষ্টা বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে হামলার মধ্য দিয়েই পারমাণবিক যুগের সূচনা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমদিকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই পারমাণবিক অস্ত্র ছিল। পরে ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। এরপর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীনসহ আরও কয়েকটি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে।
এর ফলে শুরু হয় পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা থেকেই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বর্তমান বিশ্বেও পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংঘাত, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির দুর্বলতা এবং পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো এগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করে। অন্যদিকে, নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের মতে, হিরোশিমা ও নাগাসাকির অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার মানবজাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সেই কারণেই হিরোশিমা ও নাগাসাকির ঘটনা আজও পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধে বিশ্বের জন্য একটি স্থায়ী সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সূত্র: কালবেলা

আপনার মতামত লিখুন