ইনকিলাব মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ শরীফ ওসমান বিন হাদি ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন থানার আওতাধীন বক্স কালভার্ট রোডে পূর্বপরিকল্পিত সশস্ত্র হামলার শিকার হন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাত ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন হাদি। নির্বাচনের প্রস্তুতির সময় তার ওপর হামলা ও পরবর্তী মৃত্যু রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার আগে প্রধান শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ এবং মোটরসাইকেলচালক মোহাম্মদ আলমগীর শেখ কয়েক দিন ধরে হাদির চলাফেরা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নিয়মিত কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করেন। ঘটনার দিন তারা মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদের কাছে অবস্থান নেন। জুমার নামাজ শেষে হাদি বের হলে তাকে অনুসরণ করতে থাকেন তারা। দুপুর আনুমানিক ২টা ২৪ মিনিটে ডিআর টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ফয়সাল খুব কাছ থেকে ৭.২ বোরের রিভলবার দিয়ে হাদিকে গুলি করেন।
প্রাথমিক তদন্তে প্রায় সব তদন্তকারী দলই পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী, ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান শুটার এবং মোহাম্মদ আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেলচালক হিসেবে শনাক্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন মোবাইল নম্বর, কল রেকর্ড, সিডিআর, আইএমইআই, সিসিটিভি ফুটেজ, সন্দেহভাজনদের অবস্থান এবং ঘটনার আগে-পরে তাদের যোগাযোগ পর্যালোচনা করে একটি বড় সহায়ক নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তে অস্ত্র সরবরাহ, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, পালানোর প্রস্তুতি এবং হামলার আগের রাতে কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, উত্তরা, আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর ও সাভার এলাকায় কয়েকজনের সন্দেহজনক চলাচলের তথ্যও উঠে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের পর ফয়সাল ও আলমগীর মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি নেটওয়ার্কের সহায়তায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। ২০২৬ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে।
একাধিক তদন্তে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্ত অনুযায়ী, বাপ্পী ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ভ্রমণ ভিসায় বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে গিয়ে কলকাতায় অবস্থান নেন। বর্তমানে তিনি পরিচয় পরিবর্তন করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আধারকার্ড ও প্যানকার্ড সংগ্রহ করে কলকাতার খিদিরপুর এলাকায় অবস্থান করছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতে বাপ্পী নিজের পরিচয় গোপন করে মো. মহিদউদ্দিন চৌধুরী নাম এবং পিতার নাম মো. নজরুল উদ্দিন চৌধুরী ব্যবহার করে আধারকার্ড ও প্যানকার্ড সংগ্রহ করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা জন্মতারিখের দিন ও মাস অপরিবর্তিত রেখে শুধু জন্মসাল পরিবর্তন এবং বাবার নাম আংশিক পরিবর্তন করা হয়েছে বলে তদন্তে জানা গেছে।
বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাপ্পীর নির্দেশনায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদকে প্রধান শুটার এবং মোহাম্মদ আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেলচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফয়সাল ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি এবং আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন। আলমগীরও আদাবর এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানে তিনি একটি ভাড়াকৃত ফার্নিচারের দোকান পরিচালনা করতেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, হামলার অন্তত চার থেকে পাঁচ দিন আগে থেকেই ফয়সাল ও আলমগীর হাদির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তারা অনুসারী, ভোটার কিংবা রাজনৈতিক কর্মীর পরিচয়ে হাদির আশপাশে থেকে তার চলাফেরা, নিরাপত্তাবলয় এবং নিয়মিত যাতায়াতের জায়গাগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। ৯ ডিসেম্বর ঢাকার সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে হাদির সঙ্গে ৭ থেকে ৮ জনের একটি বৈঠকে ফয়সালের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে এটিকে হামলার প্রস্তুতি ও নজরদারির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ঘটনার আগের দিন ১১ ডিসেম্বর আলমগীর আদাবরের বাসায় গিয়ে স্ত্রী, মা ও দুই মেয়ের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করেন। হামলার আগে ও পরে যোগাযোগের জন্য একাধিক মোবাইল নম্বর, হ্যান্ডসেট ও আইএমইআই ব্যবহারের তথ্যও তদন্তে পাওয়া যায়। কিছু নম্বর অল্প সময়ের জন্য চালু ছিল, আবার কয়েকটি নম্বর অন্য ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত ছিল। একই আইএমইআই নম্বরে একাধিক সিম ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে।
ফয়সালের ব্যবহৃত কয়েকটি নম্বরের সঙ্গে আলী, তানজিউল বা তানজিমুল এবং আব্দুল্লাহ মামুন নামে কয়েকজনের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য শনাক্ত করা হয়। ঘটনার আগের রাতে তানজিমুল ও আলী পৃথকভাবে কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে যান এবং পরে ঢাকায় ফিরে আসেন। তানজিমুল উত্তরা বা বিমানবন্দর এলাকায় আব্দুল্লাহ মামুনের সঙ্গে দেখা করেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। এরপর আগারগাঁও-মোহাম্মদপুর এলাকায় ফয়সাল ও আলীর সঙ্গে তাদের অবস্থানের তথ্যও উঠে আসে। এসব তথ্য পাওয়ার পর র্যাব তাদের গ্রেপ্তার করে। তদন্তে তাদের কেউ অস্ত্র সরবরাহ কিংবা হামলার আগের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন বলে সন্দেহ করা হয়।
ঘটনার দিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের গ্রিন জোন কটেজে দুই সন্দেহভাজন যুবক উবার বা ট্যাক্সিযোগে প্রবেশ করেন। তারা একটি কক্ষে কিছু সময় অবস্থান করার পর সকাল ৮টা ৫৮ মিনিটে একই গাড়িতে সেখান থেকে চলে যান। র্যাবের হাতে আটক কটেজের সার্ভিসবয় সিয়াম জিজ্ঞাসাবাদে ফয়সাল ও আলমগীর সেখানে অবস্থান করেছিলেন বলে স্বীকার করেন।
তদন্ত অনুযায়ী, ঘটনার দিন দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিটে হাদি জুমার নামাজ পড়তে মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে প্রবেশ করেন। এর তিন মিনিট পর মোটরসাইকেলে করে ফয়সাল ও আলমগীর মসজিদের কাছের খলিল হোটেল গলিতে অবস্থান নেন। দুপুর ১২টা ৫২ মিনিট থেকে ২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত তারা গলি ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় মোটরসাইকেলচালককে বারবার মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখা যায়।
নামাজ শেষে হাদি পায়ে হেঁটে গলিতে এলে তারা তার কাছাকাছি অবস্থান নেন। দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে হাদি অটোরিকশায় করে রওনা হলে ফয়সাল ও আলমগীর মোটরসাইকেলে তাকে অনুসরণ করেন। অটোরিকশাটি শাপলা চত্বর, মতিঝিল রোড ও ডিআইটি এভিনিউ হয়ে বক্স কালভার্ট রোডে প্রবেশ করে। দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে ডিআর টাওয়ারের সামনে ফয়সাল খুব কাছ থেকে হাদিকে গুলি করেন। এরপর তারা বিজয়নগরের পানির ট্যাংকি মোড় হয়ে পল্টনমুখী সড়ক দিয়ে পালিয়ে যান।
তদন্তে বলা হয়েছে, হামলার পর দেশীয় মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি নেটওয়ার্কের সহায়তায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে হত্যাকাণ্ডের দুই অভিযুক্ত ভারতে প্রবেশ করেন। সীমান্ত পার হওয়া, ভারতে আশ্রয় নেওয়া এবং অবস্থান গোপন রাখার ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিক ফিলিপ সাংমা এবং স্থানীয় কয়েকজন চোরাকারবারি সহযোগিতা করেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
এতে তদন্তসংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, হামলার পর পালানোর পথ, সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা এবং ভারতে নিরাপদে থাকার পরিকল্পনা আগেই করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারের পর তাদের বিরুদ্ধে প্রথমে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পরিচয় গোপন এবং ভারতে বেআইনিভাবে অবস্থানের অভিযোগ আনা হয়। পরে কলকাতার বিধাননগর আদালত তাদের জেলহাজতে পাঠান। মামলাটির সংবেদনশীলতার কারণে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা বিভাগ তাদের ট্রানজিট রিমান্ডে নিয়ে দিল্লিতে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছেন।
জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী, অর্থদাতা এবং ভারতে সহযোগিতাকারী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে আলমগীরের মা ও স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র্যাব নিয়ে যায় এবং পরদিন তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে তার বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত থাকা, যোগাযোগ ও অর্থায়নে সহযোগিতা এবং অস্ত্র বা আলামত গোপনে ভূমিকা রাখার অভিযোগ আনা হয়। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ জুলাই ২০২৬ হাইকোর্ট তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন।
হাদির ওপর হামলার পর পল্টন থানায় প্রথমে হত্যাচেষ্টা মামলা করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, মোবাইল যোগাযোগ, সিডিআর, আইএমইআই, অস্ত্রের ধরন, যানবাহনের গতিপথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান বিশ্লেষণ করে তদন্ত চালায়। হত্যাকাণ্ডের ২১ দিনের মধ্যে ডিবি ১৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।
অভিযোগপত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে হাদির সমালোচনা এবং তার রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে হত্যার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়। এতে শুটার, মোটরসাইকেলচালক, অস্ত্র সরবরাহকারী, সহযোগী এবং আশ্রয়দাতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চ ওই অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট হয়নি। তাদের অভিযোগ, ডিবির তদন্তে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হলেও হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, রাজনৈতিক নির্দেশদাতা এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের আড়াল করা হয়েছে। এ কারণে তারা আদালতে নারাজি আবেদন করে মামলাটির অধিকতর তদন্ত দাবি করেন।
হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চের নারাজি আবেদন বিবেচনা করে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।
সিআইডি বর্তমানে হত্যার মূল নির্দেশদাতা, অর্থায়নের উৎস, অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহ, ডিজিটাল যোগাযোগ, দেশীয় রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, সীমান্ত পারাপারে সহযোগিতাকারী নেটওয়ার্ক এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্ত করছে।
সিআইডির তদন্তে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার পাশাপাশি ১২০(বি) ধারায় সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে উপস্থিত না থেকেও পরিকল্পনা, অর্থায়ন, প্ররোচনা, অস্ত্র সরবরাহ, আশ্রয় দেওয়া কিংবা আসামিদের পালাতে সহযোগিতাকারীদের মূল অপরাধের সহযোগী হিসেবে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের ২১ দিনের মধ্যে ডিবি ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করলেও হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চ মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আড়াল করার অভিযোগ তোলে। পরে মামলাটি অধিকতর তদন্তে সিআইডিতে যাওয়ার পর ভারতের কাছ থেকে গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ, সীমান্ত পারাপার এবং সহযোগীদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক তথ্য পেতে বিলম্ব হয়। এর ফলে সিআইডির প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এ পর্যন্ত ১৮ বার পিছিয়েছে। সর্বশেষ ২০ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ থাকলেও তা জমা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও ভারতে আসামিদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা, দেশটির আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য আইনি আপত্তির কারণে তাদের বাংলাদেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বলে সর্বশেষ তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশ নীতিগতভাবে আসামিদের বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়ে সম্মত হলেও ভারতে তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পরিচয় গোপন এবং বেআইনিভাবে অবস্থানের মামলা চলমান রয়েছে। ভারতীয় আইনে সেখানে দায়ের হওয়া মামলার নিষ্পত্তি, প্রত্যাহার অথবা প্রত্যর্পণের পক্ষে আদালতের প্রয়োজনীয় আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত সরাসরি বাংলাদেশে হস্তান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি শুধু কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে ভারতীয় আদালত, কেন্দ্রীয় সরকার, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কর্তৃপক্ষ এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত সিদ্ধান্তের বিষয়ও জড়িত রয়েছে।
বাংলাদেশের হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকায় ভারতীয় আদালতে আসামিদের সম্ভাব্য সাজা এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে অভিযুক্তরা মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দাবি করলে প্রত্যর্পণ চুক্তিতে রাজনৈতিক অপরাধসংক্রান্ত ব্যতিক্রমের বিষয়েও আইনি বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে আসামিদের বিরুদ্ধে চলমান মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি, বাংলাদেশের পাঠানো নথির গ্রহণযোগ্যতা, আসামিদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং দুই দেশের আইনে অপরাধের সামঞ্জস্য—এসব বিষয় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে।
এ অবস্থায় আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ, দ্রুত দাপ্তরিক নথি বিনিময় এবং আদালতকেন্দ্রিক সমন্বিত আইনি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকলে হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রতিবেদনে ইনকিলাব মঞ্চের দাবির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, ডিবির প্রাথমিক অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ব্যক্তিদের আড়াল করা হয়েছে এবং সিআইডির তদন্তেও অস্বাভাবিক বিলম্ব হচ্ছে।
এ কারণে ইনকিলাব মঞ্চ বিষয়টিকে শুধু একটি ফৌজদারি মামলা হিসেবে না দেখে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করছে।
মঞ্চের পক্ষ থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হত্যাকারীদের ফাঁসি এবং নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। তদন্ত ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে জনজীবন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বলে একটি তদন্ত প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের বিচার ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে জামায়াতসহ অন্যান্য বিরোধী দল বিষয়টিকে সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। বিচার বিলম্বিত হলে বিরোধী দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে দায়মুক্তি, দুর্বলতা অথবা রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির অভিযোগ তুলতে পারে বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
সূত্র: মানবজমিন

সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ আগস্ট ২০২৬
ইনকিলাব মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ শরীফ ওসমান বিন হাদি ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন থানার আওতাধীন বক্স কালভার্ট রোডে পূর্বপরিকল্পিত সশস্ত্র হামলার শিকার হন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাত ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন হাদি। নির্বাচনের প্রস্তুতির সময় তার ওপর হামলা ও পরবর্তী মৃত্যু রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার আগে প্রধান শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ এবং মোটরসাইকেলচালক মোহাম্মদ আলমগীর শেখ কয়েক দিন ধরে হাদির চলাফেরা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নিয়মিত কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করেন। ঘটনার দিন তারা মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদের কাছে অবস্থান নেন। জুমার নামাজ শেষে হাদি বের হলে তাকে অনুসরণ করতে থাকেন তারা। দুপুর আনুমানিক ২টা ২৪ মিনিটে ডিআর টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ফয়সাল খুব কাছ থেকে ৭.২ বোরের রিভলবার দিয়ে হাদিকে গুলি করেন।
প্রাথমিক তদন্তে প্রায় সব তদন্তকারী দলই পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী, ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান শুটার এবং মোহাম্মদ আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেলচালক হিসেবে শনাক্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন মোবাইল নম্বর, কল রেকর্ড, সিডিআর, আইএমইআই, সিসিটিভি ফুটেজ, সন্দেহভাজনদের অবস্থান এবং ঘটনার আগে-পরে তাদের যোগাযোগ পর্যালোচনা করে একটি বড় সহায়ক নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তে অস্ত্র সরবরাহ, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, পালানোর প্রস্তুতি এবং হামলার আগের রাতে কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, উত্তরা, আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর ও সাভার এলাকায় কয়েকজনের সন্দেহজনক চলাচলের তথ্যও উঠে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের পর ফয়সাল ও আলমগীর মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি নেটওয়ার্কের সহায়তায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। ২০২৬ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে।
একাধিক তদন্তে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্ত অনুযায়ী, বাপ্পী ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ভ্রমণ ভিসায় বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে গিয়ে কলকাতায় অবস্থান নেন। বর্তমানে তিনি পরিচয় পরিবর্তন করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আধারকার্ড ও প্যানকার্ড সংগ্রহ করে কলকাতার খিদিরপুর এলাকায় অবস্থান করছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতে বাপ্পী নিজের পরিচয় গোপন করে মো. মহিদউদ্দিন চৌধুরী নাম এবং পিতার নাম মো. নজরুল উদ্দিন চৌধুরী ব্যবহার করে আধারকার্ড ও প্যানকার্ড সংগ্রহ করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা জন্মতারিখের দিন ও মাস অপরিবর্তিত রেখে শুধু জন্মসাল পরিবর্তন এবং বাবার নাম আংশিক পরিবর্তন করা হয়েছে বলে তদন্তে জানা গেছে।
বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাপ্পীর নির্দেশনায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদকে প্রধান শুটার এবং মোহাম্মদ আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেলচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফয়সাল ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি এবং আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন। আলমগীরও আদাবর এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানে তিনি একটি ভাড়াকৃত ফার্নিচারের দোকান পরিচালনা করতেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, হামলার অন্তত চার থেকে পাঁচ দিন আগে থেকেই ফয়সাল ও আলমগীর হাদির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তারা অনুসারী, ভোটার কিংবা রাজনৈতিক কর্মীর পরিচয়ে হাদির আশপাশে থেকে তার চলাফেরা, নিরাপত্তাবলয় এবং নিয়মিত যাতায়াতের জায়গাগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। ৯ ডিসেম্বর ঢাকার সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে হাদির সঙ্গে ৭ থেকে ৮ জনের একটি বৈঠকে ফয়সালের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে এটিকে হামলার প্রস্তুতি ও নজরদারির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ঘটনার আগের দিন ১১ ডিসেম্বর আলমগীর আদাবরের বাসায় গিয়ে স্ত্রী, মা ও দুই মেয়ের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করেন। হামলার আগে ও পরে যোগাযোগের জন্য একাধিক মোবাইল নম্বর, হ্যান্ডসেট ও আইএমইআই ব্যবহারের তথ্যও তদন্তে পাওয়া যায়। কিছু নম্বর অল্প সময়ের জন্য চালু ছিল, আবার কয়েকটি নম্বর অন্য ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত ছিল। একই আইএমইআই নম্বরে একাধিক সিম ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে।
ফয়সালের ব্যবহৃত কয়েকটি নম্বরের সঙ্গে আলী, তানজিউল বা তানজিমুল এবং আব্দুল্লাহ মামুন নামে কয়েকজনের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য শনাক্ত করা হয়। ঘটনার আগের রাতে তানজিমুল ও আলী পৃথকভাবে কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে যান এবং পরে ঢাকায় ফিরে আসেন। তানজিমুল উত্তরা বা বিমানবন্দর এলাকায় আব্দুল্লাহ মামুনের সঙ্গে দেখা করেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। এরপর আগারগাঁও-মোহাম্মদপুর এলাকায় ফয়সাল ও আলীর সঙ্গে তাদের অবস্থানের তথ্যও উঠে আসে। এসব তথ্য পাওয়ার পর র্যাব তাদের গ্রেপ্তার করে। তদন্তে তাদের কেউ অস্ত্র সরবরাহ কিংবা হামলার আগের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন বলে সন্দেহ করা হয়।
ঘটনার দিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের গ্রিন জোন কটেজে দুই সন্দেহভাজন যুবক উবার বা ট্যাক্সিযোগে প্রবেশ করেন। তারা একটি কক্ষে কিছু সময় অবস্থান করার পর সকাল ৮টা ৫৮ মিনিটে একই গাড়িতে সেখান থেকে চলে যান। র্যাবের হাতে আটক কটেজের সার্ভিসবয় সিয়াম জিজ্ঞাসাবাদে ফয়সাল ও আলমগীর সেখানে অবস্থান করেছিলেন বলে স্বীকার করেন।
তদন্ত অনুযায়ী, ঘটনার দিন দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিটে হাদি জুমার নামাজ পড়তে মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে প্রবেশ করেন। এর তিন মিনিট পর মোটরসাইকেলে করে ফয়সাল ও আলমগীর মসজিদের কাছের খলিল হোটেল গলিতে অবস্থান নেন। দুপুর ১২টা ৫২ মিনিট থেকে ২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত তারা গলি ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় মোটরসাইকেলচালককে বারবার মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখা যায়।
নামাজ শেষে হাদি পায়ে হেঁটে গলিতে এলে তারা তার কাছাকাছি অবস্থান নেন। দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে হাদি অটোরিকশায় করে রওনা হলে ফয়সাল ও আলমগীর মোটরসাইকেলে তাকে অনুসরণ করেন। অটোরিকশাটি শাপলা চত্বর, মতিঝিল রোড ও ডিআইটি এভিনিউ হয়ে বক্স কালভার্ট রোডে প্রবেশ করে। দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে ডিআর টাওয়ারের সামনে ফয়সাল খুব কাছ থেকে হাদিকে গুলি করেন। এরপর তারা বিজয়নগরের পানির ট্যাংকি মোড় হয়ে পল্টনমুখী সড়ক দিয়ে পালিয়ে যান।
তদন্তে বলা হয়েছে, হামলার পর দেশীয় মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি নেটওয়ার্কের সহায়তায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে হত্যাকাণ্ডের দুই অভিযুক্ত ভারতে প্রবেশ করেন। সীমান্ত পার হওয়া, ভারতে আশ্রয় নেওয়া এবং অবস্থান গোপন রাখার ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিক ফিলিপ সাংমা এবং স্থানীয় কয়েকজন চোরাকারবারি সহযোগিতা করেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
এতে তদন্তসংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, হামলার পর পালানোর পথ, সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা এবং ভারতে নিরাপদে থাকার পরিকল্পনা আগেই করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারের পর তাদের বিরুদ্ধে প্রথমে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পরিচয় গোপন এবং ভারতে বেআইনিভাবে অবস্থানের অভিযোগ আনা হয়। পরে কলকাতার বিধাননগর আদালত তাদের জেলহাজতে পাঠান। মামলাটির সংবেদনশীলতার কারণে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা বিভাগ তাদের ট্রানজিট রিমান্ডে নিয়ে দিল্লিতে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছেন।
জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী, অর্থদাতা এবং ভারতে সহযোগিতাকারী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে আলমগীরের মা ও স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র্যাব নিয়ে যায় এবং পরদিন তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে তার বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত থাকা, যোগাযোগ ও অর্থায়নে সহযোগিতা এবং অস্ত্র বা আলামত গোপনে ভূমিকা রাখার অভিযোগ আনা হয়। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ জুলাই ২০২৬ হাইকোর্ট তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন।
হাদির ওপর হামলার পর পল্টন থানায় প্রথমে হত্যাচেষ্টা মামলা করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, মোবাইল যোগাযোগ, সিডিআর, আইএমইআই, অস্ত্রের ধরন, যানবাহনের গতিপথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান বিশ্লেষণ করে তদন্ত চালায়। হত্যাকাণ্ডের ২১ দিনের মধ্যে ডিবি ১৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।
অভিযোগপত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে হাদির সমালোচনা এবং তার রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে হত্যার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়। এতে শুটার, মোটরসাইকেলচালক, অস্ত্র সরবরাহকারী, সহযোগী এবং আশ্রয়দাতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চ ওই অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট হয়নি। তাদের অভিযোগ, ডিবির তদন্তে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হলেও হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, রাজনৈতিক নির্দেশদাতা এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের আড়াল করা হয়েছে। এ কারণে তারা আদালতে নারাজি আবেদন করে মামলাটির অধিকতর তদন্ত দাবি করেন।
হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চের নারাজি আবেদন বিবেচনা করে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।
সিআইডি বর্তমানে হত্যার মূল নির্দেশদাতা, অর্থায়নের উৎস, অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহ, ডিজিটাল যোগাযোগ, দেশীয় রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, সীমান্ত পারাপারে সহযোগিতাকারী নেটওয়ার্ক এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্ত করছে।
সিআইডির তদন্তে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার পাশাপাশি ১২০(বি) ধারায় সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে উপস্থিত না থেকেও পরিকল্পনা, অর্থায়ন, প্ররোচনা, অস্ত্র সরবরাহ, আশ্রয় দেওয়া কিংবা আসামিদের পালাতে সহযোগিতাকারীদের মূল অপরাধের সহযোগী হিসেবে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের ২১ দিনের মধ্যে ডিবি ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করলেও হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চ মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আড়াল করার অভিযোগ তোলে। পরে মামলাটি অধিকতর তদন্তে সিআইডিতে যাওয়ার পর ভারতের কাছ থেকে গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ, সীমান্ত পারাপার এবং সহযোগীদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক তথ্য পেতে বিলম্ব হয়। এর ফলে সিআইডির প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এ পর্যন্ত ১৮ বার পিছিয়েছে। সর্বশেষ ২০ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ থাকলেও তা জমা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও ভারতে আসামিদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা, দেশটির আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য আইনি আপত্তির কারণে তাদের বাংলাদেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বলে সর্বশেষ তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশ নীতিগতভাবে আসামিদের বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়ে সম্মত হলেও ভারতে তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পরিচয় গোপন এবং বেআইনিভাবে অবস্থানের মামলা চলমান রয়েছে। ভারতীয় আইনে সেখানে দায়ের হওয়া মামলার নিষ্পত্তি, প্রত্যাহার অথবা প্রত্যর্পণের পক্ষে আদালতের প্রয়োজনীয় আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত সরাসরি বাংলাদেশে হস্তান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি শুধু কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে ভারতীয় আদালত, কেন্দ্রীয় সরকার, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কর্তৃপক্ষ এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত সিদ্ধান্তের বিষয়ও জড়িত রয়েছে।
বাংলাদেশের হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকায় ভারতীয় আদালতে আসামিদের সম্ভাব্য সাজা এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে অভিযুক্তরা মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দাবি করলে প্রত্যর্পণ চুক্তিতে রাজনৈতিক অপরাধসংক্রান্ত ব্যতিক্রমের বিষয়েও আইনি বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে আসামিদের বিরুদ্ধে চলমান মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি, বাংলাদেশের পাঠানো নথির গ্রহণযোগ্যতা, আসামিদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং দুই দেশের আইনে অপরাধের সামঞ্জস্য—এসব বিষয় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে।
এ অবস্থায় আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ, দ্রুত দাপ্তরিক নথি বিনিময় এবং আদালতকেন্দ্রিক সমন্বিত আইনি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকলে হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রতিবেদনে ইনকিলাব মঞ্চের দাবির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, ডিবির প্রাথমিক অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ব্যক্তিদের আড়াল করা হয়েছে এবং সিআইডির তদন্তেও অস্বাভাবিক বিলম্ব হচ্ছে।
এ কারণে ইনকিলাব মঞ্চ বিষয়টিকে শুধু একটি ফৌজদারি মামলা হিসেবে না দেখে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করছে।
মঞ্চের পক্ষ থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হত্যাকারীদের ফাঁসি এবং নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। তদন্ত ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে জনজীবন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বলে একটি তদন্ত প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের বিচার ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে জামায়াতসহ অন্যান্য বিরোধী দল বিষয়টিকে সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। বিচার বিলম্বিত হলে বিরোধী দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে দায়মুক্তি, দুর্বলতা অথবা রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির অভিযোগ তুলতে পারে বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
সূত্র: মানবজমিন

আপনার মতামত লিখুন