জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বর্তমান সরকারের মধ্যে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূত’ ভর করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে অতীতের বিভিন্ন সরকারের মতো বর্তমান সরকারও ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে জামায়াতে ইসলামীর তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬: নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ নাকি বাকস্বাধীনতা দমন?’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, আগে বিরোধী দলকে ‘ভূতে ধরেছে’ বলা হতো। এখন মনে হচ্ছে সরকারকেই সেই ভূতে ধরেছে। সরকারের ভেতরে অস্থিরতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের রায়কে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
সাইবার আইন প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধও বাড়ছে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে ২০২৫ সালে জারি করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশকে ২০২৬ সালে আইনে পরিণত করার কয়েক মাসের মধ্যেই আবার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কেন, সে বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
তাঁর ভাষ্য, আগের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে বেশ কিছু বিতর্কিত বিধান বাতিল ও সংশোধন করা হয়েছিল। কিন্তু আইনটি কার্যকর হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন করে সংশোধনীর প্রস্তাব এসেছে। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার সংশোধনের প্রয়োজন কেন হলো, সেটি সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিভিন্ন ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, মানহানি, গুজব, অসত্য তথ্য, তল্লাশি ও জব্দের মতো বিষয়ে আইনে অস্পষ্টতা থাকলে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে এসব বিধান প্রয়োগের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জামিন অযোগ্য ধারাগুলো বাতিলের দাবি জানান তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’ ও ‘ভুল তথ্য’-এর মতো শব্দগুলোর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকা জরুরি। তা না হলে আইনের অপব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আটকের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি বিদ্যমান সাইবার সুরক্ষা আইন বহাল রেখে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো আপাতত প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, আইনের খুঁটিনাটি নিয়ে ব্যস্ত থাকার পরিবর্তে সরকারের উচিত জনগণের মনোভাব বোঝা। রাজপথের মিছিলের স্লোগান, পোস্টার ও দেয়াললিখনের মাধ্যমেও জনগণ তাদের মতামত প্রকাশ করে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জনগণের রায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে বলেও মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর ভাষ্য, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের ওপর ‘কালাকানুন’ চাপিয়ে দেওয়া হলে সরকারের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারীদের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। গোলাম পরওয়ার বলেন, ইংরেজিতে একটি কথা আছে—‘ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিন’। কোনো শাসকের চরিত্র কর্তৃত্ববাদী হলে আইনকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা, অপব্যবহার ও প্রয়োগের মাধ্যমে নিরপরাধ মানুষও শাস্তির মুখে পড়তে পারেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রফিকুজ্জামান রুমান। তিনি সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর বিভিন্ন ধারা, এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে আইনের সম্পর্ক তুলে ধরেন।
প্রবন্ধে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার জন্য ১৬টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এতে প্রকৃত সাইবার অপরাধকে আইনের মূল বিষয় হিসেবে নির্ধারণ, মতপ্রকাশ ও সাইবার অপরাধকে পৃথকভাবে বিবেচনা, অস্পষ্ট ও ব্যাপক অর্থবোধক শব্দের ব্যবহার কমানো এবং মানহানিকে সাইবার অপরাধের আওতায় না রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গুজব ও অপতথ্যের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ক্ষতির বিষয়টি প্রমাণের বাধ্যবাধকতার কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া গুজব শনাক্তে স্বাধীন ও যাচাইযোগ্য ব্যবস্থা চালু, ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান পুনর্বিবেচনা, কনটেন্ট ব্লকের কারণ প্রকাশ এবং গ্রেপ্তার ও তল্লাশির ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতির গুরুত্ব বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। জামিনের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকদের বিশেষ সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও প্রস্তাবে রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবনায় কোম্পানির লাইসেন্স বাতিলের বিধান সীমিত করা, ডিজিটাল কনটেন্ট অপসারণে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালু, সাইবার অপরাধ তদন্তে দক্ষতা বৃদ্ধি, আইনের রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধ এবং সাইবার সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: ইত্তেফাক/এসজেএস

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বর্তমান সরকারের মধ্যে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূত’ ভর করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে অতীতের বিভিন্ন সরকারের মতো বর্তমান সরকারও ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে জামায়াতে ইসলামীর তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬: নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ নাকি বাকস্বাধীনতা দমন?’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, আগে বিরোধী দলকে ‘ভূতে ধরেছে’ বলা হতো। এখন মনে হচ্ছে সরকারকেই সেই ভূতে ধরেছে। সরকারের ভেতরে অস্থিরতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের রায়কে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
সাইবার আইন প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধও বাড়ছে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে ২০২৫ সালে জারি করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশকে ২০২৬ সালে আইনে পরিণত করার কয়েক মাসের মধ্যেই আবার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কেন, সে বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
তাঁর ভাষ্য, আগের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে বেশ কিছু বিতর্কিত বিধান বাতিল ও সংশোধন করা হয়েছিল। কিন্তু আইনটি কার্যকর হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন করে সংশোধনীর প্রস্তাব এসেছে। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার সংশোধনের প্রয়োজন কেন হলো, সেটি সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিভিন্ন ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, মানহানি, গুজব, অসত্য তথ্য, তল্লাশি ও জব্দের মতো বিষয়ে আইনে অস্পষ্টতা থাকলে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে এসব বিধান প্রয়োগের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জামিন অযোগ্য ধারাগুলো বাতিলের দাবি জানান তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’ ও ‘ভুল তথ্য’-এর মতো শব্দগুলোর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকা জরুরি। তা না হলে আইনের অপব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আটকের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি বিদ্যমান সাইবার সুরক্ষা আইন বহাল রেখে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো আপাতত প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, আইনের খুঁটিনাটি নিয়ে ব্যস্ত থাকার পরিবর্তে সরকারের উচিত জনগণের মনোভাব বোঝা। রাজপথের মিছিলের স্লোগান, পোস্টার ও দেয়াললিখনের মাধ্যমেও জনগণ তাদের মতামত প্রকাশ করে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জনগণের রায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে বলেও মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর ভাষ্য, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের ওপর ‘কালাকানুন’ চাপিয়ে দেওয়া হলে সরকারের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারীদের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। গোলাম পরওয়ার বলেন, ইংরেজিতে একটি কথা আছে—‘ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিন’। কোনো শাসকের চরিত্র কর্তৃত্ববাদী হলে আইনকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা, অপব্যবহার ও প্রয়োগের মাধ্যমে নিরপরাধ মানুষও শাস্তির মুখে পড়তে পারেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রফিকুজ্জামান রুমান। তিনি সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর বিভিন্ন ধারা, এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে আইনের সম্পর্ক তুলে ধরেন।
প্রবন্ধে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার জন্য ১৬টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এতে প্রকৃত সাইবার অপরাধকে আইনের মূল বিষয় হিসেবে নির্ধারণ, মতপ্রকাশ ও সাইবার অপরাধকে পৃথকভাবে বিবেচনা, অস্পষ্ট ও ব্যাপক অর্থবোধক শব্দের ব্যবহার কমানো এবং মানহানিকে সাইবার অপরাধের আওতায় না রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গুজব ও অপতথ্যের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ক্ষতির বিষয়টি প্রমাণের বাধ্যবাধকতার কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া গুজব শনাক্তে স্বাধীন ও যাচাইযোগ্য ব্যবস্থা চালু, ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান পুনর্বিবেচনা, কনটেন্ট ব্লকের কারণ প্রকাশ এবং গ্রেপ্তার ও তল্লাশির ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতির গুরুত্ব বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। জামিনের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকদের বিশেষ সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও প্রস্তাবে রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবনায় কোম্পানির লাইসেন্স বাতিলের বিধান সীমিত করা, ডিজিটাল কনটেন্ট অপসারণে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালু, সাইবার অপরাধ তদন্তে দক্ষতা বৃদ্ধি, আইনের রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধ এবং সাইবার সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: ইত্তেফাক/এসজেএস

আপনার মতামত লিখুন