বর্ষাকাল চললেও বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠে এখনো দেখা মিলছে না বর্ষার স্বাভাবিক চিত্র। যে জমিগুলো এ সময় বৃষ্টির পানিতে ভরে থাকার কথা, সেগুলোর অনেকটিতেই গভীর নলকূপের সেচের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে আমন মৌসুমে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
একসময় বর্ষার মেঘ কৃষকদের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলেও এখন সেই মৌসুমি বৃষ্টি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। গত পাঁচ দশকে রাজশাহী অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিপাত প্রায় ৩৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে তাপমাত্রা বেড়েছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নেমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, জীবিকা ও গ্রামীণ জনজীবনে।
কৃষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় আমন চাষ এখন আর শুধু বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল নয়। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার হোসেনপুর মৌজার মহাডাঙ্গা গ্রাম, গেরস্ত পৌর এলাকার হরিপুর মহল্লা এবং নাচোল উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর মৌজায় দেখা গেছে, কোথাও জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, কোথাও সেচের মাধ্যমে কাদা তৈরি করা হচ্ছে, আবার কোথাও চলছে আমনের চারা রোপণ। প্রায় সব ক্ষেত্রেই কৃষকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে সেচ ব্যয় বেড়ে গেছে।
হরিপুর মহল্লার কৃষক মোহাম্মদ নাসিম জানান, ছয় বছর আগে তার জমিতে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এরপর থেকে প্রতি বছরই নলকূপের পানি ছাড়া আমনের আবাদ সম্ভব হচ্ছে না। আগে আষাঢ় শেষ হওয়ার আগেই অর্ধেকের বেশি জমিতে রোপণ শেষ হলেও এবার বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পরও ১০ শতাংশ জমির আবাদ হয়নি।
নাচোল উপজেলার কৃষক মনিরুল ইসলাম জানান, তিনি এ বছর ১০ বিঘা জমিতে আমনের আবাদ করছেন। এর মধ্যে ছয় বিঘায় পুরোপুরি সেচের পানি ব্যবহার করতে হয়েছে, আর বাকি চার বিঘায় সেচের পাশাপাশি কিছু বৃষ্টির পানিও মিলেছে। প্রতি বিঘায় সেচ বাবদ ৬২৫ টাকা, শ্রমিক বাবদ প্রায় ৪ হাজার টাকা এবং চারা রোপণসহ অন্যান্য কাজে আরও প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। একই এলাকার আরেক কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ধানের দাম বাড়ছে না। সরকার নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন। বিকল্প না থাকায় ধান চাষ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে গড় বৃষ্টিপাত ধারাবাহিকভাবে কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে আমনের আবাদে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, স্বাভাবিকের তুলনায় এ বছর বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় কৃষকদের সেচের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। জেলায় এবার ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক গবেষণা সাময়িকী ক্লিনার ওয়াটার-এ গত এপ্রিলে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে রাজশাহীতে পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩২ সালের মধ্যে জেলার অধিকাংশ এলাকায় মাঝারি থেকে তীব্র পানিসংকট দেখা দিতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিউল্লাহর নেতৃত্বে চার সদস্যের গবেষক দল ১৩টি উপজেলার তথ্য বিশ্লেষণ এবং ৩৮৫টি পরিবারের ওপর মাঠ জরিপ পরিচালনা করে।
গবেষণার তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৭৮-৯০ সময়ে রাজশাহীতে গড় মৌসুমি বৃষ্টিপাত ছিল ১ হাজার ৪০৬ মিলিমিটার। ২০১১-২৪ সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২৫ মিলিমিটারে। অর্থাৎ প্রায় ৪৮১ মিলিমিটার বা ৩৪ শতাংশ কমেছে। গবেষকদের হিসাবে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২ মিলিমিটার করে বৃষ্টিপাত কমছে।
গবেষণার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, শতাব্দীর শেষ হওয়ার আগেই রাজশাহীতে একাধিকবার ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হতে পারে। ২০৮৮ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৭ দশমিক ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। ২০১৮ সালে ৩৫ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার দিন ছিল ১৩টি। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৭৮ সালে তা প্রায় ১৯৫ দিনে পৌঁছাতে পারে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৩৫ বছরে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ৩ দশমিক ৭৮ মিটার নিচে নেমেছে। ১৯৯০ সালে যেখানে পানির স্তর ছিল ১১ দশমিক ৬৬ মিটার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১৫ দশমিক ৪৪ মিটারে পৌঁছেছে। কৃষি সেচে গভীর নলকূপের ব্যবহার এবং ব্যাপক ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিউল্লাহ বলেন, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জনসংখ্যা ও বসতি সম্প্রসারণের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এতে মাটির আর্দ্রতা ও সবুজায়ন কমছে এবং পানি মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তানোরসহ বিভিন্ন উপজেলায় তীব্র পানিসংকট দেখা দিয়েছে। যাদের সামর্থ্য রয়েছে তারা সাবমার্সিবল পাম্প ব্যবহার করছেন, আর দরিদ্র পরিবারগুলো অন্যের কাছ থেকে পানি কিনে ব্যবহার করছে। এভাবে পানি কিনতে প্রতি পরিবারকে মাসে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৮৩০ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় গবেষকরা পানিসাশ্রয়ী সেচপ্রযুক্তি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির কৃত্রিম পুনর্ভরণ, অনিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ এবং খরাসহিষ্ণু ফসলের আবাদ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি পুকুর, খাল ও বিল পুনঃখননের মাধ্যমে উপরিভাগের পানি সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন।
নাচোল উপজেলার বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক মো. মজিদুল ইসলাম বলেন, ৩০ বছর আগে এলাকার মানুষ পুকুরের পানি পান করতেন। এখন পুকুর-বিল ধ্বংসের মুখে পড়ায় খাওয়ার পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘পরিবর্তন’-এর প্রধান নির্বাহী রাশেদ ইবনে ওবায়েদ রিপন বলেন, স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন পরিকল্পনা না থাকায় সংকট আরও বেড়েছে। একসময় রাজশাহী শহরে প্রায় ৪ হাজার পুকুর ও জলাশয় থাকলেও বর্তমানে তা ২০০-এর নিচে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে রাজশাহী অঞ্চলের ৪২টি ইউনিয়নকে পানির জন্য অতিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম বলেন, আগের বছরের তুলনায় এবার বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়েছে। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, গাছ কাটার প্রবণতা এবং নদীর নাব্য কমে যাওয়ার ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে দেশে বৃষ্টিপাত কমছে।
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’, ৪০টি ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজাকে ‘উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’ এবং ৬৬টি ইউনিয়নের ১ হাজার ২৪০টি মৌজাকে ‘মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ বিষয়ে গত ২২ জানুয়ারি গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর থেকে আগামী ১০ বছরের জন্য এসব এলাকাকে পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। খাওয়ার প্রয়োজন ছাড়া অন্য কাজে আগামী দুই বছরের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, পানিসংকটাপন্ন ঘোষিত এলাকার আয়তন ২ হাজার ৭৮৭ বর্গকিলোমিটার এবং সেখানে প্রায় ২১ লাখ ৫ হাজার মানুষ পানিসংকটে রয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারে বৃষ্টির পানি ফিল্টার করে মাটির নিচে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানির সব উৎস কার্যকরভাবে ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
ছবি: বাংলা ট্রিবিউন
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুলাই ২০২৬
বর্ষাকাল চললেও বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠে এখনো দেখা মিলছে না বর্ষার স্বাভাবিক চিত্র। যে জমিগুলো এ সময় বৃষ্টির পানিতে ভরে থাকার কথা, সেগুলোর অনেকটিতেই গভীর নলকূপের সেচের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে আমন মৌসুমে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
একসময় বর্ষার মেঘ কৃষকদের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলেও এখন সেই মৌসুমি বৃষ্টি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। গত পাঁচ দশকে রাজশাহী অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিপাত প্রায় ৩৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে তাপমাত্রা বেড়েছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নেমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, জীবিকা ও গ্রামীণ জনজীবনে।
কৃষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় আমন চাষ এখন আর শুধু বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল নয়। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার হোসেনপুর মৌজার মহাডাঙ্গা গ্রাম, গেরস্ত পৌর এলাকার হরিপুর মহল্লা এবং নাচোল উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর মৌজায় দেখা গেছে, কোথাও জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, কোথাও সেচের মাধ্যমে কাদা তৈরি করা হচ্ছে, আবার কোথাও চলছে আমনের চারা রোপণ। প্রায় সব ক্ষেত্রেই কৃষকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে সেচ ব্যয় বেড়ে গেছে।
হরিপুর মহল্লার কৃষক মোহাম্মদ নাসিম জানান, ছয় বছর আগে তার জমিতে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এরপর থেকে প্রতি বছরই নলকূপের পানি ছাড়া আমনের আবাদ সম্ভব হচ্ছে না। আগে আষাঢ় শেষ হওয়ার আগেই অর্ধেকের বেশি জমিতে রোপণ শেষ হলেও এবার বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পরও ১০ শতাংশ জমির আবাদ হয়নি।
নাচোল উপজেলার কৃষক মনিরুল ইসলাম জানান, তিনি এ বছর ১০ বিঘা জমিতে আমনের আবাদ করছেন। এর মধ্যে ছয় বিঘায় পুরোপুরি সেচের পানি ব্যবহার করতে হয়েছে, আর বাকি চার বিঘায় সেচের পাশাপাশি কিছু বৃষ্টির পানিও মিলেছে। প্রতি বিঘায় সেচ বাবদ ৬২৫ টাকা, শ্রমিক বাবদ প্রায় ৪ হাজার টাকা এবং চারা রোপণসহ অন্যান্য কাজে আরও প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। একই এলাকার আরেক কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ধানের দাম বাড়ছে না। সরকার নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন। বিকল্প না থাকায় ধান চাষ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে গড় বৃষ্টিপাত ধারাবাহিকভাবে কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে আমনের আবাদে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, স্বাভাবিকের তুলনায় এ বছর বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় কৃষকদের সেচের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। জেলায় এবার ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক গবেষণা সাময়িকী ক্লিনার ওয়াটার-এ গত এপ্রিলে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে রাজশাহীতে পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩২ সালের মধ্যে জেলার অধিকাংশ এলাকায় মাঝারি থেকে তীব্র পানিসংকট দেখা দিতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিউল্লাহর নেতৃত্বে চার সদস্যের গবেষক দল ১৩টি উপজেলার তথ্য বিশ্লেষণ এবং ৩৮৫টি পরিবারের ওপর মাঠ জরিপ পরিচালনা করে।
গবেষণার তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৭৮-৯০ সময়ে রাজশাহীতে গড় মৌসুমি বৃষ্টিপাত ছিল ১ হাজার ৪০৬ মিলিমিটার। ২০১১-২৪ সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২৫ মিলিমিটারে। অর্থাৎ প্রায় ৪৮১ মিলিমিটার বা ৩৪ শতাংশ কমেছে। গবেষকদের হিসাবে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২ মিলিমিটার করে বৃষ্টিপাত কমছে।
গবেষণার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, শতাব্দীর শেষ হওয়ার আগেই রাজশাহীতে একাধিকবার ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হতে পারে। ২০৮৮ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৭ দশমিক ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। ২০১৮ সালে ৩৫ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার দিন ছিল ১৩টি। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৭৮ সালে তা প্রায় ১৯৫ দিনে পৌঁছাতে পারে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৩৫ বছরে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ৩ দশমিক ৭৮ মিটার নিচে নেমেছে। ১৯৯০ সালে যেখানে পানির স্তর ছিল ১১ দশমিক ৬৬ মিটার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১৫ দশমিক ৪৪ মিটারে পৌঁছেছে। কৃষি সেচে গভীর নলকূপের ব্যবহার এবং ব্যাপক ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিউল্লাহ বলেন, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জনসংখ্যা ও বসতি সম্প্রসারণের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এতে মাটির আর্দ্রতা ও সবুজায়ন কমছে এবং পানি মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তানোরসহ বিভিন্ন উপজেলায় তীব্র পানিসংকট দেখা দিয়েছে। যাদের সামর্থ্য রয়েছে তারা সাবমার্সিবল পাম্প ব্যবহার করছেন, আর দরিদ্র পরিবারগুলো অন্যের কাছ থেকে পানি কিনে ব্যবহার করছে। এভাবে পানি কিনতে প্রতি পরিবারকে মাসে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৮৩০ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় গবেষকরা পানিসাশ্রয়ী সেচপ্রযুক্তি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির কৃত্রিম পুনর্ভরণ, অনিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ এবং খরাসহিষ্ণু ফসলের আবাদ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি পুকুর, খাল ও বিল পুনঃখননের মাধ্যমে উপরিভাগের পানি সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন।
নাচোল উপজেলার বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক মো. মজিদুল ইসলাম বলেন, ৩০ বছর আগে এলাকার মানুষ পুকুরের পানি পান করতেন। এখন পুকুর-বিল ধ্বংসের মুখে পড়ায় খাওয়ার পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘পরিবর্তন’-এর প্রধান নির্বাহী রাশেদ ইবনে ওবায়েদ রিপন বলেন, স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন পরিকল্পনা না থাকায় সংকট আরও বেড়েছে। একসময় রাজশাহী শহরে প্রায় ৪ হাজার পুকুর ও জলাশয় থাকলেও বর্তমানে তা ২০০-এর নিচে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে রাজশাহী অঞ্চলের ৪২টি ইউনিয়নকে পানির জন্য অতিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম বলেন, আগের বছরের তুলনায় এবার বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়েছে। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, গাছ কাটার প্রবণতা এবং নদীর নাব্য কমে যাওয়ার ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে দেশে বৃষ্টিপাত কমছে।
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’, ৪০টি ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজাকে ‘উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’ এবং ৬৬টি ইউনিয়নের ১ হাজার ২৪০টি মৌজাকে ‘মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ বিষয়ে গত ২২ জানুয়ারি গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর থেকে আগামী ১০ বছরের জন্য এসব এলাকাকে পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। খাওয়ার প্রয়োজন ছাড়া অন্য কাজে আগামী দুই বছরের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, পানিসংকটাপন্ন ঘোষিত এলাকার আয়তন ২ হাজার ৭৮৭ বর্গকিলোমিটার এবং সেখানে প্রায় ২১ লাখ ৫ হাজার মানুষ পানিসংকটে রয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারে বৃষ্টির পানি ফিল্টার করে মাটির নিচে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানির সব উৎস কার্যকরভাবে ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
ছবি: বাংলা ট্রিবিউন
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

আপনার মতামত লিখুন