পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো সড়ক, মেট্রোরেল, রেল, মনোরেল ও নৌপথকে একটি সমন্বিত যোগাযোগ নেটওয়ার্কে যুক্ত করা। এর মাধ্যমে রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করার পাশাপাশি যানজট কমানো, ভ্রমণের সময় হ্রাস এবং গণপরিবহনের দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
পরিকল্পনা সম্পর্কে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান (সচিব) কালবেলাকে বলেন, ‘একজন যাত্রী টাঙ্গাইল থেকে বাসে এসে গাবতলীতে নামলেন। এরপর মেট্রোরেলে উঠে সহজেই কমলাপুরে যেতে পারবেন। একই যাত্রায় প্রয়োজন হলে মেট্রোরেলের সংযোগ ব্যবহার করে বিমানবন্দর কিংবা নৌপথেও যুক্ত হয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। সরকার এমন একটি সমন্বিত যাতায়াত ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে।’
তিনি জানান, ২০১৩ সালের জাতীয় সমন্বিত বহুমাধ্যমভিত্তিক পরিবহন নীতিমালা এবং ২০১৫ সালের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) বাস, মেট্রোরেল, রেল, নৌপথ ও বিমান পরিবহনকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ওই পরিকল্পনায় রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ২১টি মাল্টিমোডাল ও ইন্টারচেঞ্জ স্টেশন নির্মাণের কথা ছিল।
এক দশক পর ওই পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে জানান ডিটিসিএর পরিচালক। বর্তমানে নগর রেল পরিবহন কৌশলগত পরিকল্পনা (ইউআরএসটিপি) ২০২৬-২০৪৫ অনুযায়ী আটটি মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইন, দুটি বিআরটি করিডোর, তিনটি রিং রোড, আটটি রেডিয়াল সড়ক, ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ে এবং ২১টি ট্রান্সপোর্টেশন হাব নিয়ে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে কমলাপুর, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (এয়ারপোর্ট/কুড়িল) এবং গাবতলীকে প্রধান মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
এ-সংক্রান্ত নথি, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পরিকল্পনা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাজধানীতে মেট্রোরেল ব্যবস্থায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। মেট্রোরেল লাইন-৬ চালু রয়েছে, লাইন-১ নির্মাণাধীন এবং লাইন-৫-এর কাজও এগিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি কমলাপুর, বিমানবন্দর ও গাবতলীকে ঘিরে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব তৈরির পরিকল্পনাও এগোচ্ছে। তবে এসব প্রকল্পের মধ্যে যাত্রীকেন্দ্রিক পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
হালনাগাদ ইউআরএসটিপির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় দৈনিক যাতায়াতে গণপরিবহনের অংশ ২০১৪ সালের ২২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩ সালে ৮ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলারের ব্যবহার বেড়েছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়তে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরাপদ ইন্টারচেঞ্জ, পথচারীবান্ধব সংযোগ, সমন্বিত টিকিটিং ব্যবস্থা, পার্ক-অ্যান্ড-রাইড সুবিধা, ফিডার বাস, বাস রুট রেশনালাইজেশন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয়।
ডিটিসিএ জানিয়েছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী কমলাপুরকে জাতীয় রেলওয়ে ও মেট্রোরেলের প্রধান আন্তঃসংযোগ কেন্দ্র বা হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবহন সংস্থার অবকাঠামো ও সেবার মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে যাত্রীদের এক পরিবহন মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে সহজে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে, মেট্রোরেল লাইন-১, মেট্রোরেল লাইন-৪, মেট্রোরেল লাইন-৬ এবং ভবিষ্যতের অন্যান্য রেলভিত্তিক সংযোগের সমন্বয় করা হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক উন্নয়ন, অফিস, হোটেল এবং আধুনিক নগর সুবিধাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো শুরু হয়নি।
ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকাকে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এখানে মেট্রোরেল লাইন-১, মেট্রোরেল লাইন-৬, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য অন্যান্য গণপরিবহনের সংযোগের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে বিমানযাত্রী ও নগরবাসী একই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারবেন।
অন্যদিকে, গাবতলীকে পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান পরিবহন প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে এখানে মেট্রোরেল লাইন-২ (পরিকল্পিত), মেট্রোরেল লাইন-৫ (উত্তর), মেট্রোরেল লাইন-৫ (দক্ষিণ) এবং আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের মধ্যে সমন্বিত সংযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
বর্তমানে নির্মাণাধীন মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দর থেকে কুড়িল, নতুন বাজার, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। একই লাইনের পূর্বাংশ কুড়িল থেকে ৩০০ ফিট সড়ক হয়ে কাঞ্চন পর্যন্ত প্রায় ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার উড়ালপথে নির্মিত হবে।
একই পরিকল্পনায় প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি সম্ভাব্য মনোরেল করিডোরের প্রস্তাব রয়েছে। এসব করিডোরের প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। ডিমান্ড অ্যানালাইসিসের ভিত্তিতে ৩২টি প্রধান বাস রুট এবং ২৫টি ফিডার রুট নিয়ে একটি যৌক্তিক নেটওয়ার্কের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রকল্পের আওতায় রাজধানীতে ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব বাস্তবায়নের সঙ্গে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ), ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল), বাংলাদেশ রেলওয়ে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ, বিআরটিএ, রাজউক, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো যুক্ত রয়েছে। ফলে এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প নয়; বরং একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ।
আইন অনুযায়ী পুরো পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব ডিটিসিএর। তবে মেট্রোরেল লাইন (এমআরটি) বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। কমলাপুর নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ। ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার দায়িত্বে রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং বাস ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
এ কারণে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই সমন্বয় আরও শক্তিশালী করতে মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট অথরিটি আইন, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
ঢাকার সার্বিক পরিবহন পরিকল্পনার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে, যাতে বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের মধ্যে সমন্বিত সংযোগ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, যানজট নিরসনসহ সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে একটি স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহনে ভ্রমণের সুযোগ তৈরির ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারপ্রধানের সরাসরি হস্তক্ষেপে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে এগিয়ে চলছে। বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থার প্রতিটি উন্নয়ন কার্যক্রমেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে।
তবে মেট্রোরেল নির্মাণ করলেই সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হবে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক। তার মতে, বাস রুট রেশনালাইজেশন, ফিডার বাস, নিরাপদ পথচারী অবকাঠামো, সমন্বিত টিকিটিং, পার্ক-অ্যান্ড-রাইড এবং কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা কার্যকর না হলে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাবের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।
তিনি কালবেলাকে বলেন, এক দশক আগে যে সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার কিছু অংশ এখন দৃশ্যমান হয়েছে। তবে সেই পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো বাকি। আগামী দিনের সাফল্য নির্ভর করবে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বাস, মেট্রোরেল, রেল, নৌ ও বিমান পরিবহনকে একটি কার্যকর, যাত্রীবান্ধব ও সমন্বিত মাল্টিমোডাল নেটওয়ার্কে রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার যৌথ উদ্যোগ কতটা সফল হয়, তার ওপর।
গত ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত ডিটিসিএর বৈঠকও এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
সূত্র: কালবেলা।

শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ আগস্ট ২০২৬
পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো সড়ক, মেট্রোরেল, রেল, মনোরেল ও নৌপথকে একটি সমন্বিত যোগাযোগ নেটওয়ার্কে যুক্ত করা। এর মাধ্যমে রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করার পাশাপাশি যানজট কমানো, ভ্রমণের সময় হ্রাস এবং গণপরিবহনের দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
পরিকল্পনা সম্পর্কে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান (সচিব) কালবেলাকে বলেন, ‘একজন যাত্রী টাঙ্গাইল থেকে বাসে এসে গাবতলীতে নামলেন। এরপর মেট্রোরেলে উঠে সহজেই কমলাপুরে যেতে পারবেন। একই যাত্রায় প্রয়োজন হলে মেট্রোরেলের সংযোগ ব্যবহার করে বিমানবন্দর কিংবা নৌপথেও যুক্ত হয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। সরকার এমন একটি সমন্বিত যাতায়াত ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে।’
তিনি জানান, ২০১৩ সালের জাতীয় সমন্বিত বহুমাধ্যমভিত্তিক পরিবহন নীতিমালা এবং ২০১৫ সালের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) বাস, মেট্রোরেল, রেল, নৌপথ ও বিমান পরিবহনকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ওই পরিকল্পনায় রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ২১টি মাল্টিমোডাল ও ইন্টারচেঞ্জ স্টেশন নির্মাণের কথা ছিল।
এক দশক পর ওই পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে জানান ডিটিসিএর পরিচালক। বর্তমানে নগর রেল পরিবহন কৌশলগত পরিকল্পনা (ইউআরএসটিপি) ২০২৬-২০৪৫ অনুযায়ী আটটি মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইন, দুটি বিআরটি করিডোর, তিনটি রিং রোড, আটটি রেডিয়াল সড়ক, ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ে এবং ২১টি ট্রান্সপোর্টেশন হাব নিয়ে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে কমলাপুর, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (এয়ারপোর্ট/কুড়িল) এবং গাবতলীকে প্রধান মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
এ-সংক্রান্ত নথি, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পরিকল্পনা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাজধানীতে মেট্রোরেল ব্যবস্থায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। মেট্রোরেল লাইন-৬ চালু রয়েছে, লাইন-১ নির্মাণাধীন এবং লাইন-৫-এর কাজও এগিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি কমলাপুর, বিমানবন্দর ও গাবতলীকে ঘিরে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব তৈরির পরিকল্পনাও এগোচ্ছে। তবে এসব প্রকল্পের মধ্যে যাত্রীকেন্দ্রিক পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
হালনাগাদ ইউআরএসটিপির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় দৈনিক যাতায়াতে গণপরিবহনের অংশ ২০১৪ সালের ২২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩ সালে ৮ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলারের ব্যবহার বেড়েছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়তে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরাপদ ইন্টারচেঞ্জ, পথচারীবান্ধব সংযোগ, সমন্বিত টিকিটিং ব্যবস্থা, পার্ক-অ্যান্ড-রাইড সুবিধা, ফিডার বাস, বাস রুট রেশনালাইজেশন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয়।
ডিটিসিএ জানিয়েছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী কমলাপুরকে জাতীয় রেলওয়ে ও মেট্রোরেলের প্রধান আন্তঃসংযোগ কেন্দ্র বা হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবহন সংস্থার অবকাঠামো ও সেবার মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে যাত্রীদের এক পরিবহন মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে সহজে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে, মেট্রোরেল লাইন-১, মেট্রোরেল লাইন-৪, মেট্রোরেল লাইন-৬ এবং ভবিষ্যতের অন্যান্য রেলভিত্তিক সংযোগের সমন্বয় করা হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক উন্নয়ন, অফিস, হোটেল এবং আধুনিক নগর সুবিধাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো শুরু হয়নি।
ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকাকে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এখানে মেট্রোরেল লাইন-১, মেট্রোরেল লাইন-৬, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য অন্যান্য গণপরিবহনের সংযোগের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে বিমানযাত্রী ও নগরবাসী একই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারবেন।
অন্যদিকে, গাবতলীকে পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান পরিবহন প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে এখানে মেট্রোরেল লাইন-২ (পরিকল্পিত), মেট্রোরেল লাইন-৫ (উত্তর), মেট্রোরেল লাইন-৫ (দক্ষিণ) এবং আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের মধ্যে সমন্বিত সংযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
বর্তমানে নির্মাণাধীন মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দর থেকে কুড়িল, নতুন বাজার, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। একই লাইনের পূর্বাংশ কুড়িল থেকে ৩০০ ফিট সড়ক হয়ে কাঞ্চন পর্যন্ত প্রায় ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার উড়ালপথে নির্মিত হবে।
একই পরিকল্পনায় প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি সম্ভাব্য মনোরেল করিডোরের প্রস্তাব রয়েছে। এসব করিডোরের প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। ডিমান্ড অ্যানালাইসিসের ভিত্তিতে ৩২টি প্রধান বাস রুট এবং ২৫টি ফিডার রুট নিয়ে একটি যৌক্তিক নেটওয়ার্কের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রকল্পের আওতায় রাজধানীতে ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব বাস্তবায়নের সঙ্গে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ), ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল), বাংলাদেশ রেলওয়ে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ, বিআরটিএ, রাজউক, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো যুক্ত রয়েছে। ফলে এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প নয়; বরং একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ।
আইন অনুযায়ী পুরো পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব ডিটিসিএর। তবে মেট্রোরেল লাইন (এমআরটি) বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। কমলাপুর নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ। ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার দায়িত্বে রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং বাস ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
এ কারণে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই সমন্বয় আরও শক্তিশালী করতে মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট অথরিটি আইন, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
ঢাকার সার্বিক পরিবহন পরিকল্পনার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে, যাতে বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের মধ্যে সমন্বিত সংযোগ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, যানজট নিরসনসহ সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে একটি স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহনে ভ্রমণের সুযোগ তৈরির ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারপ্রধানের সরাসরি হস্তক্ষেপে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে এগিয়ে চলছে। বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থার প্রতিটি উন্নয়ন কার্যক্রমেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে।
তবে মেট্রোরেল নির্মাণ করলেই সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হবে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক। তার মতে, বাস রুট রেশনালাইজেশন, ফিডার বাস, নিরাপদ পথচারী অবকাঠামো, সমন্বিত টিকিটিং, পার্ক-অ্যান্ড-রাইড এবং কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা কার্যকর না হলে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাবের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।
তিনি কালবেলাকে বলেন, এক দশক আগে যে সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার কিছু অংশ এখন দৃশ্যমান হয়েছে। তবে সেই পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো বাকি। আগামী দিনের সাফল্য নির্ভর করবে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বাস, মেট্রোরেল, রেল, নৌ ও বিমান পরিবহনকে একটি কার্যকর, যাত্রীবান্ধব ও সমন্বিত মাল্টিমোডাল নেটওয়ার্কে রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার যৌথ উদ্যোগ কতটা সফল হয়, তার ওপর।
গত ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত ডিটিসিএর বৈঠকও এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
সূত্র: কালবেলা।

আপনার মতামত লিখুন