তবে দিল্লির এই আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত ভারত সফরে যাবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।
কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরে নিতে দিল্লি অত্যন্ত আগ্রহী। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত বাংলাদেশের বিষয়ে তার পুরোনো নীতি পুরোপুরি পরিবর্তন করেছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত একদিকে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলছে, অন্যদিকে বিভিন্ন বিষয়ে চাপ অব্যাহত রাখছে। অর্থাৎ দিল্লি একই সঙ্গে দুই ধরনের কৌশল অনুসরণ করছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ভূরাজনৈতিকভাবে ভারতকে পিছিয়ে দিচ্ছে। এ কারণেই নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে মোদি সরকার তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে চাইছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলোর সমাধানে এখনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর পানি বণ্টন ও সীমান্তসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান না হলে সেটি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
জুলাই বিপ্লবের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে অস্থির অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পরিবর্তে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য ভারত নানা তৎপরতা চালিয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর মোদি সরকার ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের কথা বলেছিল। কিন্তু বিএনপি সরকারের ছয় মাস পার হলেও দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।
আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে দিল্লি চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পুশইন, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা এবং সর্বোপরি দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখার মাধ্যমে তারেক রহমানের সরকারকে চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। আবার কখনো সম্পর্ক উন্নয়নের ইতিবাচক বার্তা দিয়ে বাংলাদেশকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
জাতীয় স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কৌশলগত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফর করেন। ওই সফরকেও ভারত স্বাভাবিকভাবে নেয়নি বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সর্বশেষ গত ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বাংলাদেশের আগাম সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে প্রথমবারের মতো প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এর পর বাংলাদেশ নজিরবিহীন কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে ভারতের বিষয়ে এত কঠোর ভাষায় বাংলাদেশকে বিবৃতি দিতে দেখা যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের ওই বিবৃতিতে দিল্লির সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়, জুলাই বিপ্লবের বার্ষিকীতে হাসিনাকে দিয়ে জুলাই শহীদদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অপমান করা হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলেও জানানো হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আর কোনো দেশের করদ রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।
বাংলাদেশের এমন কঠোর প্রতিক্রিয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, হাসিনার অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। একই সঙ্গে হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যকেও ভারত সরকার সমর্থন করে না বলে জানান তিনি।
দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ৫ আগস্ট হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত ভারতের জন্য বিপরীত ফল বয়ে এনেছে বলে দেশটির নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছে। বিশেষ করে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলেছে বলে সূত্রগুলোর দাবি।
ওই সংবাদ সম্মেলনে জয় অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় পাকিস্তানে পরিণত হয়েছে। দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে, যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তিনি বাংলাদেশে সরাসরি ভারতের হস্তক্ষেপের আহ্বানও জানান। তার বক্তব্যের পরই মূলত মোদি সরকারকে অবস্থান কিছুটা নরম করতে হয়েছে বলে দিল্লির সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে বলেও জানা গেছে। একটি পক্ষ মনে করছে, বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। অন্য পক্ষের মত, বাংলাদেশকে বিভিন্ন ইস্যুতে চাপের মধ্যে রাখা উচিত। ভারতীয় গণমাধ্যম ও থিংকট্যাংকগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশ প্রশ্নে একই ধরনের বিভাজন রয়েছে।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা এক সিনিয়র কূটনীতিক ভারতের বাংলাদেশ নীতি প্রসঙ্গে বলেন, ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামো অত্যন্ত জটিল। দেশটির পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে অন্তত তিনটি পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর বা সাউথ ব্লক, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের অধীনে কাজ করে বলেও তিনি জানান।
ওই কূটনীতিকের দাবি, ৫ আগস্ট হাসিনাকে ঘিরে যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের সমর্থন ছিল না। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর একটি অংশ এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির একটি অংশ হাসিনাকে গণমাধ্যমের সামনে নিয়ে আসে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, হাসিনাকে কিছুটা বাড়তি সুযোগ দিলে বাংলাদেশ কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায় তা পর্যবেক্ষণ করা। সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি ও রীভা গাঙ্গুলি দাসের মতো ব্যক্তিরাও এই অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে ওই কূটনীতিক দাবি করেন।
ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি শেখ হাসিনার অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছেন। ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হাসিনা বাংলাদেশে ফিরতে চান এবং সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতেই পারেন। তার মতে, এটি দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
বীণা সিক্রি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে তিনি কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি। অথচ নির্বাচনের আগে তিনি ভারতকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে প্রথম বিদেশ সফরে দিল্লি যাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি চীন সফর করেন।
তারেক রহমান ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবেন বলে জানিয়েছিলেন—এমন দাবিও করেন বীণা সিক্রি। তার মতে, সেই প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, তারেক রহমানের তুলনায় তার মা খালেদা জিয়া অনেক বেশি সহনশীল ছিলেন।
অন্যদিকে সাবেক হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাসও শেখ হাসিনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হাসিনা ভারতের পরীক্ষিত বন্ধু। তার মতে, তিনি ভারতে বসে রাজনীতি করছেন না। বরং তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করে রাজনীতি করতেন এবং সেখান থেকেই পুরো দল পরিচালনা করেছেন।
রীভা গাঙ্গুলি দাসের দাবি, ভারত এখনো হাসিনাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই বিবেচনা করে। তার ভাষ্য, হাসিনা ভারতে পালিয়ে আসেননি; বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তার নিরাপত্তার জন্য তাকে দিল্লিতে রেখে গেছে।
তবে ভারতের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছে, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে হাসিনা এখন একটি বড় বাধা। বিশেষ করে ৫ আগস্টের ঘটনার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা না গেলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারত বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে।
ভারতের মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমেও হাসিনার চেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার এক নিবন্ধে বলেন, ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়াদিল্লির জন্য বড় কৌশলগত ধাক্কা। তবে বর্তমান কূটনৈতিক উত্তেজনা দূর করে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তার মতে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ভবিষ্যৎ অবস্থান বা সিদ্ধান্ত তার নিজস্ব বিষয়। কিন্তু ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে তাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির যোগাযোগ আরও জটিল হবে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে এ সম্পর্ককে জিম্মি করা উচিত নয় বলেও তিনি মত দেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি সম্পাদকীয়তেও বলা হয়েছে, হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তবে সেই আশ্রয়স্থলকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মঞ্চে পরিণত করা সমস্যার সৃষ্টি করছে। ব্যক্তি হাসিনা সম্মানিত অতিথি হিসেবে ভারতে থাকলেও একজন ব্যক্তির স্বার্থের কারণে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে জটিল করা উচিত নয় বলে সম্পাদকীয়তে মত দেওয়া হয়েছে।
দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, ৫ আগস্টের পর ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। উত্তেজনা কমিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৯ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। পরদিন ১০ আগস্ট তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সপরিবারে দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লি নেওয়ার আগ্রহের কথা জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানকে পাঠানো নরেন্দ্র মোদির চিঠিতেও ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানান মোদি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক পদস্থ কর্মকর্তা জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের উপযোগী পরিবেশ ভারতকেই তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা এবং শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রেও ভারত সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ১০ আগস্ট সন্ধ্যায় দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লিতে ফিরে যান। সেখানে গিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন বলে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দীনেশ ত্রিবেদী নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে নির্দেশনা চেয়েছেন। শুধু কূটনীতিক ও ‘ডিপস্টেট’-এর উদ্যোগে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না বলেও তিনি মোদিকে জানিয়েছেন। সম্পর্ক উন্নয়নে রাজনৈতিক উদ্যোগ জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লিতে থাকা অবস্থাতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন না—ঢাকার পক্ষ থেকে এমন সিদ্ধান্ত অনানুষ্ঠানিকভাবে দিল্লিকে জানানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এখন দ্বিপক্ষীয় সফরের বিষয়টি সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, ভারত সফর নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দুই দেশের আলোচনার ভিত্তিতে উভয়ের জন্য সুবিধাজনক সময়ে সফরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভারত সরকার চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লি নিতে চাইছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। দিল্লির এই হঠাৎ আগ্রহ নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে দিল্লির মতো গুরুত্বপূর্ণ সফরের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামানের মতে, এই মুহূর্তে দ্রুত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে নেওয়া মূলত দিল্লির ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের স্বার্থ এখানে কতটা রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী সফরে গেলে সব সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা দিয়ে দিল্লি ঢাকাকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব আরও এগিয়ে নেওয়ার সময়। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তার মতে, ভারত তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিয়ে তিস্তা প্রকল্প কিংবা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আপত্তি জানাতে পারে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেই আপত্তি গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে ব্ল্যাকমেইলসহ বিভিন্ন ধরনের চাপ বাড়তে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
অধ্যাপক শহীদুজ্জামান বলেন, তার বিবেচনায় এখনই প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের উপযুক্ত সময় নয়। প্রধানমন্ত্রীকে আরও সময় নেওয়া উচিত। ভারতকে আগে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। বাংলাদেশের নিরাপত্তার স্বার্থে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান কিংবা তুরস্ক—যে দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশ অংশীদারত্ব গড়ে তুলুক না কেন, তাতে ভারতের আপত্তি থাকবে না—এমন ঘোষণা প্রকাশ্যে দিতে হবে।
একই সঙ্গে পানি বণ্টন, পুশইন, সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর সমাধানে ভারতের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীও প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লি সফরে নেওয়ার ভারতীয় তৎপরতা নিয়ে সতর্ক করেছেন। তার মতে, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতাকে ভারত এখনো পুরোপুরি মেনে নেয়নি। ভারতকে আস্থায় নেওয়ার মতো কার্যকর কোনো পদক্ষেপও এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। তার ভাষায়, ভারতের দূত বিভিন্ন ইতিবাচক কথা বললেও বাস্তবে সেভাবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আগের দিনই সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে একজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। একদিকে ভারত সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলছে, অন্যদিকে হাসিনা ইস্যু ব্যবহার করছে। এভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, শুধু ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজনকে ফেরত দেওয়া কিংবা হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ দুই দেশের অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধানেও ভারতকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশি জেনারেলসহ ভারতে পালিয়ে থাকা অন্যদেরও ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
তার মতে, ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বর্তমান সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু ভারতের আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গেলে সেটি রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর উপযুক্ত নয়।
সূত্র: আমার দেশ

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬
তবে দিল্লির এই আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত ভারত সফরে যাবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।
কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরে নিতে দিল্লি অত্যন্ত আগ্রহী। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত বাংলাদেশের বিষয়ে তার পুরোনো নীতি পুরোপুরি পরিবর্তন করেছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত একদিকে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলছে, অন্যদিকে বিভিন্ন বিষয়ে চাপ অব্যাহত রাখছে। অর্থাৎ দিল্লি একই সঙ্গে দুই ধরনের কৌশল অনুসরণ করছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ভূরাজনৈতিকভাবে ভারতকে পিছিয়ে দিচ্ছে। এ কারণেই নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে মোদি সরকার তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে চাইছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলোর সমাধানে এখনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর পানি বণ্টন ও সীমান্তসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান না হলে সেটি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
জুলাই বিপ্লবের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে অস্থির অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পরিবর্তে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য ভারত নানা তৎপরতা চালিয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর মোদি সরকার ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের কথা বলেছিল। কিন্তু বিএনপি সরকারের ছয় মাস পার হলেও দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।
আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে দিল্লি চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পুশইন, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা এবং সর্বোপরি দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখার মাধ্যমে তারেক রহমানের সরকারকে চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। আবার কখনো সম্পর্ক উন্নয়নের ইতিবাচক বার্তা দিয়ে বাংলাদেশকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
জাতীয় স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কৌশলগত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফর করেন। ওই সফরকেও ভারত স্বাভাবিকভাবে নেয়নি বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সর্বশেষ গত ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বাংলাদেশের আগাম সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে প্রথমবারের মতো প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এর পর বাংলাদেশ নজিরবিহীন কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে ভারতের বিষয়ে এত কঠোর ভাষায় বাংলাদেশকে বিবৃতি দিতে দেখা যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের ওই বিবৃতিতে দিল্লির সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়, জুলাই বিপ্লবের বার্ষিকীতে হাসিনাকে দিয়ে জুলাই শহীদদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অপমান করা হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলেও জানানো হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আর কোনো দেশের করদ রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।
বাংলাদেশের এমন কঠোর প্রতিক্রিয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, হাসিনার অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। একই সঙ্গে হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যকেও ভারত সরকার সমর্থন করে না বলে জানান তিনি।
দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ৫ আগস্ট হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত ভারতের জন্য বিপরীত ফল বয়ে এনেছে বলে দেশটির নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছে। বিশেষ করে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলেছে বলে সূত্রগুলোর দাবি।
ওই সংবাদ সম্মেলনে জয় অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় পাকিস্তানে পরিণত হয়েছে। দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে, যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তিনি বাংলাদেশে সরাসরি ভারতের হস্তক্ষেপের আহ্বানও জানান। তার বক্তব্যের পরই মূলত মোদি সরকারকে অবস্থান কিছুটা নরম করতে হয়েছে বলে দিল্লির সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে বলেও জানা গেছে। একটি পক্ষ মনে করছে, বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। অন্য পক্ষের মত, বাংলাদেশকে বিভিন্ন ইস্যুতে চাপের মধ্যে রাখা উচিত। ভারতীয় গণমাধ্যম ও থিংকট্যাংকগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশ প্রশ্নে একই ধরনের বিভাজন রয়েছে।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা এক সিনিয়র কূটনীতিক ভারতের বাংলাদেশ নীতি প্রসঙ্গে বলেন, ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামো অত্যন্ত জটিল। দেশটির পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে অন্তত তিনটি পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর বা সাউথ ব্লক, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের অধীনে কাজ করে বলেও তিনি জানান।
ওই কূটনীতিকের দাবি, ৫ আগস্ট হাসিনাকে ঘিরে যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের সমর্থন ছিল না। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর একটি অংশ এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির একটি অংশ হাসিনাকে গণমাধ্যমের সামনে নিয়ে আসে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, হাসিনাকে কিছুটা বাড়তি সুযোগ দিলে বাংলাদেশ কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায় তা পর্যবেক্ষণ করা। সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি ও রীভা গাঙ্গুলি দাসের মতো ব্যক্তিরাও এই অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে ওই কূটনীতিক দাবি করেন।
ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি শেখ হাসিনার অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছেন। ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হাসিনা বাংলাদেশে ফিরতে চান এবং সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতেই পারেন। তার মতে, এটি দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
বীণা সিক্রি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে তিনি কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি। অথচ নির্বাচনের আগে তিনি ভারতকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে প্রথম বিদেশ সফরে দিল্লি যাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি চীন সফর করেন।
তারেক রহমান ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবেন বলে জানিয়েছিলেন—এমন দাবিও করেন বীণা সিক্রি। তার মতে, সেই প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, তারেক রহমানের তুলনায় তার মা খালেদা জিয়া অনেক বেশি সহনশীল ছিলেন।
অন্যদিকে সাবেক হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাসও শেখ হাসিনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হাসিনা ভারতের পরীক্ষিত বন্ধু। তার মতে, তিনি ভারতে বসে রাজনীতি করছেন না। বরং তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করে রাজনীতি করতেন এবং সেখান থেকেই পুরো দল পরিচালনা করেছেন।
রীভা গাঙ্গুলি দাসের দাবি, ভারত এখনো হাসিনাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই বিবেচনা করে। তার ভাষ্য, হাসিনা ভারতে পালিয়ে আসেননি; বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তার নিরাপত্তার জন্য তাকে দিল্লিতে রেখে গেছে।
তবে ভারতের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছে, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে হাসিনা এখন একটি বড় বাধা। বিশেষ করে ৫ আগস্টের ঘটনার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা না গেলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারত বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে।
ভারতের মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমেও হাসিনার চেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার এক নিবন্ধে বলেন, ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়াদিল্লির জন্য বড় কৌশলগত ধাক্কা। তবে বর্তমান কূটনৈতিক উত্তেজনা দূর করে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তার মতে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ভবিষ্যৎ অবস্থান বা সিদ্ধান্ত তার নিজস্ব বিষয়। কিন্তু ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে তাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির যোগাযোগ আরও জটিল হবে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে এ সম্পর্ককে জিম্মি করা উচিত নয় বলেও তিনি মত দেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি সম্পাদকীয়তেও বলা হয়েছে, হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তবে সেই আশ্রয়স্থলকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মঞ্চে পরিণত করা সমস্যার সৃষ্টি করছে। ব্যক্তি হাসিনা সম্মানিত অতিথি হিসেবে ভারতে থাকলেও একজন ব্যক্তির স্বার্থের কারণে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে জটিল করা উচিত নয় বলে সম্পাদকীয়তে মত দেওয়া হয়েছে।
দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, ৫ আগস্টের পর ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। উত্তেজনা কমিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৯ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। পরদিন ১০ আগস্ট তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সপরিবারে দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লি নেওয়ার আগ্রহের কথা জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানকে পাঠানো নরেন্দ্র মোদির চিঠিতেও ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানান মোদি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক পদস্থ কর্মকর্তা জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের উপযোগী পরিবেশ ভারতকেই তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা এবং শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রেও ভারত সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ১০ আগস্ট সন্ধ্যায় দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লিতে ফিরে যান। সেখানে গিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন বলে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দীনেশ ত্রিবেদী নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে নির্দেশনা চেয়েছেন। শুধু কূটনীতিক ও ‘ডিপস্টেট’-এর উদ্যোগে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না বলেও তিনি মোদিকে জানিয়েছেন। সম্পর্ক উন্নয়নে রাজনৈতিক উদ্যোগ জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লিতে থাকা অবস্থাতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন না—ঢাকার পক্ষ থেকে এমন সিদ্ধান্ত অনানুষ্ঠানিকভাবে দিল্লিকে জানানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এখন দ্বিপক্ষীয় সফরের বিষয়টি সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, ভারত সফর নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দুই দেশের আলোচনার ভিত্তিতে উভয়ের জন্য সুবিধাজনক সময়ে সফরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভারত সরকার চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লি নিতে চাইছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। দিল্লির এই হঠাৎ আগ্রহ নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে দিল্লির মতো গুরুত্বপূর্ণ সফরের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামানের মতে, এই মুহূর্তে দ্রুত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে নেওয়া মূলত দিল্লির ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের স্বার্থ এখানে কতটা রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী সফরে গেলে সব সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা দিয়ে দিল্লি ঢাকাকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব আরও এগিয়ে নেওয়ার সময়। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তার মতে, ভারত তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিয়ে তিস্তা প্রকল্প কিংবা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আপত্তি জানাতে পারে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেই আপত্তি গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে ব্ল্যাকমেইলসহ বিভিন্ন ধরনের চাপ বাড়তে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
অধ্যাপক শহীদুজ্জামান বলেন, তার বিবেচনায় এখনই প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের উপযুক্ত সময় নয়। প্রধানমন্ত্রীকে আরও সময় নেওয়া উচিত। ভারতকে আগে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। বাংলাদেশের নিরাপত্তার স্বার্থে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান কিংবা তুরস্ক—যে দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশ অংশীদারত্ব গড়ে তুলুক না কেন, তাতে ভারতের আপত্তি থাকবে না—এমন ঘোষণা প্রকাশ্যে দিতে হবে।
একই সঙ্গে পানি বণ্টন, পুশইন, সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর সমাধানে ভারতের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীও প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লি সফরে নেওয়ার ভারতীয় তৎপরতা নিয়ে সতর্ক করেছেন। তার মতে, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতাকে ভারত এখনো পুরোপুরি মেনে নেয়নি। ভারতকে আস্থায় নেওয়ার মতো কার্যকর কোনো পদক্ষেপও এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। তার ভাষায়, ভারতের দূত বিভিন্ন ইতিবাচক কথা বললেও বাস্তবে সেভাবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আগের দিনই সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে একজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। একদিকে ভারত সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলছে, অন্যদিকে হাসিনা ইস্যু ব্যবহার করছে। এভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, শুধু ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজনকে ফেরত দেওয়া কিংবা হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ দুই দেশের অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধানেও ভারতকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশি জেনারেলসহ ভারতে পালিয়ে থাকা অন্যদেরও ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
তার মতে, ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বর্তমান সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু ভারতের আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গেলে সেটি রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর উপযুক্ত নয়।
সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন