ঢাকা    শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

ধর্ম

নবীজির জীবনে নান্দনিকতা ও সংস্কৃতিচর্চা

নবীজির জীবনে নান্দনিকতা ও সংস্কৃতিচর্চা
নবীজির জীবনে নান্দনিকতা ও সংস্কৃতিচর্চা

অনেকের ধারণা, ধর্ম পালন মানেই হাসি-আনন্দ, শিল্প-সাহিত্য কিংবা নান্দনিকতা থেকে দূরে সরে থাকা। কিন্তু সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মহামানব রাসুল (সা.)-এর জীবন পর্যালোচনা করলে ভিন্ন একটি চিত্র পাওয়া যায়। তাঁর জীবন শুধু নামাজ-রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; রসবোধ, সৌন্দর্যবোধ ও সুস্থ সংস্কৃতিরও সুন্দর সমন্বয় ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবনে।

রাসুল (সা.) অট্টহাসি হাসতেন না, তবে তাঁর মুখে প্রায়ই কোমল হাসি দেখা যেত। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে হারেস (রা.) বলেছেন, তিনি নবীজি (সা.)-এর চেয়ে বেশি মুচকি হাসতে আর কাউকে দেখেননি। (তিরমিজি)

একবার এক বৃদ্ধা রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে জান্নাতে যাওয়ার জন্য দোয়া করতে বললেন। রাসুল (সা.) রসিকতা করে বললেন, কোনো বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবেন না। এতে বৃদ্ধা কাঁদতে শুরু করেন। পরে রাসুল (সা.) হাসতে হাসতে ব্যাখ্যা করেন, বৃদ্ধ অবস্থায় কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবেন না; আল্লাহ তাদের তরুণীরূপে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (শামায়েলে তিরমিজি)

অন্য এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে আরোহণের জন্য একটি বাহন চাইলেন। তিনি বললেন, তাকে একটি উটের বাচ্চা দেওয়া হবে। লোকটি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন, উটের বাচ্চা দিয়ে কী করবেন, সেটি তো তার ভার বহন করতে পারবে না। তখন রাসুল (সা.) হেসে বলেন, সব উটই তো কোনো না কোনো উটের বাচ্চা। (সুনানে আবু দাউদ)

রাসুল (সা.)-এর রসবোধের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি কখনো রসিকতা করতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিতেন না।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিপাটি ও সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষ। একবার তিনি বলেন, যার অন্তরে অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তখন এক সাহাবি প্রশ্ন করেন, মানুষ তো সুন্দর পোশাক পরতে পছন্দ করে, এটিও কি অহংকার? জবাবে রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন। সুন্দর পোশাক পরা অহংকার নয়; অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা। (সহিহ মুসলিম)

রাসুল (সা.) সুগন্ধি পছন্দ করতেন। তাঁর চুল ও দাড়িও থাকত পরিপাটি। সফরে যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে চিরুনি, আয়না ও মেসওয়াক থাকত। এসব বিষয় থেকে পরিপাটি ও সুন্দর থাকার প্রতি ইসলামের গুরুত্বের দিকটি বোঝা যায়।

সুস্থ শিল্প-সাহিত্যের প্রতিও ইসলামের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ রাসুল (সা.)-এর জীবনেই পাওয়া যায়। তিনি কবিতা ও ভাষার সৌন্দর্যের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। শব্দের বিন্যাস ও ভাষার অলংকার তাঁকে আকৃষ্ট করত। তিনি বলেছেন, কিছু বক্তব্যে এমন আকর্ষণ রয়েছে, যার প্রভাব জাদুর মতো। (বুখারি)

সাহাবি হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন কবি। কাফেররা কবিতার মাধ্যমে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালালে তিনি কবিতার মাধ্যমেই তার জবাব দিতেন। রাসুল (সা.) সাহিত্যের প্রতি সম্মান দেখিয়ে কবিতা আবৃত্তির জন্য মসজিদে নববিতে একটি বিশেষ মিম্বরও তৈরি করে দিয়েছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ)

ইসলামপূর্ব সময়ের কবিদের মধ্যে যাদের কবিতায় নীতিবোধ ও শিক্ষণীয় বক্তব্য থাকত, রাসুল (সা.) সেসব কবিতাও মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।

ধর্মীয় সীমারেখার মধ্যে থেকে নির্মল বিনোদনের সুযোগও রাসুল (সা.)-এর জীবনে দেখা যায়। ঈদের দিন মদিনায় উৎসবের পরিবেশ থাকত। এক ঈদের দিনে মসজিদে নববির প্রাঙ্গণে একদল যুবক বল্লম দিয়ে সামরিক কৌশল প্রদর্শন করছিল। রাসুল (সা.) আয়েশা (রা.)-কে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে সেই খেলা দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। (বুখারি)

পারিবারিক জীবনেও তিনি বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন। স্ত্রী আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তিনি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। এতে তাঁর দাম্পত্য জীবনের একটি আনন্দময় ও সুন্দর দিক ফুটে ওঠে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন থেকে বোঝা যায়, ধর্ম পালনের অর্থ আনন্দ ও সৌন্দর্যকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া নয়; বরং আনন্দকে সুস্থ ও সুন্দর পথে পরিচালিত করা। তাঁর রসবোধ, নান্দনিকতা এবং শিল্প-সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ দেখায়, তিনি শুধু আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকই ছিলেন না, বরং ছিলেন পরিপূর্ণ ও প্রাণবন্ত একজন মহামানব।

সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬


নবীজির জীবনে নান্দনিকতা ও সংস্কৃতিচর্চা

প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬

featured Image

অনেকের ধারণা, ধর্ম পালন মানেই হাসি-আনন্দ, শিল্প-সাহিত্য কিংবা নান্দনিকতা থেকে দূরে সরে থাকা। কিন্তু সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মহামানব রাসুল (সা.)-এর জীবন পর্যালোচনা করলে ভিন্ন একটি চিত্র পাওয়া যায়। তাঁর জীবন শুধু নামাজ-রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; রসবোধ, সৌন্দর্যবোধ ও সুস্থ সংস্কৃতিরও সুন্দর সমন্বয় ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবনে।

রাসুল (সা.) অট্টহাসি হাসতেন না, তবে তাঁর মুখে প্রায়ই কোমল হাসি দেখা যেত। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে হারেস (রা.) বলেছেন, তিনি নবীজি (সা.)-এর চেয়ে বেশি মুচকি হাসতে আর কাউকে দেখেননি। (তিরমিজি)

একবার এক বৃদ্ধা রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে জান্নাতে যাওয়ার জন্য দোয়া করতে বললেন। রাসুল (সা.) রসিকতা করে বললেন, কোনো বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবেন না। এতে বৃদ্ধা কাঁদতে শুরু করেন। পরে রাসুল (সা.) হাসতে হাসতে ব্যাখ্যা করেন, বৃদ্ধ অবস্থায় কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবেন না; আল্লাহ তাদের তরুণীরূপে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (শামায়েলে তিরমিজি)

অন্য এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে আরোহণের জন্য একটি বাহন চাইলেন। তিনি বললেন, তাকে একটি উটের বাচ্চা দেওয়া হবে। লোকটি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন, উটের বাচ্চা দিয়ে কী করবেন, সেটি তো তার ভার বহন করতে পারবে না। তখন রাসুল (সা.) হেসে বলেন, সব উটই তো কোনো না কোনো উটের বাচ্চা। (সুনানে আবু দাউদ)

রাসুল (সা.)-এর রসবোধের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি কখনো রসিকতা করতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিতেন না।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিপাটি ও সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষ। একবার তিনি বলেন, যার অন্তরে অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তখন এক সাহাবি প্রশ্ন করেন, মানুষ তো সুন্দর পোশাক পরতে পছন্দ করে, এটিও কি অহংকার? জবাবে রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন। সুন্দর পোশাক পরা অহংকার নয়; অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা। (সহিহ মুসলিম)

রাসুল (সা.) সুগন্ধি পছন্দ করতেন। তাঁর চুল ও দাড়িও থাকত পরিপাটি। সফরে যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে চিরুনি, আয়না ও মেসওয়াক থাকত। এসব বিষয় থেকে পরিপাটি ও সুন্দর থাকার প্রতি ইসলামের গুরুত্বের দিকটি বোঝা যায়।

সুস্থ শিল্প-সাহিত্যের প্রতিও ইসলামের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ রাসুল (সা.)-এর জীবনেই পাওয়া যায়। তিনি কবিতা ও ভাষার সৌন্দর্যের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। শব্দের বিন্যাস ও ভাষার অলংকার তাঁকে আকৃষ্ট করত। তিনি বলেছেন, কিছু বক্তব্যে এমন আকর্ষণ রয়েছে, যার প্রভাব জাদুর মতো। (বুখারি)

সাহাবি হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন কবি। কাফেররা কবিতার মাধ্যমে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালালে তিনি কবিতার মাধ্যমেই তার জবাব দিতেন। রাসুল (সা.) সাহিত্যের প্রতি সম্মান দেখিয়ে কবিতা আবৃত্তির জন্য মসজিদে নববিতে একটি বিশেষ মিম্বরও তৈরি করে দিয়েছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ)

ইসলামপূর্ব সময়ের কবিদের মধ্যে যাদের কবিতায় নীতিবোধ ও শিক্ষণীয় বক্তব্য থাকত, রাসুল (সা.) সেসব কবিতাও মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।

ধর্মীয় সীমারেখার মধ্যে থেকে নির্মল বিনোদনের সুযোগও রাসুল (সা.)-এর জীবনে দেখা যায়। ঈদের দিন মদিনায় উৎসবের পরিবেশ থাকত। এক ঈদের দিনে মসজিদে নববির প্রাঙ্গণে একদল যুবক বল্লম দিয়ে সামরিক কৌশল প্রদর্শন করছিল। রাসুল (সা.) আয়েশা (রা.)-কে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে সেই খেলা দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। (বুখারি)

পারিবারিক জীবনেও তিনি বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন। স্ত্রী আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তিনি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। এতে তাঁর দাম্পত্য জীবনের একটি আনন্দময় ও সুন্দর দিক ফুটে ওঠে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন থেকে বোঝা যায়, ধর্ম পালনের অর্থ আনন্দ ও সৌন্দর্যকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া নয়; বরং আনন্দকে সুস্থ ও সুন্দর পথে পরিচালিত করা। তাঁর রসবোধ, নান্দনিকতা এবং শিল্প-সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ দেখায়, তিনি শুধু আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকই ছিলেন না, বরং ছিলেন পরিপূর্ণ ও প্রাণবন্ত একজন মহামানব।

সূত্র: আমার দেশ


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - মোঃ আতিকুল ইসলাম
প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক - মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয় 
সহ-সম্পাদক- মোঃ জাকারিয়া হোসেন
বার্তা সম্পাদক - মোঃ ওলিউল্লাহ

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
নবীজির জীবনে নান্দনিকতা ও সংস্কৃতিচর্চা
0:00 0:00
1.0x