এরপর ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করে নতুন জীবন শুরুর স্বপ্নও দেখছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই সৌদি আরবের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান এই তরুণ।
ঈদের আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার পরিবর্তে রবিউল ফিরেছেন কফিনবন্দী হয়ে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দিনগত রাত ১টা ৪০ মিনিটে তার কফিনবন্দী মরদেহ নিজ বাড়িতে পৌঁছায়।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর বাবা আসলাম হোসেনসহ স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন প্রতিবেশীরাও। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় মহিষডাঙ্গা ভাটোদারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে রবিউলের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
শেষবারের মতো রবিউলকে একনজর দেখতে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় বাবা-মা, বোন ও স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রবিউল আউয়াল হৃদয় ওই গ্রামের আসলাম হোসেনের ছেলে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সংসারের অভাব দূর করা, বন্ধক রাখা জমি ছাড়ানো এবং ঋণের বোঝা কমানোর উদ্দেশ্যে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ২০২১ সালে করোনাকালীন সময়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমান অবিবাহিত রবিউল ইসলাম। সেখানে একটি সোফা তৈরির কারখানায় কাজ করতেন তিনি।
গত ৯ আগস্ট রাতে ওই কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে রবিউল আউয়ালও ছিলেন। একই কারখানায় রবিউলের এক খালাতো ভাইও কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও রবিউল আর ফিরতে পারেননি।
এদিকে প্রবাসজীবন শেষে সামনে ঈদে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রবিউল। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শেষ কথোপকথনেও তিনি দ্রুত বাড়ি ফিরে ঋণ পরিশোধ এবং নতুন জীবন শুরুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে মর্মান্তিকভাবে। নতুন বরের সাজে নয়, কফিনবন্দী হয়েই বাড়ি ফিরলেন তিনি।
রবিউল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান। তার পাঠানো অর্থেই চলত পরিবারের সংসার। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা সেখানে ছুটে আসেন। শোকে বারবার মূর্ছা যান তার মা ও বোন। বাকরুদ্ধ বাবা আসলাম হোসেনের নীরব কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ। স্থানীয়দের মধ্যেও নেমে আসে গভীর শোক।
পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে এখন একটাই দাবি—রবিউলকে বিদেশে পাঠানোর জন্য নেওয়া বিপুল ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।
রবিউলের বাবা আসলাম হোসেন বলেন, ‘ছেলের পাঠানো অর্থের ওপরই আমাদের সংসার চলত। তাকে বিদেশ পাঠাতে গিয়ে এখনো অনেক টাকা ঋণ রয়েছে। কথা ছিল, ঋণ শোধ করে, বন্ধকী জমি ছাড়িয়ে ও বাড়িঘর ঠিক করে সামনে ঈদে দেশে এসে বিয়ে করবে। কিন্তু আমার সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’
খাজুরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন বলেন, ‘পরিবারটি সম্পূর্ণ অসহায়। উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তার মৃত্যুতে খাজুরাবাসী শোকাহত। এই কঠিন সময়ে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রবাসী কল্যাণ-সংশ্লিষ্টদের শোকাহত পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সৌদি আরবে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এই ইউনিয়নের আরও দুজন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের দিঘিরপাড় গ্রামের শামীম হোসেন এবং একই ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের সাব্বির হোসেন শুভ। রবিউল ইসলাম হৃদয়ের মরদেহ দেশে এনে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তবে নিহত শামীম হোসেন ও সাব্বির হোসেন শুভর মরদেহ এখনো দেশে ফেরেনি। তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনের শেষ দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।’
সূত্র: বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬
এরপর ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করে নতুন জীবন শুরুর স্বপ্নও দেখছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই সৌদি আরবের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান এই তরুণ।
ঈদের আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার পরিবর্তে রবিউল ফিরেছেন কফিনবন্দী হয়ে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দিনগত রাত ১টা ৪০ মিনিটে তার কফিনবন্দী মরদেহ নিজ বাড়িতে পৌঁছায়।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর বাবা আসলাম হোসেনসহ স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন প্রতিবেশীরাও। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় মহিষডাঙ্গা ভাটোদারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে রবিউলের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
শেষবারের মতো রবিউলকে একনজর দেখতে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় বাবা-মা, বোন ও স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রবিউল আউয়াল হৃদয় ওই গ্রামের আসলাম হোসেনের ছেলে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সংসারের অভাব দূর করা, বন্ধক রাখা জমি ছাড়ানো এবং ঋণের বোঝা কমানোর উদ্দেশ্যে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ২০২১ সালে করোনাকালীন সময়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমান অবিবাহিত রবিউল ইসলাম। সেখানে একটি সোফা তৈরির কারখানায় কাজ করতেন তিনি।
গত ৯ আগস্ট রাতে ওই কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে রবিউল আউয়ালও ছিলেন। একই কারখানায় রবিউলের এক খালাতো ভাইও কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও রবিউল আর ফিরতে পারেননি।
এদিকে প্রবাসজীবন শেষে সামনে ঈদে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রবিউল। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শেষ কথোপকথনেও তিনি দ্রুত বাড়ি ফিরে ঋণ পরিশোধ এবং নতুন জীবন শুরুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে মর্মান্তিকভাবে। নতুন বরের সাজে নয়, কফিনবন্দী হয়েই বাড়ি ফিরলেন তিনি।
রবিউল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান। তার পাঠানো অর্থেই চলত পরিবারের সংসার। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা সেখানে ছুটে আসেন। শোকে বারবার মূর্ছা যান তার মা ও বোন। বাকরুদ্ধ বাবা আসলাম হোসেনের নীরব কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ। স্থানীয়দের মধ্যেও নেমে আসে গভীর শোক।
পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে এখন একটাই দাবি—রবিউলকে বিদেশে পাঠানোর জন্য নেওয়া বিপুল ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।
রবিউলের বাবা আসলাম হোসেন বলেন, ‘ছেলের পাঠানো অর্থের ওপরই আমাদের সংসার চলত। তাকে বিদেশ পাঠাতে গিয়ে এখনো অনেক টাকা ঋণ রয়েছে। কথা ছিল, ঋণ শোধ করে, বন্ধকী জমি ছাড়িয়ে ও বাড়িঘর ঠিক করে সামনে ঈদে দেশে এসে বিয়ে করবে। কিন্তু আমার সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’
খাজুরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন বলেন, ‘পরিবারটি সম্পূর্ণ অসহায়। উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তার মৃত্যুতে খাজুরাবাসী শোকাহত। এই কঠিন সময়ে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রবাসী কল্যাণ-সংশ্লিষ্টদের শোকাহত পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সৌদি আরবে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এই ইউনিয়নের আরও দুজন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের দিঘিরপাড় গ্রামের শামীম হোসেন এবং একই ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের সাব্বির হোসেন শুভ। রবিউল ইসলাম হৃদয়ের মরদেহ দেশে এনে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তবে নিহত শামীম হোসেন ও সাব্বির হোসেন শুভর মরদেহ এখনো দেশে ফেরেনি। তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনের শেষ দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।’
সূত্র: বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর

আপনার মতামত লিখুন