ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

আন্তর্জাতিক

ছয় মাসের যুদ্ধেও ইরান অটুট, স্পষ্ট লক্ষ্য নেই যুক্তরাষ্ট্রের

ছয় মাসের যুদ্ধেও ইরান অটুট, স্পষ্ট লক্ষ্য নেই যুক্তরাষ্ট্রের
ছয় মাসের যুদ্ধেও ইরান অটুট, স্পষ্ট লক্ষ্য নেই যুক্তরাষ্ট্রের

দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান চালিয়েও ইরানকে নত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। ব্যাপক বিমান হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এরপরও ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। জনগণের মধ্যেও সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা যায়নি।

সামরিক সংঘাতের পর এখন ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। নতুন কৌশলের লক্ষ্য দেশটির অর্থনীতিকে আরও সংকটে ফেলা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।

তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই কৌশল থেকেও যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশিত ফল নাও পেতে পারে।

ছয় মাসের যুদ্ধের পর উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লক্ষ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। ওয়াশিংটন আসলে কী চায়—ইরান সরকারের পতন, তেহরানের আত্মসমর্পণ, নাকি আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমঝোতা—এ বিষয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো উত্তর নেই।

চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের মূল্যায়ন, ‘এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।’

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিভাগের প্রধান সুজান ম্যালোনিও যুদ্ধটিকে ব্যর্থ বলে মনে করেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষতির পরও ইরান আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী অবস্থায় বেরিয়ে এসেছে।

ট্রাম্পের ‘স্বাধীনতা’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কোথায়?

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার সময় ঘনিয়ে এসেছে।’

কিন্তু ছয় মাস পর তার প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। অর্থনীতিকে এমন পরিস্থিতিতে নেওয়াই এর উদ্দেশ্য, যাতে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

এখন পর্যন্ত অবশ্য সেই হিসাব কার্যকর হয়নি। বরং ইরানের নেতৃত্ব আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সামরিক কর্মকর্তাদের প্রভাব বেড়েছে। দেশটির শাসকেরা নিজেদের ক্ষমতায় টিকে থাকাকে দেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সঙ্গে এক করে দেখছেন। সাধারণ মানুষের ত্যাগকে তারা দেশপ্রেম এবং এমনকি শহীদের মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত করছেন। সামান্য ভিন্নমতকেও কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে।

ফলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানকে নত করার মার্কিন প্রচেষ্টা যেমন সফল হয়নি, তেমনি ট্রাম্পের ‘স্বাধীনতা’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও এখন অনেকটাই অর্থহীন বলে মনে হচ্ছে।

ব্যাপক বোমাবর্ষণের পরও অটুট ইরান

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আকস্মিক যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং তার কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হন। গুরুতর আহত হন তার ছেলে ও বর্তমান উত্তরসূরি সাইয়েদ মুজতবা খামেনি।

কয়েক সপ্তাহের তীব্র বিমান হামলায় ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। ক্ষতির মুখে পড়ে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও। কিন্তু এত ব্যাপক হামলার পরও ইরান সরকারের পতন ঘটেনি। নেতৃত্বের মধ্যেও বড় ধরনের বিভক্তি দেখা যায়নি। জনগণও সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেনি।

এর পরিবর্তে ইরানের সামরিক বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা পুনরায় সচল করে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালায়।

সবচেয়ে বড় পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হয় হরমুজ প্রণালিতে। একপর্যায়ে তেহরান প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়।

এই যুদ্ধে কয়েক হাজার ইরানি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। নিহতের সঠিক সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। এ ছাড়া ১৮ জন মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছেন।

সামরিক অভিযানের পর অর্থনৈতিক যুদ্ধ

সামরিক অভিযান এখন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশলে রূপ নিয়েছে। গত সোমবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট ব্যাসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করেন। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করা এবং দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে ধসের দিকে ঠেলে দেওয়া।

ব্যাসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ‘প্রতিটি শেষ বিকল্প’ বন্ধ করে দেওয়াই এ অভিযানের উদ্দেশ্য। তিনি জানান, অভিযানটি প্রতিদিন আরও জোরদার হবে এবং ইরান সরকার একা না হওয়া পর্যন্ত এটি চলবে।

তবে এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—এই কৌশলের পরিণতি কোথায়?

যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের সরকারকে উৎখাত করতে চায়? নাকি হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে তেহরানকে বাধ্য করাই তাদের উদ্দেশ্য? অথবা অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে বসাতে চায় ওয়াশিংটন?

লন্ডনভিত্তিক বোরস অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের গবেষক এসফানদিয়ার বাটমাঙ্গেলিজদ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য এখনো পরিষ্কার নয়।

তার মতে, কোনো দেশের আচরণে কী পরিবর্তন আনা প্রত্যাশিত, সেটি নির্দিষ্ট না করলে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সেই দেশকে বাধ্য করা সম্ভব নয়।

ইরানের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই তেহরান আত্মসমর্পণ করবে—এমন সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বরং এর ফলে পাল্টা হামলার আশঙ্কা বাড়তে পারে। ইরান পারস্য উপসাগরে জাহাজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা আরও বাড়াতে পারে। এর পরিণতিতে আবারও মার্কিন সামরিক অভিযানের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির গবেষক সিনা তুসির ভাষায়, ‘ইরানকে ক্ষতি করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের আছে। কিন্তু সেই ক্ষতি থেকে আত্মসমর্পণ বা সরকার পতনের পথটি স্পষ্ট নয়।’

সমঝোতার সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য স্পষ্ট না হওয়ায় তেহরানের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, ইরানের নেতৃত্ব জানতে চাইছে—যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের পতন চায়, আত্মসমর্পণ চায়, নাকি সমঝোতা করতে চায়?

ইরান মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধকে যুদ্ধেরই আরেকটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে নতুন মার্কিন কৌশলে দুটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

একদিকে অর্থনৈতিক চাপ ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন আবার সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। অন্যদিকে চাপ কার্যকর হলে ইরান মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙতে আরও বড় ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে।

ভায়েজের মতে, নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধের বিকল্প না হয়ে নতুন যুদ্ধের সূচনা ঘটাতে পারে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অবশ্য যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, ক্ষুধার্ত মানুষ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করতে পারে।

তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে তেহরানের অবস্থান এখনো কঠোর। ইরান অন্তত জুনের সমঝোতা স্মারকে ফিরে যেতে চায়। ওই সমঝোতায় ট্রাম্পও স্বাক্ষর করেছিলেন। তবে এখন তিনি সেই সমঝোতাকে ‘শেষ’ বলে ঘোষণা করেছেন।

হরমুজ প্রণালি নিয়েও ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের ব্যবস্থা মেনে নিতে প্রস্তুত, তার সঙ্গে তেহরানের অবস্থানের বড় পার্থক্য রয়েছে।

অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও ইরানের নেতৃত্ব হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নয়। একই সঙ্গে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির ওপরও তাদের আস্থা নেই। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কিংবা অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়েও তেহরানের গভীর সন্দেহ রয়েছে।

যুদ্ধ থেমে আছে, শান্তি আসেনি

বর্তমানে সংঘাত অনেকটা স্থবির অবস্থায় রয়েছে। দুই পক্ষ সরাসরি একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে না। হরমুজ প্রণালির দুই পাশের অবরোধও তুলনামূলকভাবে শিথিল হয়েছে। ফলে কিছু পরিমাণ তেল সরবরাহ হচ্ছে।

বিশ্লেষকেরা এই পরিস্থিতিকে একধরনের ‘ভুয়া যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছেন।

অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলের একটি সুবিধা হলো, এর প্রভাব ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং তা সহজে পরিমাপ করা যায় না। ফলে সংঘাতের উত্তেজনাও কিছুটা কম থাকে।

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এ পরিস্থিতি ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে। তারা বিজয় খুব কাছাকাছি—এমন একটি বার্তাও দিতে পারবে। তবে এই অচলাবস্থাই শেষ পর্যন্ত বড় বিপদ তৈরি করতে পারে।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এলি গেরানমায়েহ বলেন, হোয়াইট হাউসে এখন এমন ধারণা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে সমঝোতা করা সম্ভব নয়। তেহরানেও একই ধরনের ধারণা তৈরি হচ্ছে।

তার সতর্কতা, ‘এটি বিপজ্জনক সময়।’ কারণ দুই পক্ষই যদি মনে করে যে অপর পক্ষের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব নয়, তাহলে সংঘাত আবারও সামরিক পথে ফিরে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জেরেমি শাপিরোও প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প কেন দীর্ঘস্থায়ী এবং দেশের ভেতরে অজনপ্রিয় এই যুদ্ধ শেষ করার কোনো পথ বেছে নিচ্ছেন না।

তার মতে, আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি পরিস্থিতির ধারণা দিচ্ছে, যেন যুদ্ধ এখনো চলমান। অথচ তারা চাইলে যুদ্ধ জয়ের দাবি করতে পারত। অথবা স্বীকার করতে পারত যে তারা পরাজিত হয়েছে।

ছয় মাসের এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে—ইরানকে আঘাত করার সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে, কিন্তু দেশটিকে নত করার পথ এখনো স্পষ্ট নয়। আর এই যুদ্ধের অচলাবস্থার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে ইরানের সাধারণ মানুষকে।

সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


ছয় মাসের যুদ্ধেও ইরান অটুট, স্পষ্ট লক্ষ্য নেই যুক্তরাষ্ট্রের

প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান চালিয়েও ইরানকে নত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। ব্যাপক বিমান হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এরপরও ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। জনগণের মধ্যেও সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা যায়নি।

সামরিক সংঘাতের পর এখন ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। নতুন কৌশলের লক্ষ্য দেশটির অর্থনীতিকে আরও সংকটে ফেলা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।

তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই কৌশল থেকেও যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশিত ফল নাও পেতে পারে।

ছয় মাসের যুদ্ধের পর উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লক্ষ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। ওয়াশিংটন আসলে কী চায়—ইরান সরকারের পতন, তেহরানের আত্মসমর্পণ, নাকি আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমঝোতা—এ বিষয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো উত্তর নেই।

চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের মূল্যায়ন, ‘এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।’

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিভাগের প্রধান সুজান ম্যালোনিও যুদ্ধটিকে ব্যর্থ বলে মনে করেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষতির পরও ইরান আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী অবস্থায় বেরিয়ে এসেছে।

ট্রাম্পের ‘স্বাধীনতা’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কোথায়?

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার সময় ঘনিয়ে এসেছে।’

কিন্তু ছয় মাস পর তার প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। অর্থনীতিকে এমন পরিস্থিতিতে নেওয়াই এর উদ্দেশ্য, যাতে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

এখন পর্যন্ত অবশ্য সেই হিসাব কার্যকর হয়নি। বরং ইরানের নেতৃত্ব আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সামরিক কর্মকর্তাদের প্রভাব বেড়েছে। দেশটির শাসকেরা নিজেদের ক্ষমতায় টিকে থাকাকে দেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সঙ্গে এক করে দেখছেন। সাধারণ মানুষের ত্যাগকে তারা দেশপ্রেম এবং এমনকি শহীদের মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত করছেন। সামান্য ভিন্নমতকেও কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে।

ফলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানকে নত করার মার্কিন প্রচেষ্টা যেমন সফল হয়নি, তেমনি ট্রাম্পের ‘স্বাধীনতা’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও এখন অনেকটাই অর্থহীন বলে মনে হচ্ছে।

ব্যাপক বোমাবর্ষণের পরও অটুট ইরান

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আকস্মিক যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং তার কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হন। গুরুতর আহত হন তার ছেলে ও বর্তমান উত্তরসূরি সাইয়েদ মুজতবা খামেনি।

কয়েক সপ্তাহের তীব্র বিমান হামলায় ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। ক্ষতির মুখে পড়ে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও। কিন্তু এত ব্যাপক হামলার পরও ইরান সরকারের পতন ঘটেনি। নেতৃত্বের মধ্যেও বড় ধরনের বিভক্তি দেখা যায়নি। জনগণও সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেনি।

এর পরিবর্তে ইরানের সামরিক বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা পুনরায় সচল করে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালায়।

সবচেয়ে বড় পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হয় হরমুজ প্রণালিতে। একপর্যায়ে তেহরান প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়।

এই যুদ্ধে কয়েক হাজার ইরানি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। নিহতের সঠিক সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। এ ছাড়া ১৮ জন মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছেন।

সামরিক অভিযানের পর অর্থনৈতিক যুদ্ধ

সামরিক অভিযান এখন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশলে রূপ নিয়েছে। গত সোমবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট ব্যাসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করেন। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করা এবং দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে ধসের দিকে ঠেলে দেওয়া।

ব্যাসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ‘প্রতিটি শেষ বিকল্প’ বন্ধ করে দেওয়াই এ অভিযানের উদ্দেশ্য। তিনি জানান, অভিযানটি প্রতিদিন আরও জোরদার হবে এবং ইরান সরকার একা না হওয়া পর্যন্ত এটি চলবে।

তবে এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—এই কৌশলের পরিণতি কোথায়?

যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের সরকারকে উৎখাত করতে চায়? নাকি হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে তেহরানকে বাধ্য করাই তাদের উদ্দেশ্য? অথবা অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে বসাতে চায় ওয়াশিংটন?

লন্ডনভিত্তিক বোরস অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের গবেষক এসফানদিয়ার বাটমাঙ্গেলিজদ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য এখনো পরিষ্কার নয়।

তার মতে, কোনো দেশের আচরণে কী পরিবর্তন আনা প্রত্যাশিত, সেটি নির্দিষ্ট না করলে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সেই দেশকে বাধ্য করা সম্ভব নয়।

ইরানের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই তেহরান আত্মসমর্পণ করবে—এমন সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বরং এর ফলে পাল্টা হামলার আশঙ্কা বাড়তে পারে। ইরান পারস্য উপসাগরে জাহাজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা আরও বাড়াতে পারে। এর পরিণতিতে আবারও মার্কিন সামরিক অভিযানের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির গবেষক সিনা তুসির ভাষায়, ‘ইরানকে ক্ষতি করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের আছে। কিন্তু সেই ক্ষতি থেকে আত্মসমর্পণ বা সরকার পতনের পথটি স্পষ্ট নয়।’

সমঝোতার সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য স্পষ্ট না হওয়ায় তেহরানের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, ইরানের নেতৃত্ব জানতে চাইছে—যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের পতন চায়, আত্মসমর্পণ চায়, নাকি সমঝোতা করতে চায়?

ইরান মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধকে যুদ্ধেরই আরেকটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে নতুন মার্কিন কৌশলে দুটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

একদিকে অর্থনৈতিক চাপ ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন আবার সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। অন্যদিকে চাপ কার্যকর হলে ইরান মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙতে আরও বড় ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে।

ভায়েজের মতে, নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধের বিকল্প না হয়ে নতুন যুদ্ধের সূচনা ঘটাতে পারে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অবশ্য যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, ক্ষুধার্ত মানুষ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করতে পারে।

তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে তেহরানের অবস্থান এখনো কঠোর। ইরান অন্তত জুনের সমঝোতা স্মারকে ফিরে যেতে চায়। ওই সমঝোতায় ট্রাম্পও স্বাক্ষর করেছিলেন। তবে এখন তিনি সেই সমঝোতাকে ‘শেষ’ বলে ঘোষণা করেছেন।

হরমুজ প্রণালি নিয়েও ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের ব্যবস্থা মেনে নিতে প্রস্তুত, তার সঙ্গে তেহরানের অবস্থানের বড় পার্থক্য রয়েছে।

অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও ইরানের নেতৃত্ব হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নয়। একই সঙ্গে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির ওপরও তাদের আস্থা নেই। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কিংবা অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়েও তেহরানের গভীর সন্দেহ রয়েছে।

যুদ্ধ থেমে আছে, শান্তি আসেনি

বর্তমানে সংঘাত অনেকটা স্থবির অবস্থায় রয়েছে। দুই পক্ষ সরাসরি একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে না। হরমুজ প্রণালির দুই পাশের অবরোধও তুলনামূলকভাবে শিথিল হয়েছে। ফলে কিছু পরিমাণ তেল সরবরাহ হচ্ছে।

বিশ্লেষকেরা এই পরিস্থিতিকে একধরনের ‘ভুয়া যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছেন।

অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলের একটি সুবিধা হলো, এর প্রভাব ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং তা সহজে পরিমাপ করা যায় না। ফলে সংঘাতের উত্তেজনাও কিছুটা কম থাকে।

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এ পরিস্থিতি ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে। তারা বিজয় খুব কাছাকাছি—এমন একটি বার্তাও দিতে পারবে। তবে এই অচলাবস্থাই শেষ পর্যন্ত বড় বিপদ তৈরি করতে পারে।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এলি গেরানমায়েহ বলেন, হোয়াইট হাউসে এখন এমন ধারণা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে সমঝোতা করা সম্ভব নয়। তেহরানেও একই ধরনের ধারণা তৈরি হচ্ছে।

তার সতর্কতা, ‘এটি বিপজ্জনক সময়।’ কারণ দুই পক্ষই যদি মনে করে যে অপর পক্ষের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব নয়, তাহলে সংঘাত আবারও সামরিক পথে ফিরে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জেরেমি শাপিরোও প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প কেন দীর্ঘস্থায়ী এবং দেশের ভেতরে অজনপ্রিয় এই যুদ্ধ শেষ করার কোনো পথ বেছে নিচ্ছেন না।

তার মতে, আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি পরিস্থিতির ধারণা দিচ্ছে, যেন যুদ্ধ এখনো চলমান। অথচ তারা চাইলে যুদ্ধ জয়ের দাবি করতে পারত। অথবা স্বীকার করতে পারত যে তারা পরাজিত হয়েছে।

ছয় মাসের এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে—ইরানকে আঘাত করার সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে, কিন্তু দেশটিকে নত করার পথ এখনো স্পষ্ট নয়। আর এই যুদ্ধের অচলাবস্থার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে ইরানের সাধারণ মানুষকে।

সূত্র: আমার দেশ


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - মোঃ আতিকুল ইসলাম
প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক - মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয় 
সহ-সম্পাদক- মোঃ জাকারিয়া হোসেন
বার্তা সম্পাদক - মোঃ ওলিউল্লাহ

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ছয় মাসের যুদ্ধেও ইরান অটুট, স্পষ্ট লক্ষ্য নেই যুক্তরাষ্ট্রের
0:00 0:00
1.0x