ঢাকা    মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

রাজনীতি

মালয়েশিয়াসহ শ্রমবাজারের সব সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি জামায়াত আমিরের

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
মালয়েশিয়াসহ শ্রমবাজারের সব সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি জামায়াত আমিরের
মালয়েশিয়াসহ শ্রমবাজারের সব সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি জামায়াত আমিরের

মালয়েশিয়াসহ দেশের সব শ্রমবাজারে বিদ্যমান সিন্ডিকেট ব্যবস্থা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, শ্রমবাজারে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট ও সাধারণ শ্রমিকদের ওপর শোষণ-নির্যাতন মেনে নেওয়া হবে না। এমনকি সিন্ডিকেটের সঙ্গে নিজের ভাই জড়িত থাকলেও তাকেও বাদ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘সিন্ডিকেট ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির।

জামায়াত আমির বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। তবে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান যাতে বিশেষ সুবিধা নিতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ২৫টি মাস্টার এজেন্সির কয়েকটির পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও কী যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের নির্বাচন করা হয়েছে। এসব এজেন্সির ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২২ কোটি টাকা বিনিয়োগের যে তথ্য শোনা যাচ্ছে, তা সত্য হলে তিনি এর নিন্দা জানান।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে যে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা জড়িত নয়। একই সঙ্গে কোন মানদণ্ড অনুসরণ করে ২৫টি এজেন্সি নির্বাচন করা হয়েছে, সেটিও সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে এর আগে তিনবার সংকট তৈরি হয়ে বাজার বন্ধ হয়েছে। চালু হওয়ার পর আবারও যেন চতুর্থবার বন্ধ না হয়, সেটিই তাদের প্রত্যাশা। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য অপমানজনক।

জামায়াত আমির বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন ব্যক্তি ফ্যাসিস্ট আমলে মালয়েশিয়ায় একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। সেই সিন্ডিকেট এখনো কার্যকর রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আর কোনো ‘আমিন’-এর নাম শুনতে চান না। তার ভাষ্য, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান যদি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে, বাংলাদেশকেও তা করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার আদায়ের জন্য তারা আন্দোলন করেছেন। একইভাবে শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করার আন্দোলনও করবেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাদ দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রবাসীদের প্রতি অবিচার করা হবে এবং তারা তা মেনে নেবেন না। জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সাধারণ মানুষের বিদেশে কাজের প্রয়োজনে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সরকার যেন শ্রমিকদের শোষণের হাতিয়ার হিসেবে কোনো ব্যবস্থা ব্যবহার না করে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান যেভাবে সমঝোতা করবে, বাংলাদেশকেও একইভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, শ্রমবাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্যবাজারেও সিন্ডিকেট রয়েছে। সরকারকে এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুযোগ পেলে কোথাও সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব রাখা হবে না। প্রথমে সিন্ডিকেটে কোনো নেতা বা তাদের স্বজন জড়িত কি না, তা দেখা হবে এবং এরপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

মালয়েশিয়ার বাইরে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশের শ্রমবাজার নিয়ে সমস্যা রয়েছে বলে দাবি করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বৈধ ভিসাধারী বাংলাদেশের নাগরিকদের কেউ কেউ দুবাই ও আবুধাবি বিমানবন্দরে যাওয়ার পর ফেরত পাঠানো হচ্ছে এবং তাদের ভিসা অকার্যকর বলে জানানো হচ্ছে। তার মতে, এভাবে কর্মীদের ফিরিয়ে দেওয়া তাদের চাকরির অধিকারের পাশাপাশি দেশের জন্যও অপমানজনক।

তিনি বলেন, এসব সমস্যার সমাধান করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও সমস্যার সমাধান না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ করেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কিছু ব্যক্তি, দল ও গোষ্ঠী ঘুষ এবং মানুষের ওপর জুলুম ছাড়া চলতে পারে না। তবে দেশের মানুষ তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। অধিকার আদায়ে আন্দোলন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, গণভোটের বিষয়ে সরকার আহ্বান জানিয়ে এখন তা মানতে চাইছে না। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও পূরণ করা হচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন। স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার ও নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন করার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

প্রবাসীদের শুধু ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না মন্তব্য করে তিনি বলেন, তাদের অধিকার নিশ্চিত না করলে সেটি উপহাসের মতো হবে।

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন করার উদ্যোগের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এর মাধ্যমে মানুষের কথা বলার অধিকার সীমিত করার চেষ্টা হলে তারা এর বিরোধিতা করবেন। ন্যায্য ও সত্য কথা বলার ক্ষেত্রে কোনো আইনকে ভয় করবেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি জানান, বর্তমানে সাত দফা দাবিতে তাদের আন্দোলন চলছে। শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করার দাবিটি যুক্ত করে ভবিষ্যতে তা আট দফায় উন্নীত করা হবে। এসব দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।

জামায়াত আমির বলেন, তাদের রাজনীতি দেশ ও জনগণের জন্য। তারা উচ্ছৃঙ্খল বিরোধীদল হতে চান না। তবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে অনুগত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কথা বলবেন বলে জানান তিনি।

সিন্ডিকেটমুক্ত শ্রমবাজারের আন্দোলনে বায়রার সদস্যদেরও অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সবাই একসঙ্গে আন্দোলনে নামলে বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন ডা. শফিকুর রহমান। সরকার সংশোধন হয়ে সঠিক পথে এগোলে তাদের সাধুবাদ জানানোর কথাও বলেন তিনি। একই সঙ্গে জনগণের ওপর শোষণ চালিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি পরিবর্তনের কথা বলেন।

মূল প্রবন্ধে যা বলা হয়

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান নাগরিক দাতুশ্রী আমিন নূর, বায়রার সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন, সালমান এফ রহমান, সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক এমপি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ, সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদ, নিজাম হাজারী এবং সাবেক বিএনপি নেতা কাজী মফিজুর রহমানকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করেছিল।

তার দাবি, ওই সিন্ডিকেট ১০০টি সাব-এজেন্টের কাছ থেকে লাইসেন্সের নামে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। প্রতিটি শ্রমিকের কাছ থেকে সিন্ডিকেট ফি হিসেবে ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা এবং মেডিকেল ফি বাবদ ৩ হাজার টাকা নেওয়া হতো বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এর ফলে একজন শ্রমিকের বিদেশ যেতে ব্যয় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা নির্ধারিত হয় বলে দাবি করেন তিনি।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি দাবি করেন, ওই সিন্ডিকেটে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। দুদকের তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হলেও ৫১ জনকে ক্ষমা করা হয় এবং মূল হোতা হিসেবে উল্লেখ করা রুহুল আমিন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির আরও দাবি করেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী প্রত্যাশা পূরণ না করে সরকার আবারও ২৫টি এজেন্সিকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গঠনের চেষ্টা করছে। এর পেছনে দাতুশ্রী আমিন নূর ও রুহুল আমিন স্বপনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ৩৩৮টি এজেন্সির কথা বলা হলেও বাস্তবে ২৫টি এজেন্সি সিন্ডিকেটের মূল চালক হিসেবে কাজ করছে। বর্তমান সরকারের সঙ্গে এই সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। নতুন ২৫টি লাইসেন্সের নামে প্রায় ৪২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের দাবি করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এতে বিদেশ যেতে একজন শ্রমিকের ব্যয় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার এজেন্টভিত্তিক সিন্ডিকেট ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদ জানিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এ বিষয়ে নীরব থেকে ব্যবস্থাটিকে বৈধতা দিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ২৫টি এজেন্সির তালিকা, লাইসেন্স ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানান তিনি।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমবাজারের সিন্ডিকেটের বিষয়ে আলোচনা হলেও তা ভাঙার কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। তার দাবি, এর কারণ সরকারের একটি অংশ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধভাবে এই সিন্ডিকেট ভাঙা হবে।

সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা দুর্নীতি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করতে পারলে বিএনপি পড়ে যাবে। তার দাবি, বিএনপিতে এসব ছাড়া আর কিছু নেই।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, লেবার পার্টির চেয়ার মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ।

সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


মালয়েশিয়াসহ শ্রমবাজারের সব সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি জামায়াত আমিরের

প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

মালয়েশিয়াসহ দেশের সব শ্রমবাজারে বিদ্যমান সিন্ডিকেট ব্যবস্থা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, শ্রমবাজারে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট ও সাধারণ শ্রমিকদের ওপর শোষণ-নির্যাতন মেনে নেওয়া হবে না। এমনকি সিন্ডিকেটের সঙ্গে নিজের ভাই জড়িত থাকলেও তাকেও বাদ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘সিন্ডিকেট ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির।

জামায়াত আমির বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। তবে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান যাতে বিশেষ সুবিধা নিতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ২৫টি মাস্টার এজেন্সির কয়েকটির পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও কী যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের নির্বাচন করা হয়েছে। এসব এজেন্সির ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২২ কোটি টাকা বিনিয়োগের যে তথ্য শোনা যাচ্ছে, তা সত্য হলে তিনি এর নিন্দা জানান।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে যে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা জড়িত নয়। একই সঙ্গে কোন মানদণ্ড অনুসরণ করে ২৫টি এজেন্সি নির্বাচন করা হয়েছে, সেটিও সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে এর আগে তিনবার সংকট তৈরি হয়ে বাজার বন্ধ হয়েছে। চালু হওয়ার পর আবারও যেন চতুর্থবার বন্ধ না হয়, সেটিই তাদের প্রত্যাশা। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য অপমানজনক।

জামায়াত আমির বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন ব্যক্তি ফ্যাসিস্ট আমলে মালয়েশিয়ায় একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। সেই সিন্ডিকেট এখনো কার্যকর রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আর কোনো ‘আমিন’-এর নাম শুনতে চান না। তার ভাষ্য, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান যদি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে, বাংলাদেশকেও তা করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার আদায়ের জন্য তারা আন্দোলন করেছেন। একইভাবে শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করার আন্দোলনও করবেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাদ দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রবাসীদের প্রতি অবিচার করা হবে এবং তারা তা মেনে নেবেন না। জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সাধারণ মানুষের বিদেশে কাজের প্রয়োজনে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সরকার যেন শ্রমিকদের শোষণের হাতিয়ার হিসেবে কোনো ব্যবস্থা ব্যবহার না করে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান যেভাবে সমঝোতা করবে, বাংলাদেশকেও একইভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, শ্রমবাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্যবাজারেও সিন্ডিকেট রয়েছে। সরকারকে এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুযোগ পেলে কোথাও সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব রাখা হবে না। প্রথমে সিন্ডিকেটে কোনো নেতা বা তাদের স্বজন জড়িত কি না, তা দেখা হবে এবং এরপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

মালয়েশিয়ার বাইরে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশের শ্রমবাজার নিয়ে সমস্যা রয়েছে বলে দাবি করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বৈধ ভিসাধারী বাংলাদেশের নাগরিকদের কেউ কেউ দুবাই ও আবুধাবি বিমানবন্দরে যাওয়ার পর ফেরত পাঠানো হচ্ছে এবং তাদের ভিসা অকার্যকর বলে জানানো হচ্ছে। তার মতে, এভাবে কর্মীদের ফিরিয়ে দেওয়া তাদের চাকরির অধিকারের পাশাপাশি দেশের জন্যও অপমানজনক।

তিনি বলেন, এসব সমস্যার সমাধান করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও সমস্যার সমাধান না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ করেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কিছু ব্যক্তি, দল ও গোষ্ঠী ঘুষ এবং মানুষের ওপর জুলুম ছাড়া চলতে পারে না। তবে দেশের মানুষ তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। অধিকার আদায়ে আন্দোলন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, গণভোটের বিষয়ে সরকার আহ্বান জানিয়ে এখন তা মানতে চাইছে না। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও পূরণ করা হচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন। স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার ও নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন করার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

প্রবাসীদের শুধু ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না মন্তব্য করে তিনি বলেন, তাদের অধিকার নিশ্চিত না করলে সেটি উপহাসের মতো হবে।

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন করার উদ্যোগের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এর মাধ্যমে মানুষের কথা বলার অধিকার সীমিত করার চেষ্টা হলে তারা এর বিরোধিতা করবেন। ন্যায্য ও সত্য কথা বলার ক্ষেত্রে কোনো আইনকে ভয় করবেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি জানান, বর্তমানে সাত দফা দাবিতে তাদের আন্দোলন চলছে। শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করার দাবিটি যুক্ত করে ভবিষ্যতে তা আট দফায় উন্নীত করা হবে। এসব দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।

জামায়াত আমির বলেন, তাদের রাজনীতি দেশ ও জনগণের জন্য। তারা উচ্ছৃঙ্খল বিরোধীদল হতে চান না। তবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে অনুগত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কথা বলবেন বলে জানান তিনি।

সিন্ডিকেটমুক্ত শ্রমবাজারের আন্দোলনে বায়রার সদস্যদেরও অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সবাই একসঙ্গে আন্দোলনে নামলে বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন ডা. শফিকুর রহমান। সরকার সংশোধন হয়ে সঠিক পথে এগোলে তাদের সাধুবাদ জানানোর কথাও বলেন তিনি। একই সঙ্গে জনগণের ওপর শোষণ চালিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি পরিবর্তনের কথা বলেন।

মূল প্রবন্ধে যা বলা হয়

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান নাগরিক দাতুশ্রী আমিন নূর, বায়রার সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন, সালমান এফ রহমান, সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক এমপি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ, সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদ, নিজাম হাজারী এবং সাবেক বিএনপি নেতা কাজী মফিজুর রহমানকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করেছিল।

তার দাবি, ওই সিন্ডিকেট ১০০টি সাব-এজেন্টের কাছ থেকে লাইসেন্সের নামে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। প্রতিটি শ্রমিকের কাছ থেকে সিন্ডিকেট ফি হিসেবে ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা এবং মেডিকেল ফি বাবদ ৩ হাজার টাকা নেওয়া হতো বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এর ফলে একজন শ্রমিকের বিদেশ যেতে ব্যয় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা নির্ধারিত হয় বলে দাবি করেন তিনি।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি দাবি করেন, ওই সিন্ডিকেটে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। দুদকের তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হলেও ৫১ জনকে ক্ষমা করা হয় এবং মূল হোতা হিসেবে উল্লেখ করা রুহুল আমিন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির আরও দাবি করেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী প্রত্যাশা পূরণ না করে সরকার আবারও ২৫টি এজেন্সিকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গঠনের চেষ্টা করছে। এর পেছনে দাতুশ্রী আমিন নূর ও রুহুল আমিন স্বপনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ৩৩৮টি এজেন্সির কথা বলা হলেও বাস্তবে ২৫টি এজেন্সি সিন্ডিকেটের মূল চালক হিসেবে কাজ করছে। বর্তমান সরকারের সঙ্গে এই সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। নতুন ২৫টি লাইসেন্সের নামে প্রায় ৪২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের দাবি করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এতে বিদেশ যেতে একজন শ্রমিকের ব্যয় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার এজেন্টভিত্তিক সিন্ডিকেট ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদ জানিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এ বিষয়ে নীরব থেকে ব্যবস্থাটিকে বৈধতা দিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ২৫টি এজেন্সির তালিকা, লাইসেন্স ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানান তিনি।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমবাজারের সিন্ডিকেটের বিষয়ে আলোচনা হলেও তা ভাঙার কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। তার দাবি, এর কারণ সরকারের একটি অংশ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধভাবে এই সিন্ডিকেট ভাঙা হবে।

সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা দুর্নীতি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করতে পারলে বিএনপি পড়ে যাবে। তার দাবি, বিএনপিতে এসব ছাড়া আর কিছু নেই।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, লেবার পার্টির চেয়ার মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ।

সূত্র: আমার দেশ


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
মালয়েশিয়াসহ শ্রমবাজারের সব সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি জামায়াত আমিরের
0:00 0:00
1.0x