একজন সাংবাদিককে হত্যা করে কি সত্য প্রকাশের পথ রুদ্ধ করা যায়?—এই প্রশ্নটি এখন কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে নেত্রকোনায় মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যার দ্রুত বিচার এবং চার দফা দাবিতে কাফনের কাপড় পরে রাজপথে নেমেছেন সাংবাদিক সমাজ। আজ সোমবার ২ নভেম্বর ২০২৬ দুপুরে নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক প্রতীকী ও প্রতিবাদী মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বক্তারা স্থানীয় প্রশাসনকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল এবং ৯০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কঠোর আলটিমেটাম দিয়েছেন। অন্যথায় আরও কঠোর ও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার হুশিয়ারি দেন তাঁরা।
সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ-এর ময়মনসিংহ বিভাগীয় ইউনিট, জেলা ইউনিট এবং ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংবাদিক ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে শতাধিক সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। তবে এই প্রতিবাদের আবহকে সবচেয়ে বেশি ভারী করে তুলেছিল নিহত সাংবাদিকের মা, স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপস্থিতিও। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তাঁদের এই উপস্থিতি যেন ন্যায়বিচারের এক অন্তহীন আকুতি হয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। মানববন্ধনে বক্তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, সাংবাদিক আলিফ ফকিরের এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পরিবারের স্বজন হারানোর বেদনা নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এক চরম অশুভ আঘাত। সীমান্ত এলাকার চোরাচালান ও নানা অনিয়মের চিত্র সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরাই তাঁর কাল হয়েছিল। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব কোনোভাবেই যেন আইনের হাত থেকে তাদের বাঁচাতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ কঠোর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
প্রতিবাদী এই কর্মসূচি থেকে চার দফা সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়—১) হত্যাকাণ্ডে জড়িত মামলার সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা; ২) আগামী ১৫ দিনের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল; ৩) মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা এবং ৪) ৯০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য শেষ করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর সম্পাদক মো. খায়রুল আলম রফিক বলেন, “সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হবে। নিহত সাংবাদিক আলিফ ফকিরের হত্যার বিচারের দাবী শুধু একজন সংবাদকর্মীর বিচার নয়, এটি পুরো জাতির স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই।” এ সময় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সংগঠনের পরিচালক মোহাম্মদ আলী আবির, ময়মনসিংহ জেলা ইউনিটের সভাপতি আরিফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, বিভাগীয় সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া পলাশ, দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক মো. মোহন মিয়া, সমরেন্দ্র বিশ্বশর্মা এবং নিহত আলিফের বড় ভাই শহিদুল ইসলাম ফকিরসহ স্থানীয় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।
মানববন্ধন শেষে সাংবাদিক প্রতিনিধি দল নেত্রকোনা জেলার পুলিশ সুপার তরীকুল ইসলামের সাথে সাক্ষাত করেন। পুলিশ সুপার মূল আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্রাইল বাজারসংলগ্ন তেলনজিয়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন বেসরকারি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি এবং ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ ফেসবুক পেজের চালক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে পুলিশ এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে দুজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে তাজুল ইসলামকে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মামলার তদন্ত ও গ্রেপ্তার কার্যক্রমের অগ্রগতির মধ্যেই সাংবাদিক সমাজ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে এই আন্দোলন রাজপথ ছাড়িয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। ‘সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধ হোক, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক—আলিফ ফকির হত্যার বিচার চাই’—এই স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে নেত্রকোনায় প্রতিবাদের আকাশ।

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬
একজন সাংবাদিককে হত্যা করে কি সত্য প্রকাশের পথ রুদ্ধ করা যায়?—এই প্রশ্নটি এখন কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে নেত্রকোনায় মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যার দ্রুত বিচার এবং চার দফা দাবিতে কাফনের কাপড় পরে রাজপথে নেমেছেন সাংবাদিক সমাজ। আজ সোমবার ২ নভেম্বর ২০২৬ দুপুরে নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক প্রতীকী ও প্রতিবাদী মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বক্তারা স্থানীয় প্রশাসনকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল এবং ৯০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কঠোর আলটিমেটাম দিয়েছেন। অন্যথায় আরও কঠোর ও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার হুশিয়ারি দেন তাঁরা।
সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ-এর ময়মনসিংহ বিভাগীয় ইউনিট, জেলা ইউনিট এবং ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংবাদিক ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে শতাধিক সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। তবে এই প্রতিবাদের আবহকে সবচেয়ে বেশি ভারী করে তুলেছিল নিহত সাংবাদিকের মা, স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপস্থিতিও। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তাঁদের এই উপস্থিতি যেন ন্যায়বিচারের এক অন্তহীন আকুতি হয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। মানববন্ধনে বক্তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, সাংবাদিক আলিফ ফকিরের এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পরিবারের স্বজন হারানোর বেদনা নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এক চরম অশুভ আঘাত। সীমান্ত এলাকার চোরাচালান ও নানা অনিয়মের চিত্র সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরাই তাঁর কাল হয়েছিল। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব কোনোভাবেই যেন আইনের হাত থেকে তাদের বাঁচাতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ কঠোর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
প্রতিবাদী এই কর্মসূচি থেকে চার দফা সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়—১) হত্যাকাণ্ডে জড়িত মামলার সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা; ২) আগামী ১৫ দিনের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল; ৩) মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা এবং ৪) ৯০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য শেষ করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর সম্পাদক মো. খায়রুল আলম রফিক বলেন, “সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হবে। নিহত সাংবাদিক আলিফ ফকিরের হত্যার বিচারের দাবী শুধু একজন সংবাদকর্মীর বিচার নয়, এটি পুরো জাতির স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই।” এ সময় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সংগঠনের পরিচালক মোহাম্মদ আলী আবির, ময়মনসিংহ জেলা ইউনিটের সভাপতি আরিফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, বিভাগীয় সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া পলাশ, দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক মো. মোহন মিয়া, সমরেন্দ্র বিশ্বশর্মা এবং নিহত আলিফের বড় ভাই শহিদুল ইসলাম ফকিরসহ স্থানীয় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।
মানববন্ধন শেষে সাংবাদিক প্রতিনিধি দল নেত্রকোনা জেলার পুলিশ সুপার তরীকুল ইসলামের সাথে সাক্ষাত করেন। পুলিশ সুপার মূল আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্রাইল বাজারসংলগ্ন তেলনজিয়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন বেসরকারি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি এবং ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ ফেসবুক পেজের চালক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে পুলিশ এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে দুজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে তাজুল ইসলামকে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মামলার তদন্ত ও গ্রেপ্তার কার্যক্রমের অগ্রগতির মধ্যেই সাংবাদিক সমাজ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে এই আন্দোলন রাজপথ ছাড়িয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। ‘সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধ হোক, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক—আলিফ ফকির হত্যার বিচার চাই’—এই স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে নেত্রকোনায় প্রতিবাদের আকাশ।

আপনার মতামত লিখুন