ফিজির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছর দেশটিতে নতুন করে ২ হাজার ১৬ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে নতুন শনাক্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫৮৩। ফলে এক বছরের ব্যবধানে নতুন শনাক্তের সংখ্যা ২৭ শতাংশ বেড়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, সংক্রমণ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশজুড়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হওয়ায় আগে শনাক্ত না হওয়া অনেক রোগীকেও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিজিতে প্রতি ৬০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে আনুমানিক একজন এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন বলে ইউএনএইডসের হিসাব। পাঁচ বছর আগে এই অনুপাত ছিল প্রায় প্রতি ১৬৭ জন প্রাপ্তবয়স্কে একজন। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ফিজিতে নতুন এইচআইভি সংক্রমণ প্রায় ১২ গুণ বেড়েছে।
ফিজির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংক্রমণের ধরন ও বিস্তার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে দেশে পরীক্ষা বাড়ানো হয়েছে। তবে নতুন শনাক্তের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে শুধু সংক্রমণ বেড়ে যাওয়াই নয়, উন্নত শনাক্তকরণ ব্যবস্থারও ভূমিকা রয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ১৬ জনে পৌঁছানোকে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংক্রমণ ছড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হিসেবে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের বিষয়টি উঠে এসেছে। ইউএনএইডস জানিয়েছে, যেসব সংক্রমণের ক্ষেত্রে মাধ্যম শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, সেগুলোর অর্ধেকের বেশি যৌন সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ৪২ শতাংশের বেশি ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে ব্যবহৃত সুচ বা সিরিঞ্জ ভাগাভাগি করার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তবে এইচআইভি সংক্রমণ শুধু মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফিজির স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমণ। ২০২৫ সালে ৫৯টি শিশু এইচআইভি নিয়ে জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে ১৮ জন প্রথম জন্মদিনের আগেই মারা যায়। একই সময়ে গর্ভবতী নারীদের মধ্যেও সংক্রমণের হার বেড়েছে।
ফিজির স্বাস্থ্যমন্ত্রী আন্তোনিও লালাবালাভু বলেছেন, পরিস্থিতিকে আর সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। সরকার বিনা মূল্যে স্বেচ্ছামূলক ও গোপনীয় এইচআইভি পরীক্ষা আরও সম্প্রসারণ, আক্রান্তদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে বিভিন্ন কর্মসূচি জোরদার করছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রি-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বা প্রিইপি—সংক্রমণের আগে প্রতিরোধমূলক ওষুধ—ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের জন্য সুচ ও সিরিঞ্জ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও করেছে সরকার। এর মাধ্যমে ব্যবহৃত সুচ ভাগাভাগির ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ওষুধের ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফিজি সরকার পাঁচজন মন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি মন্ত্রিসভা উপকমিটি গঠন করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য বিভাগকেও এ উদ্যোগে যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে থাকা বাধাগুলো দূর করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউএনএইডস ফিজির এই উদ্যোগে সহযোগিতার কথা জানিয়েছে।
আক্রান্ত ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে হেয় করা ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার বিষয়টিও বিশেষজ্ঞদের কাছে বড় উদ্বেগের কারণ। ইউএনএইডস ও ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, সাধারণ দৈনন্দিন সংস্পর্শের মাধ্যমে এইচআইভি ছড়ায় না। কার্যকর চিকিৎসার মাধ্যমে ভাইরাসের মাত্রা অনির্ণেয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হলে যৌন সংক্রমণও প্রতিরোধ করা যায়। তাই ভয় ও ভুল তথ্যের পরিবর্তে পরীক্ষা, দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফিজির জনসংখ্যা ১০ লাখেরও কম। এত কম জনসংখ্যার একটি দেশে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউএনএইডসের মতে, ফিজির বর্তমান পরিস্থিতি শুধু দেশটির জন্য নয়, পুরো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত হওয়ায় নতুন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও ফিজি সরকার পরিস্থিতিকে আতঙ্কের বিষয় হিসেবে না দেখে দ্রুত সমন্বিত স্বাস্থ্য উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো, মাদক ব্যবহারজনিত সংক্রমণ কমানো, মা ও শিশুর সুরক্ষা এবং সামাজিক বৈষম্য হ্রাসের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ফিজির অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধ, জনসচেতনতা এবং সহজে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে প্রয়োজন।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, ইউএনএইডস, ফিজি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিজির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছর দেশটিতে নতুন করে ২ হাজার ১৬ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে নতুন শনাক্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫৮৩। ফলে এক বছরের ব্যবধানে নতুন শনাক্তের সংখ্যা ২৭ শতাংশ বেড়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, সংক্রমণ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশজুড়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হওয়ায় আগে শনাক্ত না হওয়া অনেক রোগীকেও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিজিতে প্রতি ৬০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে আনুমানিক একজন এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন বলে ইউএনএইডসের হিসাব। পাঁচ বছর আগে এই অনুপাত ছিল প্রায় প্রতি ১৬৭ জন প্রাপ্তবয়স্কে একজন। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ফিজিতে নতুন এইচআইভি সংক্রমণ প্রায় ১২ গুণ বেড়েছে।
ফিজির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংক্রমণের ধরন ও বিস্তার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে দেশে পরীক্ষা বাড়ানো হয়েছে। তবে নতুন শনাক্তের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে শুধু সংক্রমণ বেড়ে যাওয়াই নয়, উন্নত শনাক্তকরণ ব্যবস্থারও ভূমিকা রয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ১৬ জনে পৌঁছানোকে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংক্রমণ ছড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হিসেবে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের বিষয়টি উঠে এসেছে। ইউএনএইডস জানিয়েছে, যেসব সংক্রমণের ক্ষেত্রে মাধ্যম শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, সেগুলোর অর্ধেকের বেশি যৌন সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ৪২ শতাংশের বেশি ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে ব্যবহৃত সুচ বা সিরিঞ্জ ভাগাভাগি করার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তবে এইচআইভি সংক্রমণ শুধু মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফিজির স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমণ। ২০২৫ সালে ৫৯টি শিশু এইচআইভি নিয়ে জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে ১৮ জন প্রথম জন্মদিনের আগেই মারা যায়। একই সময়ে গর্ভবতী নারীদের মধ্যেও সংক্রমণের হার বেড়েছে।
ফিজির স্বাস্থ্যমন্ত্রী আন্তোনিও লালাবালাভু বলেছেন, পরিস্থিতিকে আর সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। সরকার বিনা মূল্যে স্বেচ্ছামূলক ও গোপনীয় এইচআইভি পরীক্ষা আরও সম্প্রসারণ, আক্রান্তদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে বিভিন্ন কর্মসূচি জোরদার করছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রি-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বা প্রিইপি—সংক্রমণের আগে প্রতিরোধমূলক ওষুধ—ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের জন্য সুচ ও সিরিঞ্জ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও করেছে সরকার। এর মাধ্যমে ব্যবহৃত সুচ ভাগাভাগির ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ওষুধের ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফিজি সরকার পাঁচজন মন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি মন্ত্রিসভা উপকমিটি গঠন করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য বিভাগকেও এ উদ্যোগে যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে থাকা বাধাগুলো দূর করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউএনএইডস ফিজির এই উদ্যোগে সহযোগিতার কথা জানিয়েছে।
আক্রান্ত ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে হেয় করা ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার বিষয়টিও বিশেষজ্ঞদের কাছে বড় উদ্বেগের কারণ। ইউএনএইডস ও ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, সাধারণ দৈনন্দিন সংস্পর্শের মাধ্যমে এইচআইভি ছড়ায় না। কার্যকর চিকিৎসার মাধ্যমে ভাইরাসের মাত্রা অনির্ণেয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হলে যৌন সংক্রমণও প্রতিরোধ করা যায়। তাই ভয় ও ভুল তথ্যের পরিবর্তে পরীক্ষা, দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফিজির জনসংখ্যা ১০ লাখেরও কম। এত কম জনসংখ্যার একটি দেশে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউএনএইডসের মতে, ফিজির বর্তমান পরিস্থিতি শুধু দেশটির জন্য নয়, পুরো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত হওয়ায় নতুন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও ফিজি সরকার পরিস্থিতিকে আতঙ্কের বিষয় হিসেবে না দেখে দ্রুত সমন্বিত স্বাস্থ্য উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো, মাদক ব্যবহারজনিত সংক্রমণ কমানো, মা ও শিশুর সুরক্ষা এবং সামাজিক বৈষম্য হ্রাসের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ফিজির অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধ, জনসচেতনতা এবং সহজে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে প্রয়োজন।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, ইউএনএইডস, ফিজি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

আপনার মতামত লিখুন