জানা যায়, গারো পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে গাছ কাটার পাশাপাশি পাহাড়ের ঢাল কেটে গড়ে উঠেছে বসতি, কৃষিজমি ও বিভিন্ন স্থাপনা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নতুন গাছপালা জন্মাচ্ছে না। পাশাপাশি পাহাড়ি ঝিরি ও ছড়াগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় হাতির খাদ্য ও পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর ফলেই হাতির দল সমতল এলাকায় চলে আসছে।
একসময়ের ঘন বন, ঝিরি-ঝরনা ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল এখন পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বন্য হাতি ও সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের ওপর। ফলে দুই পক্ষের সংঘর্ষও বেড়েছে। গত এক যুগে এ ধরনের ঘটনায় ৪৯ জন মানুষ ও ৩৫টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত গত ১২ বছরে গারো পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় হাতির আক্রমণে ৪৯ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে মানুষের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদ, বিষটোপ এবং প্রতিশোধমূলক হামলায় মারা গেছে ৩৫টি বন্য হাতি। পরিবেশবিদদের মতে, এসব মৃত্যু বিচ্ছিন্ন নয়; বরং দীর্ঘদিনের বন উজাড়, পাহাড় দখল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবের ফল।
এক সময় গারো পাহাড়ের অরণ্যে হাতির জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানির উৎস ছিল। সেখানে আমলকী, হরিতকী, বহেড়া, বাঁশ, কাঁঠাল ও বুনো কলাসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ জন্মাতো। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঝিরি ও ছড়াগুলো পানিতে ভরে থাকত। তবে গত দুই দশকে ব্যাপক বন উজাড়ের কারণে সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর বনভূমি দখল, পাহাড় কাটা এবং বাণিজ্যিকভাবে গাছ নিধনের ঘটনা ঘটেছে। এতে হাতির আবাসস্থল ছোট হয়ে গেছে এবং খাদ্য ও পানির উৎস কমে এসেছে। এর সঙ্গে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘস্থায়ী খরাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এসব কারণে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হাতির দল এখন পাহাড় ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে। রাতের বেলায় তারা ফসলের মাঠ, গ্রাম এবং মানুষের বসতবাড়িতে ঢুকে পড়ছে। অন্যদিকে নিজেদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় মানুষও প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। এর ফলেই মানুষ ও হাতির মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা বাড়ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শেরপুর জেলা। সেখানে হাতির আক্রমণে ৩০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছে ৩০টি হাতি। ময়মনসিংহে ১০ জন মানুষ, নেত্রকোনায় ৫ জন মানুষ ও ২টি হাতি এবং জামালপুরে ৪ জন মানুষ ও ৩টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০১৫ সালেই চার জেলায় সর্বোচ্চ ৭টি হাতির মৃত্যু ঘটে।
পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা জয়দাঙ্গো বলেন, ১৫ বছর আগেও হাতি পাহাড়ের ভেতরেই থাকত। তখন সেখানে পর্যাপ্ত খাবার ছিল। কিন্তু বন উজাড়ের কারণে এখন খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। তাই হাতিরা লোকালয়ে চলে আসে।
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার বালিজুরী এলাকার কৃষক রমজান আলী বলেন, হাতির কোনো দোষ নেই। বনের ভেতরে তাদের খাবার ও পানির সংকট রয়েছে বলেই তারা গ্রামে আসে। কিন্তু ফসল রক্ষার জন্য মানুষ বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতে। এতে হাতিও মারা যায়, মানুষও প্রাণ হারায়।
হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আবদুর রশিদ বলেন, সারা বছরের কষ্টের ফসল এক রাতেই নষ্ট হয়ে যায়। ধারদেনা করে চাষাবাদ করেন, কিন্তু হাতির দল এসে সব শেষ করে দেয়। ক্ষতিপূরণও ঠিকমতো পান না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন ধ্বংসের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনও এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও প্রাণীবিদ অধ্যাপক ড. রোকোনুজ্জামান বলেন, সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় পাহাড়ে নতুন গাছপালা জন্মাচ্ছে না এবং ঝিরি-ছড়াগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে হাতির খাদ্য ও পানির সংকট তৈরি হয়েছে। এ কারণেই তারা সমতল এলাকায় চলে আসছে। তিনি জানান, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন ১৪০ থেকে ২৭০ কেজি খাদ্য এবং ২০০ থেকে ৩০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। বর্তমান বন পরিবেশে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বালিজুরী রেঞ্জের ৮ হাজার ৩৩০ একর বনভূমিতে বর্তমানে প্রায় ১২০টি হাতি রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বনভূমির অবস্থা এত সংখ্যক হাতির জন্য উপযোগী নয়। ময়মনসিংহ বিভাগের বালিজুরী রেঞ্জ কর্মকর্তা সুমন মিয়া জানান, হাতির খাদ্য সংকট কমাতে ১১৫ হেক্টর এলাকায় খাদ্য উপযোগী বৃক্ষরোপণের কাজ চলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বনাঞ্চলে কৃত্রিম জলাধার তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সূত্র: আমার দেশ

শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬
জানা যায়, গারো পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে গাছ কাটার পাশাপাশি পাহাড়ের ঢাল কেটে গড়ে উঠেছে বসতি, কৃষিজমি ও বিভিন্ন স্থাপনা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নতুন গাছপালা জন্মাচ্ছে না। পাশাপাশি পাহাড়ি ঝিরি ও ছড়াগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় হাতির খাদ্য ও পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর ফলেই হাতির দল সমতল এলাকায় চলে আসছে।
একসময়ের ঘন বন, ঝিরি-ঝরনা ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল এখন পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বন্য হাতি ও সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের ওপর। ফলে দুই পক্ষের সংঘর্ষও বেড়েছে। গত এক যুগে এ ধরনের ঘটনায় ৪৯ জন মানুষ ও ৩৫টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত গত ১২ বছরে গারো পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় হাতির আক্রমণে ৪৯ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে মানুষের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদ, বিষটোপ এবং প্রতিশোধমূলক হামলায় মারা গেছে ৩৫টি বন্য হাতি। পরিবেশবিদদের মতে, এসব মৃত্যু বিচ্ছিন্ন নয়; বরং দীর্ঘদিনের বন উজাড়, পাহাড় দখল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবের ফল।
এক সময় গারো পাহাড়ের অরণ্যে হাতির জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানির উৎস ছিল। সেখানে আমলকী, হরিতকী, বহেড়া, বাঁশ, কাঁঠাল ও বুনো কলাসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ জন্মাতো। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঝিরি ও ছড়াগুলো পানিতে ভরে থাকত। তবে গত দুই দশকে ব্যাপক বন উজাড়ের কারণে সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর বনভূমি দখল, পাহাড় কাটা এবং বাণিজ্যিকভাবে গাছ নিধনের ঘটনা ঘটেছে। এতে হাতির আবাসস্থল ছোট হয়ে গেছে এবং খাদ্য ও পানির উৎস কমে এসেছে। এর সঙ্গে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘস্থায়ী খরাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এসব কারণে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হাতির দল এখন পাহাড় ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে। রাতের বেলায় তারা ফসলের মাঠ, গ্রাম এবং মানুষের বসতবাড়িতে ঢুকে পড়ছে। অন্যদিকে নিজেদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় মানুষও প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। এর ফলেই মানুষ ও হাতির মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা বাড়ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শেরপুর জেলা। সেখানে হাতির আক্রমণে ৩০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছে ৩০টি হাতি। ময়মনসিংহে ১০ জন মানুষ, নেত্রকোনায় ৫ জন মানুষ ও ২টি হাতি এবং জামালপুরে ৪ জন মানুষ ও ৩টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০১৫ সালেই চার জেলায় সর্বোচ্চ ৭টি হাতির মৃত্যু ঘটে।
পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা জয়দাঙ্গো বলেন, ১৫ বছর আগেও হাতি পাহাড়ের ভেতরেই থাকত। তখন সেখানে পর্যাপ্ত খাবার ছিল। কিন্তু বন উজাড়ের কারণে এখন খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। তাই হাতিরা লোকালয়ে চলে আসে।
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার বালিজুরী এলাকার কৃষক রমজান আলী বলেন, হাতির কোনো দোষ নেই। বনের ভেতরে তাদের খাবার ও পানির সংকট রয়েছে বলেই তারা গ্রামে আসে। কিন্তু ফসল রক্ষার জন্য মানুষ বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতে। এতে হাতিও মারা যায়, মানুষও প্রাণ হারায়।
হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আবদুর রশিদ বলেন, সারা বছরের কষ্টের ফসল এক রাতেই নষ্ট হয়ে যায়। ধারদেনা করে চাষাবাদ করেন, কিন্তু হাতির দল এসে সব শেষ করে দেয়। ক্ষতিপূরণও ঠিকমতো পান না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন ধ্বংসের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনও এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও প্রাণীবিদ অধ্যাপক ড. রোকোনুজ্জামান বলেন, সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় পাহাড়ে নতুন গাছপালা জন্মাচ্ছে না এবং ঝিরি-ছড়াগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে হাতির খাদ্য ও পানির সংকট তৈরি হয়েছে। এ কারণেই তারা সমতল এলাকায় চলে আসছে। তিনি জানান, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন ১৪০ থেকে ২৭০ কেজি খাদ্য এবং ২০০ থেকে ৩০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। বর্তমান বন পরিবেশে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বালিজুরী রেঞ্জের ৮ হাজার ৩৩০ একর বনভূমিতে বর্তমানে প্রায় ১২০টি হাতি রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বনভূমির অবস্থা এত সংখ্যক হাতির জন্য উপযোগী নয়। ময়মনসিংহ বিভাগের বালিজুরী রেঞ্জ কর্মকর্তা সুমন মিয়া জানান, হাতির খাদ্য সংকট কমাতে ১১৫ হেক্টর এলাকায় খাদ্য উপযোগী বৃক্ষরোপণের কাজ চলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বনাঞ্চলে কৃত্রিম জলাধার তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন