রক্তস্নাত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি আজ ৫ আগস্ট। ২০২৪ সালের এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মুখে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তীব্র জনরোষের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারত চলে যান এবং সেখানে আশ্রয় নেন। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই আন্দোলনে শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ উৎসর্গ করেন। তাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ জাতি চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর এ দিনটিকে অনেকেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার দিন হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ ১৫ বছরের গণতন্ত্রবিরোধী শাসন থেকে মুক্তি এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সংগ্রাম। ৫ আগস্টের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে পুরোপুরি সফল না হলেও, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আজ ৩৬ জুলাই, অর্থাৎ ৫ আগস্ট। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ৩৬ দিনের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ, এই সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশ পেয়েছে নতুন বাংলাদেশ। স্বাধীনচেতা তরুণদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শুরু হয় হাসিনা সরকারের পতনের পথচলা। ছাত্র-জনতা শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ ও বয়সের বিভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। তবে শুরুতে এই আন্দোলনের লক্ষ্য সরকার পতন ছিল না; বরং বৈষম্য দূর করা এবং সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। একই মাসে রংপুরের আবু সাঈদের আত্মত্যাগ আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়। তার ঘটনার পর শিক্ষার্থী, শ্রমিক, মজুরসহ অসংখ্য মানুষ শাসকের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দাঁড়ানোর বিরল সাহস দেখান। সেই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই ছাত্র-জনতার আন্দোলন বিজয়ের মুখ দেখে এবং ক্ষমতার দম্ভ ভেঙে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানের সূত্রপাত বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় ২০২৪ সালের জুন মাসে। ৫ জুন সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলসংক্রান্ত ২০১৮ সালের পরিপত্রকে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল হয়। এর প্রতিবাদে ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। সেদিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে ধ্বনিত হয় স্লোগান—‘কোটা না মেধা? মেধা মেধা।’
১ জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামটি সামনে আসে। এই ব্যানারে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী রাজু ভাস্কর্যে সমবেত হয়ে ২০১৮ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপন পুনর্বহালের দাবি জানান। দাবি বাস্তবায়ন না হলে ৪ জুলাই পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনের মুখপাত্র নাহিদ ইসলাম।
১১ জুলাই পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এদিন হাইকোর্ট জানায়, সরকার চাইলে কোটা পদ্ধতিতে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন আনতে পারে। এরপরও আন্দোলন ও অবরোধের মাত্রা বাড়তে থাকে। সরকারি আহ্বান উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা দেশব্যাপী ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু শিক্ষার্থী আহত হন। এতে সারাদেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেই পরিস্থিতিতে তৎকালীন সড়কমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগকে মাঠে নামান। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা হামলা চালালে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। এরপরও সরকার চাইলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, কিন্তু তার পরিবর্তে সরকারি বাহিনীর হাতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশ খুব কাছ থেকে গুলি করে আবু সাঈদকে হত্যা করে। এ ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষও আন্দোলনে যোগ দেন।
৫ আগস্ট পর্যন্ত চলা এই আন্দোলনের সময়কালকে ‘জুলাই ৩৬’ নামে অভিহিত করা হয়। এই সময়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব দিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ শহীদ হন। অন্যদিকে বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, শহীদের সংখ্যা ২ হাজারেরও বেশি। এত রক্তের বিনিময়ে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলন সফল হয়। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে হেলিকপ্টারে করে ভারত চলে যান। তার দেশত্যাগের পর আওয়ামী লীগের বহু মন্ত্রী, এমপি ও নেতা আত্মগোপনে চলে যান। সরকার পতনের তিন দিন পর, ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের অন্যায়, দুর্নীতি, গুম ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনগণের বিস্ফোরিত প্রতিরোধ। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত এক দফার সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র-জনতা বুলেটের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। এই দিনটি তরুণ সমাজের সাহস, ঐক্য ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই আন্দোলনে শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ শহীদ হয়েছেন, হাজারো মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তাদের রক্তের বিনিময়ে দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। তাই তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি নতুন এক মানসিকতারও সূচনা। তরুণদের এই অর্জনকে ধরে রেখে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গঠনে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। গত দুই বছরে প্রাপ্তির পাশাপাশি অপূর্ণতা ও হতাশার জায়গাও রয়েছে, রয়েছে নানা যৌক্তিক প্রশ্ন। তবুও সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে দেশ এগিয়ে যাক নতুন বন্দোবস্তের পথে। সব ধরনের আধিপত্যবাদের অবসান ঘটুক এবং গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হোক কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র।
সূত্র: প্রতিদিনের সংবাদ

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
রক্তস্নাত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি আজ ৫ আগস্ট। ২০২৪ সালের এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মুখে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তীব্র জনরোষের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারত চলে যান এবং সেখানে আশ্রয় নেন। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই আন্দোলনে শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ উৎসর্গ করেন। তাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ জাতি চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর এ দিনটিকে অনেকেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার দিন হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ ১৫ বছরের গণতন্ত্রবিরোধী শাসন থেকে মুক্তি এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সংগ্রাম। ৫ আগস্টের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে পুরোপুরি সফল না হলেও, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আজ ৩৬ জুলাই, অর্থাৎ ৫ আগস্ট। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ৩৬ দিনের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ, এই সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশ পেয়েছে নতুন বাংলাদেশ। স্বাধীনচেতা তরুণদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শুরু হয় হাসিনা সরকারের পতনের পথচলা। ছাত্র-জনতা শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ ও বয়সের বিভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। তবে শুরুতে এই আন্দোলনের লক্ষ্য সরকার পতন ছিল না; বরং বৈষম্য দূর করা এবং সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। একই মাসে রংপুরের আবু সাঈদের আত্মত্যাগ আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়। তার ঘটনার পর শিক্ষার্থী, শ্রমিক, মজুরসহ অসংখ্য মানুষ শাসকের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দাঁড়ানোর বিরল সাহস দেখান। সেই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই ছাত্র-জনতার আন্দোলন বিজয়ের মুখ দেখে এবং ক্ষমতার দম্ভ ভেঙে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানের সূত্রপাত বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় ২০২৪ সালের জুন মাসে। ৫ জুন সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলসংক্রান্ত ২০১৮ সালের পরিপত্রকে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল হয়। এর প্রতিবাদে ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। সেদিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে ধ্বনিত হয় স্লোগান—‘কোটা না মেধা? মেধা মেধা।’
১ জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামটি সামনে আসে। এই ব্যানারে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী রাজু ভাস্কর্যে সমবেত হয়ে ২০১৮ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপন পুনর্বহালের দাবি জানান। দাবি বাস্তবায়ন না হলে ৪ জুলাই পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনের মুখপাত্র নাহিদ ইসলাম।
১১ জুলাই পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এদিন হাইকোর্ট জানায়, সরকার চাইলে কোটা পদ্ধতিতে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন আনতে পারে। এরপরও আন্দোলন ও অবরোধের মাত্রা বাড়তে থাকে। সরকারি আহ্বান উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা দেশব্যাপী ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু শিক্ষার্থী আহত হন। এতে সারাদেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেই পরিস্থিতিতে তৎকালীন সড়কমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগকে মাঠে নামান। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা হামলা চালালে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। এরপরও সরকার চাইলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, কিন্তু তার পরিবর্তে সরকারি বাহিনীর হাতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশ খুব কাছ থেকে গুলি করে আবু সাঈদকে হত্যা করে। এ ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষও আন্দোলনে যোগ দেন।
৫ আগস্ট পর্যন্ত চলা এই আন্দোলনের সময়কালকে ‘জুলাই ৩৬’ নামে অভিহিত করা হয়। এই সময়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব দিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ শহীদ হন। অন্যদিকে বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, শহীদের সংখ্যা ২ হাজারেরও বেশি। এত রক্তের বিনিময়ে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলন সফল হয়। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে হেলিকপ্টারে করে ভারত চলে যান। তার দেশত্যাগের পর আওয়ামী লীগের বহু মন্ত্রী, এমপি ও নেতা আত্মগোপনে চলে যান। সরকার পতনের তিন দিন পর, ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের অন্যায়, দুর্নীতি, গুম ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনগণের বিস্ফোরিত প্রতিরোধ। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত এক দফার সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র-জনতা বুলেটের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। এই দিনটি তরুণ সমাজের সাহস, ঐক্য ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই আন্দোলনে শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ শহীদ হয়েছেন, হাজারো মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তাদের রক্তের বিনিময়ে দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। তাই তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি নতুন এক মানসিকতারও সূচনা। তরুণদের এই অর্জনকে ধরে রেখে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গঠনে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। গত দুই বছরে প্রাপ্তির পাশাপাশি অপূর্ণতা ও হতাশার জায়গাও রয়েছে, রয়েছে নানা যৌক্তিক প্রশ্ন। তবুও সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে দেশ এগিয়ে যাক নতুন বন্দোবস্তের পথে। সব ধরনের আধিপত্যবাদের অবসান ঘটুক এবং গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হোক কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র।
সূত্র: প্রতিদিনের সংবাদ

আপনার মতামত লিখুন