ঢাকা    বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

রাজনীতি

কাদেরের স্ট্যাটাস ঘিরে তোলপাড়, এক দফা ঘোষণার নেপথ্য নিয়ে বিস্তৃত বক্তব্য

কাদেরের স্ট্যাটাস ঘিরে তোলপাড়, এক দফা ঘোষণার নেপথ্য নিয়ে বিস্তৃত বক্তব্য
কাদেরের স্ট্যাটাস ঘিরে তোলপাড়, এক দফা ঘোষণার নেপথ্য নিয়ে বিস্তৃত বক্তব্য

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয় দিনটি। সেদিন রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও ফ্যাসিবাদ বিলোপের দাবিতে এক দফা ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মাত্র দুই দিন পর দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এক দফা ঘোষণার পেছনের প্রেক্ষাপট, সে সময়ের পরিস্থিতি এবং কার কী ভূমিকা ছিল—এসব নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান তুলে ধরে সোমবার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দীর্ঘ একটি পোস্ট দেন গণঅভ্যুত্থানের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের। 'ঐতিহাসিক এক দফার নেপথ্যের ইতিহাস, কিছু বিষয় আপনাদের কাছে ক্লিয়ার করা জরুরী' শিরোনামের ওই পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঘিরে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

পোস্টে আবদুল কাদের জানান, ১ আগস্ট বৃহস্পতিবার ডিবি হেফাজত থেকে ছয় সমন্বয়ক মুক্তি পান। বের হওয়ার পর তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয়নি, যদিও ব্যক্তিগতভাবে দু-একজনের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। তিনি বলেন, মাহিন, মাসুদ, রিফাত এবং তিনি নিজেরা আলোচনা করে ২ আগস্ট শুক্রবারের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তবে ডিবি থেকে ফিরে আসা সমন্বয়কদের একটি অংশ এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি তোলে এবং বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। পরে বিরোধ নিরসন ও পরবর্তী পরিকল্পনার জন্য জুমার নামাজের পর অনলাইনে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, শুক্রবারের কর্মসূচি ঘোষণা নিয়ে নানা বাধা থাকলেও এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। জুমার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়, বিশেষ করে চট্টগ্রামে। সে সময় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত স্লোগান ছিল, "দফা এক, দাবি এক—খুনি হাসিনার পদত্যাগ।" পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি তখন ফেসবুকে লেখেন, "আমরা শীঘ্রই চূড়ান্ত ডাক দিচ্ছি।"

আবদুল কাদেরের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময় অনলাইন বৈঠক শুরু হলে সেখানে তৎকালীন ছাত্রশক্তির নেতারা অংশ নেন। হাসনাত ও সারজিস উপস্থিত ছিলেন না। বৈঠকে প্রথমে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয় এবং একজন-দুজনের ভিন্নমত ছাড়া সবাই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন।

এরপর সিদ্ধান্ত হয়, তিনি, মাসুদ, রিফাত ও মাহিন পরবর্তী তিন-চার দিন আন্দোলন পরিচালনা করবেন এবং সিনিয়ররা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হবেন। বৈঠকে তিনি ও রিফাত এক দফার প্রসঙ্গ তোলেন এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, শিক্ষক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী ও শিল্পীদের সমর্থন, সলিমুল্লাহ খানের বক্তব্য এবং চলমান দ্রোহযাত্রার বিষয়ও সেখানে আলোচনায় আসে। তবে বৈঠকে সাত থেকে দশ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর এক দফায় যাওয়ার মতামত দেওয়া হয়। পাশাপাশি পরদিন ৩ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, দীর্ঘ অনলাইন বৈঠক শেষে তার বাসায় এক নারী সাংবাদিক ও ওয়াহিদ আলম নামে একজন আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচনার সময় এক দফা ঘোষণার বিষয়টি উঠে আসে। এরপর তিনি বিভিন্ন পরিচিতজনের মতামত নেন এবং ছাত্রদলের রাকিব-নাসির ও শিবিরের সাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, নাসির বলেন বিষয়টি চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং সাদিক জানান, তিনি দলের জ্যেষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলে জানাবেন।

এরপর তিনি ওই দুই অতিথিকে জানান, তিনি এক দফার পক্ষে প্রস্তুত এবং ছাত্রদল ও শিবিরের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। তবে তিনি একা সিদ্ধান্ত নিতে চান না, রিফাত, মাহিন ও মাসুদের সম্মতিও প্রয়োজন।

পরে ওই তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, ডিবি থেকে সদ্য মুক্ত হওয়া সিনিয়ররাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। একই সঙ্গে তারা নিজেদের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে এক দফা নিয়ে এগোনোর কথা বলেন। আবদুল কাদের জানান, তিনি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে প্রাণহানি বাড়তে পারে এবং পরিস্থিতি এক দফার উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। এ সময় তিনি আরও একটি তথ্য পান যে, ৩ আগস্ট শেখ হাসিনা নয় দফা মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা তাকে আরও দ্রুত এক দফার বিষয়ে এগোতে উৎসাহিত করে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে রিফাতরা এক দফার বিষয়ে সম্মত হন। এরপর তাদের সঙ্গে আলোচনা করে ঘোষণাপত্রের খসড়া তৈরি করা হয়। খসড়াটি প্রস্তুত করেন ওই নারী সাংবাদিকের এক সহকর্মী এবং সংযোজন-বিয়োজন করেন ওয়াহিদ আলম। পরে খসড়া রিফাতদের কাছে পাঠানো হলে তারা কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনের পরামর্শ দেন। একই সময়ে তিনি ছাত্রদল, শিবিরসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যান।

আবদুল কাদের দাবি করেন, পুরো সময়জুড়ে তিনি ডিবি থেকে ফেরা সিনিয়র সমন্বয়কদের সঙ্গে এক দফার বিষয়ে যোগাযোগ করেননি। তার ভাষায়, দুপুরের বৈঠকে তাদের অবস্থান পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় তিনি আর যোগাযোগের প্রয়োজন মনে করেননি। এছাড়া তখন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, রাত প্রায় ১০টার দিকে ছাত্রদলের নাসির তাকে জানান, চেয়ারম্যানও মনে করছেন এক দফা ঘোষণার উপযুক্ত সময় এসেছে। অন্যদিকে শিবিরের সাদিক জানান, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং নামাজ পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলেন। পরে উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হয় এবং তিনি ঘোষণার একটি ভিডিওও তৈরি করেন।

তবে এর কিছু পর রিফাতরা ফোন ধরা বন্ধ করে দেন। পরে তারা জানান, নাহিদদের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তারা এক দফার বিষয়ে সম্মতি দেননি। এতে তারা নিজেরাও সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। আবদুল কাদের বলেন, এতে তারা বিস্মিত হন, কারণ তাদের সম্মতির ভিত্তিতেই প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ হয়েছিল।

পরে ৫ আগস্টের পর নাহিদদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, রিফাতরা অভিযোগ করেছিলেন যে, তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এক দফায় রাজি করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই নাহিদরা তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হলে এক দফা না দেওয়ার পরামর্শ দেন বলে তিনি দাবি করেন।

পরবর্তীতে রিফাতরা তাকে জানান, আপাতত তারা এক দফা দেবেন না। তবে নাহিদরা পরদিন মাঠ থেকেই এক দফা ঘোষণা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি এটিও জানানো হয়, যদি তা না হয়, তাহলে তারা চারজন মিলে এক দফা ঘোষণা করবেন। এই আশ্বাসের ভিত্তিতেই তিনি সেদিন প্রস্তুত করা ভিডিও প্রকাশ করেননি।

পোস্টে আবদুল কাদের বলেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল এক দফা ঘোষণা নিশ্চিত করা। কার মাধ্যমে ঘোষণা আসছে, সেটি তার কাছে মুখ্য ছিল না। তিনি মনে করতেন, দীর্ঘসূত্রিতা আরও প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

তিনি আরও দাবি করেন, রিফাত-মাসুদদের ভয়ভীতি দেখিয়ে রাজি করানোর অভিযোগ কিংবা নাহিদ-মাহফুজদের পরবর্তীকালে দেওয়া ‘কোয়াটার থেকে চাপ’ বা ‘ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখার ফাঁদ’—এসব বক্তব্য তার কাছে সত্য বলে মনে হয়নি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, রিফাতরা পরে তাকে জানিয়েছিলেন, তারা গুলির মুখে জিম্মি বা জোরপূর্বক রাজি করানোর অভিযোগ সে অর্থে করেননি। তবে সার্বিক পরিস্থিতিতে তারা ভীত ও উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় ভুগছিলেন। তিনি বলেন, তার নিজের পাশে বিভিন্ন মানুষের সমর্থন থাকলেও রিফাতরা তখন তিনজন একটি বাসায় একা ছিলেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, যাদেরকে পরে ‘কোয়াটার’ বা ‘ফাঁদের অংশ’ বলা হয়েছে, তারাই ২২-২৩ জুলাই থেকে তাদের চারজনকে নিরাপত্তা দিয়েছিলেন এবং নিজেদের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

আবদুল কাদেরের দাবি, এক দফা নিয়ে প্রথম আলোচনায় ছিলেন একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকের এক নারী সাংবাদিক, ওয়াহিদ আলম এবং তায়সীর কাদের চৌধুরী। পরে অনলাইনে যুক্ত হন সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এবং পরে ফোনে মতামত দেন মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন। তাদের সবার অংশগ্রহণে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এগোয়।

তিনি আরও জানান, ওয়াহিদ আলমের মাধ্যমে সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মাঠের পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন এবং পাশে থাকার আশ্বাস দেন। একই সময়ে তায়সীর কাদের চৌধুরী বিএনপি নেতা মীর হেলালের সঙ্গেও পরামর্শ করেন।

আবদুল কাদেরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা, মতবিনিময় ও পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর এক দফা ঘোষণার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয় এবং এরপর রিফাতদের বিষয়টি জানানো হয়। তিনি বলেন, সেখানে উপস্থিত সবাই ভিন্ন ভিন্ন পটভূমির মানুষ ছিলেন এবং এক দফা নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও মতবিনিময় হয়েছিল। এটি ছিল একটি সাধারণ বাসায় অনুষ্ঠিত স্বাভাবিক আলোচনা, কোনো ‘কোয়াটার’ বা ‘ফাঁদ’ নয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঘোষণাপত্রে ছাত্রদের সমন্বয়ে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাবও ছিল। পাশাপাশি ছাত্রদল ও শিবিরের নেতারা নিজ নিজ দলের সঙ্গে আলোচনা করে এক দফার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছিলেন। তাই এটিকে ‘কোয়াটার থেকে আসা পরিকল্পনা’ বা ‘ফ্যাসিবাদের অংশ’ হিসেবে দেখার কোনো ভিত্তি তিনি খুঁজে পান না।

সবশেষে তিনি বলেন, ভয়ভীতির অভিযোগ বলতে কেবল একটি ঘটনা ঘটেছিল। রিফাতরা যখন নিরাপত্তার শর্তে এক দফায় রাজি হয়ে পরে আবার সিদ্ধান্ত বদলাতে থাকেন এবং ফোন ধরা বন্ধ করেন, তখন ওই নারী সাংবাদিক বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, "তোমাদের বিষয়ে আমরা আর মাথা ঘামাবো না, কাল থেকে তোমরা কোথায় থাকবে না থাকবে, আমরা আর জানি না।" অন্যদিকে ওয়াহিদ আলম বারবার বলেন, এক দফা ঘোষণা দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণ তাদের সিদ্ধান্ত; তারা কেবল পরামর্শ ও সহযোগিতা করতে পারেন। আবদুল কাদেরের দাবি, এর বাইরে ভয়ভীতি বা জোর করার মতো কিছু তার চোখে পড়েনি এবং সে সময়ের আলোচনার একটি অংশ তার কাছে রেকর্ডও রয়েছে।

সূত্র: মানবজমিন

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬


কাদেরের স্ট্যাটাস ঘিরে তোলপাড়, এক দফা ঘোষণার নেপথ্য নিয়ে বিস্তৃত বক্তব্য

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয় দিনটি। সেদিন রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও ফ্যাসিবাদ বিলোপের দাবিতে এক দফা ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মাত্র দুই দিন পর দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এক দফা ঘোষণার পেছনের প্রেক্ষাপট, সে সময়ের পরিস্থিতি এবং কার কী ভূমিকা ছিল—এসব নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান তুলে ধরে সোমবার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দীর্ঘ একটি পোস্ট দেন গণঅভ্যুত্থানের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের। 'ঐতিহাসিক এক দফার নেপথ্যের ইতিহাস, কিছু বিষয় আপনাদের কাছে ক্লিয়ার করা জরুরী' শিরোনামের ওই পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঘিরে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

পোস্টে আবদুল কাদের জানান, ১ আগস্ট বৃহস্পতিবার ডিবি হেফাজত থেকে ছয় সমন্বয়ক মুক্তি পান। বের হওয়ার পর তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয়নি, যদিও ব্যক্তিগতভাবে দু-একজনের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। তিনি বলেন, মাহিন, মাসুদ, রিফাত এবং তিনি নিজেরা আলোচনা করে ২ আগস্ট শুক্রবারের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তবে ডিবি থেকে ফিরে আসা সমন্বয়কদের একটি অংশ এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি তোলে এবং বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। পরে বিরোধ নিরসন ও পরবর্তী পরিকল্পনার জন্য জুমার নামাজের পর অনলাইনে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, শুক্রবারের কর্মসূচি ঘোষণা নিয়ে নানা বাধা থাকলেও এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। জুমার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়, বিশেষ করে চট্টগ্রামে। সে সময় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত স্লোগান ছিল, "দফা এক, দাবি এক—খুনি হাসিনার পদত্যাগ।" পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি তখন ফেসবুকে লেখেন, "আমরা শীঘ্রই চূড়ান্ত ডাক দিচ্ছি।"

আবদুল কাদেরের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময় অনলাইন বৈঠক শুরু হলে সেখানে তৎকালীন ছাত্রশক্তির নেতারা অংশ নেন। হাসনাত ও সারজিস উপস্থিত ছিলেন না। বৈঠকে প্রথমে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয় এবং একজন-দুজনের ভিন্নমত ছাড়া সবাই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন।

এরপর সিদ্ধান্ত হয়, তিনি, মাসুদ, রিফাত ও মাহিন পরবর্তী তিন-চার দিন আন্দোলন পরিচালনা করবেন এবং সিনিয়ররা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হবেন। বৈঠকে তিনি ও রিফাত এক দফার প্রসঙ্গ তোলেন এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, শিক্ষক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী ও শিল্পীদের সমর্থন, সলিমুল্লাহ খানের বক্তব্য এবং চলমান দ্রোহযাত্রার বিষয়ও সেখানে আলোচনায় আসে। তবে বৈঠকে সাত থেকে দশ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর এক দফায় যাওয়ার মতামত দেওয়া হয়। পাশাপাশি পরদিন ৩ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, দীর্ঘ অনলাইন বৈঠক শেষে তার বাসায় এক নারী সাংবাদিক ও ওয়াহিদ আলম নামে একজন আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচনার সময় এক দফা ঘোষণার বিষয়টি উঠে আসে। এরপর তিনি বিভিন্ন পরিচিতজনের মতামত নেন এবং ছাত্রদলের রাকিব-নাসির ও শিবিরের সাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, নাসির বলেন বিষয়টি চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং সাদিক জানান, তিনি দলের জ্যেষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলে জানাবেন।

এরপর তিনি ওই দুই অতিথিকে জানান, তিনি এক দফার পক্ষে প্রস্তুত এবং ছাত্রদল ও শিবিরের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। তবে তিনি একা সিদ্ধান্ত নিতে চান না, রিফাত, মাহিন ও মাসুদের সম্মতিও প্রয়োজন।

পরে ওই তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, ডিবি থেকে সদ্য মুক্ত হওয়া সিনিয়ররাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। একই সঙ্গে তারা নিজেদের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে এক দফা নিয়ে এগোনোর কথা বলেন। আবদুল কাদের জানান, তিনি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে প্রাণহানি বাড়তে পারে এবং পরিস্থিতি এক দফার উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। এ সময় তিনি আরও একটি তথ্য পান যে, ৩ আগস্ট শেখ হাসিনা নয় দফা মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা তাকে আরও দ্রুত এক দফার বিষয়ে এগোতে উৎসাহিত করে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে রিফাতরা এক দফার বিষয়ে সম্মত হন। এরপর তাদের সঙ্গে আলোচনা করে ঘোষণাপত্রের খসড়া তৈরি করা হয়। খসড়াটি প্রস্তুত করেন ওই নারী সাংবাদিকের এক সহকর্মী এবং সংযোজন-বিয়োজন করেন ওয়াহিদ আলম। পরে খসড়া রিফাতদের কাছে পাঠানো হলে তারা কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনের পরামর্শ দেন। একই সময়ে তিনি ছাত্রদল, শিবিরসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যান।

আবদুল কাদের দাবি করেন, পুরো সময়জুড়ে তিনি ডিবি থেকে ফেরা সিনিয়র সমন্বয়কদের সঙ্গে এক দফার বিষয়ে যোগাযোগ করেননি। তার ভাষায়, দুপুরের বৈঠকে তাদের অবস্থান পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় তিনি আর যোগাযোগের প্রয়োজন মনে করেননি। এছাড়া তখন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, রাত প্রায় ১০টার দিকে ছাত্রদলের নাসির তাকে জানান, চেয়ারম্যানও মনে করছেন এক দফা ঘোষণার উপযুক্ত সময় এসেছে। অন্যদিকে শিবিরের সাদিক জানান, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং নামাজ পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলেন। পরে উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হয় এবং তিনি ঘোষণার একটি ভিডিওও তৈরি করেন।

তবে এর কিছু পর রিফাতরা ফোন ধরা বন্ধ করে দেন। পরে তারা জানান, নাহিদদের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তারা এক দফার বিষয়ে সম্মতি দেননি। এতে তারা নিজেরাও সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। আবদুল কাদের বলেন, এতে তারা বিস্মিত হন, কারণ তাদের সম্মতির ভিত্তিতেই প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ হয়েছিল।

পরে ৫ আগস্টের পর নাহিদদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, রিফাতরা অভিযোগ করেছিলেন যে, তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এক দফায় রাজি করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই নাহিদরা তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হলে এক দফা না দেওয়ার পরামর্শ দেন বলে তিনি দাবি করেন।

পরবর্তীতে রিফাতরা তাকে জানান, আপাতত তারা এক দফা দেবেন না। তবে নাহিদরা পরদিন মাঠ থেকেই এক দফা ঘোষণা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি এটিও জানানো হয়, যদি তা না হয়, তাহলে তারা চারজন মিলে এক দফা ঘোষণা করবেন। এই আশ্বাসের ভিত্তিতেই তিনি সেদিন প্রস্তুত করা ভিডিও প্রকাশ করেননি।

পোস্টে আবদুল কাদের বলেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল এক দফা ঘোষণা নিশ্চিত করা। কার মাধ্যমে ঘোষণা আসছে, সেটি তার কাছে মুখ্য ছিল না। তিনি মনে করতেন, দীর্ঘসূত্রিতা আরও প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

তিনি আরও দাবি করেন, রিফাত-মাসুদদের ভয়ভীতি দেখিয়ে রাজি করানোর অভিযোগ কিংবা নাহিদ-মাহফুজদের পরবর্তীকালে দেওয়া ‘কোয়াটার থেকে চাপ’ বা ‘ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখার ফাঁদ’—এসব বক্তব্য তার কাছে সত্য বলে মনে হয়নি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, রিফাতরা পরে তাকে জানিয়েছিলেন, তারা গুলির মুখে জিম্মি বা জোরপূর্বক রাজি করানোর অভিযোগ সে অর্থে করেননি। তবে সার্বিক পরিস্থিতিতে তারা ভীত ও উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় ভুগছিলেন। তিনি বলেন, তার নিজের পাশে বিভিন্ন মানুষের সমর্থন থাকলেও রিফাতরা তখন তিনজন একটি বাসায় একা ছিলেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, যাদেরকে পরে ‘কোয়াটার’ বা ‘ফাঁদের অংশ’ বলা হয়েছে, তারাই ২২-২৩ জুলাই থেকে তাদের চারজনকে নিরাপত্তা দিয়েছিলেন এবং নিজেদের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

আবদুল কাদেরের দাবি, এক দফা নিয়ে প্রথম আলোচনায় ছিলেন একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকের এক নারী সাংবাদিক, ওয়াহিদ আলম এবং তায়সীর কাদের চৌধুরী। পরে অনলাইনে যুক্ত হন সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এবং পরে ফোনে মতামত দেন মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন। তাদের সবার অংশগ্রহণে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এগোয়।

তিনি আরও জানান, ওয়াহিদ আলমের মাধ্যমে সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মাঠের পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন এবং পাশে থাকার আশ্বাস দেন। একই সময়ে তায়সীর কাদের চৌধুরী বিএনপি নেতা মীর হেলালের সঙ্গেও পরামর্শ করেন।

আবদুল কাদেরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা, মতবিনিময় ও পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর এক দফা ঘোষণার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয় এবং এরপর রিফাতদের বিষয়টি জানানো হয়। তিনি বলেন, সেখানে উপস্থিত সবাই ভিন্ন ভিন্ন পটভূমির মানুষ ছিলেন এবং এক দফা নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও মতবিনিময় হয়েছিল। এটি ছিল একটি সাধারণ বাসায় অনুষ্ঠিত স্বাভাবিক আলোচনা, কোনো ‘কোয়াটার’ বা ‘ফাঁদ’ নয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঘোষণাপত্রে ছাত্রদের সমন্বয়ে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাবও ছিল। পাশাপাশি ছাত্রদল ও শিবিরের নেতারা নিজ নিজ দলের সঙ্গে আলোচনা করে এক দফার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছিলেন। তাই এটিকে ‘কোয়াটার থেকে আসা পরিকল্পনা’ বা ‘ফ্যাসিবাদের অংশ’ হিসেবে দেখার কোনো ভিত্তি তিনি খুঁজে পান না।

সবশেষে তিনি বলেন, ভয়ভীতির অভিযোগ বলতে কেবল একটি ঘটনা ঘটেছিল। রিফাতরা যখন নিরাপত্তার শর্তে এক দফায় রাজি হয়ে পরে আবার সিদ্ধান্ত বদলাতে থাকেন এবং ফোন ধরা বন্ধ করেন, তখন ওই নারী সাংবাদিক বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, "তোমাদের বিষয়ে আমরা আর মাথা ঘামাবো না, কাল থেকে তোমরা কোথায় থাকবে না থাকবে, আমরা আর জানি না।" অন্যদিকে ওয়াহিদ আলম বারবার বলেন, এক দফা ঘোষণা দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণ তাদের সিদ্ধান্ত; তারা কেবল পরামর্শ ও সহযোগিতা করতে পারেন। আবদুল কাদেরের দাবি, এর বাইরে ভয়ভীতি বা জোর করার মতো কিছু তার চোখে পড়েনি এবং সে সময়ের আলোচনার একটি অংশ তার কাছে রেকর্ডও রয়েছে।

সূত্র: মানবজমিন


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - মোঃ আতিকুল ইসলাম
প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক - মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয় 
সহ-সম্পাদক- মোঃ জাকারিয়া হোসেন
বার্তা সম্পাদক - সর্বজিৎ চাকমা

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
কাদেরের স্ট্যাটাস ঘিরে তোলপাড়, এক দফা ঘোষণার নেপথ্য নিয়ে বিস্তৃত বক্তব্য
0:00 0:00
1.0x