বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী মো. আব্দুল মান্নান এবং জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. ওবায়দুর রহমান।
তারা জানান, বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালতের বিচারক সোনা মিয়ার জামিন মঞ্জুর করেন। ওইদিন সন্ধ্যায় জামিনের আদেশ কারাগারে পৌঁছায়। এরপর শুক্রবার সকালে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
আইনজীবী মো. আব্দুল মান্নান জানান, সোনা মিয়াকে চারটি শর্তে জামিন দেওয়া হয়েছে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিতে হবে, প্রতি সপ্তাহে থানায় হাজিরা দিতে হবে, কোনোভাবেই দেশত্যাগ করা যাবে না এবং প্রতি তিন মাস পরপর আদালতে হাজির হতে হবে।
আইনজীবী সমিতির সভাপতি আরও জানান, এ ঘটনায় প্রকৃত মূল আসামিকে দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং আদালতে সোপর্দ করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি শুরু হয় ২০২০ সালের ২ মার্চ। সেদিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দায়ের করা মামলায় সোনা মিয়াকে এজাহারের ২ নম্বর আসামি করা হয়।
এজাহারে তার বাবার নাম নজির আহমদ এবং বর্তমান ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া উল্লেখ করা হয়। স্থায়ী ঠিকানা দেখানো হয় রামু উপজেলার গর্জনিয়া।
অভিযানের সময় ওই ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া একটি জন্মনিবন্ধনের ফটোকপির ভিত্তিতেই সোনা মিয়া হিসেবে তার পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছিল বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২ নম্বর আসামির নাম ও ঠিকানা যাচাই করতে কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ অনুসন্ধান করে। কিন্তু অনুসন্ধানে সোনা মিয়ার দেওয়া নাম ও ঠিকানার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক না হওয়ায় তাকে কারাগারে রেখে মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ করার অনুরোধ করা হয়েছিল।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন কথিত সোনা মিয়া কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালত থেকে জামিন পান। পরে কারাগার থেকে বের হয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
এর দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত ওই মামলায় সোনা মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়ের পর গত ২৩ জুন কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনরত র্যাব-১৫-এর এক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসারের ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে র্যাবের অভিযানে জন্মনিবন্ধনে থাকা সোনা মিয়া গ্রেপ্তার হলেও প্রকৃত অপরাধী রমজান আলী তখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
কারাগারে নেওয়ার পর সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে দাবি করেন, তিনি ওই মামলার আসামি নন। কারাগারে যাওয়ার পরই তিনি জানতে পারেন, তাকে একটি মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিষয়টি কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে জেলা জজ আদালতে জানানো হয়। পরে সেখান থেকে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় বিষয়টি পাঠানো হয়।
পুলিশের তদন্তে তখন বেরিয়ে আসে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ এবং ২০২৬ সালে মৃত্যুদণ্ডের পর গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলীও বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
আদালতের নির্দেশে সদর থানা পুলিশ নতুন করে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি অন্য একজনের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু মামলায় তাকেই সোনা মিয়া নামে আসামি করে বিচার করা হয় এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়।
আদালতের নির্দেশে গত ২ জুলাই সদর থানা পুলিশ নতুন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া ভিন্ন ব্যক্তি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেছিলেন। তার আসল নাম রমজান আলী।
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকতেন। পরে তারা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস শুরু করেন। একপর্যায়ে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন কার্ড রমজানের কাছে থেকে যায়। সেই জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই সময়ে কারাগারে সংরক্ষিত তথ্যেও তাদের পরিচয়ের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে।
২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির বাবার নাম মৃত নজির আহমদ, মায়ের নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা উল্লেখ ছিল। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে বাম ও ডান গালে এবং ডান বাহুতে ক্ষত থাকার কথা নথিতে উল্লেখ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার বাবার নামও মৃত নজির আহমদ উল্লেখ করা হলেও মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহুতে তিল, পেটের বাম পাশে তিল এবং পিঠের মাঝখানে তিলের কথা উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর তদন্ত এবং জামিন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই জানিয়েছিলেন যে সোনা মিয়ার নাম ও ঠিকানা সঠিক নয়। এরপরও কীভাবে ওই পরিচয়ে থাকা ব্যক্তি আদালত থেকে জামিন পেলেন এবং পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলেন, মামলা দায়ের থেকে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তদন্ত কর্মকর্তার বড় ধরনের গাফিলতি ছিল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
তার মতে, কোনো ব্যক্তি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে পরিচয় দিলে সেটি যাচাই করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। কিন্তু এখানে প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তদন্তে সোনা মিয়ার প্রকৃত নাম রমজান—এ তথ্যও বের করা হয়নি। ফলে প্রকৃত আসামি জামিন নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। পরে প্রকৃত সোনা মিয়াকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এবং বর্তমানে বান্দরবানের রুমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মানস বড়ুয়া বলেন, তদন্তের সময় মূল আসামির সঠিক নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। মিথ্যা পরিচয় দেওয়ার কারণে ওই আসামিকে কারাগারে রেখে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার অনুরোধ করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনরত র্যাব-১৫-এর সহকারী পরিচালক (আইন ও গণমাধ্যম) ও সহকারী পুলিশ সুপার আ. ম. ফারুক বলেন, ওয়ারেন্টের ভিত্তিতেই র্যাব ওই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। নাম ও ঠিকানা যাচাই করে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, আদালত থেকে যে নাম ও ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল, সেটির ভিত্তিতেই র্যাব সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে।
সূত্র: আমার দেশ

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী মো. আব্দুল মান্নান এবং জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. ওবায়দুর রহমান।
তারা জানান, বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালতের বিচারক সোনা মিয়ার জামিন মঞ্জুর করেন। ওইদিন সন্ধ্যায় জামিনের আদেশ কারাগারে পৌঁছায়। এরপর শুক্রবার সকালে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
আইনজীবী মো. আব্দুল মান্নান জানান, সোনা মিয়াকে চারটি শর্তে জামিন দেওয়া হয়েছে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিতে হবে, প্রতি সপ্তাহে থানায় হাজিরা দিতে হবে, কোনোভাবেই দেশত্যাগ করা যাবে না এবং প্রতি তিন মাস পরপর আদালতে হাজির হতে হবে।
আইনজীবী সমিতির সভাপতি আরও জানান, এ ঘটনায় প্রকৃত মূল আসামিকে দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং আদালতে সোপর্দ করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি শুরু হয় ২০২০ সালের ২ মার্চ। সেদিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দায়ের করা মামলায় সোনা মিয়াকে এজাহারের ২ নম্বর আসামি করা হয়।
এজাহারে তার বাবার নাম নজির আহমদ এবং বর্তমান ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া উল্লেখ করা হয়। স্থায়ী ঠিকানা দেখানো হয় রামু উপজেলার গর্জনিয়া।
অভিযানের সময় ওই ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া একটি জন্মনিবন্ধনের ফটোকপির ভিত্তিতেই সোনা মিয়া হিসেবে তার পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছিল বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২ নম্বর আসামির নাম ও ঠিকানা যাচাই করতে কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ অনুসন্ধান করে। কিন্তু অনুসন্ধানে সোনা মিয়ার দেওয়া নাম ও ঠিকানার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক না হওয়ায় তাকে কারাগারে রেখে মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ করার অনুরোধ করা হয়েছিল।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন কথিত সোনা মিয়া কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালত থেকে জামিন পান। পরে কারাগার থেকে বের হয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
এর দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত ওই মামলায় সোনা মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়ের পর গত ২৩ জুন কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনরত র্যাব-১৫-এর এক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসারের ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে র্যাবের অভিযানে জন্মনিবন্ধনে থাকা সোনা মিয়া গ্রেপ্তার হলেও প্রকৃত অপরাধী রমজান আলী তখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
কারাগারে নেওয়ার পর সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে দাবি করেন, তিনি ওই মামলার আসামি নন। কারাগারে যাওয়ার পরই তিনি জানতে পারেন, তাকে একটি মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিষয়টি কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে জেলা জজ আদালতে জানানো হয়। পরে সেখান থেকে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় বিষয়টি পাঠানো হয়।
পুলিশের তদন্তে তখন বেরিয়ে আসে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ এবং ২০২৬ সালে মৃত্যুদণ্ডের পর গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলীও বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
আদালতের নির্দেশে সদর থানা পুলিশ নতুন করে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি অন্য একজনের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু মামলায় তাকেই সোনা মিয়া নামে আসামি করে বিচার করা হয় এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়।
আদালতের নির্দেশে গত ২ জুলাই সদর থানা পুলিশ নতুন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া ভিন্ন ব্যক্তি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেছিলেন। তার আসল নাম রমজান আলী।
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকতেন। পরে তারা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস শুরু করেন। একপর্যায়ে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন কার্ড রমজানের কাছে থেকে যায়। সেই জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই সময়ে কারাগারে সংরক্ষিত তথ্যেও তাদের পরিচয়ের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে।
২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির বাবার নাম মৃত নজির আহমদ, মায়ের নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা উল্লেখ ছিল। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে বাম ও ডান গালে এবং ডান বাহুতে ক্ষত থাকার কথা নথিতে উল্লেখ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার বাবার নামও মৃত নজির আহমদ উল্লেখ করা হলেও মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহুতে তিল, পেটের বাম পাশে তিল এবং পিঠের মাঝখানে তিলের কথা উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর তদন্ত এবং জামিন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই জানিয়েছিলেন যে সোনা মিয়ার নাম ও ঠিকানা সঠিক নয়। এরপরও কীভাবে ওই পরিচয়ে থাকা ব্যক্তি আদালত থেকে জামিন পেলেন এবং পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলেন, মামলা দায়ের থেকে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তদন্ত কর্মকর্তার বড় ধরনের গাফিলতি ছিল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
তার মতে, কোনো ব্যক্তি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে পরিচয় দিলে সেটি যাচাই করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। কিন্তু এখানে প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তদন্তে সোনা মিয়ার প্রকৃত নাম রমজান—এ তথ্যও বের করা হয়নি। ফলে প্রকৃত আসামি জামিন নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। পরে প্রকৃত সোনা মিয়াকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এবং বর্তমানে বান্দরবানের রুমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মানস বড়ুয়া বলেন, তদন্তের সময় মূল আসামির সঠিক নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। মিথ্যা পরিচয় দেওয়ার কারণে ওই আসামিকে কারাগারে রেখে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার অনুরোধ করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনরত র্যাব-১৫-এর সহকারী পরিচালক (আইন ও গণমাধ্যম) ও সহকারী পুলিশ সুপার আ. ম. ফারুক বলেন, ওয়ারেন্টের ভিত্তিতেই র্যাব ওই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। নাম ও ঠিকানা যাচাই করে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, আদালত থেকে যে নাম ও ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল, সেটির ভিত্তিতেই র্যাব সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে।
সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন