গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পরদিন অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সরকারের তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছিল। এগুলো হলো—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। এরপর পার হয়েছে ১৮০ দিন। ফলে ছয় মাস পর প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের নির্ধারিত অগ্রাধিকারগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে।
কারণ, গত ছয় মাসে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
তবে সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কয়েকটি উদ্যোগ ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায়কে গুরুত্ব না দেওয়ায় নতুন করে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে সরকারের দাবি, ছয় মাসের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় সবই অর্জন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি যে অঙ্গীকার করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে। গত ছয় মাসে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যের বেশিরভাগই পূরণ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদ সদস্যদের ট্যাক্সমুক্ত গাড়ি না নেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া কয়েকটি উদ্যোগও সাধারণ মানুষের প্রশংসা পেয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা ছিল। বিভিন্ন অপরাধ এবং মব ভায়োলেন্স নিয়েও উদ্বেগ ছিল। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসেও পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হয়নি বলে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) নিয়মিত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। সংস্থাটির ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসের প্রতিবেদনে গণপিটুনি, রাজনৈতিক সংঘাত, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং কারাগারে মৃত্যুর একাধিক ঘটনা উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন বা সহিংসতায় ২২০ জন মারা গেছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে নয়টি। কারাগারে বন্দি বা বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৫৫ জন। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি।
একই সময়ে মব সহিংসতায় ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটিও (এইচআরএসএস) দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনে জানুয়ারি মাসের তথ্যও রয়েছে। ওই সময় ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ছিল ৫২৯টি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তা বেড়ে ৮৩০টিতে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪২। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের ঘটনা ৫৬ শতাংশ বেড়েছে।
এ ছাড়া আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় বিরোধী দল এনসিপি ও জামায়াতের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, সরকারের মধ্যে শুরুতে যে উদ্বেগ ছিল, তা ধীরে ধীরে কমেনি। গত ছয় মাসেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
তার মতে, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে অপরাধ প্রবণতা কমছে না। খুন, চাঁদাবাজি, নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো ঘটনাও বাড়ছে।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। উচ্চ সরকারি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং বিনিয়োগ সংকট শুরু থেকেই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই দেশের অর্থনীতি নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে ছিল। বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ধীরগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং জনসেবার অবনতির কারণে মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারও অর্থনৈতিক খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ছয় মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়, আবার একেবারে কম সময়ও নয়।
তিনি বলেন, সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে এগিয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে। আগে একীভূত করা পাঁচটি ব্যাংক কার্যকর করার উদ্যোগকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি।
তবে দ্রব্যমূল্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
অর্থনীতিবিদেরা সামাজিক নিরাপত্তা খাতের কিছু পদক্ষেপকে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকেও সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন তারা।
তবে বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে এখনো ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও ঘাটতি ছিল। বন্ধ কারখানা চালু করতে সরকার একটি তহবিল গঠন করেছে। অপচয় না হলে এর সুফল পাওয়া যেতে পারে। কারখানাগুলো চালু হলে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
গত চার বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং এর প্রভাবে দ্রব্যমূল্যও বেড়েছে। নিম্ন ও সাধারণ আয়ের মানুষের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের চাপ এখনো রয়েছে। আর্থিক নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মূল্যস্ফীতি কমানো কঠিন।
সরকারের ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির কারণ হওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ খাত অন্যতম। লোডশেডিং এবং অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে।
গত কয়েক মাসে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং তীব্র হয়েছে। মধ্যরাতের পর দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এর মধ্যে চলতি মাসের শুরুতে বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে জুন মাসের ব্যবহারের বিপরীতে পাওয়া বিল নিয়ে অনেক গ্রাহক প্রশ্ন তোলেন। তাদের অভিযোগ, স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, কী প্রক্রিয়ায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। অনেক গ্রাহক সকালে উঠে দেখেছেন তাদের বিল দ্বিগুণ হয়েছে। তার মতে, ছয় মাসে অন্তত বিদ্যুৎ খাতকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব ছিল।
জ্বালানি খাতের সংকটও সরকারের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইরান, আমেরিকা ও ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়।
এরপর গত মাসের শেষ দিকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ গ্যাস সংকট দেখা দেয়। গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে অনেক এলাকার পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে।
এ অবস্থায় আগস্টের শুরুতে প্রথমবার সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে কর্মসূচি পালন করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বিরোধী দল সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিতেও যায়।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ছাড়া জীবন ও অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সরকারকে এই দুই খাতে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। তা না হলে জীবন ও অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
বিএনপিও জ্বালানি সংকটের বিষয়টি স্বীকার করছে। তবে দলটি এটিকে সরকারের ত্রুটি হিসেবে দেখছে না।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, আন্তর্জাতিক সংকট এবং একটি টার্মিনাল নষ্ট হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং এ বিষয়ে কাজ চলছে।
অর্থনীতি, রাজনীতি ও সুশাসনের নানা ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা থাকলেও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে কয়েকজন বিশ্লেষক ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
এর অন্যতম কারণ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া। ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়া বর্তমান সরকারের বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন তারেক রহমান। এটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। প্রথমে তিনি মালয়েশিয়া যান এবং পরে সেখান থেকে চীনে যান।
সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
বিশ্লেষকেরা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডর এবং চীনের সঙ্গে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষায় ‘টু প্লাস টু’ সমঝোতাকে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবিরের মতে, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর সফলতার মধ্যে পড়ে। চীনের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব এবং তিস্তা প্রকল্পে চীনের ফিজিবিলিটি স্টাডিতে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এগুলো সাফল্য।
তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনো জটিলতা রয়েছে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্যও আলাদা আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল।
তবে রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ভারত সফরের জন্য তারা অনুকূল পরিবেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এক ব্রিফিংয়ে বলেন, দুই দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ রাখছে। তবে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের পর সফরের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও পরিষ্কার বলে জানান তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সম্পন্ন হলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে তা সহায়ক হতে পারে।
গণঅভ্যুত্থানের পর হাসিনা সরকারের সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ, একতরফা নির্বাচন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জোরালো হয়।
সংস্কারের উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকটি কমিশন গঠন করে। তাদের সুপারিশ নিয়ে ঐকমত্য কমিশনও গঠন করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এসব সুপারিশ নিয়ে জুলাই সনদ তৈরি হয়। পরে এর ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়।
তবে বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ওই গণভোটের আদেশকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করায় শুরুতেই বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
এ ছাড়া স্বাধীন বিচার বিভাগ, গুম কমিশন গঠন এবং দুর্নীতি দমনের মতো কয়েকটি বিষয়ে ছয় মাস পার হতে চললেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন অনুমোদন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের কার্যকারিতা এবং পুলিশ সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতিও হতাশা তৈরি করেছে বলে তারা মনে করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, বিএনপির কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল দলটি পরিবর্তন ও সংস্কারে গুরুত্ব দেবে। কিন্তু নির্বাচনের পর ছয় মাসে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কিংবা রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে মানুষ ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পায়নি।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংস্কারের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মাঠের আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত-এনসিপি জোট।
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ ও সাফল্য থাকলেও মানুষের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর কিছু উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কয়েকটি অর্জন সরকারের ইতিবাচক দিক হিসেবে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে সরকারের সামনে এখনো বড় পরীক্ষা রয়েছে।
সরকারের দাবি, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে এবং ছয় মাসের লক্ষ্যমাত্রার অধিকাংশই অর্জিত হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে, আগামী সময়ে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাপ কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংস্কার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা।
সূত্র: আমার দেশ।

সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পরদিন অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সরকারের তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছিল। এগুলো হলো—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। এরপর পার হয়েছে ১৮০ দিন। ফলে ছয় মাস পর প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের নির্ধারিত অগ্রাধিকারগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে।
কারণ, গত ছয় মাসে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
তবে সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কয়েকটি উদ্যোগ ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায়কে গুরুত্ব না দেওয়ায় নতুন করে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে সরকারের দাবি, ছয় মাসের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় সবই অর্জন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি যে অঙ্গীকার করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে। গত ছয় মাসে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যের বেশিরভাগই পূরণ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদ সদস্যদের ট্যাক্সমুক্ত গাড়ি না নেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া কয়েকটি উদ্যোগও সাধারণ মানুষের প্রশংসা পেয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা ছিল। বিভিন্ন অপরাধ এবং মব ভায়োলেন্স নিয়েও উদ্বেগ ছিল। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসেও পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হয়নি বলে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) নিয়মিত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। সংস্থাটির ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসের প্রতিবেদনে গণপিটুনি, রাজনৈতিক সংঘাত, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং কারাগারে মৃত্যুর একাধিক ঘটনা উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন বা সহিংসতায় ২২০ জন মারা গেছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে নয়টি। কারাগারে বন্দি বা বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৫৫ জন। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি।
একই সময়ে মব সহিংসতায় ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটিও (এইচআরএসএস) দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনে জানুয়ারি মাসের তথ্যও রয়েছে। ওই সময় ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ছিল ৫২৯টি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তা বেড়ে ৮৩০টিতে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪২। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের ঘটনা ৫৬ শতাংশ বেড়েছে।
এ ছাড়া আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় বিরোধী দল এনসিপি ও জামায়াতের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, সরকারের মধ্যে শুরুতে যে উদ্বেগ ছিল, তা ধীরে ধীরে কমেনি। গত ছয় মাসেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
তার মতে, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে অপরাধ প্রবণতা কমছে না। খুন, চাঁদাবাজি, নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো ঘটনাও বাড়ছে।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। উচ্চ সরকারি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং বিনিয়োগ সংকট শুরু থেকেই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই দেশের অর্থনীতি নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে ছিল। বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ধীরগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং জনসেবার অবনতির কারণে মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারও অর্থনৈতিক খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ছয় মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়, আবার একেবারে কম সময়ও নয়।
তিনি বলেন, সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে এগিয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে। আগে একীভূত করা পাঁচটি ব্যাংক কার্যকর করার উদ্যোগকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি।
তবে দ্রব্যমূল্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
অর্থনীতিবিদেরা সামাজিক নিরাপত্তা খাতের কিছু পদক্ষেপকে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকেও সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন তারা।
তবে বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে এখনো ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও ঘাটতি ছিল। বন্ধ কারখানা চালু করতে সরকার একটি তহবিল গঠন করেছে। অপচয় না হলে এর সুফল পাওয়া যেতে পারে। কারখানাগুলো চালু হলে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
গত চার বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং এর প্রভাবে দ্রব্যমূল্যও বেড়েছে। নিম্ন ও সাধারণ আয়ের মানুষের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের চাপ এখনো রয়েছে। আর্থিক নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মূল্যস্ফীতি কমানো কঠিন।
সরকারের ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির কারণ হওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ খাত অন্যতম। লোডশেডিং এবং অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে।
গত কয়েক মাসে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং তীব্র হয়েছে। মধ্যরাতের পর দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এর মধ্যে চলতি মাসের শুরুতে বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে জুন মাসের ব্যবহারের বিপরীতে পাওয়া বিল নিয়ে অনেক গ্রাহক প্রশ্ন তোলেন। তাদের অভিযোগ, স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, কী প্রক্রিয়ায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। অনেক গ্রাহক সকালে উঠে দেখেছেন তাদের বিল দ্বিগুণ হয়েছে। তার মতে, ছয় মাসে অন্তত বিদ্যুৎ খাতকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব ছিল।
জ্বালানি খাতের সংকটও সরকারের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইরান, আমেরিকা ও ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়।
এরপর গত মাসের শেষ দিকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ গ্যাস সংকট দেখা দেয়। গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে অনেক এলাকার পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে।
এ অবস্থায় আগস্টের শুরুতে প্রথমবার সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে কর্মসূচি পালন করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বিরোধী দল সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিতেও যায়।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ছাড়া জীবন ও অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সরকারকে এই দুই খাতে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। তা না হলে জীবন ও অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
বিএনপিও জ্বালানি সংকটের বিষয়টি স্বীকার করছে। তবে দলটি এটিকে সরকারের ত্রুটি হিসেবে দেখছে না।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, আন্তর্জাতিক সংকট এবং একটি টার্মিনাল নষ্ট হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং এ বিষয়ে কাজ চলছে।
অর্থনীতি, রাজনীতি ও সুশাসনের নানা ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা থাকলেও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে কয়েকজন বিশ্লেষক ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
এর অন্যতম কারণ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া। ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়া বর্তমান সরকারের বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন তারেক রহমান। এটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। প্রথমে তিনি মালয়েশিয়া যান এবং পরে সেখান থেকে চীনে যান।
সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
বিশ্লেষকেরা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডর এবং চীনের সঙ্গে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষায় ‘টু প্লাস টু’ সমঝোতাকে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবিরের মতে, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর সফলতার মধ্যে পড়ে। চীনের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব এবং তিস্তা প্রকল্পে চীনের ফিজিবিলিটি স্টাডিতে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এগুলো সাফল্য।
তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনো জটিলতা রয়েছে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্যও আলাদা আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল।
তবে রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ভারত সফরের জন্য তারা অনুকূল পরিবেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এক ব্রিফিংয়ে বলেন, দুই দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ রাখছে। তবে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের পর সফরের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও পরিষ্কার বলে জানান তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সম্পন্ন হলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে তা সহায়ক হতে পারে।
গণঅভ্যুত্থানের পর হাসিনা সরকারের সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ, একতরফা নির্বাচন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জোরালো হয়।
সংস্কারের উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকটি কমিশন গঠন করে। তাদের সুপারিশ নিয়ে ঐকমত্য কমিশনও গঠন করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এসব সুপারিশ নিয়ে জুলাই সনদ তৈরি হয়। পরে এর ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়।
তবে বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ওই গণভোটের আদেশকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করায় শুরুতেই বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
এ ছাড়া স্বাধীন বিচার বিভাগ, গুম কমিশন গঠন এবং দুর্নীতি দমনের মতো কয়েকটি বিষয়ে ছয় মাস পার হতে চললেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন অনুমোদন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের কার্যকারিতা এবং পুলিশ সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতিও হতাশা তৈরি করেছে বলে তারা মনে করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, বিএনপির কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল দলটি পরিবর্তন ও সংস্কারে গুরুত্ব দেবে। কিন্তু নির্বাচনের পর ছয় মাসে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কিংবা রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে মানুষ ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পায়নি।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংস্কারের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মাঠের আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত-এনসিপি জোট।
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ ও সাফল্য থাকলেও মানুষের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর কিছু উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কয়েকটি অর্জন সরকারের ইতিবাচক দিক হিসেবে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে সরকারের সামনে এখনো বড় পরীক্ষা রয়েছে।
সরকারের দাবি, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে এবং ছয় মাসের লক্ষ্যমাত্রার অধিকাংশই অর্জিত হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে, আগামী সময়ে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাপ কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংস্কার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা।
সূত্র: আমার দেশ।

আপনার মতামত লিখুন