গত ২৮ জুলাই নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বড় চারিগাঁও এলাকায় নতুন একটি গ্যাসকূপ খননের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)।
দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস খাত ধীরে ধীরে বড় সংকটের দিকে যাচ্ছে। একদিকে প্রতিবছর দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে কমে আসছে উত্তোলনযোগ্য মজুত। বাড়তি চাহিদা পূরণে ফলে সরকারকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে দেশে গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে দেশের অধিকাংশ বড় গ্যাসক্ষেত্রের মজুতও শেষ পর্যায়ের দিকে পৌঁছেছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৬৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হতো। ওই সময় দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকে উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৩০১ মিলিয়ন ঘনফুট। তিতাসে ৪৪৩ মিলিয়ন, জালালাবাদে ২৩৬ মিলিয়ন এবং হবিগঞ্জে ১৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হতো।
২০২১ সালে উৎপাদন কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এরপর ২০২২ সাল থেকে উৎপাদন কমার প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়। ওই বছর উৎপাদন নেমে আসে ১ হাজার ৪৩৬ মিলিয়ন ঘনফুটে। ২০২৩ সালে দেশের ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১ হাজার ৩১১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়। ২০২৪ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৫৮ মিলিয়ন ঘনফুটে।
সর্বশেষ ২০২৫ সালে দেশের গ্যাস উৎপাদন ১ হাজার ১৬৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। অর্থাৎ ২০২০ সালের তুলনায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট বা প্রায় ৩০ শতাংশ।
উৎপাদন কমার প্রভাব দেশের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলোতেও পড়েছে। ২০২০ সালে বিবিয়ানা থেকে দৈনিক ১ হাজার ৩০১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হলেও ২০২৫ সালে তা কমে ৯৭২ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়ায়। একই সময়ে তিতাসে উৎপাদন ৪৪৩ থেকে কমে ৩৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট, হবিগঞ্জে ১৮৭ থেকে ১০৮ মিলিয়ন ঘনফুট এবং জালালাবাদে ২৩৬ থেকে ১৪৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে।
চলতি বছরে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ আগস্ট দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে মাত্র ৯০৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিবিয়ানা থেকে উৎপাদন হয়েছে ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ৫৬১ মিলিয়ন ঘনফুট কম। জালালাবাদ থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সামগ্রিকভাবে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।
২০২০ সালে দৈনিক গড়ে এলএনজি সরবরাহ ছিল ৫০৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৯০০ মিলিয়ন, ২০২২ সালে ৯২২ মিলিয়ন এবং ২০২৩ সালে ৯৭৩ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছায়। ২০২৪ সালে সাময়িকভাবে সরবরাহ কমে ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামলেও ২০২৫ সালে তা আবার বেড়ে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট হয়।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে এরই মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুতের প্রায় ৭৪ শতাংশ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমান হারে উৎপাদন অব্যাহত থাকলে অবশিষ্ট মজুত আরও ১০ থেকে ১১ বছর চলতে পারে। এ কারণে ২০৩১ সালের পর বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মোট উত্তোলনযোগ্য মজুত ২৯ হাজার ৯২৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার ৯১ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট মজুতের ৭৩ দশমিক ৮২ শতাংশ ইতোমধ্যে ব্যবহার হয়েছে।
অবশিষ্ট মজুতের বড় অংশ বর্তমানে তিতাস, রশিদপুর ও কৈলাসটিলা—এই তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে অবশিষ্ট মজুতের পরিমাণ ৬ হাজার ৩৬৭ বিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট অবশিষ্ট মজুতের ৮১ দশমিক ২৬ শতাংশ।
এর মধ্যে রশিদপুরে ২ হাজার ৩৮২ বিলিয়ন ঘনফুট, কৈলাসটিলায় ২ হাজার ৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট এবং তিতাসে ১ হাজার ৯২৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত রয়েছে।
অন্যদিকে হবিগঞ্জ, শ্রীকাইল ও বেগমগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রের মজুত প্রায় শেষ পর্যায়ে। বিবিয়ানা ও জালালাবাদ ক্ষেত্রের মজুতও কাগজে-কলমে শেষ হয়ে গেলেও সেখান থেকে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো সময় এসব ক্ষেত্রের উৎপাদন দ্রুত কমে যেতে পারে।
দেশে গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন কমলেও চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে এই চাহিদা প্রায় ৫ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে।
তবে বর্তমান দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সক্ষমতা দিয়ে এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে এলএনজি আমদানির ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ছে। জ্বালানি খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে, একটি নতুন গ্যাসকূপ খননে বাপেক্সের গড়ে ব্যয় হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা স্থানীয় গ্যাসের অর্ধেকের বেশি আসে শেভরন পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্র থেকে। কয়েক বছর ধরে অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে এসব ক্ষেত্রের মজুত দ্রুত কমেছে। অন্যদিকে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে, কিন্তু উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি।
তাদের ভাষ্য, দেশে গ্যাসের চাহিদা যে হারে বাড়ছে, তাতে এখনই নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, কূপ খনন এবং গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। তা না হলে আগামী দশকে দেশের গ্যাস খাত বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন কালবেলাকে বলেন, গ্যাসকূপের মজুত কমে যাওয়া স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। তবে নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত নতুন গ্যাসকূপের অনুসন্ধান ও খনন করা প্রয়োজন। বিগত সরকারগুলো তা করেনি। ফলে সামনে গ্যাস সংকট তৈরি হবে। কারণ এলএনজি দিয়ে একটি দেশের গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। সরকারের এখন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
সূত্র: কালবেলা।

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬
গত ২৮ জুলাই নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বড় চারিগাঁও এলাকায় নতুন একটি গ্যাসকূপ খননের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)।
দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস খাত ধীরে ধীরে বড় সংকটের দিকে যাচ্ছে। একদিকে প্রতিবছর দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে কমে আসছে উত্তোলনযোগ্য মজুত। বাড়তি চাহিদা পূরণে ফলে সরকারকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে দেশে গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে দেশের অধিকাংশ বড় গ্যাসক্ষেত্রের মজুতও শেষ পর্যায়ের দিকে পৌঁছেছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৬৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হতো। ওই সময় দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকে উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৩০১ মিলিয়ন ঘনফুট। তিতাসে ৪৪৩ মিলিয়ন, জালালাবাদে ২৩৬ মিলিয়ন এবং হবিগঞ্জে ১৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হতো।
২০২১ সালে উৎপাদন কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এরপর ২০২২ সাল থেকে উৎপাদন কমার প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়। ওই বছর উৎপাদন নেমে আসে ১ হাজার ৪৩৬ মিলিয়ন ঘনফুটে। ২০২৩ সালে দেশের ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১ হাজার ৩১১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়। ২০২৪ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৫৮ মিলিয়ন ঘনফুটে।
সর্বশেষ ২০২৫ সালে দেশের গ্যাস উৎপাদন ১ হাজার ১৬৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। অর্থাৎ ২০২০ সালের তুলনায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট বা প্রায় ৩০ শতাংশ।
উৎপাদন কমার প্রভাব দেশের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলোতেও পড়েছে। ২০২০ সালে বিবিয়ানা থেকে দৈনিক ১ হাজার ৩০১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হলেও ২০২৫ সালে তা কমে ৯৭২ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়ায়। একই সময়ে তিতাসে উৎপাদন ৪৪৩ থেকে কমে ৩৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট, হবিগঞ্জে ১৮৭ থেকে ১০৮ মিলিয়ন ঘনফুট এবং জালালাবাদে ২৩৬ থেকে ১৪৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে।
চলতি বছরে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ আগস্ট দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে মাত্র ৯০৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিবিয়ানা থেকে উৎপাদন হয়েছে ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ৫৬১ মিলিয়ন ঘনফুট কম। জালালাবাদ থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সামগ্রিকভাবে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।
২০২০ সালে দৈনিক গড়ে এলএনজি সরবরাহ ছিল ৫০৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৯০০ মিলিয়ন, ২০২২ সালে ৯২২ মিলিয়ন এবং ২০২৩ সালে ৯৭৩ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছায়। ২০২৪ সালে সাময়িকভাবে সরবরাহ কমে ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামলেও ২০২৫ সালে তা আবার বেড়ে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট হয়।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে এরই মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুতের প্রায় ৭৪ শতাংশ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমান হারে উৎপাদন অব্যাহত থাকলে অবশিষ্ট মজুত আরও ১০ থেকে ১১ বছর চলতে পারে। এ কারণে ২০৩১ সালের পর বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মোট উত্তোলনযোগ্য মজুত ২৯ হাজার ৯২৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার ৯১ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট মজুতের ৭৩ দশমিক ৮২ শতাংশ ইতোমধ্যে ব্যবহার হয়েছে।
অবশিষ্ট মজুতের বড় অংশ বর্তমানে তিতাস, রশিদপুর ও কৈলাসটিলা—এই তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে অবশিষ্ট মজুতের পরিমাণ ৬ হাজার ৩৬৭ বিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট অবশিষ্ট মজুতের ৮১ দশমিক ২৬ শতাংশ।
এর মধ্যে রশিদপুরে ২ হাজার ৩৮২ বিলিয়ন ঘনফুট, কৈলাসটিলায় ২ হাজার ৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট এবং তিতাসে ১ হাজার ৯২৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত রয়েছে।
অন্যদিকে হবিগঞ্জ, শ্রীকাইল ও বেগমগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রের মজুত প্রায় শেষ পর্যায়ে। বিবিয়ানা ও জালালাবাদ ক্ষেত্রের মজুতও কাগজে-কলমে শেষ হয়ে গেলেও সেখান থেকে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো সময় এসব ক্ষেত্রের উৎপাদন দ্রুত কমে যেতে পারে।
দেশে গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন কমলেও চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে এই চাহিদা প্রায় ৫ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে।
তবে বর্তমান দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সক্ষমতা দিয়ে এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে এলএনজি আমদানির ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ছে। জ্বালানি খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে, একটি নতুন গ্যাসকূপ খননে বাপেক্সের গড়ে ব্যয় হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা স্থানীয় গ্যাসের অর্ধেকের বেশি আসে শেভরন পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্র থেকে। কয়েক বছর ধরে অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে এসব ক্ষেত্রের মজুত দ্রুত কমেছে। অন্যদিকে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে, কিন্তু উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি।
তাদের ভাষ্য, দেশে গ্যাসের চাহিদা যে হারে বাড়ছে, তাতে এখনই নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, কূপ খনন এবং গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। তা না হলে আগামী দশকে দেশের গ্যাস খাত বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন কালবেলাকে বলেন, গ্যাসকূপের মজুত কমে যাওয়া স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। তবে নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত নতুন গ্যাসকূপের অনুসন্ধান ও খনন করা প্রয়োজন। বিগত সরকারগুলো তা করেনি। ফলে সামনে গ্যাস সংকট তৈরি হবে। কারণ এলএনজি দিয়ে একটি দেশের গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। সরকারের এখন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
সূত্র: কালবেলা।

আপনার মতামত লিখুন