সম্প্রতি শরীয়তপুরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কথিত নিষ্ক্রিয়তা এবং স্থানীয় প্রেসক্লাবের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো সাংবাদিকতার দীর্ঘদিনের ক্ষতকে আবারও সামনে এনেছে। শরীয়তপুরে সময় টিভির প্রতিনিধি এ বি এম ইসরাফিল, নিউজ ২৪-এর প্রতিনিধি বিধান মজুমদার অনি, দ্য ডেইলি স্টারের জাহিদ হাসান রনি এবং দৈনিক এদিনের শরীয়তপুর জেলা প্রতিনিধি মোহাম্মদ বরকত উল্লাহর ওপর হামলা, ধারাবাহিক হয়রানি ও আইনি জটিলতার অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের বর্তমান মফস্বল সাংবাদিকতার একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে।
সাংবাদিক নেতারা যখন একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন, তখন সাধারণ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই জটিল হয়ে পড়ে। প্রশাসন, পুলিশ, প্রেসক্লাব কিংবা সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না থাকায় ক্ষমতাশালী মহলের সামনে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়েন।
পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থক সরকারি কর্মকর্তা, প্রকাশ্য হুমকি কিংবা নির্যাতনের মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শরীয়তপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা ও আমলাতান্ত্রিক আগ্রাসন—এই তিন ধরনের চাপের কারণে সাংবাদিকরা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
শরীয়তপুরের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও সাংবাদিক নেতৃত্ব—এই তিনটি ক্ষমতাকাঠামোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার শুরুতে কোনো পূর্ব নোটিশ বা বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঐতিহ্যবাহী শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ও তিনটি দেয়াল ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
প্রেসক্লাবের সদস্যরা প্রায় ৩০ বছর ধরে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ১৪ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে জায়গাটির উন্নয়ন করে আসছিলেন। এর মধ্যে পার্ক সম্প্রসারণের কথা বলে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের নেতৃত্বে রাতের আঁধারে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি আরও বিতর্কিত হয় যখন জেলা প্রশাসক দাবি করেন, প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেনের সম্মতিতেই এই উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মফস্বল সাংবাদিকতার একটি বড় সংকট সামনে আসে। প্রেসক্লাব সভাপতি আবুল হোসেন একই সঙ্গে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি। একজন সাংবাদিক নেতার একই সময়ে রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা তার সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটির ৮০ শতাংশ সদস্যের তথাকথিত মৌখিক সম্মতির ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ কার্যক্রম মেনে নেওয়া সাধারণ সাংবাদিকদের স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সময় টিভির প্রতিনিধি ও প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক এ বি এম ইসরাফিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদী অবস্থান নেন। এরপর তাকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে প্রেসক্লাব সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবুল হোসেনের ছেলে পলাশ এবং তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা ইসরাফিলের ওপর হামলা চালান। এ ছাড়া প্রেসক্লাব উচ্ছেদের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে জেলা প্রশাসন কার্যালয় চত্বরে সাংবাদিক জাহিদ হাসান, বিধান মজুমদার ও বরকত মোল্লাও হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা লেখবা, আমরা তোমাগো পিডামু। আমাগো কাছে অনেক সাংবাদিকের তালিকা আছে, রেডি থাইক্কো।’
এ ধরনের বক্তব্যকে শুধু ব্যক্তিগত হুমকি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি স্বাধীন মতপ্রকাশ ও মুক্ত গণমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদাহরণ বলেও দেখা হচ্ছে। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে, সেখানে রাজনৈতিক ক্যাডারভিত্তিক মব-জাস্টিস এবং গণমাধ্যমের ওপর হামলার সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য নয়।
একটি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতনের পর যদি আরেকটি উগ্র ও সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি জায়গা করে নেয়, তাহলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী হওয়া কঠিন হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও উপজেলা প্রেসক্লাব থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিক নেতাদের ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ ছিল। দলীয় পদধারী এসব নেতার বিরুদ্ধে ভিন্নমতের সাংবাদিকদের কোণঠাসা করার অভিযোগও রয়েছে। আবার ভিন্নমতের সাংবাদিকরা হামলা বা জেল-জুলুমের শিকার হলেও তারা প্রতিবাদ না করে বরং সেই পরিস্থিতিকে সমর্থন করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
শরীয়তপুরের ঘটনাপ্রবাহে সাংবাদিক নির্যাতনের আরেকটি দিক হিসেবে পাল্টা মামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে এসেছে। সাংবাদিক ইসরাফিলসহ আক্রান্ত সাংবাদিকরা থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণে গড়িমসি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লা এবং পরে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমান উল্লাহ আমানের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও মারপিটের অভিযোগ করা হলে পুলিশ তা গ্রহণ করেছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, এটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সাংবাদিকদের চাপে রাখার একটি কৌশল। তাদের ভাষ্য, কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা আইনি পদক্ষেপ নিলে পাল্টা চাঁদাবাজি বা মানহানির মামলা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের আইনি জটিলতায় ফেলে মানসিকভাবে দুর্বল করা এবং শেষ পর্যন্ত আপস বা মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়।
‘সাংবাদিকরা যখন রাজনৈতিক নেতা হয়, তখন সাধারণ সাংবাদিকরা মার খায়’—বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই কথাটি অনেকের কাছে কঠিন সত্য হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের জন্য কেউ কেউ সাংবাদিক নেতৃত্বের অবস্থান থেকে সরাসরি রাজনৈতিক ভূমিকায় যুক্ত হন। এতে সাংবাদিকতার পেশাগত মান ও স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্যতম শর্ত হলো রাজনৈতিক দলের আদর্শ ও দলীয় এজেন্ডা থেকে পেশাগতভাবে দূরে থাকা।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক প্রেসক্লাব সাংবাদিকতার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতির প্রভাববলয়ে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সংগঠনের নেতৃত্বে আসার ক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতা বা দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও লবিং বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন সাংবাদিক নেতা যখন একই সঙ্গে বড় রাজনৈতিক দলের সহ-সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হন, তখন তার আনুগত্য সাংবাদিকতার চেয়ে দলের প্রতি বেশি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে দলীয় কোনো নেতা-কর্মীর হাতে সাংবাদিক আক্রান্ত হলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক নেতারা নীরব থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন বা পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে আক্রান্ত সাংবাদিকদেরই মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
শরীয়তপুরের ক্ষেত্রেও প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন রবিন আক্রান্ত সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়িয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কোনো উদ্যোগ নেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ধরনের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি মফস্বলের সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিকদের আরও একাকী করে তুলছে।
সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট।
ঢাকাকেন্দ্রিক গণমাধ্যমের মালিক ও নীতিনির্ধারকেরা মফস্বল প্রতিনিধিদের নিরাপত্তার বিষয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেন না—এমন অভিযোগ রয়েছে। মফস্বলের সাংবাদিকদের অনেকেই সীমিত বেতন কিংবা অনেক ক্ষেত্রে বিনা বেতনে শুধু লাইনেজ বা প্রকাশিত সংবাদের পরিমাণের ভিত্তিতে পাওয়া অর্থের বিনিময়ে কাজ করেন।
স্থানীয় ভূমিদস্যু, দুর্নীতিবাজ আমলা কিংবা রাজনৈতিক ক্যাডারদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠক, টিআরপি বা ভিউ বাড়ানোর সুযোগ পায়। কিন্তু এসব প্রতিবেদন করার কারণে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ও তার পরিবার স্থানীয়ভাবে হুমকি বা হামলার মুখে পড়লে কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান অনেক সময় দূরত্ব কিংবা রাজনৈতিক সমীকরণের কারণ দেখিয়ে পিছিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
শরীয়তপুরে আক্রান্ত এক সাংবাদিকও এমন পরিস্থিতিতে নিজের প্রতিষ্ঠানকে পাশে না পাওয়ার আক্ষেপ করেছেন। এই প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবকহীনতা মফস্বল সাংবাদিকদের আরও দুর্বল করে দেয়। নিজের প্রতিষ্ঠান, প্রেসক্লাব ও স্থানীয় প্রশাসন—কেউ পাশে না থাকলে ক্ষমতাশালী মহলের কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া সাংবাদিকের সামনে আর কোনো পথ থাকে না—এমন বাস্তবতাই সামনে আসে।
শরীয়তপুরের ঘটনাকে বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংবাদিকতার চিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সাংবাদিক নির্যাতনের একটি অভিন্ন ধারা চোখে পড়ে।
এর প্রথম ধাপ হিসেবে তথ্য পাওয়ার অধিকার সীমিত করার বিষয়টি সামনে আসে। সরকারি বা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের তথ্য চাইলে সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, বর্তমানের সাইবার নিরাপত্তা আইন কিংবা সরকারি গোপনীয়তা আইনের ভয় দেখানো হয়। কোনো নোটিশ ছাড়া প্রেসক্লাবের দেয়াল ভেঙে ফেলা যেমন প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার উদাহরণ, তেমনি সরকারি প্রকল্পের দুর্নীতি আড়াল করতে সাংবাদিকদের তথ্য না দেওয়াও একই সংস্কৃতির অংশ।
দ্বিতীয়ত, মফস্বল এলাকায় পুলিশ প্রশাসন স্থানীয় ক্ষমতাশালী বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন হয়ে কাজ করে—এমন অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিক আক্রান্ত হলে মামলা নিতে গড়িমসি করা, অভিযুক্তদের প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ দেওয়া এবং পরে তাদের ‘খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’ বলা—এসব অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। বিপরীতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি মামলা করলে পুলিশ দ্রুত তা গ্রহণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় প্রেসক্লাবগুলোও আওয়ামীপন্থী, বিএনপিপন্থী, জামায়াতপন্থীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এক পক্ষের সাংবাদিক আক্রান্ত হলে অন্য পক্ষ নীরব থাকে কিংবা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখে। সাংবাদিকদের নিজেদের এই বিভক্তিকেই অপরাধীরা কাজে লাগায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকতার এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে এবং সাংবাদিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু মৌলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
প্রেসক্লাব বা সাংবাদিক সংগঠনের গঠনতন্ত্রে এমন বিধান থাকা প্রয়োজন, কোনো ব্যক্তি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে কিংবা রাজনৈতিক দলের পদে থাকলে তিনি সাংবাদিক সংগঠনের কোনো পদে নির্বাচন বা নেতৃত্ব দিতে পারবেন না। কারণ সাংবাদিকতা ও সক্রিয় দলীয় রাজনীতি একসঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
ঢাকার মূলধারার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর মফস্বল প্রতিনিধিদের জন্য নির্দিষ্ট নিয়োগপত্র, সম্মানী এবং জরুরি আইনি ও চিকিৎসা তহবিল থাকা প্রয়োজন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো প্রতিনিধি হামলা বা মামলার শিকার হলে কেন্দ্রীয় আইনি দলের মাধ্যমে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নেওয়া উচিত।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি স্বাধীন সাংবাদিক সুরক্ষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন, যা জাতীয় সংসদের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ থাকবে। কোনো সাংবাদিক হামলা বা হয়রানিমূলক মামলার শিকার হলে কমিশন স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারবে। স্থানীয় পুলিশ বা প্রশাসনের গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করার সুযোগও থাকা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের সত্য প্রকাশে বাধা দিতে দায়ের করা হয়রানিমূলক পাল্টা মামলা কিংবা চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বিশেষ সেল থাকা দরকার। তদন্ত ছাড়া এসব মামলায় কোনো সাংবাদিককে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করা যাবে না—এমন আইনি বিধানও প্রয়োজন।
শরীয়তপুরের মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ, বিধান মজুমদার, এ বি এম ইসরাফিল ও জাহিদ হাসান রনিদের লড়াই শুধু ব্যক্তিগত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই নয়; এটি মফস্বল সাংবাদিকতার স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখার সংগ্রামও। প্রশাসন, পুলিশ, প্রেসক্লাব ও কর্মস্থলের সহায়তার অভাবে সাংবাদিকরা যেভাবে ক্ষমতাশালী মহলের সামনে অসহায় হয়ে পড়ছেন, তা গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজের জন্য উদ্বেগজনক।
সাংবাদিক নেতাদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করা এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কর্মীদের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নেওয়া জরুরি। তা না হলে বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে।
ডেস্কে বসে তৈরি করা সংবাদের তুলনায় মাঠে গিয়ে সত্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে যারা ঝুঁকি নিচ্ছেন, তাদের একাকীত্ব ও অসহায়ত্ব দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ এবং সাংবাদিক সমাজ—সবার। ক্ষমতাশালী মহলের সামনে সাংবাদিকদের আত্মসমর্পণের সংস্কৃতি এখনই বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে অন্যায়, নির্যাতন ও দুর্নীতির খবর মূলধারার গণমাধ্যমে তুলে ধরা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
সূত্র: দি ডেইলি এদিন

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সম্প্রতি শরীয়তপুরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কথিত নিষ্ক্রিয়তা এবং স্থানীয় প্রেসক্লাবের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো সাংবাদিকতার দীর্ঘদিনের ক্ষতকে আবারও সামনে এনেছে। শরীয়তপুরে সময় টিভির প্রতিনিধি এ বি এম ইসরাফিল, নিউজ ২৪-এর প্রতিনিধি বিধান মজুমদার অনি, দ্য ডেইলি স্টারের জাহিদ হাসান রনি এবং দৈনিক এদিনের শরীয়তপুর জেলা প্রতিনিধি মোহাম্মদ বরকত উল্লাহর ওপর হামলা, ধারাবাহিক হয়রানি ও আইনি জটিলতার অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের বর্তমান মফস্বল সাংবাদিকতার একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে।
সাংবাদিক নেতারা যখন একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন, তখন সাধারণ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই জটিল হয়ে পড়ে। প্রশাসন, পুলিশ, প্রেসক্লাব কিংবা সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না থাকায় ক্ষমতাশালী মহলের সামনে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়েন।
পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থক সরকারি কর্মকর্তা, প্রকাশ্য হুমকি কিংবা নির্যাতনের মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শরীয়তপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা ও আমলাতান্ত্রিক আগ্রাসন—এই তিন ধরনের চাপের কারণে সাংবাদিকরা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
শরীয়তপুরের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও সাংবাদিক নেতৃত্ব—এই তিনটি ক্ষমতাকাঠামোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার শুরুতে কোনো পূর্ব নোটিশ বা বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঐতিহ্যবাহী শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ও তিনটি দেয়াল ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
প্রেসক্লাবের সদস্যরা প্রায় ৩০ বছর ধরে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ১৪ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে জায়গাটির উন্নয়ন করে আসছিলেন। এর মধ্যে পার্ক সম্প্রসারণের কথা বলে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের নেতৃত্বে রাতের আঁধারে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি আরও বিতর্কিত হয় যখন জেলা প্রশাসক দাবি করেন, প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেনের সম্মতিতেই এই উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মফস্বল সাংবাদিকতার একটি বড় সংকট সামনে আসে। প্রেসক্লাব সভাপতি আবুল হোসেন একই সঙ্গে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি। একজন সাংবাদিক নেতার একই সময়ে রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা তার সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটির ৮০ শতাংশ সদস্যের তথাকথিত মৌখিক সম্মতির ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ কার্যক্রম মেনে নেওয়া সাধারণ সাংবাদিকদের স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সময় টিভির প্রতিনিধি ও প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক এ বি এম ইসরাফিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদী অবস্থান নেন। এরপর তাকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে প্রেসক্লাব সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবুল হোসেনের ছেলে পলাশ এবং তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা ইসরাফিলের ওপর হামলা চালান। এ ছাড়া প্রেসক্লাব উচ্ছেদের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে জেলা প্রশাসন কার্যালয় চত্বরে সাংবাদিক জাহিদ হাসান, বিধান মজুমদার ও বরকত মোল্লাও হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা লেখবা, আমরা তোমাগো পিডামু। আমাগো কাছে অনেক সাংবাদিকের তালিকা আছে, রেডি থাইক্কো।’
এ ধরনের বক্তব্যকে শুধু ব্যক্তিগত হুমকি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি স্বাধীন মতপ্রকাশ ও মুক্ত গণমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদাহরণ বলেও দেখা হচ্ছে। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে, সেখানে রাজনৈতিক ক্যাডারভিত্তিক মব-জাস্টিস এবং গণমাধ্যমের ওপর হামলার সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য নয়।
একটি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতনের পর যদি আরেকটি উগ্র ও সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি জায়গা করে নেয়, তাহলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী হওয়া কঠিন হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও উপজেলা প্রেসক্লাব থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিক নেতাদের ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ ছিল। দলীয় পদধারী এসব নেতার বিরুদ্ধে ভিন্নমতের সাংবাদিকদের কোণঠাসা করার অভিযোগও রয়েছে। আবার ভিন্নমতের সাংবাদিকরা হামলা বা জেল-জুলুমের শিকার হলেও তারা প্রতিবাদ না করে বরং সেই পরিস্থিতিকে সমর্থন করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
শরীয়তপুরের ঘটনাপ্রবাহে সাংবাদিক নির্যাতনের আরেকটি দিক হিসেবে পাল্টা মামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে এসেছে। সাংবাদিক ইসরাফিলসহ আক্রান্ত সাংবাদিকরা থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণে গড়িমসি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লা এবং পরে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমান উল্লাহ আমানের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও মারপিটের অভিযোগ করা হলে পুলিশ তা গ্রহণ করেছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, এটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সাংবাদিকদের চাপে রাখার একটি কৌশল। তাদের ভাষ্য, কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা আইনি পদক্ষেপ নিলে পাল্টা চাঁদাবাজি বা মানহানির মামলা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের আইনি জটিলতায় ফেলে মানসিকভাবে দুর্বল করা এবং শেষ পর্যন্ত আপস বা মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়।
‘সাংবাদিকরা যখন রাজনৈতিক নেতা হয়, তখন সাধারণ সাংবাদিকরা মার খায়’—বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই কথাটি অনেকের কাছে কঠিন সত্য হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের জন্য কেউ কেউ সাংবাদিক নেতৃত্বের অবস্থান থেকে সরাসরি রাজনৈতিক ভূমিকায় যুক্ত হন। এতে সাংবাদিকতার পেশাগত মান ও স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্যতম শর্ত হলো রাজনৈতিক দলের আদর্শ ও দলীয় এজেন্ডা থেকে পেশাগতভাবে দূরে থাকা।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক প্রেসক্লাব সাংবাদিকতার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতির প্রভাববলয়ে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সংগঠনের নেতৃত্বে আসার ক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতা বা দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও লবিং বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন সাংবাদিক নেতা যখন একই সঙ্গে বড় রাজনৈতিক দলের সহ-সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হন, তখন তার আনুগত্য সাংবাদিকতার চেয়ে দলের প্রতি বেশি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে দলীয় কোনো নেতা-কর্মীর হাতে সাংবাদিক আক্রান্ত হলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক নেতারা নীরব থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন বা পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে আক্রান্ত সাংবাদিকদেরই মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
শরীয়তপুরের ক্ষেত্রেও প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন রবিন আক্রান্ত সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়িয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কোনো উদ্যোগ নেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ধরনের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি মফস্বলের সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিকদের আরও একাকী করে তুলছে।
সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট।
ঢাকাকেন্দ্রিক গণমাধ্যমের মালিক ও নীতিনির্ধারকেরা মফস্বল প্রতিনিধিদের নিরাপত্তার বিষয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেন না—এমন অভিযোগ রয়েছে। মফস্বলের সাংবাদিকদের অনেকেই সীমিত বেতন কিংবা অনেক ক্ষেত্রে বিনা বেতনে শুধু লাইনেজ বা প্রকাশিত সংবাদের পরিমাণের ভিত্তিতে পাওয়া অর্থের বিনিময়ে কাজ করেন।
স্থানীয় ভূমিদস্যু, দুর্নীতিবাজ আমলা কিংবা রাজনৈতিক ক্যাডারদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠক, টিআরপি বা ভিউ বাড়ানোর সুযোগ পায়। কিন্তু এসব প্রতিবেদন করার কারণে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ও তার পরিবার স্থানীয়ভাবে হুমকি বা হামলার মুখে পড়লে কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান অনেক সময় দূরত্ব কিংবা রাজনৈতিক সমীকরণের কারণ দেখিয়ে পিছিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
শরীয়তপুরে আক্রান্ত এক সাংবাদিকও এমন পরিস্থিতিতে নিজের প্রতিষ্ঠানকে পাশে না পাওয়ার আক্ষেপ করেছেন। এই প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবকহীনতা মফস্বল সাংবাদিকদের আরও দুর্বল করে দেয়। নিজের প্রতিষ্ঠান, প্রেসক্লাব ও স্থানীয় প্রশাসন—কেউ পাশে না থাকলে ক্ষমতাশালী মহলের কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া সাংবাদিকের সামনে আর কোনো পথ থাকে না—এমন বাস্তবতাই সামনে আসে।
শরীয়তপুরের ঘটনাকে বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংবাদিকতার চিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সাংবাদিক নির্যাতনের একটি অভিন্ন ধারা চোখে পড়ে।
এর প্রথম ধাপ হিসেবে তথ্য পাওয়ার অধিকার সীমিত করার বিষয়টি সামনে আসে। সরকারি বা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের তথ্য চাইলে সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, বর্তমানের সাইবার নিরাপত্তা আইন কিংবা সরকারি গোপনীয়তা আইনের ভয় দেখানো হয়। কোনো নোটিশ ছাড়া প্রেসক্লাবের দেয়াল ভেঙে ফেলা যেমন প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার উদাহরণ, তেমনি সরকারি প্রকল্পের দুর্নীতি আড়াল করতে সাংবাদিকদের তথ্য না দেওয়াও একই সংস্কৃতির অংশ।
দ্বিতীয়ত, মফস্বল এলাকায় পুলিশ প্রশাসন স্থানীয় ক্ষমতাশালী বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন হয়ে কাজ করে—এমন অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিক আক্রান্ত হলে মামলা নিতে গড়িমসি করা, অভিযুক্তদের প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ দেওয়া এবং পরে তাদের ‘খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’ বলা—এসব অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। বিপরীতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি মামলা করলে পুলিশ দ্রুত তা গ্রহণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় প্রেসক্লাবগুলোও আওয়ামীপন্থী, বিএনপিপন্থী, জামায়াতপন্থীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এক পক্ষের সাংবাদিক আক্রান্ত হলে অন্য পক্ষ নীরব থাকে কিংবা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখে। সাংবাদিকদের নিজেদের এই বিভক্তিকেই অপরাধীরা কাজে লাগায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকতার এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে এবং সাংবাদিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু মৌলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
প্রেসক্লাব বা সাংবাদিক সংগঠনের গঠনতন্ত্রে এমন বিধান থাকা প্রয়োজন, কোনো ব্যক্তি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে কিংবা রাজনৈতিক দলের পদে থাকলে তিনি সাংবাদিক সংগঠনের কোনো পদে নির্বাচন বা নেতৃত্ব দিতে পারবেন না। কারণ সাংবাদিকতা ও সক্রিয় দলীয় রাজনীতি একসঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
ঢাকার মূলধারার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর মফস্বল প্রতিনিধিদের জন্য নির্দিষ্ট নিয়োগপত্র, সম্মানী এবং জরুরি আইনি ও চিকিৎসা তহবিল থাকা প্রয়োজন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো প্রতিনিধি হামলা বা মামলার শিকার হলে কেন্দ্রীয় আইনি দলের মাধ্যমে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নেওয়া উচিত।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি স্বাধীন সাংবাদিক সুরক্ষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন, যা জাতীয় সংসদের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ থাকবে। কোনো সাংবাদিক হামলা বা হয়রানিমূলক মামলার শিকার হলে কমিশন স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারবে। স্থানীয় পুলিশ বা প্রশাসনের গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করার সুযোগও থাকা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের সত্য প্রকাশে বাধা দিতে দায়ের করা হয়রানিমূলক পাল্টা মামলা কিংবা চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বিশেষ সেল থাকা দরকার। তদন্ত ছাড়া এসব মামলায় কোনো সাংবাদিককে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করা যাবে না—এমন আইনি বিধানও প্রয়োজন।
শরীয়তপুরের মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ, বিধান মজুমদার, এ বি এম ইসরাফিল ও জাহিদ হাসান রনিদের লড়াই শুধু ব্যক্তিগত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই নয়; এটি মফস্বল সাংবাদিকতার স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখার সংগ্রামও। প্রশাসন, পুলিশ, প্রেসক্লাব ও কর্মস্থলের সহায়তার অভাবে সাংবাদিকরা যেভাবে ক্ষমতাশালী মহলের সামনে অসহায় হয়ে পড়ছেন, তা গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজের জন্য উদ্বেগজনক।
সাংবাদিক নেতাদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করা এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কর্মীদের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নেওয়া জরুরি। তা না হলে বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে।
ডেস্কে বসে তৈরি করা সংবাদের তুলনায় মাঠে গিয়ে সত্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে যারা ঝুঁকি নিচ্ছেন, তাদের একাকীত্ব ও অসহায়ত্ব দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ এবং সাংবাদিক সমাজ—সবার। ক্ষমতাশালী মহলের সামনে সাংবাদিকদের আত্মসমর্পণের সংস্কৃতি এখনই বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে অন্যায়, নির্যাতন ও দুর্নীতির খবর মূলধারার গণমাধ্যমে তুলে ধরা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
সূত্র: দি ডেইলি এদিন

আপনার মতামত লিখুন