ঢাকা    সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

মতামত

পরিবর্তনের প্রত্যাশা, পুরনো রাজনীতির প্রতিফলন: সংকটে এনসিপি

পরিবর্তনের প্রত্যাশা, পুরনো রাজনীতির প্রতিফলন: সংকটে এনসিপি
পরিবর্তনের প্রত্যাশা, পুরনো রাজনীতির প্রতিফলন: সংকটে এনসিপি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রায় দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানে তরুণ প্রজন্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোটা সংস্কারের নির্দিষ্ট ও অহিংস দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ অল্প সময়ের মধ্যেই সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলনে রূপ নেয়। সে সময় মানুষের মধ্যে যে ব্যাপক ঐক্য ও আবেগ তৈরি হয়েছিল, তার লক্ষ্য শুধু সরকার পরিবর্তন ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রত্যাশা—সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের অবসান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ এবং জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। অনেকের প্রত্যাশা ছিল, এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও মৌলিক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর ছাত্রনেতাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়া, ক্ষমতা প্রয়োগ এবং নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়া সেই প্রত্যাশাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ করে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ও জনগণের প্রত্যাশাকে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়াই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু শুরু থেকেই দলটি জনগণের ব্যাপক আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে ক্ষমতার সঙ্গে দলীয় রাজনীতির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। আন্দোলনের দুই শীর্ষ নেতা যখন অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তখনই তাদের প্রভাবে নতুন দল গঠনের কার্যক্রম এগিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। দলনিরপেক্ষ থাকার অঙ্গীকার করা অন্তর্বর্তী সরকারের অংশ হয়েও রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি শুরু থেকেই সমালোচিত হয়। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, নতুন দল গঠনে রাষ্ট্রযন্ত্র, আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুবিধা ব্যবহার করা হয়েছে। এ কারণে দলটির জন্মের সময়ই ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। সরকার ও দলের মধ্যকার স্বার্থের সংঘাত তরুণ নেতৃত্বের সংস্কারকামী ভাবমূর্তিকেও দুর্বল করে।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় জুলুম, গুম, খুন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইনের শাসনের সংকট কাটার পরিবর্তে মব ভায়োলেন্সের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রেও কাউকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে গণপিটুনির দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জোর করে অপমানজনকভাবে পদত্যাগ করানো, মাজার ও উপাসনালয়ে হামলা, আদালত প্রাঙ্গণে আসামিদের ওপর হামলা, থানা ও সরকারি দপ্তরে বিশৃঙ্খলা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব সহিংসতার ঘটনায় বহু মানুষ নিহত, গুরুতর আহত ও পঙ্গু হন; তাদের অনেকেই সম্পূর্ণ নিরপরাধ ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের একটি অংশ নিজেদের এনসিপির নেতা-কর্মী হিসেবে পরিচয় দিলেও তাদের বিরুদ্ধে যথাসময়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এমনকি কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং কিছু ঘটনাকে ‘জনরোষ’ বা ‘বিপ্লবী প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টায় বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন দিনের সূচনার প্রত্যাশা তৈরি করা তরুণ নেতৃত্বের সময়েই আইনের বিকল্প হিসেবে মব ভায়োলেন্সের বিস্তার সমাজে নতুন নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।

ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রবেশের পর সততা ও দুর্নীতির প্রশ্নেও দলটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আসে। দল গঠনের আগে ও পরে বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ জনপরিসরে আসে। জেলা প্রশাসক নিয়োগে প্রভাব বিস্তার, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দলীয় ব্যক্তিকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা এবং এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তকের কাগজ কেনাকাটায় মধ্যস্বত্বভোগী কমিশনের সঙ্গে নেতাদের নাম জড়িয়ে যাওয়ার বিষয় সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়। একই সময়ে শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সহকারী ও স্বজনদের ঘিরে তদবির বাণিজ্যের গুঞ্জনও মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। তবে এসব অভিযোগের অধিকাংশের কোনো নিরপেক্ষ বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবুও ক্ষমতার চর্চার শুরুতেই তরুণ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পুরনো প্রশাসনিক দুর্নীতি ও তদবির সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তির অভিযোগ মানুষের প্রত্যাশাকে দুর্বল করে। এতে বোঝা যায়, শুধু বক্তব্যের মাধ্যমে পুরনো দুর্নীতির সংস্কৃতি দূর করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

রাজনৈতিক আদর্শ ও মতাদর্শের ক্ষেত্রেও দলটির অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তির মধ্যে ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। এই সর্বজনীন অবস্থানের প্রতি আস্থা রেখেই প্রগতিশীল, মধ্যপন্থি ও সাধারণ নাগরিকদের অনেকে আন্দোলনে অংশ নেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দলটির নেতাদের পক্ষ থেকে জুলাই আন্দোলনকে ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করার চেষ্টা করা হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করে। একই সঙ্গে নির্বাচনী হিসাব ও ক্ষমতার সমীকরণের কারণে জামায়াতে ইসলামীর মতো আদর্শিকভাবে ভিন্ন মেরুর দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও সমঝোতার পথে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে। এর ফলে মুক্তমনা, সেক্যুলার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারমুখী অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে বলে লেখাটিতে তুলে ধরা হয়েছে।

দলটির সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো আন্দোলনের সামগ্রিক ও বহুমাত্রিক চরিত্রকে উপেক্ষা করে একক দলীয় কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর অর্জন ছিল না। রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা লাখ লাখ সাধারণ ছাত্র-জনতার সম্মিলিত অংশগ্রহণ, রক্ত ও আত্মত্যাগের ফলেই কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর এনসিপি এই যৌথ অর্জন ও ব্যাপক জনসমর্থনকে নিজেদের স্থায়ী ও একক রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার ভুল করেছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। সম্মিলিত অর্জনকে একক দলীয় সম্পদে পরিণত করার এই প্রবণতায় অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে দলটির দূরত্ব বাড়ে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জেলা সফরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া না পাওয়ার ঘটনাগুলো দলটির মাঠপর্যায়ের বিচ্ছিন্নতার চিত্র তুলে ধরে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকটগুলোর একটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে। রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসনের তাত্ত্বিক বক্তব্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি থেকে স্বস্তি, স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলায় দ্রুত ও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টিও হতাশা বাড়ায়। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং পরিসংখ্যানে অর্থ পাচার নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকায় হতাশা আরও বাড়ে। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করার বদলে ক্ষমতার পদ-পদবি বণ্টন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে তরুণ নেতৃত্বের সঙ্গে জনগণের মধ্যে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান দীর্ঘদিনের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের একটি ঐতিহাসিক বিজয় ছিল। তরুণদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, ক্ষমতার আকর্ষণ, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ, মব ভায়োলেন্সের বিস্তার এবং আদর্শিক বিচ্যুতির কারণে তা এখন বড় সংকটে পড়েছে। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রভাব-বাণিজ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তরুণ নেতৃত্বের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষমতার সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে গিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মূল দর্শন—ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক সাম্য এবং সবাইকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করাই নতুন রাজনৈতিক শক্তির আত্মশুদ্ধি ও ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পথ হিসেবে লেখাটিতে তুলে ধরা হয়েছে।

সূত্র: bdnews24

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬


পরিবর্তনের প্রত্যাশা, পুরনো রাজনীতির প্রতিফলন: সংকটে এনসিপি

প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬

featured Image

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রায় দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানে তরুণ প্রজন্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোটা সংস্কারের নির্দিষ্ট ও অহিংস দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ অল্প সময়ের মধ্যেই সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলনে রূপ নেয়। সে সময় মানুষের মধ্যে যে ব্যাপক ঐক্য ও আবেগ তৈরি হয়েছিল, তার লক্ষ্য শুধু সরকার পরিবর্তন ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রত্যাশা—সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের অবসান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ এবং জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। অনেকের প্রত্যাশা ছিল, এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও মৌলিক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর ছাত্রনেতাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়া, ক্ষমতা প্রয়োগ এবং নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়া সেই প্রত্যাশাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ করে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ও জনগণের প্রত্যাশাকে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়াই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু শুরু থেকেই দলটি জনগণের ব্যাপক আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে ক্ষমতার সঙ্গে দলীয় রাজনীতির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। আন্দোলনের দুই শীর্ষ নেতা যখন অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তখনই তাদের প্রভাবে নতুন দল গঠনের কার্যক্রম এগিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। দলনিরপেক্ষ থাকার অঙ্গীকার করা অন্তর্বর্তী সরকারের অংশ হয়েও রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি শুরু থেকেই সমালোচিত হয়। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, নতুন দল গঠনে রাষ্ট্রযন্ত্র, আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুবিধা ব্যবহার করা হয়েছে। এ কারণে দলটির জন্মের সময়ই ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। সরকার ও দলের মধ্যকার স্বার্থের সংঘাত তরুণ নেতৃত্বের সংস্কারকামী ভাবমূর্তিকেও দুর্বল করে।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় জুলুম, গুম, খুন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইনের শাসনের সংকট কাটার পরিবর্তে মব ভায়োলেন্সের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রেও কাউকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে গণপিটুনির দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জোর করে অপমানজনকভাবে পদত্যাগ করানো, মাজার ও উপাসনালয়ে হামলা, আদালত প্রাঙ্গণে আসামিদের ওপর হামলা, থানা ও সরকারি দপ্তরে বিশৃঙ্খলা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব সহিংসতার ঘটনায় বহু মানুষ নিহত, গুরুতর আহত ও পঙ্গু হন; তাদের অনেকেই সম্পূর্ণ নিরপরাধ ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের একটি অংশ নিজেদের এনসিপির নেতা-কর্মী হিসেবে পরিচয় দিলেও তাদের বিরুদ্ধে যথাসময়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এমনকি কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং কিছু ঘটনাকে ‘জনরোষ’ বা ‘বিপ্লবী প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টায় বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন দিনের সূচনার প্রত্যাশা তৈরি করা তরুণ নেতৃত্বের সময়েই আইনের বিকল্প হিসেবে মব ভায়োলেন্সের বিস্তার সমাজে নতুন নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।

ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রবেশের পর সততা ও দুর্নীতির প্রশ্নেও দলটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আসে। দল গঠনের আগে ও পরে বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ জনপরিসরে আসে। জেলা প্রশাসক নিয়োগে প্রভাব বিস্তার, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দলীয় ব্যক্তিকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা এবং এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তকের কাগজ কেনাকাটায় মধ্যস্বত্বভোগী কমিশনের সঙ্গে নেতাদের নাম জড়িয়ে যাওয়ার বিষয় সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়। একই সময়ে শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সহকারী ও স্বজনদের ঘিরে তদবির বাণিজ্যের গুঞ্জনও মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। তবে এসব অভিযোগের অধিকাংশের কোনো নিরপেক্ষ বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবুও ক্ষমতার চর্চার শুরুতেই তরুণ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পুরনো প্রশাসনিক দুর্নীতি ও তদবির সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তির অভিযোগ মানুষের প্রত্যাশাকে দুর্বল করে। এতে বোঝা যায়, শুধু বক্তব্যের মাধ্যমে পুরনো দুর্নীতির সংস্কৃতি দূর করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

রাজনৈতিক আদর্শ ও মতাদর্শের ক্ষেত্রেও দলটির অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তির মধ্যে ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। এই সর্বজনীন অবস্থানের প্রতি আস্থা রেখেই প্রগতিশীল, মধ্যপন্থি ও সাধারণ নাগরিকদের অনেকে আন্দোলনে অংশ নেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দলটির নেতাদের পক্ষ থেকে জুলাই আন্দোলনকে ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করার চেষ্টা করা হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করে। একই সঙ্গে নির্বাচনী হিসাব ও ক্ষমতার সমীকরণের কারণে জামায়াতে ইসলামীর মতো আদর্শিকভাবে ভিন্ন মেরুর দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও সমঝোতার পথে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে। এর ফলে মুক্তমনা, সেক্যুলার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারমুখী অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে বলে লেখাটিতে তুলে ধরা হয়েছে।

দলটির সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো আন্দোলনের সামগ্রিক ও বহুমাত্রিক চরিত্রকে উপেক্ষা করে একক দলীয় কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর অর্জন ছিল না। রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা লাখ লাখ সাধারণ ছাত্র-জনতার সম্মিলিত অংশগ্রহণ, রক্ত ও আত্মত্যাগের ফলেই কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর এনসিপি এই যৌথ অর্জন ও ব্যাপক জনসমর্থনকে নিজেদের স্থায়ী ও একক রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার ভুল করেছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। সম্মিলিত অর্জনকে একক দলীয় সম্পদে পরিণত করার এই প্রবণতায় অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে দলটির দূরত্ব বাড়ে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জেলা সফরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া না পাওয়ার ঘটনাগুলো দলটির মাঠপর্যায়ের বিচ্ছিন্নতার চিত্র তুলে ধরে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকটগুলোর একটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে। রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসনের তাত্ত্বিক বক্তব্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি থেকে স্বস্তি, স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলায় দ্রুত ও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টিও হতাশা বাড়ায়। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং পরিসংখ্যানে অর্থ পাচার নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকায় হতাশা আরও বাড়ে। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করার বদলে ক্ষমতার পদ-পদবি বণ্টন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে তরুণ নেতৃত্বের সঙ্গে জনগণের মধ্যে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান দীর্ঘদিনের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের একটি ঐতিহাসিক বিজয় ছিল। তরুণদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, ক্ষমতার আকর্ষণ, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ, মব ভায়োলেন্সের বিস্তার এবং আদর্শিক বিচ্যুতির কারণে তা এখন বড় সংকটে পড়েছে। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রভাব-বাণিজ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তরুণ নেতৃত্বের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষমতার সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে গিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মূল দর্শন—ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক সাম্য এবং সবাইকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করাই নতুন রাজনৈতিক শক্তির আত্মশুদ্ধি ও ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পথ হিসেবে লেখাটিতে তুলে ধরা হয়েছে।

সূত্র: bdnews24


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - মোঃ আতিকুল ইসলাম
প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক - মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয় 
সহ-সম্পাদক- মোঃ জাকারিয়া হোসেন
বার্তা সম্পাদক - মোঃ ওলিউল্লাহ

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
পরিবর্তনের প্রত্যাশা, পুরনো রাজনীতির প্রতিফলন: সংকটে এনসিপি
0:00 0:00
1.0x