রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণত ফজর ও জোহরের নামাজে তুলনামূলক দীর্ঘ কিরাত পাঠ করতেন। আসর ও এশায় থাকত মাঝারি দৈর্ঘ্যের কিরাত এবং মাগরিবে পড়তেন অপেক্ষাকৃত ছোট সুরা।
হজরত সুলাইমান ইবনু ইয়াসার (রহ.)-এর বর্ণনায় হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন—
مَا صَلَّيْتُ وَرَاءَ أَحَدٍ أَشْبَهَ صَلاَةً بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ فُلاَنٍ. قَالَ سُلَيْمَانُ: كَانَ يُطِيلُ الرَّكْعَتَيْنِ الأُولَيَيْنِ مِنَ الظُّهْرِ وَيُخَفِّفُ الأُخْرَيَيْنِ، وَيُخَفِّفُ الْعَصْرَ، وَيَقْرَأُ فِي الْمَغْرِبِ بِقِصَارِ الْمُفَصَّلِ، وَيَقْرَأُ فِي الْعِشَاءِ بِأَوْسَاطِ الْمُفَصَّلِ، وَيَقْرَأُ فِي الصُّبْحِ بِطِوَالِ الْمُفَصَّلِ
এর অর্থ, ‘আমি অমুক ব্যক্তির পেছনে এমন নামাজ আর পড়িনি, যার নামাজ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামাজের সঙ্গে এতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুলাইমান বলেন, তিনি জোহরের প্রথম দুই রাকাত দীর্ঘ করতেন এবং শেষ দুই রাকাত সংক্ষিপ্ত রাখতেন। আসরের নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন। মাগরিবে কিসারুল মুফাসসাল, এশায় আওসাতুল মুফাসসাল এবং ফজরে তিওয়ালুল মুফাসসাল পাঠ করতেন।’ (নাসাঈ ৯৮২)
প্রখ্যাত ফকিহ শাইখ ইবনু উসাইমিন (রহ.) মুফাসসাল সুরাগুলোকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন।
দীর্ঘ মুফাসসাল: সুরা কাফ থেকে সুরা আন-নাবা পর্যন্ত।
মাঝারি মুফাসসাল: সুরা আন-নাবা থেকে সুরা আদ-দুহা পর্যন্ত।
ছোট মুফাসসাল: সুরা আদ-দুহা থেকে কুরআনের শেষ সুরা আন-নাস পর্যন্ত।
(আশ-শারহুল মুমতি আলা যাদিল মুস্তাকনি ৩/৭৫)
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের নামাজে প্রায় ৬০ থেকে ১০০ আয়াত তেলাওয়াত করতেন। এটি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধ পারার কাছাকাছি। এ নামাজে তিনি প্রায়ই সুরা কাফ, আস-সাজদাহ, আল-মুলক, আল-মুমিনুন অথবা আস-সাফফাত তেলাওয়াত করতেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সাইব (রা.) বর্ণনা করেন, একবার মক্কায় ফজরের নামাজে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা মুমিনুন শুরু করেন। পরে মুসা, হারুন অথবা ঈসা (আ.)-এর বর্ণনায় পৌঁছালে তাঁর কাশি আসে এবং তিনি রুকুতে চলে যান। (মুসলিম ৪৫৫)
তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে কিরাত সংক্ষিপ্তও করেছেন। সফর অবস্থায় তিনি কখনো সুরা নাস ও সুরা ফালাকের মতো ছোট সুরা দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। (আবু দাউদ ১৪৬২)
ইমামের জন্য মুক্তাদিদের অবস্থা ও প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কোনো শিশুর কান্না শুনলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন।
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنِّي لأَدْخُلُ فِي الصَّلاَةِ وَأَنَا أُرِيدُ إِطَالَتَهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَجَوَّزُ فِي صَلاَتِي مِمَّا أَعْلَمُ مِنْ شدَّةِ وَجْدِ أُمِّهِ مِنْ بُكَائِهِ
অর্থাৎ, ‘আমি নামাজে দাঁড়াই এবং তা দীর্ঘ করার ইচ্ছা রাখি। কিন্তু কোনো শিশুর কান্না শুনলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করি। কারণ আমি জানি, শিশুর কান্নায় তার মায়ের মনে কতটা কষ্ট হয়।’ (বুখারি ৭০৭, মুসলিম ৪৭০)
ইমাম মালিক (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত থাকলে, সফরের তাড়া থাকলে কিংবা কারও সহযোগিতায় যাওয়ার প্রয়োজন হলে সংক্ষিপ্ত কিরাতে নামাজ আদায় করা যেতে পারে। (শরহু সহিহিল বুখারি, ইবনু বাত্তাল ২/৩৮৫)।
এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো কোনো সময়ে ফজরের নামাজে সুরা আত-তাকভির অথবা সুরা আয-যিলযালের মতো ছোট সুরাও তেলাওয়াত করেছেন। (আবু দাউদ ৭৮৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে বোঝা যায়, নামাজে কিরাতের ক্ষেত্রে একনিষ্ঠতার পাশাপাশি ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দর ও সাবলীল তেলাওয়াতের মাধ্যমে নামাজকে প্রাণবন্ত রাখার পাশাপাশি মুক্তাদিদের সামর্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বৃদ্ধ, অসুস্থ ও প্রয়োজনগ্রস্ত মুসল্লিদের উপস্থিতির বিষয়টি বিবেচনা করে কিরাতের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা সুন্নাহর অন্যতম দিক। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সুন্নাহ অনুসরণ করে কিরাত পাঠে এই ভারসাম্য বজায় রাখাই হেদায়েতের পথ।
সূত্র: যুগান্তর

শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণত ফজর ও জোহরের নামাজে তুলনামূলক দীর্ঘ কিরাত পাঠ করতেন। আসর ও এশায় থাকত মাঝারি দৈর্ঘ্যের কিরাত এবং মাগরিবে পড়তেন অপেক্ষাকৃত ছোট সুরা।
হজরত সুলাইমান ইবনু ইয়াসার (রহ.)-এর বর্ণনায় হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন—
مَا صَلَّيْتُ وَرَاءَ أَحَدٍ أَشْبَهَ صَلاَةً بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ فُلاَنٍ. قَالَ سُلَيْمَانُ: كَانَ يُطِيلُ الرَّكْعَتَيْنِ الأُولَيَيْنِ مِنَ الظُّهْرِ وَيُخَفِّفُ الأُخْرَيَيْنِ، وَيُخَفِّفُ الْعَصْرَ، وَيَقْرَأُ فِي الْمَغْرِبِ بِقِصَارِ الْمُفَصَّلِ، وَيَقْرَأُ فِي الْعِشَاءِ بِأَوْسَاطِ الْمُفَصَّلِ، وَيَقْرَأُ فِي الصُّبْحِ بِطِوَالِ الْمُفَصَّلِ
এর অর্থ, ‘আমি অমুক ব্যক্তির পেছনে এমন নামাজ আর পড়িনি, যার নামাজ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামাজের সঙ্গে এতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুলাইমান বলেন, তিনি জোহরের প্রথম দুই রাকাত দীর্ঘ করতেন এবং শেষ দুই রাকাত সংক্ষিপ্ত রাখতেন। আসরের নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন। মাগরিবে কিসারুল মুফাসসাল, এশায় আওসাতুল মুফাসসাল এবং ফজরে তিওয়ালুল মুফাসসাল পাঠ করতেন।’ (নাসাঈ ৯৮২)
প্রখ্যাত ফকিহ শাইখ ইবনু উসাইমিন (রহ.) মুফাসসাল সুরাগুলোকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন।
দীর্ঘ মুফাসসাল: সুরা কাফ থেকে সুরা আন-নাবা পর্যন্ত।
মাঝারি মুফাসসাল: সুরা আন-নাবা থেকে সুরা আদ-দুহা পর্যন্ত।
ছোট মুফাসসাল: সুরা আদ-দুহা থেকে কুরআনের শেষ সুরা আন-নাস পর্যন্ত।
(আশ-শারহুল মুমতি আলা যাদিল মুস্তাকনি ৩/৭৫)
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের নামাজে প্রায় ৬০ থেকে ১০০ আয়াত তেলাওয়াত করতেন। এটি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধ পারার কাছাকাছি। এ নামাজে তিনি প্রায়ই সুরা কাফ, আস-সাজদাহ, আল-মুলক, আল-মুমিনুন অথবা আস-সাফফাত তেলাওয়াত করতেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সাইব (রা.) বর্ণনা করেন, একবার মক্কায় ফজরের নামাজে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা মুমিনুন শুরু করেন। পরে মুসা, হারুন অথবা ঈসা (আ.)-এর বর্ণনায় পৌঁছালে তাঁর কাশি আসে এবং তিনি রুকুতে চলে যান। (মুসলিম ৪৫৫)
তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে কিরাত সংক্ষিপ্তও করেছেন। সফর অবস্থায় তিনি কখনো সুরা নাস ও সুরা ফালাকের মতো ছোট সুরা দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। (আবু দাউদ ১৪৬২)
ইমামের জন্য মুক্তাদিদের অবস্থা ও প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কোনো শিশুর কান্না শুনলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন।
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنِّي لأَدْخُلُ فِي الصَّلاَةِ وَأَنَا أُرِيدُ إِطَالَتَهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَجَوَّزُ فِي صَلاَتِي مِمَّا أَعْلَمُ مِنْ شدَّةِ وَجْدِ أُمِّهِ مِنْ بُكَائِهِ
অর্থাৎ, ‘আমি নামাজে দাঁড়াই এবং তা দীর্ঘ করার ইচ্ছা রাখি। কিন্তু কোনো শিশুর কান্না শুনলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করি। কারণ আমি জানি, শিশুর কান্নায় তার মায়ের মনে কতটা কষ্ট হয়।’ (বুখারি ৭০৭, মুসলিম ৪৭০)
ইমাম মালিক (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত থাকলে, সফরের তাড়া থাকলে কিংবা কারও সহযোগিতায় যাওয়ার প্রয়োজন হলে সংক্ষিপ্ত কিরাতে নামাজ আদায় করা যেতে পারে। (শরহু সহিহিল বুখারি, ইবনু বাত্তাল ২/৩৮৫)।
এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো কোনো সময়ে ফজরের নামাজে সুরা আত-তাকভির অথবা সুরা আয-যিলযালের মতো ছোট সুরাও তেলাওয়াত করেছেন। (আবু দাউদ ৭৮৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে বোঝা যায়, নামাজে কিরাতের ক্ষেত্রে একনিষ্ঠতার পাশাপাশি ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দর ও সাবলীল তেলাওয়াতের মাধ্যমে নামাজকে প্রাণবন্ত রাখার পাশাপাশি মুক্তাদিদের সামর্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বৃদ্ধ, অসুস্থ ও প্রয়োজনগ্রস্ত মুসল্লিদের উপস্থিতির বিষয়টি বিবেচনা করে কিরাতের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা সুন্নাহর অন্যতম দিক। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সুন্নাহ অনুসরণ করে কিরাত পাঠে এই ভারসাম্য বজায় রাখাই হেদায়েতের পথ।
সূত্র: যুগান্তর

আপনার মতামত লিখুন