স্বাধীনতার পর ভারতের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশই ছিল ব্রিটিশ আমলে পাওয়া অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামনির্ভর। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র পরিবর্তন হতে থাকে। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন বা ডিআরডিও। এরপর পর্যায়ক্রমে ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান ও ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়নে মনোযোগ দেয় দেশটি।
বর্তমানে ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তি ও নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডিআরডিওর গবেষণার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগও বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে স্থল, আকাশ ও সমুদ্র—তিন ক্ষেত্রেই ভারতের সামরিক সক্ষমতা আগের তুলনায় আধুনিক হয়েছে।
সামরিক শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভারতের বড় পরিবর্তন এসেছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়। নিজস্ব প্রযুক্তিতে দেশটি আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করেছে। পাশাপাশি মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য এমআরএসএএমও ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। এর সঙ্গে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০, বারাক-৮, স্পাইডার ও কিউআরএসএএমের মতো বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্যও দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। ফলে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশপথের বিভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে ভারত।
ভারতের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য একটি নাম ব্রহ্মোস। ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র স্থল, সমুদ্র ও আকাশ—তিন প্ল্যাটফর্ম থেকেই ব্যবহার করা সম্ভব। ভারতের স্থল ও নৌ প্রতিরক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। উচ্চগতির এই ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত হওয়ায় দূরপাল্লায় নির্ভুল হামলার সক্ষমতা বেড়েছে। পাশাপাশি পৃথ্বী, অগ্নি ও আকাশের মতো ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মাধ্যমে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ভিত্তিও ধাপে ধাপে তৈরি করেছে ভারত।
ভারতীয় সেনাবাহিনীতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। প্রচলিত ট্যাংক ও কামানের পাশাপাশি রকেট সিস্টেম, ক্ষেপণাস্ত্র, আধুনিক রাডার, ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পিনাকা রকেট সিস্টেম, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ব্রহ্মোসের মতো অস্ত্র স্থলবাহিনীর আক্রমণ এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়িয়েছে। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি ও দ্রুত হামলার সক্ষমতা বাড়াতেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও যুদ্ধজাহাজে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করছে ভারত। বিমান ও জাহাজবিধ্বংসী হুমকি মোকাবিলায় যুদ্ধজাহাজগুলোতে বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। বারাক-৮ বা এলআর-এসএএম এবং ভিএল-এসআরএসএএমের মতো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়িয়েছে। সমুদ্রভিত্তিক নিরাপত্তার পাশাপাশি দূরবর্তী অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতেও নৌসক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি।
আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের গুরুত্ব বাড়ায় ভারতও এই খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে টাপাস, রুস্তম, আর্চার, ঘাতক ও সুইফটের মতো বিভিন্ন ধরনের ড্রোন তৈরির কাজ করেছে দেশটি। নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য ড্রোন প্রযুক্তিকে ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ভারতের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিজ্ঞান ও গবেষণাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি দেশটির প্রতিরক্ষা গবেষণায় নতুন ভিত্তি তৈরি করে। বর্তমানে রাডার, সেন্সর, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং হাইপারসনিক প্রযুক্তির মতো আধুনিক ক্ষেত্রেও গবেষণা বাড়ানো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, একসময় বিদেশি ও পুরোনো অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ভারত এখন ধীরে ধীরে দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলছে। আকাশ প্রতিরক্ষা, ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র, স্থলবাহিনীর আধুনিকীকরণ, নৌসক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ড্রোন প্রযুক্তি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রস্তুতি ভারতের সামরিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে।
সূত্র: এই সময়

রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬
স্বাধীনতার পর ভারতের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশই ছিল ব্রিটিশ আমলে পাওয়া অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামনির্ভর। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র পরিবর্তন হতে থাকে। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন বা ডিআরডিও। এরপর পর্যায়ক্রমে ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান ও ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়নে মনোযোগ দেয় দেশটি।
বর্তমানে ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তি ও নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডিআরডিওর গবেষণার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগও বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে স্থল, আকাশ ও সমুদ্র—তিন ক্ষেত্রেই ভারতের সামরিক সক্ষমতা আগের তুলনায় আধুনিক হয়েছে।
সামরিক শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভারতের বড় পরিবর্তন এসেছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়। নিজস্ব প্রযুক্তিতে দেশটি আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করেছে। পাশাপাশি মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য এমআরএসএএমও ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। এর সঙ্গে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০, বারাক-৮, স্পাইডার ও কিউআরএসএএমের মতো বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্যও দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। ফলে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশপথের বিভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে ভারত।
ভারতের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য একটি নাম ব্রহ্মোস। ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র স্থল, সমুদ্র ও আকাশ—তিন প্ল্যাটফর্ম থেকেই ব্যবহার করা সম্ভব। ভারতের স্থল ও নৌ প্রতিরক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। উচ্চগতির এই ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত হওয়ায় দূরপাল্লায় নির্ভুল হামলার সক্ষমতা বেড়েছে। পাশাপাশি পৃথ্বী, অগ্নি ও আকাশের মতো ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মাধ্যমে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ভিত্তিও ধাপে ধাপে তৈরি করেছে ভারত।
ভারতীয় সেনাবাহিনীতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। প্রচলিত ট্যাংক ও কামানের পাশাপাশি রকেট সিস্টেম, ক্ষেপণাস্ত্র, আধুনিক রাডার, ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পিনাকা রকেট সিস্টেম, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ব্রহ্মোসের মতো অস্ত্র স্থলবাহিনীর আক্রমণ এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়িয়েছে। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি ও দ্রুত হামলার সক্ষমতা বাড়াতেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও যুদ্ধজাহাজে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করছে ভারত। বিমান ও জাহাজবিধ্বংসী হুমকি মোকাবিলায় যুদ্ধজাহাজগুলোতে বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। বারাক-৮ বা এলআর-এসএএম এবং ভিএল-এসআরএসএএমের মতো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়িয়েছে। সমুদ্রভিত্তিক নিরাপত্তার পাশাপাশি দূরবর্তী অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতেও নৌসক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি।
আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের গুরুত্ব বাড়ায় ভারতও এই খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে টাপাস, রুস্তম, আর্চার, ঘাতক ও সুইফটের মতো বিভিন্ন ধরনের ড্রোন তৈরির কাজ করেছে দেশটি। নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য ড্রোন প্রযুক্তিকে ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ভারতের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিজ্ঞান ও গবেষণাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি দেশটির প্রতিরক্ষা গবেষণায় নতুন ভিত্তি তৈরি করে। বর্তমানে রাডার, সেন্সর, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং হাইপারসনিক প্রযুক্তির মতো আধুনিক ক্ষেত্রেও গবেষণা বাড়ানো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, একসময় বিদেশি ও পুরোনো অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ভারত এখন ধীরে ধীরে দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলছে। আকাশ প্রতিরক্ষা, ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র, স্থলবাহিনীর আধুনিকীকরণ, নৌসক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ড্রোন প্রযুক্তি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রস্তুতি ভারতের সামরিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে।
সূত্র: এই সময়

আপনার মতামত লিখুন