ঢাকা    বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

ধর্ম

কায়েদে মিল্লাত আপোষহীন রাহবার আল্লামা বাবুনগরীর ইন্তেকালের পাঁচ বছর

কায়েদে মিল্লাত আপোষহীন রাহবার আল্লামা বাবুনগরীর ইন্তেকালের পাঁচ বছর
কায়েদে মিল্লাত আপোষহীন রাহবার আল্লামা বাবুনগরীর ইন্তেকালের পাঁচ বছর

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর ও বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরীর ইন্তেকালের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। তাঁর শিক্ষাজীবন, দীর্ঘ শিক্ষকতা, হাদিস গবেষণা, হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব, শাপলা চত্বরের পর গ্রেপ্তার এবং সংগ্রামী জীবনের নানা অধ্যায় নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।

২০২১ সালের ১৯ আগস্ট বাংলাদেশের ইসলামি অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। ওইদিন ইন্তেকাল করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর ও বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী (রহ.)। দেখতে দেখতে তাঁর ইন্তেকালের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু পরিবর্তিত হলেও আলেমসমাজ ও তাঁর অনুসারীদের কাছে তাঁর কর্মময় জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শের স্মৃতি এখনো অমলিন।

আল্লামা বাবুনগরী ছিলেন শিক্ষক, মুহাদ্দিস, লেখক, সংগঠক ও আন্দোলনের নেতা। তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ইলমের মসনদ ও আন্দোলনের ময়দান—দুটোকেই একসঙ্গে ধারণ করা। কিতাব-সুন্নাহর শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয়েও তিনি প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী ১৯৫৩ সালের ৮ অক্টোবর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারও দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। তাঁর বাবা আল্লামা আবুল হাসান হাটহাজারী মাদরাসার তাফসির বিভাগের শিক্ষক ছিলেন।

শৈশবেই তিনি বাবুনগরের আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে মক্তব, হেফজ ও প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। পরে দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসায় ভর্তি হয়ে উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করেন।

১৯৭৬ সালে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর হাদিস বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান ও গবেষণার জন্য পাকিস্তানে যান।

করাচির জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়ায় উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগে ভর্তি হয়ে প্রায় দুই বছর গবেষণা করেন। সেখানে ইমাম দারিমী ও তাঁর শিক্ষকদের জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে আরবি ভাষায় একটি গবেষণামূলক অভিসন্দর্ভ প্রস্তুত করেন। গবেষণা শেষে তিনি হাদিসের উচ্চতর সনদ অর্জন করেন।

শিক্ষকতা ও জ্ঞানচর্চা

১৯৭৮ সালের শেষ দিকে দেশে ফিরে বাবুনগর মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন আল্লামা বাবুনগরী। দীর্ঘ সময় সেখানে শিক্ষকতার পাশাপাশি উচ্চতর হাদিস গবেষণার একটি বিভাগও চালু করেন।

২০০৩ সালে হাটহাজারী মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা সচিব, সহকারী পরিচালক ও শায়খুল হাদিসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী তাঁর কাছে হাদিস পড়েছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর ছাত্রসংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি। তাঁর ছাত্র-শাগরেদরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি আরবি, বাংলা ও উর্দু ভাষায় বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন তিনি। বিভিন্ন সাময়িকীতেও তাঁর বহু প্রবন্ধ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

ইলমের ময়দান থেকে নেতৃত্বে

সময়ের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি শুধু একজন মুহাদ্দিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইসলাম ও মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে উঠলে তাঁকে নেতৃত্বের সামনেও দেখা গেছে।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, শিক্ষানীতি, মূর্তি-ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর বক্তব্য ও অবস্থান ইসলামপন্থী অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর নাম ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ২০১০ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার সময় তিনি মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০২০ সালে শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি হেফাজতে ইসলামের আমীর নির্বাচিত হন।

এর মাধ্যমে তাঁর নেতৃত্বের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। দেশের কওমি মাদরাসা, আলেমসমাজ ও ইসলামপন্থী অঙ্গনে তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

শাপলা চত্বরের পর কঠিন সময়

আল্লামা বাবুনগরীর সংগ্রামী জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় ২০১৩ সালের ৫ মে। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে সেদিন রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশ ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের পর ব্যাপক ধরপাকড় ও মামলা শুরু হয়। হেফাজত আন্দোলনসহ কয়েকটি অভিযোগে ২০১৩ সালের ৭ মে পুরান ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির এলাকা থেকে আল্লামা বাবুনগরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে ১৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং মোট ১৯ দিন কারাগারে রাখা হয়।

পরবর্তীতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তিনি মুক্তি পান। রিমান্ডে তাঁর ওপর অমানবিক নির্যাতন এবং তাঁকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে আল্লামা বাবুনগরী নিজেই দাবি করেছিলেন।

গ্রেপ্তার ও কারাবাস তাঁর শারীরিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। পরবর্তী সময়েও অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগেছেন তিনি। তবে এসব প্রতিকূলতা তাঁর প্রকাশ্য অবস্থানকে থামাতে পারেনি।

কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি আবার হাদিসের দরসে ফিরেছেন, শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় থেকেছেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের বিশ্বাস ও অবস্থানে অটল থাকার মানসিকতা তাঁকে অনুসারীদের কাছে আলাদা মর্যাদা দেয়।

২০২১ সালের আন্দোলন ও শেষ সময়

২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের ঘটনাও ঘটে। এরপর হেফাজতে ইসলাম ও সংগঠনটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা ও গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হয়।

সংগঠনের অনেক নেতা কারাবন্দি হন। অনেকে রিমান্ড ও মামলার মুখোমুখি হন। এ পরিস্থিতিতে কারাবন্দি আলেম-উলামা ও নেতাকর্মীদের মুক্তি ছিল আল্লামা বাবুনগরীর অন্যতম উদ্বেগের বিষয়।

নিজের শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি তাঁদের মুক্তির বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। বয়স ও অসুস্থতা তাঁকে দুর্বল করে দিলেও সহযোদ্ধাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁর কর্মকাণ্ডে শেষ সময় পর্যন্ত দেখা গেছে।

এ সময়ে তাঁর ওপর সাংগঠনিক ও মানসিক চাপও বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিনের শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি সংগঠনের সংকট ও নেতাকর্মীদের কারাবাস তাঁর শেষ জীবনের বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে।

শেষ বিদায়

২০২১ সালের ১৯ আগস্ট অসুস্থ হয়ে পড়লে আল্লামা বাবুনগরীকে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই দুপুরে তিনি ইন্তেকাল করেন।

তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আলেম, শিক্ষার্থী, অনুসারী ও সাধারণ মানুষ হাটহাজারীতে ছুটে আসেন। জানাজায় বিপুল মানুষের সমাগম হয়। পরে হাটহাজারী মাদরাসার কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

জীবনের দীর্ঘ সময় যে হাটহাজারীতে তিনি হাদিসের দরস দিয়েছেন, সেখানেই তাঁর শেষ ঠিকানা হয়।

পাঁচ বছর পরও অমলিন স্মৃতি

আল্লামা বাবুনগরীর ইন্তেকালের পাঁচ বছর পর তাঁর জীবন ফিরে দেখলে ইলমের প্রতি গভীর অনুরাগ, ছাত্র গড়ার প্রচেষ্টা, লেখালেখি, সংগঠনের নেতৃত্ব, আন্দোলনে সক্রিয়তা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের বিশ্বাসে অটল থাকার বিষয়গুলো সামনে আসে।

তাঁর রাজনৈতিক ও আন্দোলনকেন্দ্রিক অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে দীর্ঘ শিক্ষকতা, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ওপর প্রভাব, হাদিস গবেষণা এবং ইসলামি অঙ্গনে তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। নতুন নেতৃত্ব এসেছে, নতুন আন্দোলনও তৈরি হয়েছে। তবে আল্লামা বাবুনগরীর প্রজন্মের কাছে তিনি একজন সংগ্রামী আলেম হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

হাদিসের মসনদ থেকে রাজপথ, কারাগার থেকে আবার দরসের ময়দান—জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গেছেন।

পাঁচ বছর পরও তাঁর অনুসারীদের কাছে তিনি একজন প্রিয় মুহাদ্দিস ও রাহবার। বাংলাদেশের ইসলামি আন্দোলনের ইতিহাসেও তিনি এমন একটি অধ্যায়ের প্রতিনিধি, যেখানে ইলম, নেতৃত্ব, ত্যাগ ও আপসহীনতার বিষয়গুলো একসূত্রে যুক্ত।

সূত্র: দশদিক।

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬


কায়েদে মিল্লাত আপোষহীন রাহবার আল্লামা বাবুনগরীর ইন্তেকালের পাঁচ বছর

প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর ও বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরীর ইন্তেকালের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। তাঁর শিক্ষাজীবন, দীর্ঘ শিক্ষকতা, হাদিস গবেষণা, হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব, শাপলা চত্বরের পর গ্রেপ্তার এবং সংগ্রামী জীবনের নানা অধ্যায় নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।

২০২১ সালের ১৯ আগস্ট বাংলাদেশের ইসলামি অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। ওইদিন ইন্তেকাল করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর ও বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী (রহ.)। দেখতে দেখতে তাঁর ইন্তেকালের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু পরিবর্তিত হলেও আলেমসমাজ ও তাঁর অনুসারীদের কাছে তাঁর কর্মময় জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শের স্মৃতি এখনো অমলিন।

আল্লামা বাবুনগরী ছিলেন শিক্ষক, মুহাদ্দিস, লেখক, সংগঠক ও আন্দোলনের নেতা। তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ইলমের মসনদ ও আন্দোলনের ময়দান—দুটোকেই একসঙ্গে ধারণ করা। কিতাব-সুন্নাহর শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয়েও তিনি প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী ১৯৫৩ সালের ৮ অক্টোবর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারও দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। তাঁর বাবা আল্লামা আবুল হাসান হাটহাজারী মাদরাসার তাফসির বিভাগের শিক্ষক ছিলেন।

শৈশবেই তিনি বাবুনগরের আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে মক্তব, হেফজ ও প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। পরে দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসায় ভর্তি হয়ে উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করেন।

১৯৭৬ সালে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর হাদিস বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান ও গবেষণার জন্য পাকিস্তানে যান।

করাচির জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়ায় উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগে ভর্তি হয়ে প্রায় দুই বছর গবেষণা করেন। সেখানে ইমাম দারিমী ও তাঁর শিক্ষকদের জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে আরবি ভাষায় একটি গবেষণামূলক অভিসন্দর্ভ প্রস্তুত করেন। গবেষণা শেষে তিনি হাদিসের উচ্চতর সনদ অর্জন করেন।

শিক্ষকতা ও জ্ঞানচর্চা

১৯৭৮ সালের শেষ দিকে দেশে ফিরে বাবুনগর মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন আল্লামা বাবুনগরী। দীর্ঘ সময় সেখানে শিক্ষকতার পাশাপাশি উচ্চতর হাদিস গবেষণার একটি বিভাগও চালু করেন।

২০০৩ সালে হাটহাজারী মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা সচিব, সহকারী পরিচালক ও শায়খুল হাদিসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী তাঁর কাছে হাদিস পড়েছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর ছাত্রসংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি। তাঁর ছাত্র-শাগরেদরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি আরবি, বাংলা ও উর্দু ভাষায় বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন তিনি। বিভিন্ন সাময়িকীতেও তাঁর বহু প্রবন্ধ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

ইলমের ময়দান থেকে নেতৃত্বে

সময়ের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি শুধু একজন মুহাদ্দিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইসলাম ও মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে উঠলে তাঁকে নেতৃত্বের সামনেও দেখা গেছে।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, শিক্ষানীতি, মূর্তি-ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর বক্তব্য ও অবস্থান ইসলামপন্থী অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর নাম ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ২০১০ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার সময় তিনি মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০২০ সালে শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি হেফাজতে ইসলামের আমীর নির্বাচিত হন।

এর মাধ্যমে তাঁর নেতৃত্বের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। দেশের কওমি মাদরাসা, আলেমসমাজ ও ইসলামপন্থী অঙ্গনে তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

শাপলা চত্বরের পর কঠিন সময়

আল্লামা বাবুনগরীর সংগ্রামী জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় ২০১৩ সালের ৫ মে। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে সেদিন রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশ ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের পর ব্যাপক ধরপাকড় ও মামলা শুরু হয়। হেফাজত আন্দোলনসহ কয়েকটি অভিযোগে ২০১৩ সালের ৭ মে পুরান ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির এলাকা থেকে আল্লামা বাবুনগরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে ১৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং মোট ১৯ দিন কারাগারে রাখা হয়।

পরবর্তীতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তিনি মুক্তি পান। রিমান্ডে তাঁর ওপর অমানবিক নির্যাতন এবং তাঁকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে আল্লামা বাবুনগরী নিজেই দাবি করেছিলেন।

গ্রেপ্তার ও কারাবাস তাঁর শারীরিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। পরবর্তী সময়েও অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগেছেন তিনি। তবে এসব প্রতিকূলতা তাঁর প্রকাশ্য অবস্থানকে থামাতে পারেনি।

কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি আবার হাদিসের দরসে ফিরেছেন, শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় থেকেছেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের বিশ্বাস ও অবস্থানে অটল থাকার মানসিকতা তাঁকে অনুসারীদের কাছে আলাদা মর্যাদা দেয়।

২০২১ সালের আন্দোলন ও শেষ সময়

২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের ঘটনাও ঘটে। এরপর হেফাজতে ইসলাম ও সংগঠনটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা ও গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হয়।

সংগঠনের অনেক নেতা কারাবন্দি হন। অনেকে রিমান্ড ও মামলার মুখোমুখি হন। এ পরিস্থিতিতে কারাবন্দি আলেম-উলামা ও নেতাকর্মীদের মুক্তি ছিল আল্লামা বাবুনগরীর অন্যতম উদ্বেগের বিষয়।

নিজের শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি তাঁদের মুক্তির বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। বয়স ও অসুস্থতা তাঁকে দুর্বল করে দিলেও সহযোদ্ধাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁর কর্মকাণ্ডে শেষ সময় পর্যন্ত দেখা গেছে।

এ সময়ে তাঁর ওপর সাংগঠনিক ও মানসিক চাপও বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিনের শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি সংগঠনের সংকট ও নেতাকর্মীদের কারাবাস তাঁর শেষ জীবনের বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে।

শেষ বিদায়

২০২১ সালের ১৯ আগস্ট অসুস্থ হয়ে পড়লে আল্লামা বাবুনগরীকে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই দুপুরে তিনি ইন্তেকাল করেন।

তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আলেম, শিক্ষার্থী, অনুসারী ও সাধারণ মানুষ হাটহাজারীতে ছুটে আসেন। জানাজায় বিপুল মানুষের সমাগম হয়। পরে হাটহাজারী মাদরাসার কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

জীবনের দীর্ঘ সময় যে হাটহাজারীতে তিনি হাদিসের দরস দিয়েছেন, সেখানেই তাঁর শেষ ঠিকানা হয়।

পাঁচ বছর পরও অমলিন স্মৃতি

আল্লামা বাবুনগরীর ইন্তেকালের পাঁচ বছর পর তাঁর জীবন ফিরে দেখলে ইলমের প্রতি গভীর অনুরাগ, ছাত্র গড়ার প্রচেষ্টা, লেখালেখি, সংগঠনের নেতৃত্ব, আন্দোলনে সক্রিয়তা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের বিশ্বাসে অটল থাকার বিষয়গুলো সামনে আসে।

তাঁর রাজনৈতিক ও আন্দোলনকেন্দ্রিক অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে দীর্ঘ শিক্ষকতা, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ওপর প্রভাব, হাদিস গবেষণা এবং ইসলামি অঙ্গনে তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। নতুন নেতৃত্ব এসেছে, নতুন আন্দোলনও তৈরি হয়েছে। তবে আল্লামা বাবুনগরীর প্রজন্মের কাছে তিনি একজন সংগ্রামী আলেম হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

হাদিসের মসনদ থেকে রাজপথ, কারাগার থেকে আবার দরসের ময়দান—জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গেছেন।

পাঁচ বছর পরও তাঁর অনুসারীদের কাছে তিনি একজন প্রিয় মুহাদ্দিস ও রাহবার। বাংলাদেশের ইসলামি আন্দোলনের ইতিহাসেও তিনি এমন একটি অধ্যায়ের প্রতিনিধি, যেখানে ইলম, নেতৃত্ব, ত্যাগ ও আপসহীনতার বিষয়গুলো একসূত্রে যুক্ত।

সূত্র: দশদিক।


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - মোঃ আতিকুল ইসলাম
প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক - মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয় 
সহ-সম্পাদক- মোঃ জাকারিয়া হোসেন
বার্তা সম্পাদক - মোঃ ওলিউল্লাহ

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
কায়েদে মিল্লাত আপোষহীন রাহবার আল্লামা বাবুনগরীর ইন্তেকালের পাঁচ বছর
0:00 0:00
1.0x