রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুলের জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর অধিবেশনকক্ষেই ফল ঘোষণা করা হবে।
বুধবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রথম ভোটগ্রহণের ৩৫ বছর পর এবার আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হচ্ছে। তাঁর মতে, এ কারণে এবারের নির্বাচন ঐতিহাসিক এবং এর দিকে দেশ ও বিশ্বের মানুষের আগ্রহ রয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পর একজন রাষ্ট্রপতি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়ে সবার আগ্রহ রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতা ভোট দেবেন। তাঁদের ভোট দেওয়ার সময় সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা থাকবে। ভোট চলার সময়ে সম্প্রচার বন্ধ থাকবে এবং বিকেল ৫টায় ভোট গণনা শুরু হলে আবার সরাসরি সম্প্রচার চালু হবে।
কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা দেখা যাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, বিষয়টি উন্মুক্ত থাকবে। ব্যালটে প্রার্থীর নামের পাশে ভোটারের নাম থাকবে। ব্যালট পাওয়ার পর তিনি তা গণনার সময় কে কাকে ভোট দিয়েছেন, তা দেখতে পারবেন। অন্য নির্বাচনে সাধারণত এমনটি দেখা যায় না বলেও তিনি জানান।
কতটি ব্যালট ছাপানো হয়েছে, কতটি ব্যবহার হয়েছে, কতটি অব্যবহৃত রয়েছে, কতটি বাতিল হয়েছে এবং প্রার্থীরা কত ভোট পেয়েছেন—সব তথ্য বিস্তারিতভাবে ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার কিছুটা ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন নির্বাচনী কর্তা। তাঁর ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভ্যস্ত নন, সংসদ সচিবালয়ও এ প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত নয়। তারপরও প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি ও মহড়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
অধিবেশনকক্ষের বাইরে ভোটের প্রচারে বাধা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ভোটের দিন অধিবেশনকক্ষের ভেতরে কোনো প্রচার-প্রচারণা করা যাবে না। নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর এমন একটি নির্বাচন পরিচালনার সুযোগ পাওয়া তাঁর জন্য ভাগ্যের বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল সরকারি দল বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলায় আয়োজিত সভায় সংসদ সদস্যদের নির্বাচন বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, সভায় নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং সবাইকে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটের ভোটারদেরও একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার ভোট শুরুর আগে তাদের সংসদীয় দলের সভা হবে। সেখানে ১১ দলীয় ঐক্যের ভোটারদের অলি আহমদকে ভোট দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হবে।
বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আজ একটি ঐতিহাসিক দিন। অনেক মূল্য দিয়ে তারা এ অবস্থানে এসেছেন। এ জন্য তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।
তিনি বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রের সর্বত্র জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিষয়টি সবাইকে মনে রাখতে হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মির্জা ফখরুল বহু বছর ধরে দলের সঙ্গে যুক্ত। দলের কঠিন সময়ে সাহসের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং কখনো দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। তাঁকে কারাবন্দিও করা হয়েছিল। সে সময় তারেক রহমানকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের বাইরে থাকতে হয়েছিল।
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে দলীয় সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকার কথা বলেন। বিশেষভাবে সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় বিদায়ী বক্তব্য দেওয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি নেতাকর্মীদের কাছে দোয়া চান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, বক্তব্যের শুরুতে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন মির্জা ফখরুল এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, দায়িত্ব পালনের সময়ে তাঁর কোনো ভুল হয়ে থাকলে বা অজান্তে কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
তিনি বলেন, দল তাঁকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও তিনি সেই সম্মান রক্ষা করবেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না বলেও জানান তিনি।
বঙ্গভবনে যাওয়ার পর সহকর্মীদের মিস করবেন উল্লেখ করে তিনি সবার কাছে দোয়া চান।
সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আব্দুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, আগামীকাল শুক্রবার নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ নেবেন। ২১ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বঙ্গভবনে এ আয়োজন করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমান সংসদে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলের সংসদ সদস্য ২৫০ জন। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্য ৯০ জন। ফলে ভোটের সংখ্যাগত হিসাব অনুযায়ী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় অনেকটাই স্পষ্ট।
তবে অলি আহমদকে প্রার্থী করে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষের ভোটার সংখ্যা বেশি হওয়ায় জয় সম্ভব নয় জেনেও তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের ভূমিকা তুলে ধরা।
এ সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন আটজন। জোটের বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন এমপিও রয়েছেন। এই নয়টি ভোট কোন প্রার্থীর দিকে যাবে, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে।
সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিপরীতে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার বিধানসংক্রান্ত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে করা রিট খারিজের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন রিটকারী আইনজীবী ইউনূছ আলী আকন্দ। আবেদনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিতের আবেদনও করা হয়েছে।
গত ১৩ আগস্ট হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি করেন ইউনূছ আলী আকন্দ। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না এবং এ অনুচ্ছেদ বহাল থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—এ বিষয়ে রুল চাওয়া হয়।
প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারি হলে তা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত রাখার আবেদন করেন তিনি। রিটে আইনসচিব ও মন্ত্রিপরিষদসচিবকে বিবাদী করা হয়।
গত মঙ্গলবার বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের বেঞ্চ রিটটি সরাসরি খারিজ করে দেন। আদেশে বলা হয়, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে একই যুক্তিতে ২০১৭ সালেও রিট করেছিলেন আবেদনকারী। প্রাথমিক শুনানির পর ওই রিটে দ্বিধাবিভক্ত আদেশ হয়েছিল। পরে তৃতীয় বেঞ্চ গঠন করা হয় এবং শুনানি শেষে ২০১৮ সালে রিটটি খারিজ হয়।
আদেশে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালের রিট খারিজের বিরুদ্ধে আবেদনকারী পরে কোনো আপিল করেননি। ফলে একই যুক্তি ও একই আবেদনের ভিত্তিতে করা বর্তমান রিটের আর কোনো সারবত্তা নেই। আগের রিট খারিজের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে প্রতিকার না চেয়ে একই বিষয়ে একই যুক্তিতে করা রিটে হাইকোর্ট থেকে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নেই।
এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে সিদ্ধান্ত সংসদেই হওয়া সমীচীন বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুলের জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর অধিবেশনকক্ষেই ফল ঘোষণা করা হবে।
বুধবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রথম ভোটগ্রহণের ৩৫ বছর পর এবার আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হচ্ছে। তাঁর মতে, এ কারণে এবারের নির্বাচন ঐতিহাসিক এবং এর দিকে দেশ ও বিশ্বের মানুষের আগ্রহ রয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পর একজন রাষ্ট্রপতি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়ে সবার আগ্রহ রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতা ভোট দেবেন। তাঁদের ভোট দেওয়ার সময় সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা থাকবে। ভোট চলার সময়ে সম্প্রচার বন্ধ থাকবে এবং বিকেল ৫টায় ভোট গণনা শুরু হলে আবার সরাসরি সম্প্রচার চালু হবে।
কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা দেখা যাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, বিষয়টি উন্মুক্ত থাকবে। ব্যালটে প্রার্থীর নামের পাশে ভোটারের নাম থাকবে। ব্যালট পাওয়ার পর তিনি তা গণনার সময় কে কাকে ভোট দিয়েছেন, তা দেখতে পারবেন। অন্য নির্বাচনে সাধারণত এমনটি দেখা যায় না বলেও তিনি জানান।
কতটি ব্যালট ছাপানো হয়েছে, কতটি ব্যবহার হয়েছে, কতটি অব্যবহৃত রয়েছে, কতটি বাতিল হয়েছে এবং প্রার্থীরা কত ভোট পেয়েছেন—সব তথ্য বিস্তারিতভাবে ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার কিছুটা ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন নির্বাচনী কর্তা। তাঁর ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভ্যস্ত নন, সংসদ সচিবালয়ও এ প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত নয়। তারপরও প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি ও মহড়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
অধিবেশনকক্ষের বাইরে ভোটের প্রচারে বাধা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ভোটের দিন অধিবেশনকক্ষের ভেতরে কোনো প্রচার-প্রচারণা করা যাবে না। নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর এমন একটি নির্বাচন পরিচালনার সুযোগ পাওয়া তাঁর জন্য ভাগ্যের বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল সরকারি দল বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলায় আয়োজিত সভায় সংসদ সদস্যদের নির্বাচন বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, সভায় নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং সবাইকে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটের ভোটারদেরও একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার ভোট শুরুর আগে তাদের সংসদীয় দলের সভা হবে। সেখানে ১১ দলীয় ঐক্যের ভোটারদের অলি আহমদকে ভোট দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হবে।
বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আজ একটি ঐতিহাসিক দিন। অনেক মূল্য দিয়ে তারা এ অবস্থানে এসেছেন। এ জন্য তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।
তিনি বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রের সর্বত্র জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিষয়টি সবাইকে মনে রাখতে হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মির্জা ফখরুল বহু বছর ধরে দলের সঙ্গে যুক্ত। দলের কঠিন সময়ে সাহসের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং কখনো দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। তাঁকে কারাবন্দিও করা হয়েছিল। সে সময় তারেক রহমানকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের বাইরে থাকতে হয়েছিল।
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে দলীয় সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকার কথা বলেন। বিশেষভাবে সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় বিদায়ী বক্তব্য দেওয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি নেতাকর্মীদের কাছে দোয়া চান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, বক্তব্যের শুরুতে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন মির্জা ফখরুল এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, দায়িত্ব পালনের সময়ে তাঁর কোনো ভুল হয়ে থাকলে বা অজান্তে কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
তিনি বলেন, দল তাঁকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও তিনি সেই সম্মান রক্ষা করবেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না বলেও জানান তিনি।
বঙ্গভবনে যাওয়ার পর সহকর্মীদের মিস করবেন উল্লেখ করে তিনি সবার কাছে দোয়া চান।
সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আব্দুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, আগামীকাল শুক্রবার নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ নেবেন। ২১ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বঙ্গভবনে এ আয়োজন করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমান সংসদে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলের সংসদ সদস্য ২৫০ জন। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্য ৯০ জন। ফলে ভোটের সংখ্যাগত হিসাব অনুযায়ী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় অনেকটাই স্পষ্ট।
তবে অলি আহমদকে প্রার্থী করে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষের ভোটার সংখ্যা বেশি হওয়ায় জয় সম্ভব নয় জেনেও তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের ভূমিকা তুলে ধরা।
এ সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন আটজন। জোটের বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন এমপিও রয়েছেন। এই নয়টি ভোট কোন প্রার্থীর দিকে যাবে, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে।
সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিপরীতে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার বিধানসংক্রান্ত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে করা রিট খারিজের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন রিটকারী আইনজীবী ইউনূছ আলী আকন্দ। আবেদনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিতের আবেদনও করা হয়েছে।
গত ১৩ আগস্ট হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি করেন ইউনূছ আলী আকন্দ। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না এবং এ অনুচ্ছেদ বহাল থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—এ বিষয়ে রুল চাওয়া হয়।
প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারি হলে তা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত রাখার আবেদন করেন তিনি। রিটে আইনসচিব ও মন্ত্রিপরিষদসচিবকে বিবাদী করা হয়।
গত মঙ্গলবার বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের বেঞ্চ রিটটি সরাসরি খারিজ করে দেন। আদেশে বলা হয়, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে একই যুক্তিতে ২০১৭ সালেও রিট করেছিলেন আবেদনকারী। প্রাথমিক শুনানির পর ওই রিটে দ্বিধাবিভক্ত আদেশ হয়েছিল। পরে তৃতীয় বেঞ্চ গঠন করা হয় এবং শুনানি শেষে ২০১৮ সালে রিটটি খারিজ হয়।
আদেশে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালের রিট খারিজের বিরুদ্ধে আবেদনকারী পরে কোনো আপিল করেননি। ফলে একই যুক্তি ও একই আবেদনের ভিত্তিতে করা বর্তমান রিটের আর কোনো সারবত্তা নেই। আগের রিট খারিজের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে প্রতিকার না চেয়ে একই বিষয়ে একই যুক্তিতে করা রিটে হাইকোর্ট থেকে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নেই।
এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে সিদ্ধান্ত সংসদেই হওয়া সমীচীন বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ

আপনার মতামত লিখুন