গাজার মাগাজি শরণার্থী শিবিরে প্রতিদিন সূর্য ওঠার পর পানি সংগ্রহের জন্য ট্রাকের অপেক্ষায় থাকে ১০ বছর বয়সী মায়সারা জাকুত। প্রায় ২০ লিটার বা পাঁচ গ্যালন ধারণক্ষমতার একটি পাত্র কাঁধে নিয়ে পরিবারের তাঁবুতে পানি পৌঁছে দেয় সে।
মায়সারা আল জাজিরাকে জানিয়েছে, তাদের তাঁবুতে কোনো পানি নেই। পান করার জন্য যেমন নেই, তেমনি বাসন পরিষ্কার কিংবা টয়লেট ব্যবহারের জন্যও পানি পাওয়া যায় না।
১২ বছর বয়সী ইয়ামেন সালেহও পানি বহনের কষ্টের কথা জানিয়েছে। তার ভাষ্য, প্রতিবার তাঁবুতে পানি নিয়ে যাওয়ার পর সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা অনুভব করে। বিশেষ করে কাঁধ ও পিঠে ব্যথা বেশি হয় বলে জানায় সে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ভারী পানির পাত্র বহন করার কারণে শিশুদের মধ্যে এমন কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা যুদ্ধের আগে তাদের বয়সী শিশুদের মধ্যে খুব একটা দেখা যেত না। এসব সমস্যার মধ্যে হার্নিয়া এবং মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যাওয়ার সমস্যা, অর্থাৎ স্কোলিওসিসও রয়েছে।
দুই সন্তানের মা ফিদা সালেহ বলেন, বাস্তুচ্যুত জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে সন্তানদের আগের স্বাভাবিক জীবনের স্মৃতিই এখন তাদের আনন্দের অন্যতম উৎস। তার ভাষায়, এসব স্মৃতির মধ্য দিয়েই কঠিন বাস্তবতার মাঝে কিছুটা সুখ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
গাজার পুনর্গঠন শুরু না হওয়া পর্যন্ত এসব সমস্যা চলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলের যুদ্ধে গাজায় ৭৩ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। উপত্যকার অধিকাংশ মানুষ বর্তমানে বাস্তুচ্যুত হয়ে বিভিন্ন শিবিরে অবস্থান করছেন।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজার পুনর্গঠন শুরু হয়নি। পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নানা বাধা রয়েছে। ইসরাইলের অবস্থান হলো, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজার পুনর্গঠনের অনুমতি দেওয়া হবে না।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোও বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। পানি ও খাবারের জন্য গাজার মানুষ এসব সংস্থার সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি বছর ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন এবং জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফসহ কয়েকটি সংস্থাকে গাজায় তাদের কার্যক্রম কমাতে হয়েছে। মানবিক সহায়তা বহনকারী ট্রাক প্রবেশে বিধিনিষেধ এবং অর্থের সংকটকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে গাজার বিপুলসংখ্যক মানুষের এখনো জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। ইউনিসেফের হিসাবে, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন মাথাপিছু ছয় লিটার বা ১ দশমিক ৬ গ্যালনের পানি পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত। জাতিসংঘের এই সংস্থার মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে নির্ধারিত ন্যূনতম প্রয়োজনের তুলনায় এই পরিমাণও অনেক কম।
ইউনিসেফ আরও জানিয়েছে, গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এ অবস্থায় নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
মাগাজি শিবিরের মেয়র মোহাম্মদ মোসলেহ জানান, শিবিরটিতে তীব্র পানি সংকট চলছে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। ইসরাইলি অবরোধের কারণে পানির পাম্প ও জেনারেটর চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ এবং জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, গাজার যেসব এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেসব এলাকার বিস্তারের কারণে পৌর কর্তৃপক্ষের পানির কূপগুলোতেও প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়েছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি গত বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
মোসলেহ জানান, মাগাজি শিবিরে স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষের পরিচালনায় মাত্র একটি পানির ট্যাংকার রয়েছে। অথচ পাঁচ হাজারের বেশি পরিবারের পানির প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা এই একটি ট্যাংকার দিয়েই করতে হচ্ছে।
প্রতিদিন খাবার ও পানির সন্ধানে সংগ্রাম করতে গিয়ে পরিবারগুলো চরম অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছে। শিশুদের ওপর এর মানসিক চাপ আরও গভীর হয়ে উঠছে।
মায়সারার মা হুদা জাকুত জানান, খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলে তার মেয়ে প্রায়ই কান্নায় ভেঙে পড়ে।
হুদার ভাষ্য, একবার তার মেয়ে তাঁবুতে ফিরে আসে কান্নারত অবস্থায়, হাতে ছিল একটি খালি বাটি। দৃশ্যটি দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান। মেয়েটি শুধু নিজের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় কষ্ট পায়নি, পরিবারের জন্য খাবার সংগ্রহ করতে না পারার বিষয়টিও তাকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল।
সূত্র: আল জাজিরা

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
গাজার মাগাজি শরণার্থী শিবিরে প্রতিদিন সূর্য ওঠার পর পানি সংগ্রহের জন্য ট্রাকের অপেক্ষায় থাকে ১০ বছর বয়সী মায়সারা জাকুত। প্রায় ২০ লিটার বা পাঁচ গ্যালন ধারণক্ষমতার একটি পাত্র কাঁধে নিয়ে পরিবারের তাঁবুতে পানি পৌঁছে দেয় সে।
মায়সারা আল জাজিরাকে জানিয়েছে, তাদের তাঁবুতে কোনো পানি নেই। পান করার জন্য যেমন নেই, তেমনি বাসন পরিষ্কার কিংবা টয়লেট ব্যবহারের জন্যও পানি পাওয়া যায় না।
১২ বছর বয়সী ইয়ামেন সালেহও পানি বহনের কষ্টের কথা জানিয়েছে। তার ভাষ্য, প্রতিবার তাঁবুতে পানি নিয়ে যাওয়ার পর সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা অনুভব করে। বিশেষ করে কাঁধ ও পিঠে ব্যথা বেশি হয় বলে জানায় সে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ভারী পানির পাত্র বহন করার কারণে শিশুদের মধ্যে এমন কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা যুদ্ধের আগে তাদের বয়সী শিশুদের মধ্যে খুব একটা দেখা যেত না। এসব সমস্যার মধ্যে হার্নিয়া এবং মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যাওয়ার সমস্যা, অর্থাৎ স্কোলিওসিসও রয়েছে।
দুই সন্তানের মা ফিদা সালেহ বলেন, বাস্তুচ্যুত জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে সন্তানদের আগের স্বাভাবিক জীবনের স্মৃতিই এখন তাদের আনন্দের অন্যতম উৎস। তার ভাষায়, এসব স্মৃতির মধ্য দিয়েই কঠিন বাস্তবতার মাঝে কিছুটা সুখ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
গাজার পুনর্গঠন শুরু না হওয়া পর্যন্ত এসব সমস্যা চলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলের যুদ্ধে গাজায় ৭৩ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। উপত্যকার অধিকাংশ মানুষ বর্তমানে বাস্তুচ্যুত হয়ে বিভিন্ন শিবিরে অবস্থান করছেন।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজার পুনর্গঠন শুরু হয়নি। পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নানা বাধা রয়েছে। ইসরাইলের অবস্থান হলো, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজার পুনর্গঠনের অনুমতি দেওয়া হবে না।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোও বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। পানি ও খাবারের জন্য গাজার মানুষ এসব সংস্থার সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি বছর ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন এবং জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফসহ কয়েকটি সংস্থাকে গাজায় তাদের কার্যক্রম কমাতে হয়েছে। মানবিক সহায়তা বহনকারী ট্রাক প্রবেশে বিধিনিষেধ এবং অর্থের সংকটকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে গাজার বিপুলসংখ্যক মানুষের এখনো জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। ইউনিসেফের হিসাবে, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন মাথাপিছু ছয় লিটার বা ১ দশমিক ৬ গ্যালনের পানি পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত। জাতিসংঘের এই সংস্থার মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে নির্ধারিত ন্যূনতম প্রয়োজনের তুলনায় এই পরিমাণও অনেক কম।
ইউনিসেফ আরও জানিয়েছে, গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এ অবস্থায় নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
মাগাজি শিবিরের মেয়র মোহাম্মদ মোসলেহ জানান, শিবিরটিতে তীব্র পানি সংকট চলছে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। ইসরাইলি অবরোধের কারণে পানির পাম্প ও জেনারেটর চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ এবং জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, গাজার যেসব এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেসব এলাকার বিস্তারের কারণে পৌর কর্তৃপক্ষের পানির কূপগুলোতেও প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়েছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি গত বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
মোসলেহ জানান, মাগাজি শিবিরে স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষের পরিচালনায় মাত্র একটি পানির ট্যাংকার রয়েছে। অথচ পাঁচ হাজারের বেশি পরিবারের পানির প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা এই একটি ট্যাংকার দিয়েই করতে হচ্ছে।
প্রতিদিন খাবার ও পানির সন্ধানে সংগ্রাম করতে গিয়ে পরিবারগুলো চরম অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছে। শিশুদের ওপর এর মানসিক চাপ আরও গভীর হয়ে উঠছে।
মায়সারার মা হুদা জাকুত জানান, খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলে তার মেয়ে প্রায়ই কান্নায় ভেঙে পড়ে।
হুদার ভাষ্য, একবার তার মেয়ে তাঁবুতে ফিরে আসে কান্নারত অবস্থায়, হাতে ছিল একটি খালি বাটি। দৃশ্যটি দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান। মেয়েটি শুধু নিজের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় কষ্ট পায়নি, পরিবারের জন্য খাবার সংগ্রহ করতে না পারার বিষয়টিও তাকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল।
সূত্র: আল জাজিরা

আপনার মতামত লিখুন