ঢাকা    বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

মতামত

বিটিভির লোগো নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে রূপান্তর

বিটিভির লোগো নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে রূপান্তর


একটি গণমাধ্যমের শক্তি তার লোগোতে নয়, মানুষের আস্থায়। দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, দ্রুত ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনগণের কথা তুলে ধরার সক্ষমতাই একটি গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করে। সেই জায়গা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন গণমাধ্যম—বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও বাংলাদেশ বেতারকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

বিটিভির লোগো পরিবর্তন নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—শুধু লোগো পরিবর্তন করলেই কি রাষ্ট্রায়ত্ত এই সম্প্রচারমাধ্যমের দর্শক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে? নাকি প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো, সংবাদ পরিবেশনের ধরন, ব্যবস্থাপনা এবং তৃণমূল পর্যায়ের কার্যক্রমে আমূল পরিবর্তন?

বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের মতে, বিটিভির লোগো পরিবর্তনের চেয়ে বেশি জরুরি প্রতিষ্ঠানটিকে দায়িত্বশীল ও গণমুখী গণমাধ্যমে পরিণত করা। সংগঠনটির দাবি, বিটিভির দর্শক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধির সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের বসবাস রাজধানীর বাইরে। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা কিংবা সীমান্তবর্তী এলাকার প্রতিদিনের অসংখ্য ঘটনা জাতীয় গণমাধ্যমের আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ এসব এলাকার মানুষের জীবন, সংকট, সম্ভাবনা ও উন্নয়নচিত্রই বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম যদি জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়, তাহলে তার সংবাদ কাভারেজও হওয়া উচিত জনগণকেন্দ্রিক। উপজেলা পর্যায়ে দক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধি থাকলে স্থানীয় সমস্যা, প্রশাসনের কার্যক্রম, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কৃষি, নদীভাঙন, দুর্যোগ, অপরাধ, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনার খবর সরাসরি জাতীয় সম্প্রচারে উঠে আসতে পারে।

এতে শুধু বিটিভির সংবাদভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে না; তৃণমূলের মানুষও রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে নিজেদের গণমাধ্যম হিসেবে ভাবার সুযোগ পাবে।

আয়-ব্যয়ের ব্যবধানও ভাবনার বিষয়

রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনাও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বিটিভির আয় ছিল ৮ কোটি ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।

আগের কয়েক বছরের হিসাবেও আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল ৩৪ কোটি ৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, বিপরীতে ব্যয় ২৮০ কোটি ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ৪০ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ২৮৫ কোটি ৪৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় দাঁড়ায় ৩০ কোটি ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, আর ব্যয় বেড়ে হয় ৩৭০ কোটি ৬১ লাখ ৫১ হাজার টাকা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল ৪৪ কোটি ৪১ লাখ ২২ হাজার টাকা, বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২৯৮ কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ৩০৭ কোটি ১২ লাখ ২২ হাজার টাকা।

এই পরিসংখ্যান কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের কার্যকারিতা, ব্যবস্থাপনা ও জনসম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন সামনে আনে।

বাসসের সংকটও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা—বাসসের অবস্থাও নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। দেশে বিপুলসংখ্যক সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল থাকলেও বাসসের গ্রাহকসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।

বাসসের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির গ্রাহক ৪৮টি; এর মধ্যে নিয়মিত সেবা নেয় ২৮টি মিডিয়া। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাসসের নিজস্ব সংবাদসেবা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন দেশের সংবাদ সংস্থার সঙ্গে খবর আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকলেও বিদেশে বাসসের নিজস্ব গ্রাহক না থাকা প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির গ্রাহক বাসস। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংগ্রহে বাসসকে অন্য সংস্থার সেবা নিতে হচ্ছে, অথচ নিজের উৎপাদিত সংবাদ আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির সক্ষমতা এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছেনি।

বাসসের বিজ্ঞাপন আয়ও নেই। বার্ষিক গ্রাহক ফি থেকে আয় প্রায় ৬৭ লাখ টাকা হলেও সেই অর্থও অনাদায়ী থাকার কথা বলা হচ্ছে। বিপরীতে সরকার থেকে বছরে ৩৮ কোটি টাকার বেশি অনুদান নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত একটি সংবাদ সংস্থা কীভাবে আরও দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য অপরিহার্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে?

বাসসকে ঘিরে দলীয়করণ, ইচ্ছেমতো নিয়োগ ও পদোন্নতির মতো অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিক ও কর্মীদের চাকরি ও অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জনস্বার্থে অবদান।

ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশ বেতারের চ্যালেঞ্জ

বিটিভি ও বাসসের পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতারও রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় দেশের কোটি মানুষের কাছে সংবাদ, বিনোদন ও জনসচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল বেতার।

কিন্তু ডিজিটাল যুগে মানুষের তথ্য গ্রহণের অভ্যাস বদলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলোর প্রতিযোগিতা বেড়েছে।

এই বাস্তবতায় শুধু পুরোনো কাঠামো ধরে রাখলে হবে না। বাংলাদেশ বেতারকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, স্থানীয় কনটেন্ট, দ্রুত সংবাদ এবং জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠানকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শক্তিশালী প্রতিনিধি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি।

তৃণমূলে প্রতিনিধি বাড়ানোর প্রয়োজন

বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম দীর্ঘদিন ধরে বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতারে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছে। সাংবাদিকদের রুটি-রুজির ১৪ দফা দাবির মধ্যেও এটি অন্যতম।

দাবিটি বাস্তবায়িত হলে সারাদেশে দেড় হাজারের বেশি সাংবাদিকের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সুফল শুধু কর্মসংস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহের পরিধিও বহুগুণে বাড়তে পারে।

একজন স্থানীয় প্রতিনিধি তার এলাকার এমন অনেক খবর জানেন, যা ঢাকার কোনো ডেস্কের পক্ষে নিয়মিতভাবে জানা সম্ভব নয়। সঠিক প্রশিক্ষণ, নৈতিকতার মানদণ্ড এবং পেশাগত জবাবদিহির আওতায় এসব প্রতিনিধিকে কাজে লাগানো গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের সংবাদভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

লোগোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের আস্থা

একটি গণমাধ্যমের ব্র্যান্ডিং গুরুত্বপূর্ণ—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ব্র্যান্ডের বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের পরিবর্তন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিটিভির পর্দায় নতুন লোগো দর্শকের চোখে পড়বে; কিন্তু দর্শককে ধরে রাখবে ভালো অনুষ্ঠান, নির্ভরযোগ্য সংবাদ, দ্রুত আপডেট, স্থানীয় মানুষের কথা এবং রাষ্ট্রের পাশাপাশি জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া সাংবাদিকতা।

একইভাবে বাসসের নতুন প্রযুক্তি কিংবা নতুন স্লোগান তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সংবাদ দেশের সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ বেতারও তখনই তার পুরোনো শক্তি ফিরে পাবে, যখন শ্রোতা মনে করবেন—এই মাধ্যমটি তার জীবনের কথা বলে।

প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার

রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে কার্যকর করতে শুধু সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পেশাদার নেতৃত্ব, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সংবাদ পরিবেশনের সংস্কৃতি এবং কঠোর জবাবদিহি।

এর পাশাপাশি প্রয়োজন এমন সাংবাদিক, যারা চাকরিকে শুধু বেতন-ভাতার সুযোগ হিসেবে দেখবেন না; বরং জনগণের প্রতি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করবেন। যারা মাঠে যাবেন, মানুষের কথা শুনবেন, তথ্য যাচাই করবেন এবং রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত গণমাধ্যমকে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে ভূমিকা রাখবেন।

বেসরকারি গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে সরকারি প্রতিষ্ঠানসুলভ ধীরগতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পেশাদার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে হবে।

বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতার কেবল সরকারি দপ্তর নয়; এগুলো জনগণের অর্থে পরিচালিত জাতীয় গণমাধ্যম। তাই এগুলোর সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে জনগণের অর্থ, তথ্যের অধিকার এবং দেশের গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।

লোগো পরিবর্তন একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বড় পরিবর্তন—তৃণমূলে প্রতিনিধি, দ্রুত ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠান, দক্ষ মানবসম্পদ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্ব এবং সর্বোপরি সামাজিক দায়বদ্ধতা।

রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে যদি সত্যিকার অর্থে গণমুখী করা যায়, তাহলে সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরশীল এই তিন প্রতিষ্ঠানও একদিন বেসরকারি গণমাধ্যমের জন্য শক্তিশালী প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারে।

এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকারের দায়িত্বশীলরা কি পারবেন দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতারকে আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও গণমানুষের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে?

লেখক: আহমেদ আবু জাফর
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম
সভাপতি,

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বিটিভির লোগো নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে রূপান্তর

প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image


একটি গণমাধ্যমের শক্তি তার লোগোতে নয়, মানুষের আস্থায়। দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, দ্রুত ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনগণের কথা তুলে ধরার সক্ষমতাই একটি গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করে। সেই জায়গা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন গণমাধ্যম—বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও বাংলাদেশ বেতারকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

বিটিভির লোগো পরিবর্তন নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—শুধু লোগো পরিবর্তন করলেই কি রাষ্ট্রায়ত্ত এই সম্প্রচারমাধ্যমের দর্শক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে? নাকি প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো, সংবাদ পরিবেশনের ধরন, ব্যবস্থাপনা এবং তৃণমূল পর্যায়ের কার্যক্রমে আমূল পরিবর্তন?

বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের মতে, বিটিভির লোগো পরিবর্তনের চেয়ে বেশি জরুরি প্রতিষ্ঠানটিকে দায়িত্বশীল ও গণমুখী গণমাধ্যমে পরিণত করা। সংগঠনটির দাবি, বিটিভির দর্শক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধির সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের বসবাস রাজধানীর বাইরে। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা কিংবা সীমান্তবর্তী এলাকার প্রতিদিনের অসংখ্য ঘটনা জাতীয় গণমাধ্যমের আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ এসব এলাকার মানুষের জীবন, সংকট, সম্ভাবনা ও উন্নয়নচিত্রই বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম যদি জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়, তাহলে তার সংবাদ কাভারেজও হওয়া উচিত জনগণকেন্দ্রিক। উপজেলা পর্যায়ে দক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধি থাকলে স্থানীয় সমস্যা, প্রশাসনের কার্যক্রম, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কৃষি, নদীভাঙন, দুর্যোগ, অপরাধ, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনার খবর সরাসরি জাতীয় সম্প্রচারে উঠে আসতে পারে।

এতে শুধু বিটিভির সংবাদভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে না; তৃণমূলের মানুষও রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে নিজেদের গণমাধ্যম হিসেবে ভাবার সুযোগ পাবে।

আয়-ব্যয়ের ব্যবধানও ভাবনার বিষয়

রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনাও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বিটিভির আয় ছিল ৮ কোটি ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।

আগের কয়েক বছরের হিসাবেও আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল ৩৪ কোটি ৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, বিপরীতে ব্যয় ২৮০ কোটি ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ৪০ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ২৮৫ কোটি ৪৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় দাঁড়ায় ৩০ কোটি ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, আর ব্যয় বেড়ে হয় ৩৭০ কোটি ৬১ লাখ ৫১ হাজার টাকা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল ৪৪ কোটি ৪১ লাখ ২২ হাজার টাকা, বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২৯৮ কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ৩০৭ কোটি ১২ লাখ ২২ হাজার টাকা।

এই পরিসংখ্যান কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের কার্যকারিতা, ব্যবস্থাপনা ও জনসম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন সামনে আনে।

বাসসের সংকটও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা—বাসসের অবস্থাও নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। দেশে বিপুলসংখ্যক সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল থাকলেও বাসসের গ্রাহকসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।

বাসসের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির গ্রাহক ৪৮টি; এর মধ্যে নিয়মিত সেবা নেয় ২৮টি মিডিয়া। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাসসের নিজস্ব সংবাদসেবা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন দেশের সংবাদ সংস্থার সঙ্গে খবর আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকলেও বিদেশে বাসসের নিজস্ব গ্রাহক না থাকা প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির গ্রাহক বাসস। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংগ্রহে বাসসকে অন্য সংস্থার সেবা নিতে হচ্ছে, অথচ নিজের উৎপাদিত সংবাদ আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির সক্ষমতা এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছেনি।

বাসসের বিজ্ঞাপন আয়ও নেই। বার্ষিক গ্রাহক ফি থেকে আয় প্রায় ৬৭ লাখ টাকা হলেও সেই অর্থও অনাদায়ী থাকার কথা বলা হচ্ছে। বিপরীতে সরকার থেকে বছরে ৩৮ কোটি টাকার বেশি অনুদান নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত একটি সংবাদ সংস্থা কীভাবে আরও দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য অপরিহার্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে?

বাসসকে ঘিরে দলীয়করণ, ইচ্ছেমতো নিয়োগ ও পদোন্নতির মতো অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিক ও কর্মীদের চাকরি ও অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জনস্বার্থে অবদান।

ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশ বেতারের চ্যালেঞ্জ

বিটিভি ও বাসসের পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতারও রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় দেশের কোটি মানুষের কাছে সংবাদ, বিনোদন ও জনসচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল বেতার।

কিন্তু ডিজিটাল যুগে মানুষের তথ্য গ্রহণের অভ্যাস বদলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলোর প্রতিযোগিতা বেড়েছে।

এই বাস্তবতায় শুধু পুরোনো কাঠামো ধরে রাখলে হবে না। বাংলাদেশ বেতারকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, স্থানীয় কনটেন্ট, দ্রুত সংবাদ এবং জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠানকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শক্তিশালী প্রতিনিধি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি।

তৃণমূলে প্রতিনিধি বাড়ানোর প্রয়োজন

বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম দীর্ঘদিন ধরে বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতারে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছে। সাংবাদিকদের রুটি-রুজির ১৪ দফা দাবির মধ্যেও এটি অন্যতম।

দাবিটি বাস্তবায়িত হলে সারাদেশে দেড় হাজারের বেশি সাংবাদিকের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সুফল শুধু কর্মসংস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহের পরিধিও বহুগুণে বাড়তে পারে।

একজন স্থানীয় প্রতিনিধি তার এলাকার এমন অনেক খবর জানেন, যা ঢাকার কোনো ডেস্কের পক্ষে নিয়মিতভাবে জানা সম্ভব নয়। সঠিক প্রশিক্ষণ, নৈতিকতার মানদণ্ড এবং পেশাগত জবাবদিহির আওতায় এসব প্রতিনিধিকে কাজে লাগানো গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের সংবাদভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

লোগোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের আস্থা

একটি গণমাধ্যমের ব্র্যান্ডিং গুরুত্বপূর্ণ—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ব্র্যান্ডের বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের পরিবর্তন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিটিভির পর্দায় নতুন লোগো দর্শকের চোখে পড়বে; কিন্তু দর্শককে ধরে রাখবে ভালো অনুষ্ঠান, নির্ভরযোগ্য সংবাদ, দ্রুত আপডেট, স্থানীয় মানুষের কথা এবং রাষ্ট্রের পাশাপাশি জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া সাংবাদিকতা।

একইভাবে বাসসের নতুন প্রযুক্তি কিংবা নতুন স্লোগান তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সংবাদ দেশের সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ বেতারও তখনই তার পুরোনো শক্তি ফিরে পাবে, যখন শ্রোতা মনে করবেন—এই মাধ্যমটি তার জীবনের কথা বলে।

প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার

রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে কার্যকর করতে শুধু সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পেশাদার নেতৃত্ব, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সংবাদ পরিবেশনের সংস্কৃতি এবং কঠোর জবাবদিহি।

এর পাশাপাশি প্রয়োজন এমন সাংবাদিক, যারা চাকরিকে শুধু বেতন-ভাতার সুযোগ হিসেবে দেখবেন না; বরং জনগণের প্রতি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করবেন। যারা মাঠে যাবেন, মানুষের কথা শুনবেন, তথ্য যাচাই করবেন এবং রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত গণমাধ্যমকে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে ভূমিকা রাখবেন।

বেসরকারি গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে সরকারি প্রতিষ্ঠানসুলভ ধীরগতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পেশাদার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে হবে।

বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতার কেবল সরকারি দপ্তর নয়; এগুলো জনগণের অর্থে পরিচালিত জাতীয় গণমাধ্যম। তাই এগুলোর সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে জনগণের অর্থ, তথ্যের অধিকার এবং দেশের গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।

লোগো পরিবর্তন একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বড় পরিবর্তন—তৃণমূলে প্রতিনিধি, দ্রুত ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠান, দক্ষ মানবসম্পদ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্ব এবং সর্বোপরি সামাজিক দায়বদ্ধতা।

রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে যদি সত্যিকার অর্থে গণমুখী করা যায়, তাহলে সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরশীল এই তিন প্রতিষ্ঠানও একদিন বেসরকারি গণমাধ্যমের জন্য শক্তিশালী প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারে।

এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকারের দায়িত্বশীলরা কি পারবেন দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতারকে আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও গণমানুষের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে?

লেখক: আহমেদ আবু জাফর
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম
সভাপতি,


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - মোঃ আতিকুল ইসলাম
প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক - মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয় 
সহ-সম্পাদক- মোঃ জাকারিয়া হোসেন
বার্তা সম্পাদক - মোঃ ওলিউল্লাহ

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
বিটিভির লোগো নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে রূপান্তর
0:00 0:00
1.0x