নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সময় নষ্ট না করে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছেন এবং সেগুলো নিজেই তদারকি করছেন। সরকারের খাল খনন, বৃক্ষরোপণ এবং বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সময়ে লক্ষাধিক শিক্ষকের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের বকেয়া অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করায় সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো স্বস্তি পেয়েছে। এ ধরনের আরও কিছু ইতিবাচক কাজও চলছে।
তবে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সংকটের দ্রুত সমাধান ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মতো বড় রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এখনো আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যায়নি।
সরকারের প্রথম ছয় মাসেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ক্ষমতাসীন বিএনপিকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে। এতে যেমন গ্রাহকদের দুর্ভোগ বেড়েছে, তেমনি সরকারকেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে লুটপাটের রাজ্যে পরিণত হওয়া এ খাতে শৃঙ্খলা ও স্বস্তি ফেরাতে সরকার প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি। পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার বলছে, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জঞ্জাল সরাতেই তাদের বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি খুবই সীমিত। একদিকে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ ও দলের ঘোষিত ৩১ দফার ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজ, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, কর্মসংস্থান তৈরি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে রাখা এবং প্রশাসনে গতি ফেরানোর চাপ—সব মিলিয়ে সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামলাতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ রয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মাথায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া দলীয়করণে জর্জরিত প্রশাসন ও দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব পড়ে তারেক রহমান সরকারের ওপর। যদিও এ কাজের অনেকটাই অন্তর্বর্তী সরকার এগিয়ে দিয়ে গেছে।
সরকার গঠনের পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি জানান, দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব, প্রতিপত্তি বা জোরজবরদস্তির পরিবর্তে আইনের শাসনই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হবে।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার সব ধরনের অনাচার ও অনিয়মের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি বলেন, যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, যারা ভোট দেননি কিংবা কাউকেই ভোট দেননি—সবার অধিকার এই সরকারের কাছে সমান। দল-মত, ধর্ম ও দর্শন যার যার হলেও রাষ্ট্র সবার এবং একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের অধিকার সমান।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত নীতি ও নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
১৮ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে সিদ্ধান্ত ও আলোচনার বিষয় তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকারের প্রথম দিনেই নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। এতে সব মন্ত্রী ও উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে সরকার ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে বলে জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শুরুতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে, বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে যেন কোনো সংকট তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও বলেন, পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, মানুষের সহনীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাই সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার।
সরকারের প্রথম ছয় মাস শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে অর্জন ও সীমাবদ্ধতার প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেগুলো পর্যালোচনা করছেন। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কর্মদক্ষতার প্রতিবেদনও তিনি দেখছেন। ছয় মাসের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে আগামী দিনের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে কিছু পরিবর্তন ও রদবদলের আলোচনা চলছে।
ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতারাও মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও কোথাও কোথাও দলগতভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচ্যুতিও ঘটছে এবং মানুষের প্রত্যাশা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে আমার দেশকে বলেন, সরকারপ্রধানের সাধারণ জীবনযাপন এবং দিন-রাত কাজ করার চেষ্টা মানুষকে আশাবাদী করছে। তবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে না আসা, মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক অবনতি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে মানুষের ভোগান্তি প্রত্যাশাকে ধাক্কা দিচ্ছে। তার মতে, এসব দেখে কোথাও টিমওয়ার্কে ঘাটতি ও শিথিলতার বিষয়টি মনে হচ্ছে।
সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান জনগণের সামনে আশাবাদ ও ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছেন। সরকারের মুখপাত্র মাহদী আমিনের মতে, ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী জনগণের আস্থা, ভালোবাসা ও সমর্থন অর্জন করেছেন। নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ রক্ষা এবং গণমানুষের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্বেরও প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আচরণকে ভিন্নধারার নেতৃত্বচর্চা হিসেবে দেখছেন। ভদ্রতা, সংযম, সৌজন্য, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্বের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
শপথ নেওয়ার পর দলের মন্ত্রী-এমপিদের কাছ থেকে সরকারি প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার অঙ্গীকার নেওয়া, সরকারি বাসভবনের বদলে ব্যক্তিগত বাসভবনে থাকা, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার এবং নিজের অর্থে জ্বালানি খরচ করার উদ্যোগকে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড ব্যক্তিগত সংযমের বার্তাও দিচ্ছে।
সরকারি ব্যয় কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি নিজের ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করা, চলাচলের সময় ট্রাফিক সিগন্যালে অপেক্ষা করা, কাছাকাছি কর্মসূচিতে হেঁটে যাওয়া, সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার অফিস করা এবং তরুণ উদ্ভাবকদের উৎসাহ দেওয়ার মতো উদ্যোগগুলো সাধারণ মানুষের কাছে শুধু ব্যক্তিগত বা প্রতীকী পদক্ষেপ নয়। এগুলো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরলতা, মানবিকতা, জবাবদিহি, জনসম্পৃক্ততা ও অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্বের নতুন ধারা তৈরির চেষ্টা হিসেবেও প্রশংসিত হচ্ছে।
সরকারের ছয় মাসের অর্জনের বড় অংশকে ম্লান করে দিয়েছে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের পরিস্থিতি। এ সময়ে এসব খাতে সরবরাহ সংকট ছিল তীব্র। সর্বশেষ গ্যাস সংকটের কারণে সপ্তাহজুড়ে দেশের অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রায় অচল অবস্থায় ছিল। অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে। বাসাবাড়িতে রান্নার চুলা জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনে যানবাহন চালকদের ভোগান্তি চরমে ওঠে।
ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি এবং এলএনজি কার্গো খালাস করতে না পারার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হয়। বিদ্যুৎ লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। বিদ্যুৎ স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য ফোর্স চেয়ে চিঠি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কৌশলপত্র ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নিজেও গত শনিবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের কারণে মানুষের ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি সংসদে ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা ঘোষণা করার কথা জানিয়েছেন।
সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এতে সাড়া দেওয়ার শেষ সময় নভেম্বর। বিদেশি কোম্পানিগুলো সাড়া দিলে বড় গ্যাস মজুত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দরপত্রের বাইরে জিটুজি পদ্ধতিতে মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে পেট্রোবাংলার যৌথভাবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগও রয়েছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার ১০ দিনের মাথায় ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এর প্রভাবে হরমুজ প্রণালির সংকটে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ আটকে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের অনেকে তেল সরবরাহে অপারগতা জানায়। ফলে দেশের জ্বালানি তেলের মজুত ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে নেমে আসে।
একপর্যায়ে সরকার জ্বালানি তেলের রেশনিং শুরু করে। রেশনিং ও আতঙ্কের কারণে প্রায় দুই মাস মানুষ জ্বালানি তেল সংগ্রহে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়ে। সর্বত্র হাহাকার দেখা দেয়। দুই দফায় দাম বাড়িয়ে রেশনিং তুলে নেওয়ার পর তেল পাম্পে দীর্ঘ সারি কমে আসে।
তবে জ্বালানি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সংস্কারে ব্যর্থতার অভিযোগ মানতে রাজি নন সরকারের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি গতকাল আমার দেশকে বলেন, কিছু ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্যে ঘাটতি থাকতে পারে এবং সরকার দায়বদ্ধতা অস্বীকার করছে না। জনভোগান্তির জন্য সরকার দুঃখিত। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ পরিস্থিতি ভালোভাবে মোকাবিলা করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
মাহদী আমিন আরও বলেন, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়েও সরকার কাজ করছে এবং অপরাধ ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজেটে বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। সংস্কারের ক্ষেত্রেও অল্প সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের অধিকাংশ অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার স্বচ্ছতা, সুশাসন, জনকল্যাণ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় কমানো, বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে কাজ করছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার ইস্যুতে গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়। ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারসহ জুলাই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। ক্ষমতায় যাওয়ার পঞ্চম মাসে সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটিও গঠন করে সরকারি দল।
তবে সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কারের দাবিতে থাকা জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ওই কমিটিতে অংশ নেয়নি। এ অবস্থায় সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ছয় মাসে সংস্কারের ক্ষেত্রে খুব কম অগ্রগতি হওয়ায় সরকার জনআকাঙ্ক্ষা কতটা ধারণ করতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে ৩৫ দফা অঙ্গীকার রয়েছে। এর প্রথম দফায় ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদে যে ঐকমত্য হয়েছে, সেই অনুযায়ী তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ছয় মাসে সেই ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সরকারসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এর আওতায় ৭১ হাজারের বেশি পরিবার এসেছে। পরিবারের নারীপ্রধানের ব্যাংক হিসাবে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষামূলক পর্যায় শেষে গতকাল কিশোরগঞ্জ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছে।
কৃষকদের জন্য চালু হয়েছে ‘কৃষক কার্ড’। সরকারের হিসাবে, প্রথম ছয় মাসে ২০ হাজারের বেশি কৃষক পরিবার এ কর্মসূচির আওতায় এসেছে। কৃষি উপকরণ কেনার জন্য কার্ডধারীরা আড়াই হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। পাশাপাশি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সাড়ে ১৪ লাখ কৃষক পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
পরিবেশ ও কৃষির সঙ্গে যুক্ত বড় একটি প্রতিশ্রুতি ছিল খাল পুনঃখনন। পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য রয়েছে বিএনপির। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসেই ৬২টি জেলায় প্রায় এক হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। তবে খাল খনন ও পুনঃখননকে ঘিরে কিছু অনিয়ম ও বিতর্কও সামনে এসেছে।
নির্বাচনি ইশতেহারে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রথম ১৮০ দিনে আড়াই কোটির বেশি বৃক্ষরোপণের দাবি করেছে বিএনপি সরকার। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। তবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ে অনিয়ম, তথ্যের অসঙ্গতি এবং একশ্রেণির কর্মকর্তা ও দলীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগও উঠেছে।
এ ছাড়া এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা, ২০০ সরকারি ভবনকে চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তর, জাতীয় পল্লি উন্নয়ন দিবস, দুই হাজার মিনি কোল্ডস্টোরেজ, প্রিপেইড মিটারের অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহার, উপজেলা হাসপাতাল উন্নয়ন, ইউনিয়নভিত্তিক স্বাস্থ্য ইউনিট এবং পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের মধ্যে রাখা হয়েছে।
তবে পর্যবেক্ষক মহলের মতে, এসব জনতুষ্টিমূলক কর্মসূচির কারণে সংস্কারের গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার যদি আড়ালে পড়ে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দল ও সরকার চাপ ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একাধিকবার সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এখনো বড় সমস্যা হিসেবে রয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের বলয়ও পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি।
বেশ কয়েকটি আলোচিত হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনায় সরকার চাপের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে বিচার সম্পন্ন করতে হয়েছে। সরকারদলীয় অনেক নেতাকর্মীর বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও সরকারের সমালোচনার কারণ হয়েছে।
নিজেদের মধ্যেও সংঘাত, মারামারি ও খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে। ছয় মাসে নিজেদের সংঘাতে ৩৮ জনের প্রাণ গেছে। হাসিনার আমলের তুলনায় দখল, চাঁদাবাজি ও মাস্তানির ঘটনা কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একাধিকবার মারামারি ও অস্থিরতা দেখা গেছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে কিছু অতিউৎসাহী নেতাকর্মীর পেশিশক্তি প্রদর্শনের ঘটনা সরকারের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করেন অনেকে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের থানাগুলোতে ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। দাঙ্গার ঘটনায় ১৩টি, হত্যার ঘটনায় ১ হাজার ৭৯১টি এবং দ্রুতবিচার আইনে ৪০৮টি মামলা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা। এ ছাড়া ২৬৫টি ডাকাতি, ৯০৪টি ছিনতাই, ৫১২টি অপহরণ, ৪ হাজার ৮০৮টি চুরি, ১ হাজার ৫৯১টি সিঁধেল চুরি এবং অন্যান্য ঘটনায় ৪১ হাজার ৯২৫টি মামলা হয়েছে।
ছয় মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও গ্যাং কালচারের কারণে বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মে মাসে ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার (৮) ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যার ঘটনাও দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ঢাকা মহানগরীসহ বড় শহরগুলোতে ছিনতাই ও চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্যও পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ প্রসঙ্গে সরকারের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে। তিনি জানান, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের একটি শিশুধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসে হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় এক মাসে ১০টি রায় দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার পলাতক আসামি মোজাফফর হোসেনকে ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তনু হত্যা মামলার আসামি, শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামি এবং সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় প্রশাসনকে কার্যকর ও জনমুখী করা। দেড় দশকের বেশি সময়ের দলীয়করণ, পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে বিতর্ক, কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি—সব মিলিয়ে প্রশাসনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের অনুগত কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনার অভিযোগও উঠেছিল। সরকারের দাবি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে এবং প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত গতি এখনো ফিরে আসেনি। বরং মতলববাজ ও অযোগ্য দলবাজদের একটি অংশ নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে পদায়নের অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং সরকারি সেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।
বিএনপি ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য, প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে এনে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে অন্য কোনো সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদি ফল দেবে না। তাই প্রশাসনিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তবে মেধা ও যোগ্যতার বদলে আবারও দলীয় আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। অনেকের মতে, পরিস্থিতি নতুন বোতলে পুরোনো মদ ঢালার মতো হয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনে আগের মতোই একশ্রেণির সুবিধাবাদী ও দলবাজ চক্র সক্রিয় হয়েছে। পর্দার আড়াল থেকে তাদের ইশারা-ইঙ্গিতেই অনেক কিছু পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশাসনকে পেশাদার ও গতিশীল করতে চাইলেও তার প্রতিফলন সব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না।
ছয় মাসে অর্থনীতিতেও প্রত্যাশিত স্বস্তি ফিরে আসেনি। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিপুল খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। এর সঙ্গে রয়েছে মূল্যস্ফীতির চাপ।
রপ্তানি বাজারও এখনো স্থিতিশীল হয়নি। সর্বশেষ জুলাই মাসে প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানোও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
ব্যাংকগুলোতে অলস অর্থের পরিমাণ বেড়ে চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে রেকর্ড করেছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তাদের আস্থা ফেরাতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেগুলো সফল হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারের মধ্যেও এটি ছিল অন্যতম। বাজার নিয়ন্ত্রণে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সব ক্ষেত্রে তার সুফল এখনো পুরোপুরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি।
সূত্র: আমার দেশ

সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সময় নষ্ট না করে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছেন এবং সেগুলো নিজেই তদারকি করছেন। সরকারের খাল খনন, বৃক্ষরোপণ এবং বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সময়ে লক্ষাধিক শিক্ষকের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের বকেয়া অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করায় সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো স্বস্তি পেয়েছে। এ ধরনের আরও কিছু ইতিবাচক কাজও চলছে।
তবে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সংকটের দ্রুত সমাধান ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মতো বড় রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এখনো আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যায়নি।
সরকারের প্রথম ছয় মাসেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ক্ষমতাসীন বিএনপিকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে। এতে যেমন গ্রাহকদের দুর্ভোগ বেড়েছে, তেমনি সরকারকেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে লুটপাটের রাজ্যে পরিণত হওয়া এ খাতে শৃঙ্খলা ও স্বস্তি ফেরাতে সরকার প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি। পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার বলছে, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জঞ্জাল সরাতেই তাদের বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি খুবই সীমিত। একদিকে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ ও দলের ঘোষিত ৩১ দফার ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজ, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, কর্মসংস্থান তৈরি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে রাখা এবং প্রশাসনে গতি ফেরানোর চাপ—সব মিলিয়ে সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামলাতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ রয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মাথায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া দলীয়করণে জর্জরিত প্রশাসন ও দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব পড়ে তারেক রহমান সরকারের ওপর। যদিও এ কাজের অনেকটাই অন্তর্বর্তী সরকার এগিয়ে দিয়ে গেছে।
সরকার গঠনের পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি জানান, দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব, প্রতিপত্তি বা জোরজবরদস্তির পরিবর্তে আইনের শাসনই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হবে।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার সব ধরনের অনাচার ও অনিয়মের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি বলেন, যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, যারা ভোট দেননি কিংবা কাউকেই ভোট দেননি—সবার অধিকার এই সরকারের কাছে সমান। দল-মত, ধর্ম ও দর্শন যার যার হলেও রাষ্ট্র সবার এবং একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের অধিকার সমান।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত নীতি ও নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
১৮ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে সিদ্ধান্ত ও আলোচনার বিষয় তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকারের প্রথম দিনেই নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। এতে সব মন্ত্রী ও উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে সরকার ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে বলে জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শুরুতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে, বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে যেন কোনো সংকট তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও বলেন, পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, মানুষের সহনীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাই সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার।
সরকারের প্রথম ছয় মাস শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে অর্জন ও সীমাবদ্ধতার প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেগুলো পর্যালোচনা করছেন। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কর্মদক্ষতার প্রতিবেদনও তিনি দেখছেন। ছয় মাসের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে আগামী দিনের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে কিছু পরিবর্তন ও রদবদলের আলোচনা চলছে।
ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতারাও মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও কোথাও কোথাও দলগতভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচ্যুতিও ঘটছে এবং মানুষের প্রত্যাশা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে আমার দেশকে বলেন, সরকারপ্রধানের সাধারণ জীবনযাপন এবং দিন-রাত কাজ করার চেষ্টা মানুষকে আশাবাদী করছে। তবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে না আসা, মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক অবনতি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে মানুষের ভোগান্তি প্রত্যাশাকে ধাক্কা দিচ্ছে। তার মতে, এসব দেখে কোথাও টিমওয়ার্কে ঘাটতি ও শিথিলতার বিষয়টি মনে হচ্ছে।
সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান জনগণের সামনে আশাবাদ ও ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছেন। সরকারের মুখপাত্র মাহদী আমিনের মতে, ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী জনগণের আস্থা, ভালোবাসা ও সমর্থন অর্জন করেছেন। নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ রক্ষা এবং গণমানুষের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্বেরও প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আচরণকে ভিন্নধারার নেতৃত্বচর্চা হিসেবে দেখছেন। ভদ্রতা, সংযম, সৌজন্য, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্বের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
শপথ নেওয়ার পর দলের মন্ত্রী-এমপিদের কাছ থেকে সরকারি প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার অঙ্গীকার নেওয়া, সরকারি বাসভবনের বদলে ব্যক্তিগত বাসভবনে থাকা, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার এবং নিজের অর্থে জ্বালানি খরচ করার উদ্যোগকে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড ব্যক্তিগত সংযমের বার্তাও দিচ্ছে।
সরকারি ব্যয় কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি নিজের ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করা, চলাচলের সময় ট্রাফিক সিগন্যালে অপেক্ষা করা, কাছাকাছি কর্মসূচিতে হেঁটে যাওয়া, সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার অফিস করা এবং তরুণ উদ্ভাবকদের উৎসাহ দেওয়ার মতো উদ্যোগগুলো সাধারণ মানুষের কাছে শুধু ব্যক্তিগত বা প্রতীকী পদক্ষেপ নয়। এগুলো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরলতা, মানবিকতা, জবাবদিহি, জনসম্পৃক্ততা ও অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্বের নতুন ধারা তৈরির চেষ্টা হিসেবেও প্রশংসিত হচ্ছে।
সরকারের ছয় মাসের অর্জনের বড় অংশকে ম্লান করে দিয়েছে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের পরিস্থিতি। এ সময়ে এসব খাতে সরবরাহ সংকট ছিল তীব্র। সর্বশেষ গ্যাস সংকটের কারণে সপ্তাহজুড়ে দেশের অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রায় অচল অবস্থায় ছিল। অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে। বাসাবাড়িতে রান্নার চুলা জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনে যানবাহন চালকদের ভোগান্তি চরমে ওঠে।
ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি এবং এলএনজি কার্গো খালাস করতে না পারার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হয়। বিদ্যুৎ লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। বিদ্যুৎ স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য ফোর্স চেয়ে চিঠি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কৌশলপত্র ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নিজেও গত শনিবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের কারণে মানুষের ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি সংসদে ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা ঘোষণা করার কথা জানিয়েছেন।
সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এতে সাড়া দেওয়ার শেষ সময় নভেম্বর। বিদেশি কোম্পানিগুলো সাড়া দিলে বড় গ্যাস মজুত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দরপত্রের বাইরে জিটুজি পদ্ধতিতে মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে পেট্রোবাংলার যৌথভাবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগও রয়েছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার ১০ দিনের মাথায় ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এর প্রভাবে হরমুজ প্রণালির সংকটে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ আটকে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের অনেকে তেল সরবরাহে অপারগতা জানায়। ফলে দেশের জ্বালানি তেলের মজুত ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে নেমে আসে।
একপর্যায়ে সরকার জ্বালানি তেলের রেশনিং শুরু করে। রেশনিং ও আতঙ্কের কারণে প্রায় দুই মাস মানুষ জ্বালানি তেল সংগ্রহে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়ে। সর্বত্র হাহাকার দেখা দেয়। দুই দফায় দাম বাড়িয়ে রেশনিং তুলে নেওয়ার পর তেল পাম্পে দীর্ঘ সারি কমে আসে।
তবে জ্বালানি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সংস্কারে ব্যর্থতার অভিযোগ মানতে রাজি নন সরকারের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি গতকাল আমার দেশকে বলেন, কিছু ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্যে ঘাটতি থাকতে পারে এবং সরকার দায়বদ্ধতা অস্বীকার করছে না। জনভোগান্তির জন্য সরকার দুঃখিত। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ পরিস্থিতি ভালোভাবে মোকাবিলা করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
মাহদী আমিন আরও বলেন, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়েও সরকার কাজ করছে এবং অপরাধ ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজেটে বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। সংস্কারের ক্ষেত্রেও অল্প সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের অধিকাংশ অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার স্বচ্ছতা, সুশাসন, জনকল্যাণ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় কমানো, বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে কাজ করছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার ইস্যুতে গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়। ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারসহ জুলাই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। ক্ষমতায় যাওয়ার পঞ্চম মাসে সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটিও গঠন করে সরকারি দল।
তবে সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কারের দাবিতে থাকা জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ওই কমিটিতে অংশ নেয়নি। এ অবস্থায় সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ছয় মাসে সংস্কারের ক্ষেত্রে খুব কম অগ্রগতি হওয়ায় সরকার জনআকাঙ্ক্ষা কতটা ধারণ করতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে ৩৫ দফা অঙ্গীকার রয়েছে। এর প্রথম দফায় ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদে যে ঐকমত্য হয়েছে, সেই অনুযায়ী তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ছয় মাসে সেই ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সরকারসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এর আওতায় ৭১ হাজারের বেশি পরিবার এসেছে। পরিবারের নারীপ্রধানের ব্যাংক হিসাবে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষামূলক পর্যায় শেষে গতকাল কিশোরগঞ্জ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছে।
কৃষকদের জন্য চালু হয়েছে ‘কৃষক কার্ড’। সরকারের হিসাবে, প্রথম ছয় মাসে ২০ হাজারের বেশি কৃষক পরিবার এ কর্মসূচির আওতায় এসেছে। কৃষি উপকরণ কেনার জন্য কার্ডধারীরা আড়াই হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। পাশাপাশি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সাড়ে ১৪ লাখ কৃষক পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
পরিবেশ ও কৃষির সঙ্গে যুক্ত বড় একটি প্রতিশ্রুতি ছিল খাল পুনঃখনন। পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য রয়েছে বিএনপির। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসেই ৬২টি জেলায় প্রায় এক হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। তবে খাল খনন ও পুনঃখননকে ঘিরে কিছু অনিয়ম ও বিতর্কও সামনে এসেছে।
নির্বাচনি ইশতেহারে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রথম ১৮০ দিনে আড়াই কোটির বেশি বৃক্ষরোপণের দাবি করেছে বিএনপি সরকার। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। তবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ে অনিয়ম, তথ্যের অসঙ্গতি এবং একশ্রেণির কর্মকর্তা ও দলীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগও উঠেছে।
এ ছাড়া এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা, ২০০ সরকারি ভবনকে চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তর, জাতীয় পল্লি উন্নয়ন দিবস, দুই হাজার মিনি কোল্ডস্টোরেজ, প্রিপেইড মিটারের অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহার, উপজেলা হাসপাতাল উন্নয়ন, ইউনিয়নভিত্তিক স্বাস্থ্য ইউনিট এবং পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের মধ্যে রাখা হয়েছে।
তবে পর্যবেক্ষক মহলের মতে, এসব জনতুষ্টিমূলক কর্মসূচির কারণে সংস্কারের গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার যদি আড়ালে পড়ে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দল ও সরকার চাপ ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একাধিকবার সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এখনো বড় সমস্যা হিসেবে রয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের বলয়ও পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি।
বেশ কয়েকটি আলোচিত হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনায় সরকার চাপের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে বিচার সম্পন্ন করতে হয়েছে। সরকারদলীয় অনেক নেতাকর্মীর বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও সরকারের সমালোচনার কারণ হয়েছে।
নিজেদের মধ্যেও সংঘাত, মারামারি ও খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে। ছয় মাসে নিজেদের সংঘাতে ৩৮ জনের প্রাণ গেছে। হাসিনার আমলের তুলনায় দখল, চাঁদাবাজি ও মাস্তানির ঘটনা কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একাধিকবার মারামারি ও অস্থিরতা দেখা গেছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে কিছু অতিউৎসাহী নেতাকর্মীর পেশিশক্তি প্রদর্শনের ঘটনা সরকারের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করেন অনেকে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের থানাগুলোতে ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। দাঙ্গার ঘটনায় ১৩টি, হত্যার ঘটনায় ১ হাজার ৭৯১টি এবং দ্রুতবিচার আইনে ৪০৮টি মামলা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা। এ ছাড়া ২৬৫টি ডাকাতি, ৯০৪টি ছিনতাই, ৫১২টি অপহরণ, ৪ হাজার ৮০৮টি চুরি, ১ হাজার ৫৯১টি সিঁধেল চুরি এবং অন্যান্য ঘটনায় ৪১ হাজার ৯২৫টি মামলা হয়েছে।
ছয় মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও গ্যাং কালচারের কারণে বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মে মাসে ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার (৮) ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যার ঘটনাও দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ঢাকা মহানগরীসহ বড় শহরগুলোতে ছিনতাই ও চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্যও পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ প্রসঙ্গে সরকারের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে। তিনি জানান, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের একটি শিশুধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসে হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় এক মাসে ১০টি রায় দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার পলাতক আসামি মোজাফফর হোসেনকে ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তনু হত্যা মামলার আসামি, শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামি এবং সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় প্রশাসনকে কার্যকর ও জনমুখী করা। দেড় দশকের বেশি সময়ের দলীয়করণ, পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে বিতর্ক, কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি—সব মিলিয়ে প্রশাসনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের অনুগত কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনার অভিযোগও উঠেছিল। সরকারের দাবি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে এবং প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত গতি এখনো ফিরে আসেনি। বরং মতলববাজ ও অযোগ্য দলবাজদের একটি অংশ নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে পদায়নের অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং সরকারি সেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।
বিএনপি ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য, প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে এনে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে অন্য কোনো সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদি ফল দেবে না। তাই প্রশাসনিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তবে মেধা ও যোগ্যতার বদলে আবারও দলীয় আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। অনেকের মতে, পরিস্থিতি নতুন বোতলে পুরোনো মদ ঢালার মতো হয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনে আগের মতোই একশ্রেণির সুবিধাবাদী ও দলবাজ চক্র সক্রিয় হয়েছে। পর্দার আড়াল থেকে তাদের ইশারা-ইঙ্গিতেই অনেক কিছু পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশাসনকে পেশাদার ও গতিশীল করতে চাইলেও তার প্রতিফলন সব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না।
ছয় মাসে অর্থনীতিতেও প্রত্যাশিত স্বস্তি ফিরে আসেনি। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিপুল খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। এর সঙ্গে রয়েছে মূল্যস্ফীতির চাপ।
রপ্তানি বাজারও এখনো স্থিতিশীল হয়নি। সর্বশেষ জুলাই মাসে প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানোও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
ব্যাংকগুলোতে অলস অর্থের পরিমাণ বেড়ে চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে রেকর্ড করেছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তাদের আস্থা ফেরাতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেগুলো সফল হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারের মধ্যেও এটি ছিল অন্যতম। বাজার নিয়ন্ত্রণে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সব ক্ষেত্রে তার সুফল এখনো পুরোপুরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি।
সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন