বাবাকে কোন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, তা জানতে কারাগারের পরিচিত কর্মকর্তাদের একের পর এক ফোন করতে থাকেন তিনি। কোনো জায়গা থেকেই নিশ্চিত তথ্য না পেয়ে পরিবারের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে সম্ভাব্য কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ শুরু করেন। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, মিরপুর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও পিজি হাসপাতালে তারা ছুটে যান। কিন্তু কোথাও সাঈদীর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
রাত ১০টার কিছু পর তারা জানতে পারেন, সাঈদীকে শাহবাগের পিজি হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের সামনে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।
রাত ১১টার দিকে পিজি হাসপাতালের মূল গেটের দিক থেকে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শোনা যায়। সঙ্গে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য। অ্যাম্বুলেন্সটি ডি-ব্লকের ইমার্জেন্সির সামনে থামলে পরিবারের সদস্যরা সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের আটকে দেন।
অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খোলার পর দুই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের কাঁধে ভর করে সাঈদী নিচে নামেন। মেহেদি দেওয়া লাল দাড়িতে তাকে মায়াবি দেখাচ্ছিল বলে বর্ণনা করেছেন তার ছেলে। নেমেই তিনি কাউকে আগে সালাম দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে হাত নেড়ে উপস্থিত লোকজনকে বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম।’ জবাবে গভীর রাতে উপস্থিত জনতাও সমস্বরে ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’ বলে ওঠে। তখন তার মুখে হাসি ছিল।
তার ছেলে জানান, ১৩ বছর কারাগারে থাকার সময় বিভিন্ন সময়ে সাঈদীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। প্রতিবারই তিনি হাসপাতালে উপস্থিত থাকতেন এবং বাবাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতেন। কিন্তু শেষবারের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালজুড়ে আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। সাঈদীর অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোর পর পুরো গাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়। তিনি বাবার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়। এতে সাঈদী কষ্ট পান এবং তাকে কাছে আসতে দেওয়ার জন্য প্রতিবাদ করেন। কিন্তু তার কথাও শোনা হয়নি।
সাঈদীকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে দ্রুত হুইলচেয়ারে বসিয়ে ইমার্জেন্সিতে নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য ছাড়া অন্য কাউকে সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ভেতরে ঢোকার পর ডি-ব্লকের মূল গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ইমার্জেন্সিতে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগে। এই সময়ে তার ছেলে বাবার সঙ্গে কথা বলা বা শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জানার সুযোগ পাননি বলে দাবি করেন।
ইমার্জেন্সি রুমে কিছুক্ষণ পর পিজি হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ এবং ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এসএম মোস্তফা জামান আসেন। তারা ভেতরে কী আলোচনা করেন বা কী সিদ্ধান্ত নেন, তা পরিবারকে জানানো হয়নি বলে দাবি করা হয়।
পরে চিকিৎসকরা বেরিয়ে এলে সাংবাদিকরা তাদের ঘিরে ধরেন। ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলে চলে যান। আর ডা. এসএম মোস্তফা জামান সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
তিনি জানান, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী তার অধীনে কার্ডিয়াক ইমার্জেন্সিতে ভর্তি হয়েছেন। প্রাথমিক ইসিজিতে তার হার্ট অ্যাটাকের তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে তার হার্টে রিং পরানো হয়েছিল। চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, তার প্রাইমারি পিসিআই প্রয়োজন হতে পারে। তবে বুকের ব্যথা কমে যাওয়ায় তখনই পিসিআই না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। আপাতত তাকে কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে রাখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ব্রিফিং শেষে সাঈদীর ছেলে ডা. এসএম মোস্তফা জামানের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দেন এবং জানতে চান, হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকলে এনজিওগ্রাম করা হচ্ছে না কেন।
জবাবে ওই চিকিৎসক বলেন, ওই মুহূর্তে সাঈদীর বুকে ব্যথা না থাকায় এনজিওগ্রাম না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাঈদীর ছেলে পরে প্রশ্ন তোলেন, হার্ট অ্যাটাকের পর কেন তার বাবার প্রাইমারি পিসিআই করা হলো না, কেন মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়নি, হাসপাতালে এত কঠোর নিরাপত্তা কেন ছিল এবং পরিবারের সদস্যদের কেন তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা সাঈদীকে সিসিইউতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের সদস্যরা তখন বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ দরজা খুললে দেখা যায়, সাঈদী হুইলচেয়ারে বসে দরজার দিকে মুখ করে আছেন। তিনি তার ছেলে ও ছোট ভাই নাসীমকে দেখে হাসেন। তার ছেলে বলেন, ওই হাসি দেখে তিনি বুঝতে পারেন, সন্তানদের কাছাকাছি দেখে বাবা স্বস্তি পেয়েছিলেন।
এরপর সিসিইউর দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সেটিই ছিল বাবার সঙ্গে তাদের শেষ দেখা।
পরদিন ভোরে সিসিইউতে বাবার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেন সাঈদীর ছেলে। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, ৫০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য অবস্থান করছেন। সিসিইউর প্রবেশপথে পুলিশ চেকপোস্টও বসানো হয়েছিল।
বারবার চেষ্টা করেও তিনি বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। পরে তার মনে পড়ে ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদের কথা। তিনি চিকিৎসকের অফিসে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন।
প্রায় বেলা ১১টার দিকে ডা. মেশকাত অফিসে এলে তার কক্ষের সামনেও পুলিশ দেখতে পান তিনি। সেখানে প্রবেশের সময় পুলিশ তাকে বাধা দেয় এবং সাক্ষাতের অনুমতি নেওয়ার কথা জানায়।
পরে অনুমতি পেয়ে তিনি কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে ডা. মেশকাত আহমেদের সঙ্গে পিজি হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমান এবং ডা. এসএম মোস্তফা জামান ছিলেন।
সাঈদীর ছেলে বাবার শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে ডা. মেশকাত জানান, স্যার আগের তুলনায় সুস্থ আছেন। এরপর তিনি বাবার সঙ্গে দেখা করতে চান। হাসপাতালের পরিচালক তাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলেন এবং দেখা করার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।
কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তিনি কোনো খবর পাননি।
এরপর আইনজীবীদের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুটি আবেদন করা হয়। একটি আবেদনে পরিবারের সদস্যদের সাঈদীর সঙ্গে হাসপাতালে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হয়। অন্যটিতে বয়স ও অসুস্থতা বিবেচনায় পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে অথবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যকে সার্বক্ষণিক অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে থাকার অনুমতি চাওয়া হয়।
দুপুর ১টার দিকে তিনি আবার ডা. মেশকাতের অফিসে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমানের অফিসে যান। সেখানে ডা. এসএম মোস্তফা জামানকেও দেখতে পান।
পরিচালক তখন বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত ছিলেন। সাঈদীর ছেলে সেখানে অপেক্ষা করতে থাকেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাবার কোনো খবর না পাওয়া এবং দেখা করতে না পারায় তিনি ক্রমেই অস্থির হয়ে পড়ছিলেন।
এরপর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করেন। মন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, তার আবেদন হাতে এসেছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সাঈদীর ছেলে সিসিইউতে ওঠার সিঁড়িতে অপেক্ষা করতে থাকেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সাক্ষাতের অনুমতির কোনো খবর পাননি।
এ সময় হাসপাতাল চত্বরে প্রশাসনের বিভিন্ন গাড়ি আসতে দেখা যায়। নতুন করে অনেক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ে। একই সঙ্গে সাংবাদিক ও সাঈদীর অনুসারীদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে।
সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পরিবারের কাউকে সাঈদীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। তার ছেলে তখন মনে করেন, পরিকল্পিতভাবেই তাদের সাক্ষাৎ থেকে বিরত রাখা হচ্ছে।
মাগরিবের পর তিনি লোকমুখে সাঈদীর দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের খবর পান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তাকে জানান, সাঈদী স্বাভাবিক আছেন।
তবে তার ছেলে তাদের বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারেননি বলে জানান। এ সময় হাসপাতাল চত্বরে পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে। সরকারের ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাড়ি আসতে থাকে। বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং চিকিৎসক ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ছুটোছুটি করতে দেখা যায়।
সাঈদীর ছেলে অভিযোগ করেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার চিকিৎসা নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। তার পুরোনো রোগ বা চিকিৎসার ইতিহাস সম্পর্কেও পরিবারের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। কী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, শারীরিক অবস্থার কী পরিবর্তন হচ্ছে, দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও পরিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এমনকি সাঈদীকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার বিষয়েও পরিবারকে অবহিত করা হয়নি এবং এ বিষয়ে কোনো লিখিত বা মৌখিক অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তার ছেলে।
এর মধ্যে এশার আজান হলে তিনি ছোট ভাই নাসীম সাঈদীকে নিয়ে পিজি হাসপাতালের মসজিদে নামাজ পড়তে যান। সেখানে ইমাম সুরা আলে ইমরানের ১৬৭ নম্বর আয়াত থেকে তিলাওয়াত করেন। আয়াতটির অর্থ—আল্লাহর পথে নিহতদের মৃত মনে না করতে বলা হয়েছে; বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত ও রিজিকপ্রাপ্ত।
নামাজের সময় সাঈদীর ছেলে কান্নায় ভেঙে পড়েন বলে তার বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নামাজ শেষে এক পুলিশ কর্মকর্তা এসে তাকে জানান, রমনা জোনের এডিসি হারুন অর রশীদ ও শাহবাগ থানার ওসি নূর মোহাম্মাদ তার সঙ্গে কথা বলার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছেন। এরপর তারা তাকে সিসিইউর দিকে যেতে বলেন।
তিনি মনে করেছিলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে করা আবেদনের ভিত্তিতে হয়তো এবার বাবার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পাওয়া গেছে। কিন্তু সিসিইউর সামনে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সাঈদী আর জীবিত নেই।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাকে তার বাবার ইন্তেকালের খবর জানান। সংবাদটি শুনে তিনি ভেঙে পড়েন এবং ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক লোকজনের শোরগোলে সেই চিৎকার হারিয়ে যায়।
তার বক্তব্য, মুক্ত বাবাকে দেখার যে স্বপ্ন ছিল, তা আর পূরণ হয়নি।
সাঈদীর ছেলে অভিযোগ করেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও শেখ হাসিনা আল্লামা সাঈদীকে কথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দিতে চেয়েছিল। তার দাবি, সেটি না পেরে চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে হত্যার পথ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, এখন তার কাছে মনে হচ্ছে একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে চিকিৎসার নামে সাঈদীকে হত্যা করা হয়েছে।
তার অভিযোগ, ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ, ডা. এসএম মোস্তফা জামান এবং মো. রেজাউর রহমান ক্লিনিক্যাল নেগ্লিজেন্সের মতো অপরাধের কারণে তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দ্রুত এনজিওগ্রাম ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়। বুকের ব্যথা না থাকলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে Early PCI-এর মাধ্যমে রোগীকে স্থিতিশীল করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তার প্রশ্ন, সাঈদীর ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম কেন করা হলো।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ডা. এসএম মোস্তফা জামান প্রথমে প্রাইমারি পিসিআইয়ের কথা বললেও পরে বুকের ব্যথা না থাকাকে কারণ দেখিয়ে কেন তা করা হলো না।
সাঈদীর ছেলে দাবি করেন, PCI না করার ক্ষেত্রে যে কারণগুলো প্রযোজ্য, তার বাবার ক্ষেত্রে সেগুলো ছিল না। তাই তার মতে, এটি মেডিকেল নেগ্লিজেন্সের বিষয়।
এ ছাড়া ডা. এসএম মোস্তফা জামান সাঈদীকে রাত ৭টা ১০ মিনিটে লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার কথা বললেও পরিবারের কাছ থেকে কেন এ বিষয়ে অনুমতি নেওয়া হয়নি—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সাঈদীর ছেলে আরও দাবি করেন, ডা. এসএম মোস্তফা জামান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক কমিটির সদস্য, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগ নেতা এবং ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগের কথিত গণজাগরণ মঞ্চে সাঈদীর ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেওয়া ব্যক্তি ছিলেন।
তার প্রশ্ন, যে ব্যক্তি অতীতে সাঈদীর ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন করেছেন, তিনি কীভাবে সাঈদীর চিকিৎসার দায়িত্ব পেলেন এবং তার কাছ থেকে সাঈদী যথাযথ চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ ছিল কি না।
শেষে তিনি সরকারের কাছে আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে দ্রুত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান। একই সঙ্গে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তার ভাষায়, সাঈদীকে হত্যার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থার আহ্বান জানান।
সূত্র: আমার দেশ

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
বাবাকে কোন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, তা জানতে কারাগারের পরিচিত কর্মকর্তাদের একের পর এক ফোন করতে থাকেন তিনি। কোনো জায়গা থেকেই নিশ্চিত তথ্য না পেয়ে পরিবারের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে সম্ভাব্য কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ শুরু করেন। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, মিরপুর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও পিজি হাসপাতালে তারা ছুটে যান। কিন্তু কোথাও সাঈদীর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
রাত ১০টার কিছু পর তারা জানতে পারেন, সাঈদীকে শাহবাগের পিজি হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের সামনে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।
রাত ১১টার দিকে পিজি হাসপাতালের মূল গেটের দিক থেকে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শোনা যায়। সঙ্গে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য। অ্যাম্বুলেন্সটি ডি-ব্লকের ইমার্জেন্সির সামনে থামলে পরিবারের সদস্যরা সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের আটকে দেন।
অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খোলার পর দুই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের কাঁধে ভর করে সাঈদী নিচে নামেন। মেহেদি দেওয়া লাল দাড়িতে তাকে মায়াবি দেখাচ্ছিল বলে বর্ণনা করেছেন তার ছেলে। নেমেই তিনি কাউকে আগে সালাম দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে হাত নেড়ে উপস্থিত লোকজনকে বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম।’ জবাবে গভীর রাতে উপস্থিত জনতাও সমস্বরে ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’ বলে ওঠে। তখন তার মুখে হাসি ছিল।
তার ছেলে জানান, ১৩ বছর কারাগারে থাকার সময় বিভিন্ন সময়ে সাঈদীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। প্রতিবারই তিনি হাসপাতালে উপস্থিত থাকতেন এবং বাবাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতেন। কিন্তু শেষবারের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালজুড়ে আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। সাঈদীর অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোর পর পুরো গাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়। তিনি বাবার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়। এতে সাঈদী কষ্ট পান এবং তাকে কাছে আসতে দেওয়ার জন্য প্রতিবাদ করেন। কিন্তু তার কথাও শোনা হয়নি।
সাঈদীকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে দ্রুত হুইলচেয়ারে বসিয়ে ইমার্জেন্সিতে নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য ছাড়া অন্য কাউকে সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ভেতরে ঢোকার পর ডি-ব্লকের মূল গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ইমার্জেন্সিতে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগে। এই সময়ে তার ছেলে বাবার সঙ্গে কথা বলা বা শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জানার সুযোগ পাননি বলে দাবি করেন।
ইমার্জেন্সি রুমে কিছুক্ষণ পর পিজি হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ এবং ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এসএম মোস্তফা জামান আসেন। তারা ভেতরে কী আলোচনা করেন বা কী সিদ্ধান্ত নেন, তা পরিবারকে জানানো হয়নি বলে দাবি করা হয়।
পরে চিকিৎসকরা বেরিয়ে এলে সাংবাদিকরা তাদের ঘিরে ধরেন। ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলে চলে যান। আর ডা. এসএম মোস্তফা জামান সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
তিনি জানান, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী তার অধীনে কার্ডিয়াক ইমার্জেন্সিতে ভর্তি হয়েছেন। প্রাথমিক ইসিজিতে তার হার্ট অ্যাটাকের তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে তার হার্টে রিং পরানো হয়েছিল। চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, তার প্রাইমারি পিসিআই প্রয়োজন হতে পারে। তবে বুকের ব্যথা কমে যাওয়ায় তখনই পিসিআই না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। আপাতত তাকে কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে রাখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ব্রিফিং শেষে সাঈদীর ছেলে ডা. এসএম মোস্তফা জামানের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দেন এবং জানতে চান, হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকলে এনজিওগ্রাম করা হচ্ছে না কেন।
জবাবে ওই চিকিৎসক বলেন, ওই মুহূর্তে সাঈদীর বুকে ব্যথা না থাকায় এনজিওগ্রাম না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাঈদীর ছেলে পরে প্রশ্ন তোলেন, হার্ট অ্যাটাকের পর কেন তার বাবার প্রাইমারি পিসিআই করা হলো না, কেন মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়নি, হাসপাতালে এত কঠোর নিরাপত্তা কেন ছিল এবং পরিবারের সদস্যদের কেন তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা সাঈদীকে সিসিইউতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের সদস্যরা তখন বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ দরজা খুললে দেখা যায়, সাঈদী হুইলচেয়ারে বসে দরজার দিকে মুখ করে আছেন। তিনি তার ছেলে ও ছোট ভাই নাসীমকে দেখে হাসেন। তার ছেলে বলেন, ওই হাসি দেখে তিনি বুঝতে পারেন, সন্তানদের কাছাকাছি দেখে বাবা স্বস্তি পেয়েছিলেন।
এরপর সিসিইউর দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সেটিই ছিল বাবার সঙ্গে তাদের শেষ দেখা।
পরদিন ভোরে সিসিইউতে বাবার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেন সাঈদীর ছেলে। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, ৫০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য অবস্থান করছেন। সিসিইউর প্রবেশপথে পুলিশ চেকপোস্টও বসানো হয়েছিল।
বারবার চেষ্টা করেও তিনি বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। পরে তার মনে পড়ে ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদের কথা। তিনি চিকিৎসকের অফিসে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন।
প্রায় বেলা ১১টার দিকে ডা. মেশকাত অফিসে এলে তার কক্ষের সামনেও পুলিশ দেখতে পান তিনি। সেখানে প্রবেশের সময় পুলিশ তাকে বাধা দেয় এবং সাক্ষাতের অনুমতি নেওয়ার কথা জানায়।
পরে অনুমতি পেয়ে তিনি কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে ডা. মেশকাত আহমেদের সঙ্গে পিজি হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমান এবং ডা. এসএম মোস্তফা জামান ছিলেন।
সাঈদীর ছেলে বাবার শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে ডা. মেশকাত জানান, স্যার আগের তুলনায় সুস্থ আছেন। এরপর তিনি বাবার সঙ্গে দেখা করতে চান। হাসপাতালের পরিচালক তাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলেন এবং দেখা করার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।
কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তিনি কোনো খবর পাননি।
এরপর আইনজীবীদের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুটি আবেদন করা হয়। একটি আবেদনে পরিবারের সদস্যদের সাঈদীর সঙ্গে হাসপাতালে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হয়। অন্যটিতে বয়স ও অসুস্থতা বিবেচনায় পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে অথবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যকে সার্বক্ষণিক অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে থাকার অনুমতি চাওয়া হয়।
দুপুর ১টার দিকে তিনি আবার ডা. মেশকাতের অফিসে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমানের অফিসে যান। সেখানে ডা. এসএম মোস্তফা জামানকেও দেখতে পান।
পরিচালক তখন বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত ছিলেন। সাঈদীর ছেলে সেখানে অপেক্ষা করতে থাকেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাবার কোনো খবর না পাওয়া এবং দেখা করতে না পারায় তিনি ক্রমেই অস্থির হয়ে পড়ছিলেন।
এরপর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করেন। মন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, তার আবেদন হাতে এসেছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সাঈদীর ছেলে সিসিইউতে ওঠার সিঁড়িতে অপেক্ষা করতে থাকেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সাক্ষাতের অনুমতির কোনো খবর পাননি।
এ সময় হাসপাতাল চত্বরে প্রশাসনের বিভিন্ন গাড়ি আসতে দেখা যায়। নতুন করে অনেক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ে। একই সঙ্গে সাংবাদিক ও সাঈদীর অনুসারীদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে।
সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পরিবারের কাউকে সাঈদীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। তার ছেলে তখন মনে করেন, পরিকল্পিতভাবেই তাদের সাক্ষাৎ থেকে বিরত রাখা হচ্ছে।
মাগরিবের পর তিনি লোকমুখে সাঈদীর দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের খবর পান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তাকে জানান, সাঈদী স্বাভাবিক আছেন।
তবে তার ছেলে তাদের বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারেননি বলে জানান। এ সময় হাসপাতাল চত্বরে পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে। সরকারের ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাড়ি আসতে থাকে। বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং চিকিৎসক ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ছুটোছুটি করতে দেখা যায়।
সাঈদীর ছেলে অভিযোগ করেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার চিকিৎসা নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। তার পুরোনো রোগ বা চিকিৎসার ইতিহাস সম্পর্কেও পরিবারের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। কী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, শারীরিক অবস্থার কী পরিবর্তন হচ্ছে, দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও পরিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এমনকি সাঈদীকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার বিষয়েও পরিবারকে অবহিত করা হয়নি এবং এ বিষয়ে কোনো লিখিত বা মৌখিক অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তার ছেলে।
এর মধ্যে এশার আজান হলে তিনি ছোট ভাই নাসীম সাঈদীকে নিয়ে পিজি হাসপাতালের মসজিদে নামাজ পড়তে যান। সেখানে ইমাম সুরা আলে ইমরানের ১৬৭ নম্বর আয়াত থেকে তিলাওয়াত করেন। আয়াতটির অর্থ—আল্লাহর পথে নিহতদের মৃত মনে না করতে বলা হয়েছে; বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত ও রিজিকপ্রাপ্ত।
নামাজের সময় সাঈদীর ছেলে কান্নায় ভেঙে পড়েন বলে তার বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নামাজ শেষে এক পুলিশ কর্মকর্তা এসে তাকে জানান, রমনা জোনের এডিসি হারুন অর রশীদ ও শাহবাগ থানার ওসি নূর মোহাম্মাদ তার সঙ্গে কথা বলার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছেন। এরপর তারা তাকে সিসিইউর দিকে যেতে বলেন।
তিনি মনে করেছিলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে করা আবেদনের ভিত্তিতে হয়তো এবার বাবার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পাওয়া গেছে। কিন্তু সিসিইউর সামনে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সাঈদী আর জীবিত নেই।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাকে তার বাবার ইন্তেকালের খবর জানান। সংবাদটি শুনে তিনি ভেঙে পড়েন এবং ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক লোকজনের শোরগোলে সেই চিৎকার হারিয়ে যায়।
তার বক্তব্য, মুক্ত বাবাকে দেখার যে স্বপ্ন ছিল, তা আর পূরণ হয়নি।
সাঈদীর ছেলে অভিযোগ করেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও শেখ হাসিনা আল্লামা সাঈদীকে কথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দিতে চেয়েছিল। তার দাবি, সেটি না পেরে চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে হত্যার পথ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, এখন তার কাছে মনে হচ্ছে একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে চিকিৎসার নামে সাঈদীকে হত্যা করা হয়েছে।
তার অভিযোগ, ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ, ডা. এসএম মোস্তফা জামান এবং মো. রেজাউর রহমান ক্লিনিক্যাল নেগ্লিজেন্সের মতো অপরাধের কারণে তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দ্রুত এনজিওগ্রাম ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়। বুকের ব্যথা না থাকলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে Early PCI-এর মাধ্যমে রোগীকে স্থিতিশীল করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তার প্রশ্ন, সাঈদীর ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম কেন করা হলো।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ডা. এসএম মোস্তফা জামান প্রথমে প্রাইমারি পিসিআইয়ের কথা বললেও পরে বুকের ব্যথা না থাকাকে কারণ দেখিয়ে কেন তা করা হলো না।
সাঈদীর ছেলে দাবি করেন, PCI না করার ক্ষেত্রে যে কারণগুলো প্রযোজ্য, তার বাবার ক্ষেত্রে সেগুলো ছিল না। তাই তার মতে, এটি মেডিকেল নেগ্লিজেন্সের বিষয়।
এ ছাড়া ডা. এসএম মোস্তফা জামান সাঈদীকে রাত ৭টা ১০ মিনিটে লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার কথা বললেও পরিবারের কাছ থেকে কেন এ বিষয়ে অনুমতি নেওয়া হয়নি—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সাঈদীর ছেলে আরও দাবি করেন, ডা. এসএম মোস্তফা জামান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক কমিটির সদস্য, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগ নেতা এবং ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগের কথিত গণজাগরণ মঞ্চে সাঈদীর ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেওয়া ব্যক্তি ছিলেন।
তার প্রশ্ন, যে ব্যক্তি অতীতে সাঈদীর ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন করেছেন, তিনি কীভাবে সাঈদীর চিকিৎসার দায়িত্ব পেলেন এবং তার কাছ থেকে সাঈদী যথাযথ চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ ছিল কি না।
শেষে তিনি সরকারের কাছে আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে দ্রুত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান। একই সঙ্গে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তার ভাষায়, সাঈদীকে হত্যার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থার আহ্বান জানান।
সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন