ঢাকা    মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

মতামত

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে দিল্লিতে অস্থিরতা

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে দিল্লিতে অস্থিরতা
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে দিল্লিতে অস্থিরতা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানোকে কেন্দ্র করে দেশটির গণমাধ্যম ও সাবেক কূটনীতিকদের মধ্যে নানা আলোচনা ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তবে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের সরকারপ্রধান কখন কোন দেশে সফর করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সংশ্লিষ্ট দেশেরই। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রচারণা দেখে মনে হচ্ছে, আমন্ত্রণ পাওয়ার পরপরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি ছুটে যাওয়া উচিত ছিল। শেখ হাসিনার শাসনামলে তার ভারত সফরের ক্ষেত্রে এমন প্রবণতা দেখা গেছে।

শেখ হাসিনার প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ছিল বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের অধিকার হরণ ও নিপীড়নের ক্ষেত্রে ভারতীয় সমর্থনের অভিযোগও রয়েছে। জনসমর্থনহীন সরকারকে সমর্থনের বিনিময়ে দিল্লি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ওই সময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তার স্বাতন্ত্র্য হারিয়েছিল বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন দুই দেশের সম্পর্ককে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। একই সময়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘ভারতকে যা দিয়েছি, তা চিরদিন মনে রাখবে।’

লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, ওই সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি কার্যত ছিল না। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিল্লির সাউথ ব্লকের সম্প্রসারিত অংশে পরিণত হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগও ক্রমে জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি ভারতনির্ভর রাজনৈতিক দলে পরিণত হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সাভারের এক জনসভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘দিল্লির আছে, আমরা আছি।’ লেখাটিতে এ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, জনগণের সমর্থনের বদলে দিল্লির সমর্থনই তখন ক্ষমতায় থাকার প্রধান ভিত্তি ছিল।

ভারতের সমর্থনে ক্ষমতা নবায়নের প্রায় ছয় মাস পর ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগ ঘটে। এর মধ্য দিয়ে ভারতের সেই প্রভাবের অবসান ঘটে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ শুরু করে এবং আগের ভারতনির্ভর নীতি থেকে বেরিয়ে আসে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

লেখাটির ভাষ্য অনুযায়ী, হাসিনার পতনের চেয়েও বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি দিল্লির জন্য বড় আঘাত হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে ভারতের গণমাধ্যম, থিংকট্যাংক ও সাবেক কূটনীতিকরা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে লক্ষ্য করে প্রচারণা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দেশের ভেতরে ভারতের সফট পাওয়ার হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যম ও থিংকট্যাংকগুলোরও ড. ইউনূসের প্রতি অবস্থান পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারত আশা করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের পর নির্বাচিত সরকার ধীরে ধীরে ভারতের স্বার্থের অনুকূলে কাজ করবে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তনের পাশাপাশি স্বাধীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হয়েছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে চলার নীতি থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

লেখাটিতে বলা হয়েছে, ভারতের হিন্দুত্ববাদী নেতারা মনে করেছিলেন, শেখ হাসিনার মতো তারেক রহমানকেও দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি দ্রুত সেখানে যাবেন। এ কারণে বিমসটেকের মতো ভারতনিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পলাতক শেখ হাসিনাকে দিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতের মাটিতে দণ্ডিত একজন অপরাধীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, দিল্লি সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ফেরত চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এখন দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো নেই; অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে তিনি ভারত সফরে যাবেন।

এর পর থেকেই ভারতের গণমাধ্যম ও সাবেক কূটনীতিকদের বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা বেড়েছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে দেশের আওয়ামীপন্থী প্রচারকদেরও যুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, আমন্ত্রণ পাওয়ার পরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি যাওয়া উচিত ছিল। নির্ধারিত সময়ে সফর না করাকে ভারতের প্রতি অসম্মান হিসেবেও উপস্থাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারত ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে—এমন বক্তব্যও প্রচার করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

লেখাটিতে বলা হয়েছে, ভারত বাংলাদেশকে কোনো পণ্য বিনা মূল্যে দেয় না; প্রতিটি পণ্য বাংলাদেশকে কিনতে হয়। ভারত থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণ ডিজেল কেনে, তা দেশের মোট চাহিদার দশ ভাগের এক ভাগেরও কম। বাংলাদেশ অন্যান্য দেশ থেকেও ডিজেল কেনে। ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনা নিয়েও দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জসহ বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার কারণে বর্তমান বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে।

আদানি থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিকে মোদি সরকারকে ঘুষ দেওয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ত্রিপুরার পালাটানায় ভারতের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে তিতাস নদ ভরাট করে তৈরি রাস্তা দিয়ে নেওয়া এবং আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার করে বিনাশুল্কে ভারতে নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণায় নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে ত্রিদেশীয় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা শুরু হয়নি এবং বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক কোনো আমন্ত্রণও জানানো হয়নি বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স প্রধানমন্ত্রীকে রিয়াদ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে সরকার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে।

লেখাটিতে বলা হয়েছে, যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বা জোটে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্পর্ক বিবেচনা করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হতে পারে না। কোনো ত্রিদেশীয় জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ে এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভ হয়, তাহলে সেখানে যোগ দেওয়া উচিত বলেও মত দেওয়া হয়েছে।

ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান বা তুরস্কের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ এসব দেশের সঙ্গে গড়ে ওঠা কোনো জোটে যুক্ত হতে পারবে না—দিল্লির এমন প্রত্যাশা থাকা উচিত নয় বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সার্ককে অকার্যকর করার মাধ্যমে ভারত আঞ্চলিক জোটে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ক্ষুদ্র স্বার্থনির্ভর এবং জোট গঠন ও নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় উদার নীতির অভাব রয়েছে বলেও লেখাটিতে মন্তব্য করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র ইরানকে পরিত্যাগ করে ইসরাইলকে সহায়তা করার প্রসঙ্গ তুলে ধরে দেশটির মিত্রদের প্রতি ভারতের অবস্থানের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

সবশেষে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে দিল্লিতে যে বাংলাদেশবিরোধী আলোচনা ও প্রচারণা চলছে, তার পেছনে শেখ হাসিনা আমলে প্রতিষ্ঠিত প্রভাব হারানোর বিষয়টি কাজ করছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর দিল্লির আধিপত্যেরও অবসান হয়েছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারত ভবিষ্যতে তারেক রহমানের সরকারের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে আগের পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে বলেও লেখাটিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে যে আত্মমর্যাদা ফিরে পেয়েছে, তা সহজে ছাড়বে না এবং তারেক রহমানের সরকার বিষয়টি উপলব্ধি করছে বলে লেখাটির শেষাংশে মন্তব্য করা হয়েছে।

সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬


প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে দিল্লিতে অস্থিরতা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানোকে কেন্দ্র করে দেশটির গণমাধ্যম ও সাবেক কূটনীতিকদের মধ্যে নানা আলোচনা ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তবে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের সরকারপ্রধান কখন কোন দেশে সফর করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সংশ্লিষ্ট দেশেরই। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রচারণা দেখে মনে হচ্ছে, আমন্ত্রণ পাওয়ার পরপরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি ছুটে যাওয়া উচিত ছিল। শেখ হাসিনার শাসনামলে তার ভারত সফরের ক্ষেত্রে এমন প্রবণতা দেখা গেছে।

শেখ হাসিনার প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ছিল বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের অধিকার হরণ ও নিপীড়নের ক্ষেত্রে ভারতীয় সমর্থনের অভিযোগও রয়েছে। জনসমর্থনহীন সরকারকে সমর্থনের বিনিময়ে দিল্লি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ওই সময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তার স্বাতন্ত্র্য হারিয়েছিল বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন দুই দেশের সম্পর্ককে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। একই সময়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘ভারতকে যা দিয়েছি, তা চিরদিন মনে রাখবে।’

লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, ওই সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি কার্যত ছিল না। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিল্লির সাউথ ব্লকের সম্প্রসারিত অংশে পরিণত হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগও ক্রমে জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি ভারতনির্ভর রাজনৈতিক দলে পরিণত হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সাভারের এক জনসভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘দিল্লির আছে, আমরা আছি।’ লেখাটিতে এ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, জনগণের সমর্থনের বদলে দিল্লির সমর্থনই তখন ক্ষমতায় থাকার প্রধান ভিত্তি ছিল।

ভারতের সমর্থনে ক্ষমতা নবায়নের প্রায় ছয় মাস পর ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগ ঘটে। এর মধ্য দিয়ে ভারতের সেই প্রভাবের অবসান ঘটে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ শুরু করে এবং আগের ভারতনির্ভর নীতি থেকে বেরিয়ে আসে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

লেখাটির ভাষ্য অনুযায়ী, হাসিনার পতনের চেয়েও বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি দিল্লির জন্য বড় আঘাত হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে ভারতের গণমাধ্যম, থিংকট্যাংক ও সাবেক কূটনীতিকরা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে লক্ষ্য করে প্রচারণা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দেশের ভেতরে ভারতের সফট পাওয়ার হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যম ও থিংকট্যাংকগুলোরও ড. ইউনূসের প্রতি অবস্থান পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারত আশা করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের পর নির্বাচিত সরকার ধীরে ধীরে ভারতের স্বার্থের অনুকূলে কাজ করবে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তনের পাশাপাশি স্বাধীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হয়েছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে চলার নীতি থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

লেখাটিতে বলা হয়েছে, ভারতের হিন্দুত্ববাদী নেতারা মনে করেছিলেন, শেখ হাসিনার মতো তারেক রহমানকেও দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি দ্রুত সেখানে যাবেন। এ কারণে বিমসটেকের মতো ভারতনিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পলাতক শেখ হাসিনাকে দিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতের মাটিতে দণ্ডিত একজন অপরাধীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, দিল্লি সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ফেরত চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এখন দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো নেই; অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে তিনি ভারত সফরে যাবেন।

এর পর থেকেই ভারতের গণমাধ্যম ও সাবেক কূটনীতিকদের বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা বেড়েছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে দেশের আওয়ামীপন্থী প্রচারকদেরও যুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, আমন্ত্রণ পাওয়ার পরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি যাওয়া উচিত ছিল। নির্ধারিত সময়ে সফর না করাকে ভারতের প্রতি অসম্মান হিসেবেও উপস্থাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারত ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে—এমন বক্তব্যও প্রচার করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

লেখাটিতে বলা হয়েছে, ভারত বাংলাদেশকে কোনো পণ্য বিনা মূল্যে দেয় না; প্রতিটি পণ্য বাংলাদেশকে কিনতে হয়। ভারত থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণ ডিজেল কেনে, তা দেশের মোট চাহিদার দশ ভাগের এক ভাগেরও কম। বাংলাদেশ অন্যান্য দেশ থেকেও ডিজেল কেনে। ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনা নিয়েও দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জসহ বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার কারণে বর্তমান বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে।

আদানি থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিকে মোদি সরকারকে ঘুষ দেওয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ত্রিপুরার পালাটানায় ভারতের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে তিতাস নদ ভরাট করে তৈরি রাস্তা দিয়ে নেওয়া এবং আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার করে বিনাশুল্কে ভারতে নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণায় নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে ত্রিদেশীয় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা শুরু হয়নি এবং বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক কোনো আমন্ত্রণও জানানো হয়নি বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স প্রধানমন্ত্রীকে রিয়াদ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে সরকার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে।

লেখাটিতে বলা হয়েছে, যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বা জোটে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্পর্ক বিবেচনা করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হতে পারে না। কোনো ত্রিদেশীয় জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ে এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভ হয়, তাহলে সেখানে যোগ দেওয়া উচিত বলেও মত দেওয়া হয়েছে।

ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান বা তুরস্কের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ এসব দেশের সঙ্গে গড়ে ওঠা কোনো জোটে যুক্ত হতে পারবে না—দিল্লির এমন প্রত্যাশা থাকা উচিত নয় বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সার্ককে অকার্যকর করার মাধ্যমে ভারত আঞ্চলিক জোটে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ক্ষুদ্র স্বার্থনির্ভর এবং জোট গঠন ও নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় উদার নীতির অভাব রয়েছে বলেও লেখাটিতে মন্তব্য করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র ইরানকে পরিত্যাগ করে ইসরাইলকে সহায়তা করার প্রসঙ্গ তুলে ধরে দেশটির মিত্রদের প্রতি ভারতের অবস্থানের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

সবশেষে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে দিল্লিতে যে বাংলাদেশবিরোধী আলোচনা ও প্রচারণা চলছে, তার পেছনে শেখ হাসিনা আমলে প্রতিষ্ঠিত প্রভাব হারানোর বিষয়টি কাজ করছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর দিল্লির আধিপত্যেরও অবসান হয়েছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারত ভবিষ্যতে তারেক রহমানের সরকারের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে আগের পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে বলেও লেখাটিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে যে আত্মমর্যাদা ফিরে পেয়েছে, তা সহজে ছাড়বে না এবং তারেক রহমানের সরকার বিষয়টি উপলব্ধি করছে বলে লেখাটির শেষাংশে মন্তব্য করা হয়েছে।

সূত্র: আমার দেশ


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - মোঃ আতিকুল ইসলাম
প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক - মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয় 
সহ-সম্পাদক- মোঃ জাকারিয়া হোসেন
বার্তা সম্পাদক - মোঃ ওলিউল্লাহ

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে দিল্লিতে অস্থিরতা
0:00 0:00
1.0x