শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সভাটির প্রতিপাদ্য ছিল—‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার’।
বক্তব্যের একপর্যায়ে ভারতে একটি মানসিক হাসপাতালে কাটানো সময়ের কথা স্মরণ করে কেঁদে ফেলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আমি বিদেশের মাটিতে পাগল অবস্থায় মারা যাব, আমার পরিবার হয়তো আমার কবরও দেখতে পারবে না—এমন ভয়ও পেয়েছিলাম।’
নিজের গুমের সময়ের বন্দিজীবনের কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাজধানীর উত্তরা থেকে অপহরণের পর তাকে প্রায় আট ফুট লম্বা ও চার ফুট প্রশস্ত একটি অন্ধকার, সংকীর্ণ কক্ষে ৬১ দিন রাখা হয়েছিল। কক্ষটিতে ছিল একটি পানির কল এবং শৌচকার্যের জন্য নর্দমার সঙ্গে সংযুক্ত একটি সরু ছিদ্র। দুর্গন্ধ ও প্রচণ্ড গরমের মধ্যে মেঝেতে একটি কম্বল ও বালিশ ব্যবহার করেই তাকে থাকতে হতো।
তার ভাষ্য, কক্ষের দরজার ওপর থাকা সামান্য ফাঁক দিয়ে যে বাতাস ঢুকত, সেটিই ছিল তার জন্য একমাত্র স্বস্তি। দরজার বাইরে একটি বৈদ্যুতিক পাখা সারাক্ষণ চালু রাখা হতো। হৃদরোগে আক্রান্ত থাকা সত্ত্বেও বন্দি অবস্থায় তিনি কোনো চিকিৎসা পাননি। অসুস্থ হয়ে পড়লে একপর্যায়ে চোখ বেঁধে তাকে অন্য একটি স্থানে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ভারতে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও বর্ণনা করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, চোখ বাঁধা অবস্থায় প্রথমে মাইক্রোবাসে এবং পরে গভীর রাতে জিপে করে তাকে অজ্ঞাত একটি স্থানে নেওয়া হয়। দীর্ঘ যাত্রার পর হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থাতেই তাকে চামচ দিয়ে নুডলস খেতে দেওয়া হয়েছিল।
বন্দি থাকায় বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তার পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কামরুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবরও তিনি জানতেন না। বিষয়টি জানার পর জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাও বিস্মিত হয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
পরে ভোরের দিকে একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকায় তাকে নামিয়ে দিয়ে অপহরণকারীরা মুখ ঢেকে দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়। এরপর একটি বিলবোর্ড দেখতে পেয়ে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং এলাকায় রয়েছেন।
স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। প্রথমে তাকে একটি বেসামরিক হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে মানসিক ভারসাম্যহীন সন্দেহে একটি মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে মানসিক রোগীদের সঙ্গে তাকে রাখা হতো এবং জোর করে মানসিক রোগের ওষুধ খাওয়ানো হতো বলে জানান তিনি। এমনকি তার চশমাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
দাড়ি ও চুল কেটে দেওয়ার পর নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় তিনি আরও ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে হাসপাতাল থেকেই তার স্ত্রীর ফোন আসে। ফোনে স্ত্রীর কান্নার শব্দ শুনে তিনি বুঝতে পারেন, তার পরিবার তার জীবিত থাকার খবর পেয়েছে।
পরে সিভিল হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় সাংবাদিকদের টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে নিজের পরিচয় জানিয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন’।
ভারতে অবস্থানকালে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ফরেনার্স অ্যাক্টে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর শিলংয়ের নিম্ন আদালত এবং ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিল আদালত তাকে খালাস দেন।
ভারতে অবস্থানকালেই বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে সালাহউদ্দিন আহমদকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রায় নয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে তিনি বাংলাদেশে ফেরেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হওয়ায় ভারত থেকে আমি দেশে ফিরতে পেরেছি। যারা জুলাই যুদ্ধ করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।’
সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একান্ত সচিবের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০০১ সালে কক্সবাজার থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দলটির আন্দোলন পরিচালনার সময় ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনা নিয়ে সে সময় বিএনপি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল।
সূত্র: দৈনিক জনবানী

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সভাটির প্রতিপাদ্য ছিল—‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার’।
বক্তব্যের একপর্যায়ে ভারতে একটি মানসিক হাসপাতালে কাটানো সময়ের কথা স্মরণ করে কেঁদে ফেলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আমি বিদেশের মাটিতে পাগল অবস্থায় মারা যাব, আমার পরিবার হয়তো আমার কবরও দেখতে পারবে না—এমন ভয়ও পেয়েছিলাম।’
নিজের গুমের সময়ের বন্দিজীবনের কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাজধানীর উত্তরা থেকে অপহরণের পর তাকে প্রায় আট ফুট লম্বা ও চার ফুট প্রশস্ত একটি অন্ধকার, সংকীর্ণ কক্ষে ৬১ দিন রাখা হয়েছিল। কক্ষটিতে ছিল একটি পানির কল এবং শৌচকার্যের জন্য নর্দমার সঙ্গে সংযুক্ত একটি সরু ছিদ্র। দুর্গন্ধ ও প্রচণ্ড গরমের মধ্যে মেঝেতে একটি কম্বল ও বালিশ ব্যবহার করেই তাকে থাকতে হতো।
তার ভাষ্য, কক্ষের দরজার ওপর থাকা সামান্য ফাঁক দিয়ে যে বাতাস ঢুকত, সেটিই ছিল তার জন্য একমাত্র স্বস্তি। দরজার বাইরে একটি বৈদ্যুতিক পাখা সারাক্ষণ চালু রাখা হতো। হৃদরোগে আক্রান্ত থাকা সত্ত্বেও বন্দি অবস্থায় তিনি কোনো চিকিৎসা পাননি। অসুস্থ হয়ে পড়লে একপর্যায়ে চোখ বেঁধে তাকে অন্য একটি স্থানে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ভারতে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও বর্ণনা করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, চোখ বাঁধা অবস্থায় প্রথমে মাইক্রোবাসে এবং পরে গভীর রাতে জিপে করে তাকে অজ্ঞাত একটি স্থানে নেওয়া হয়। দীর্ঘ যাত্রার পর হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থাতেই তাকে চামচ দিয়ে নুডলস খেতে দেওয়া হয়েছিল।
বন্দি থাকায় বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তার পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কামরুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবরও তিনি জানতেন না। বিষয়টি জানার পর জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাও বিস্মিত হয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
পরে ভোরের দিকে একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকায় তাকে নামিয়ে দিয়ে অপহরণকারীরা মুখ ঢেকে দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়। এরপর একটি বিলবোর্ড দেখতে পেয়ে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং এলাকায় রয়েছেন।
স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। প্রথমে তাকে একটি বেসামরিক হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে মানসিক ভারসাম্যহীন সন্দেহে একটি মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে মানসিক রোগীদের সঙ্গে তাকে রাখা হতো এবং জোর করে মানসিক রোগের ওষুধ খাওয়ানো হতো বলে জানান তিনি। এমনকি তার চশমাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
দাড়ি ও চুল কেটে দেওয়ার পর নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় তিনি আরও ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে হাসপাতাল থেকেই তার স্ত্রীর ফোন আসে। ফোনে স্ত্রীর কান্নার শব্দ শুনে তিনি বুঝতে পারেন, তার পরিবার তার জীবিত থাকার খবর পেয়েছে।
পরে সিভিল হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় সাংবাদিকদের টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে নিজের পরিচয় জানিয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন’।
ভারতে অবস্থানকালে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ফরেনার্স অ্যাক্টে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর শিলংয়ের নিম্ন আদালত এবং ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিল আদালত তাকে খালাস দেন।
ভারতে অবস্থানকালেই বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে সালাহউদ্দিন আহমদকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রায় নয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে তিনি বাংলাদেশে ফেরেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হওয়ায় ভারত থেকে আমি দেশে ফিরতে পেরেছি। যারা জুলাই যুদ্ধ করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।’
সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একান্ত সচিবের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০০১ সালে কক্সবাজার থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দলটির আন্দোলন পরিচালনার সময় ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনা নিয়ে সে সময় বিএনপি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল।
সূত্র: দৈনিক জনবানী

আপনার মতামত লিখুন