ঢাকা    শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
ইনসাফ টাইম ২৪

আন্তর্জাতিক

হুথিরা কি লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে?

হুথিরা কি লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে?
হুথিরা কি লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে?

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরো অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। তাদের অগ্রযাত্রা এখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির প্রবেশমুখ পর্যন্ত পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার বন্দরনগরী মোকা দখলের মাধ্যমে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে গোষ্ঠীটি।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, হুথিদের এই অগ্রগতি ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবর্তনগুলোর একটি। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি তেল পরিবহনে বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরপথের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে।

এরই মধ্যে সৌদি পতাকাবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে হুথিরা। ইয়েমেনের পুরো উপকূল এবং বাব আল-মান্দেবের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—হুথিরা কি সত্যিই লোহিত সাগরের নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ার মতো অবস্থানে যেতে পারবে?

ইয়েমেনে আবার কেন যুদ্ধ

ইয়েমেনে ২০১৪ সাল থেকে যুদ্ধ চলছে। ওই বছর হুথি যোদ্ধারা রাজধানী সানা এবং বন্দরনগরী হুদাইদাহ দখল করলে সরকারকে সরে যেতে হয়।

এরপর ইরানের সমর্থন নিয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় সামরিক জোট। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পক্ষে লড়াই করছে এই জোট। সরকারের প্রধান ঘাঁটি এডেনে।

ইরানের প্রভাব ঠেকানো এবং ইয়েমেন সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৫ সালে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সৌদি আরব।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হয়। বড় আকারের সংঘর্ষ থেমে গেলেও বিচ্ছিন্ন লড়াই অব্যাহত ছিল। গত সপ্তাহে আবারও তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক বছরের মধ্যে এটি অন্যতম বড় সংঘর্ষ।

এবার হুথিদের প্রধান লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগরের উপকূল। দ্রুত অগ্রসর হয়ে তারা একের পর এক এলাকা দখলে নেয়। ইয়েমেন সরকারের বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালালেও হুথিদের অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব হয়নি।

কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব

বাব আল-মান্দেব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি। এটি সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।

বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ প্রতিদিন এই নৌপথ দিয়ে চলাচল করে।

যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ পরিবহন করা হতো। ফেব্রুয়ারিতে ইরান প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার পর বাব আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

এ কারণে ইয়েমেনের উপকূল দখল করে বাব আল-মান্দেবের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া হুথিদের জন্য কেবল সামরিক সাফল্য নয়; গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্যপথে চাপ সৃষ্টিরও সুযোগ তৈরি করেছে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সৌদি তেলে

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাব আল-মান্দেব পুরোপুরি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে সৌদি আরব।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব তার ইস্ট-ওয়েস্ট ক্রুড অয়েল পাইপলাইনের ব্যবহার বাড়িয়েছে। ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন আবকাইক তেলক্ষেত্র থেকে আরব উপদ্বীপ অতিক্রম করে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছেছে।

এই পাইপলাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি তেল বিশ্ববাজারে পাঠানো সম্ভব।

হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য বিঘ্নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই ১৯৮০-এর দশকে পাইপলাইনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে হুথিদের ড্রোন হামলার সময়ও এটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল।

বর্তমান যুদ্ধের পর সৌদি আরব পাইপলাইনটির সক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাড়িয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের উপকূলে পাঠানো সম্ভব। যুদ্ধের আগে এর সক্ষমতা ছিল ৫০ লাখ ব্যারেল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর বাব আল-মান্দেব দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন ২১ শতাংশ বেড়েছে।

এখন পুরো ইয়েমেন উপকূল হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় সৌদি আরবের সেই বিকল্প পথটিও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

এরই মধ্যে লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করেছে হুথিরা। শুক্রবার ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে ধোঁয়া ওঠার ছবি প্রকাশিত হয়। তবে পাইপলাইনটি হামলার শিকার হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি।

ইরান কতটা লাভবান হবে

হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ইরানের।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের অগ্রযাত্রা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে নতুন একটি বড় ফ্রন্ট তৈরি করছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অচলাবস্থার মধ্যে তেহরানের হাতে চাপ প্রয়োগের আরেকটি উপায় তৈরি হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি করছে। তবে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় পর্যবেক্ষকদের মতে, সেখানে বর্তমানে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

এর সঙ্গে বাব আল-মান্দেবের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ যুক্ত হলে ইরানের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আলাম সালেহের মতে, এর ফলে হরমুজের পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর ইরানের প্রভাব তৈরি হবে।

এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়তে পারে। তেলের দাম বেড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রেও চাপ বাড়বে। ইতোমধ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটি অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ভোটারদের ক্ষোভ প্রকাশ পেতে পারে। ট্রাম্পও চলতি সপ্তাহে বলেছেন, ওই নির্বাচনের আগে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আলাম সালেহের মতে, ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলে নত করতে চায় ওয়াশিংটন। কিন্তু পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।

হুথিদের অগ্রগতি চীন ও রাশিয়ার কাছেও একটি বার্তা দিচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রভাব আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে।

হুথিরা কি নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে?

হুথিদের দ্রুত অগ্রসর হওয়ার অর্থ এই নয় যে তারা দীর্ঘ সময় বাব আল-মান্দেব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।

ইয়েমেন সরকারের বাহিনীতে আনুমানিক ৩ লাখ সদস্য রয়েছে। অন্যদিকে হুথিদের সদস্যসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার।

তবে সরকারি বাহিনী অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত। পাশাপাশি সৌদি আরবের চাপও রয়েছে। ফলে সামরিক ফ্রন্ট খণ্ডিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির সুবিধা নিয়েছে দ্রুতগতির ও কৌশলী হুথি বাহিনী।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, প্রায় এক দশক আগে সৌদি বাহিনী যে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, বর্তমান হুথি বাহিনী তার তুলনায় অনেক বেশি উন্নত।

গত কয়েক বছরে ইরান থেকে পাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হুথিদের সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে।

তবে কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে হুথিদের বড় দুর্বলতা রয়েছে। দ্রুত সামরিক সাফল্য অর্জন করলেও দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ধরে রাখা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

তার মতে, হুথিদের অগ্রযাত্রার পেছনে শুধু তাদের সামরিক শক্তি নয়, সৌদি-সমর্থিত জোটের সক্ষমতাকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করাও একটি কারণ।

তবে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বাব আল-মান্দেব কিংবা পুরো লোহিত সাগর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হুথিদের জন্য অপরিহার্য নাও হতে পারে। আলাম সালেহের মতে, নৌপথটি ঝুঁকিপূর্ণ—এমন সামান্য আশঙ্কাই যথেষ্ট। এর ফলে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানিগুলো ওই নৌপথ এড়িয়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ, নৌপথ পুরোপুরি বন্ধ না করেও হুথিরা সেটিকে কার্যত অচল করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

সৌদি আরবের সামনে এখন কী পথ

এখন বড় প্রশ্ন হলো, সৌদি আরব নিজেদের বিমান শক্তি ব্যবহার করে হুথিদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারবে কি না।

গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি বাহিনী হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো লক্ষ্য করে অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে মোকাও রয়েছে। তবে এসব হামলা এখন পর্যন্ত হুথিদের অগ্রযাত্রা বন্ধ করতে পারেনি।

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তি আপাতত সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হোক—এটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলো চায় না।

এদিকে ওয়াশিংটনের সরাসরি সামরিক সহায়তার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দুবার ফোন করেন। তিনি হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলার অনুরোধ জানান। তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।

ফলে বাব আল-মান্দেব ঘিরে হুথিদের অগ্রযাত্রা এখন আর শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধের বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি, লোহিত সাগরের নৌপথ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের শক্তির ভারসাম্য।

হুথিরা লোহিত সাগর পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে কি না, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে তারা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারবে।

সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন

ইনসাফ টাইম ২৪

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


হুথিরা কি লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে?

প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরো অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। তাদের অগ্রযাত্রা এখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির প্রবেশমুখ পর্যন্ত পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার বন্দরনগরী মোকা দখলের মাধ্যমে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে গোষ্ঠীটি।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, হুথিদের এই অগ্রগতি ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবর্তনগুলোর একটি। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি তেল পরিবহনে বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরপথের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে।

এরই মধ্যে সৌদি পতাকাবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে হুথিরা। ইয়েমেনের পুরো উপকূল এবং বাব আল-মান্দেবের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—হুথিরা কি সত্যিই লোহিত সাগরের নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ার মতো অবস্থানে যেতে পারবে?

ইয়েমেনে আবার কেন যুদ্ধ

ইয়েমেনে ২০১৪ সাল থেকে যুদ্ধ চলছে। ওই বছর হুথি যোদ্ধারা রাজধানী সানা এবং বন্দরনগরী হুদাইদাহ দখল করলে সরকারকে সরে যেতে হয়।

এরপর ইরানের সমর্থন নিয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় সামরিক জোট। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পক্ষে লড়াই করছে এই জোট। সরকারের প্রধান ঘাঁটি এডেনে।

ইরানের প্রভাব ঠেকানো এবং ইয়েমেন সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৫ সালে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সৌদি আরব।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হয়। বড় আকারের সংঘর্ষ থেমে গেলেও বিচ্ছিন্ন লড়াই অব্যাহত ছিল। গত সপ্তাহে আবারও তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক বছরের মধ্যে এটি অন্যতম বড় সংঘর্ষ।

এবার হুথিদের প্রধান লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগরের উপকূল। দ্রুত অগ্রসর হয়ে তারা একের পর এক এলাকা দখলে নেয়। ইয়েমেন সরকারের বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালালেও হুথিদের অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব হয়নি।

কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব

বাব আল-মান্দেব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি। এটি সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।

বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ প্রতিদিন এই নৌপথ দিয়ে চলাচল করে।

যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ পরিবহন করা হতো। ফেব্রুয়ারিতে ইরান প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার পর বাব আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

এ কারণে ইয়েমেনের উপকূল দখল করে বাব আল-মান্দেবের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া হুথিদের জন্য কেবল সামরিক সাফল্য নয়; গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্যপথে চাপ সৃষ্টিরও সুযোগ তৈরি করেছে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সৌদি তেলে

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাব আল-মান্দেব পুরোপুরি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে সৌদি আরব।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব তার ইস্ট-ওয়েস্ট ক্রুড অয়েল পাইপলাইনের ব্যবহার বাড়িয়েছে। ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন আবকাইক তেলক্ষেত্র থেকে আরব উপদ্বীপ অতিক্রম করে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছেছে।

এই পাইপলাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি তেল বিশ্ববাজারে পাঠানো সম্ভব।

হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য বিঘ্নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই ১৯৮০-এর দশকে পাইপলাইনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে হুথিদের ড্রোন হামলার সময়ও এটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল।

বর্তমান যুদ্ধের পর সৌদি আরব পাইপলাইনটির সক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাড়িয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের উপকূলে পাঠানো সম্ভব। যুদ্ধের আগে এর সক্ষমতা ছিল ৫০ লাখ ব্যারেল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর বাব আল-মান্দেব দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন ২১ শতাংশ বেড়েছে।

এখন পুরো ইয়েমেন উপকূল হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় সৌদি আরবের সেই বিকল্প পথটিও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

এরই মধ্যে লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করেছে হুথিরা। শুক্রবার ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে ধোঁয়া ওঠার ছবি প্রকাশিত হয়। তবে পাইপলাইনটি হামলার শিকার হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি।

ইরান কতটা লাভবান হবে

হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ইরানের।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের অগ্রযাত্রা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে নতুন একটি বড় ফ্রন্ট তৈরি করছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অচলাবস্থার মধ্যে তেহরানের হাতে চাপ প্রয়োগের আরেকটি উপায় তৈরি হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি করছে। তবে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় পর্যবেক্ষকদের মতে, সেখানে বর্তমানে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

এর সঙ্গে বাব আল-মান্দেবের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ যুক্ত হলে ইরানের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আলাম সালেহের মতে, এর ফলে হরমুজের পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর ইরানের প্রভাব তৈরি হবে।

এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়তে পারে। তেলের দাম বেড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রেও চাপ বাড়বে। ইতোমধ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটি অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ভোটারদের ক্ষোভ প্রকাশ পেতে পারে। ট্রাম্পও চলতি সপ্তাহে বলেছেন, ওই নির্বাচনের আগে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আলাম সালেহের মতে, ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলে নত করতে চায় ওয়াশিংটন। কিন্তু পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।

হুথিদের অগ্রগতি চীন ও রাশিয়ার কাছেও একটি বার্তা দিচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রভাব আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে।

হুথিরা কি নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে?

হুথিদের দ্রুত অগ্রসর হওয়ার অর্থ এই নয় যে তারা দীর্ঘ সময় বাব আল-মান্দেব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।

ইয়েমেন সরকারের বাহিনীতে আনুমানিক ৩ লাখ সদস্য রয়েছে। অন্যদিকে হুথিদের সদস্যসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার।

তবে সরকারি বাহিনী অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত। পাশাপাশি সৌদি আরবের চাপও রয়েছে। ফলে সামরিক ফ্রন্ট খণ্ডিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির সুবিধা নিয়েছে দ্রুতগতির ও কৌশলী হুথি বাহিনী।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, প্রায় এক দশক আগে সৌদি বাহিনী যে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, বর্তমান হুথি বাহিনী তার তুলনায় অনেক বেশি উন্নত।

গত কয়েক বছরে ইরান থেকে পাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হুথিদের সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে।

তবে কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে হুথিদের বড় দুর্বলতা রয়েছে। দ্রুত সামরিক সাফল্য অর্জন করলেও দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ধরে রাখা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

তার মতে, হুথিদের অগ্রযাত্রার পেছনে শুধু তাদের সামরিক শক্তি নয়, সৌদি-সমর্থিত জোটের সক্ষমতাকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করাও একটি কারণ।

তবে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বাব আল-মান্দেব কিংবা পুরো লোহিত সাগর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হুথিদের জন্য অপরিহার্য নাও হতে পারে। আলাম সালেহের মতে, নৌপথটি ঝুঁকিপূর্ণ—এমন সামান্য আশঙ্কাই যথেষ্ট। এর ফলে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানিগুলো ওই নৌপথ এড়িয়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ, নৌপথ পুরোপুরি বন্ধ না করেও হুথিরা সেটিকে কার্যত অচল করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

সৌদি আরবের সামনে এখন কী পথ

এখন বড় প্রশ্ন হলো, সৌদি আরব নিজেদের বিমান শক্তি ব্যবহার করে হুথিদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারবে কি না।

গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি বাহিনী হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো লক্ষ্য করে অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে মোকাও রয়েছে। তবে এসব হামলা এখন পর্যন্ত হুথিদের অগ্রযাত্রা বন্ধ করতে পারেনি।

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তি আপাতত সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হোক—এটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলো চায় না।

এদিকে ওয়াশিংটনের সরাসরি সামরিক সহায়তার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দুবার ফোন করেন। তিনি হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলার অনুরোধ জানান। তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।

ফলে বাব আল-মান্দেব ঘিরে হুথিদের অগ্রযাত্রা এখন আর শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধের বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি, লোহিত সাগরের নৌপথ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের শক্তির ভারসাম্য।

হুথিরা লোহিত সাগর পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে কি না, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে তারা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারবে।

সূত্র: আমার দেশ


ইনসাফ টাইম ২৪

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান - মোঃ জাকারিয়া আহম্মেদ 
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - মোঃ আতিকুল ইসলাম
প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক - মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয় 
সহ-সম্পাদক- মোঃ জাকারিয়া হোসেন
বার্তা সম্পাদক - মোঃ ওলিউল্লাহ

কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
হুথিরা কি লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে?
0:00 0:00
1.0x