এ অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হলে কী ধরনের অবদান রাখতে পারবে এবং জোটে তার ভূমিকা কী হতে পারে? সম্ভাব্য নতুন সদস্যদের তুলনায় আঙ্কারা, ইসলামাবাদ ও রিয়াদের কাছে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বেশি কিছু দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। ফলে জোটের সদস্যরা সেই সক্ষমতাকে বিবেচনায় রেখেই আলোচনাকে এগিয়ে নিতে পারে।
মৌলিক বিষয় থেকেই এ আলোচনা শুরু করা যায়। সামরিক জোটকে সবসময় সভ্যতার ঐক্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিশৃঙ্খল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এসব জোটকে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সক্ষমতা ও সেবা বিনিময়ের একটি কাঠামো হিসেবে দেখা যায়, যেখানে সরবরাহকারী ও গ্রহীতার মধ্যে এক ধরনের লেনদেন থাকে।
তাই মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগদানের আগ্রহও কৌশলগত ও সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যনির্ভর হওয়া প্রয়োজন। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ এমন কী দিতে পারে, যা জোটের প্রতিষ্ঠাতা তিন দেশ গ্রহণে আগ্রহী হবে? একই সঙ্গে সদস্যপদ পেলে বাংলাদেশের নিজস্ব হার্ড-সিকিউরিটি বা কঠোর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কী ধরনের সুবিধা তৈরি হবে, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কয়েক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন মিশনে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ইউনিফর্মধারী সদস্য মোতায়েন করেছে। এর ফলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম সামরিক বাহিনীর একটি বিশেষায়িত দক্ষতায় পরিণত হয়েছে।
কঠিন ও প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশের বাহিনীগুলো বিমান চলাচল বা অ্যাভিয়েশন, জরুরি চিকিৎসা ও রোগী স্থানান্তর বা মেডিকেল ইভাকুয়েশন এবং প্রকৌশল কার্যক্রমের মতো ক্ষেত্রে বাস্তব দক্ষতা অর্জন করেছে। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে বাংলাদেশের একটি অ্যাভিয়েশন ইউনিট সৈন্য, সরঞ্জাম ও হতাহতদের পরিবহনে ৩৯ হাজার ঘণ্টার বেশি সময় কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই সফলভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।
তবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের আয় ও প্রশিক্ষণের সুযোগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ফলে বিদ্যমান সক্ষমতা ধরে রাখতে ঢাকার বিকল্প পৃষ্ঠপোষক বা সহযোগী প্রয়োজন।
মক্কা চুক্তির আওতায় যদি পর্যায়ক্রমিক বা ঘূর্ণায়মান বাহিনী, ঘাঁটি নিরাপত্তার জন্য দল কিংবা যুদ্ধকালীন অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশ তুলনামূলক কম সুযোগ ব্যয়ের বিনিময়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সৈন্য বা জনবল দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি ‘এক্সপিডিশনারি’ বা অভিযান-সক্ষম বাহিনী কিংবা ‘স্ট্যান্ডবাই’ বা প্রস্তুত বাহিনী মোতায়েন করতে পারে। এতে দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা কাঠামোর ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব বা উল্লেখযোগ্য সুযোগ ব্যয় ছাড়াই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে। এ ধরনের বিশেষায়িত বা ‘অ্যাসিমেট্রিক’ অবদান কোনো দেশকে জোটের জন্য বোঝা না বানিয়ে মূল্যবান অংশীদারে পরিণত করতে পারে।
জাতিসংঘের কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সম্পদশালী সদস্য সৌদি আরবের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। এর মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশের সেনাসদস্যরা যে আয় করে থাকেন, তার বিকল্প ব্যবস্থা দ্রুত তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
মক্কা চুক্তির তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশের কোনোটিরই বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থান নেই। একইভাবে মালাক্কা প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ নৌপথের কাছাকাছিও তাদের কোনো অবস্থান নেই।
একটি জোটের জন্য কোনো দেশের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ থাকা মানে লজিস্টিকস ও রসদ সরবরাহ, প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ, নজরদারি এবং চলাচলের সুবিধা পাওয়া। একই সঙ্গে ভৌগোলিক নৈকট্য প্রতিপক্ষের গতিবিধি ঠেকানো বা ‘ডিনায়াল ক্যাপাবিলিটি’ বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে।
ঢাকার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি হলে আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ পূর্ব ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে লজিস্টিকস ও চলাচলের সুবিধা পেতে পারে। এর মধ্যে বন্দরে নোঙর করা, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং সম্ভাব্য পর্যায়ক্রমিক উপস্থিতির সুযোগ রয়েছে। এর জন্য আনুষ্ঠানিক সামরিক ঘাঁটি স্থাপনে যে বিপুল ব্যয় প্রয়োজন হয়, তা এড়ানো সম্ভব হবে।
ভারতের এ অঞ্চলের আধিপত্যের বিপরীতে চুক্তিটি একটি পরোক্ষ কৌশলগত ভারসাম্য বা ‘হেজ’ হিসেবে কাজ করতে পারে এবং প্রকৃত কৌশলগত গভীরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ইসলামাবাদের জন্য এটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তার প্রধান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি ‘পূর্ব রণাঙ্গন’ বা ‘ইস্টার্ন ফ্রন্ট’ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমানে আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তবে বাহিনীর আকারের তুলনায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতিও রয়েছে।
তুরস্কের ড্রোন, স্থল-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নৌ-শিল্প এবং পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধবিমান শিল্পের জন্য বর্তমান ক্রেতা-ভিত্তির বাইরে নতুন রপ্তানি বাজার প্রয়োজন। ২০২৪ সালে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের পর ঢাকা হঠাৎ উপলব্ধি করে যে, নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও অস্ত্রভান্ডার নতুন করে সাজানো প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারকদের জন্য বাংলাদেশ বড় ও স্থিতিশীল ক্রেতা হিসেবে সামনে এসেছে। এখানে শক্তিশালী দেশীয় প্রতিরক্ষা লবি বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাধাও নেই। উপসাগরীয় বা মধ্য এশিয়ার বেশির ভাগ বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে পণ্য বিক্রির সুযোগ সহজ এবং এর মাধ্যমে আগামী এক দশক পারস্পরিক সামরিক সক্ষমতার সামঞ্জস্য বজায় রাখা সম্ভব হতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে সহায়তা বা বাণিজ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের চেয়ে দুটি বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি হলো শ্রমশক্তিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার। শুধু সৌদি আরবেই প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন, যা দেশটিতে বসবাসকারী অভিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী। একই সঙ্গে সৌদি আরব বাংলাদেশের রেমিট্যান্সেরও প্রধান উৎস।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার বা ৫৮৫ কোটি ডলার আয় করেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহায়তা কিংবা বাণিজ্য-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণার বাইরে এই দুটি ‘লিভার’ বা প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা সম্পর্ক ঢাকার জন্য এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে পারে, যার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় অনুরোধ বা দরকষাকষির ক্ষমতাহীন অবস্থানের পরিবর্তে শ্রমিক কোটা, মজুরি সুরক্ষা ও ভিসার নিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো আলোচনার প্যাকেজের অংশ হিসেবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এটি সৌদি আরবে আগে থেকেই কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের উপস্থিতিকে এমন একটি দরকষাকষির উপকরণে রূপ দিতে পারে, যা রাষ্ট্রগুলো সাধারণত ব্যবহারের সুযোগ পায় না।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাত বর্তমানে পশ্চিমা পোশাক বাজারের ওপর বিপজ্জনক মাত্রায় নির্ভরশীল। এই বাজার এখন শুল্ক বা ট্যারিফ-সংক্রান্ত চাপের মুখে রয়েছে।
অন্যদিকে ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’-এর আওতাধীন পুঁজি এবং তুরস্কের শিল্প বিনিয়োগ এমন কিছু বিকল্প, যেগুলো এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। প্রতিরক্ষা ও শ্রমনির্ভর অংশীদারত্বের মাধ্যমে সার্বভৌম তহবিল বরাদ্দ ও যৌথ উদ্যোগে উৎপাদনের মতো নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আলোচনার মাধ্যমে এসব সুযোগ অর্জন করা কঠিন। কারণ ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলে বড় ধরনের পুঁজি প্রবাহের আগে নিরাপত্তা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, পরে নয়।
বাংলাদেশ তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত ও দক্ষ জনবল বা সৈন্য, ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের বাজারের মতো বিভিন্ন সুবিধা দিতে পারে।
এর বিপরীতে বাংলাদেশের উচিত এসব অবদানের যথাযথ মূল্য বা প্রতিদান নিশ্চিত করা। এর মধ্যে থাকতে পারে আকাশ-প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বর্ধিত প্রতিরোধ ব্যবস্থার নিশ্চয়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ উৎপাদন, টেকসই পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা তৈরিতে সহায়তা, সহজে ড্রোন ও অস্ত্র হস্তান্তর এবং রেমিট্যান্স প্রদানকারী শীর্ষস্থানীয় কর্মীদের জন্য সুবিধাজনক শ্রমশর্ত।
সব মিলিয়ে, মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের বিদ্যমান সম্পদকে এমন কিছু সক্ষমতায় রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা বর্তমানে দেশের নেই। চুক্তিটি যখন সম্প্রসারণের দিকে যাচ্ছে এবং এমন সদস্য খুঁজছে যারা শুধু বোঝা হয়ে থাকবে না, বরং দায়িত্ব ও ভার ভাগ করে নিতে পারবে, তখন বাংলাদেশের জন্য প্রতিদান নিশ্চিত করার উপযুক্ত সময় হতে পারে এখনই।
সে হিসেবে ‘মক্কা চুক্তি’তে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য একটি পারস্পরিক লাভজনক বা ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
সূত্র: আমার দেশ

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এ অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হলে কী ধরনের অবদান রাখতে পারবে এবং জোটে তার ভূমিকা কী হতে পারে? সম্ভাব্য নতুন সদস্যদের তুলনায় আঙ্কারা, ইসলামাবাদ ও রিয়াদের কাছে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বেশি কিছু দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। ফলে জোটের সদস্যরা সেই সক্ষমতাকে বিবেচনায় রেখেই আলোচনাকে এগিয়ে নিতে পারে।
মৌলিক বিষয় থেকেই এ আলোচনা শুরু করা যায়। সামরিক জোটকে সবসময় সভ্যতার ঐক্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিশৃঙ্খল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এসব জোটকে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সক্ষমতা ও সেবা বিনিময়ের একটি কাঠামো হিসেবে দেখা যায়, যেখানে সরবরাহকারী ও গ্রহীতার মধ্যে এক ধরনের লেনদেন থাকে।
তাই মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগদানের আগ্রহও কৌশলগত ও সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যনির্ভর হওয়া প্রয়োজন। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ এমন কী দিতে পারে, যা জোটের প্রতিষ্ঠাতা তিন দেশ গ্রহণে আগ্রহী হবে? একই সঙ্গে সদস্যপদ পেলে বাংলাদেশের নিজস্ব হার্ড-সিকিউরিটি বা কঠোর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কী ধরনের সুবিধা তৈরি হবে, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কয়েক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন মিশনে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ইউনিফর্মধারী সদস্য মোতায়েন করেছে। এর ফলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম সামরিক বাহিনীর একটি বিশেষায়িত দক্ষতায় পরিণত হয়েছে।
কঠিন ও প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশের বাহিনীগুলো বিমান চলাচল বা অ্যাভিয়েশন, জরুরি চিকিৎসা ও রোগী স্থানান্তর বা মেডিকেল ইভাকুয়েশন এবং প্রকৌশল কার্যক্রমের মতো ক্ষেত্রে বাস্তব দক্ষতা অর্জন করেছে। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে বাংলাদেশের একটি অ্যাভিয়েশন ইউনিট সৈন্য, সরঞ্জাম ও হতাহতদের পরিবহনে ৩৯ হাজার ঘণ্টার বেশি সময় কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই সফলভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।
তবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের আয় ও প্রশিক্ষণের সুযোগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ফলে বিদ্যমান সক্ষমতা ধরে রাখতে ঢাকার বিকল্প পৃষ্ঠপোষক বা সহযোগী প্রয়োজন।
মক্কা চুক্তির আওতায় যদি পর্যায়ক্রমিক বা ঘূর্ণায়মান বাহিনী, ঘাঁটি নিরাপত্তার জন্য দল কিংবা যুদ্ধকালীন অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশ তুলনামূলক কম সুযোগ ব্যয়ের বিনিময়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সৈন্য বা জনবল দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি ‘এক্সপিডিশনারি’ বা অভিযান-সক্ষম বাহিনী কিংবা ‘স্ট্যান্ডবাই’ বা প্রস্তুত বাহিনী মোতায়েন করতে পারে। এতে দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা কাঠামোর ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব বা উল্লেখযোগ্য সুযোগ ব্যয় ছাড়াই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে। এ ধরনের বিশেষায়িত বা ‘অ্যাসিমেট্রিক’ অবদান কোনো দেশকে জোটের জন্য বোঝা না বানিয়ে মূল্যবান অংশীদারে পরিণত করতে পারে।
জাতিসংঘের কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সম্পদশালী সদস্য সৌদি আরবের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। এর মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশের সেনাসদস্যরা যে আয় করে থাকেন, তার বিকল্প ব্যবস্থা দ্রুত তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
মক্কা চুক্তির তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশের কোনোটিরই বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থান নেই। একইভাবে মালাক্কা প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ নৌপথের কাছাকাছিও তাদের কোনো অবস্থান নেই।
একটি জোটের জন্য কোনো দেশের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ থাকা মানে লজিস্টিকস ও রসদ সরবরাহ, প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ, নজরদারি এবং চলাচলের সুবিধা পাওয়া। একই সঙ্গে ভৌগোলিক নৈকট্য প্রতিপক্ষের গতিবিধি ঠেকানো বা ‘ডিনায়াল ক্যাপাবিলিটি’ বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে।
ঢাকার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি হলে আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ পূর্ব ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে লজিস্টিকস ও চলাচলের সুবিধা পেতে পারে। এর মধ্যে বন্দরে নোঙর করা, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং সম্ভাব্য পর্যায়ক্রমিক উপস্থিতির সুযোগ রয়েছে। এর জন্য আনুষ্ঠানিক সামরিক ঘাঁটি স্থাপনে যে বিপুল ব্যয় প্রয়োজন হয়, তা এড়ানো সম্ভব হবে।
ভারতের এ অঞ্চলের আধিপত্যের বিপরীতে চুক্তিটি একটি পরোক্ষ কৌশলগত ভারসাম্য বা ‘হেজ’ হিসেবে কাজ করতে পারে এবং প্রকৃত কৌশলগত গভীরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ইসলামাবাদের জন্য এটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তার প্রধান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি ‘পূর্ব রণাঙ্গন’ বা ‘ইস্টার্ন ফ্রন্ট’ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমানে আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তবে বাহিনীর আকারের তুলনায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতিও রয়েছে।
তুরস্কের ড্রোন, স্থল-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নৌ-শিল্প এবং পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধবিমান শিল্পের জন্য বর্তমান ক্রেতা-ভিত্তির বাইরে নতুন রপ্তানি বাজার প্রয়োজন। ২০২৪ সালে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের পর ঢাকা হঠাৎ উপলব্ধি করে যে, নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও অস্ত্রভান্ডার নতুন করে সাজানো প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারকদের জন্য বাংলাদেশ বড় ও স্থিতিশীল ক্রেতা হিসেবে সামনে এসেছে। এখানে শক্তিশালী দেশীয় প্রতিরক্ষা লবি বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাধাও নেই। উপসাগরীয় বা মধ্য এশিয়ার বেশির ভাগ বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে পণ্য বিক্রির সুযোগ সহজ এবং এর মাধ্যমে আগামী এক দশক পারস্পরিক সামরিক সক্ষমতার সামঞ্জস্য বজায় রাখা সম্ভব হতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে সহায়তা বা বাণিজ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের চেয়ে দুটি বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি হলো শ্রমশক্তিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার। শুধু সৌদি আরবেই প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন, যা দেশটিতে বসবাসকারী অভিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী। একই সঙ্গে সৌদি আরব বাংলাদেশের রেমিট্যান্সেরও প্রধান উৎস।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার বা ৫৮৫ কোটি ডলার আয় করেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহায়তা কিংবা বাণিজ্য-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণার বাইরে এই দুটি ‘লিভার’ বা প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা সম্পর্ক ঢাকার জন্য এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে পারে, যার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় অনুরোধ বা দরকষাকষির ক্ষমতাহীন অবস্থানের পরিবর্তে শ্রমিক কোটা, মজুরি সুরক্ষা ও ভিসার নিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো আলোচনার প্যাকেজের অংশ হিসেবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এটি সৌদি আরবে আগে থেকেই কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের উপস্থিতিকে এমন একটি দরকষাকষির উপকরণে রূপ দিতে পারে, যা রাষ্ট্রগুলো সাধারণত ব্যবহারের সুযোগ পায় না।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাত বর্তমানে পশ্চিমা পোশাক বাজারের ওপর বিপজ্জনক মাত্রায় নির্ভরশীল। এই বাজার এখন শুল্ক বা ট্যারিফ-সংক্রান্ত চাপের মুখে রয়েছে।
অন্যদিকে ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’-এর আওতাধীন পুঁজি এবং তুরস্কের শিল্প বিনিয়োগ এমন কিছু বিকল্প, যেগুলো এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। প্রতিরক্ষা ও শ্রমনির্ভর অংশীদারত্বের মাধ্যমে সার্বভৌম তহবিল বরাদ্দ ও যৌথ উদ্যোগে উৎপাদনের মতো নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আলোচনার মাধ্যমে এসব সুযোগ অর্জন করা কঠিন। কারণ ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলে বড় ধরনের পুঁজি প্রবাহের আগে নিরাপত্তা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, পরে নয়।
বাংলাদেশ তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত ও দক্ষ জনবল বা সৈন্য, ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের বাজারের মতো বিভিন্ন সুবিধা দিতে পারে।
এর বিপরীতে বাংলাদেশের উচিত এসব অবদানের যথাযথ মূল্য বা প্রতিদান নিশ্চিত করা। এর মধ্যে থাকতে পারে আকাশ-প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বর্ধিত প্রতিরোধ ব্যবস্থার নিশ্চয়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ উৎপাদন, টেকসই পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা তৈরিতে সহায়তা, সহজে ড্রোন ও অস্ত্র হস্তান্তর এবং রেমিট্যান্স প্রদানকারী শীর্ষস্থানীয় কর্মীদের জন্য সুবিধাজনক শ্রমশর্ত।
সব মিলিয়ে, মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের বিদ্যমান সম্পদকে এমন কিছু সক্ষমতায় রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা বর্তমানে দেশের নেই। চুক্তিটি যখন সম্প্রসারণের দিকে যাচ্ছে এবং এমন সদস্য খুঁজছে যারা শুধু বোঝা হয়ে থাকবে না, বরং দায়িত্ব ও ভার ভাগ করে নিতে পারবে, তখন বাংলাদেশের জন্য প্রতিদান নিশ্চিত করার উপযুক্ত সময় হতে পারে এখনই।
সে হিসেবে ‘মক্কা চুক্তি’তে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য একটি পারস্পরিক লাভজনক বা ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
সূত্র: আমার দেশ

আপনার মতামত লিখুন